#আকাশ_যেমন_করে_হাসে – [০৩]
লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
–“বাড়ির নাম ‘ছুটি’ যে?
এই প্রশ্নটা একসময় আমার মনেও এসেছিল। তবে আমার বাবা, জবাব মাহাবুব হোসেন এর এক সুন্দর উত্তর দিয়েছিলেন। আমি বাবার উত্তরটাই আওড়ালাম,
–“মানুষ তো কর্মজীবনকে বিদায় দিয়ে বাড়িতে ছুটি কাটাতেই আসে। ছুটিই যে আমাদের বাড়ি।”
কথাগুলো হয়তো প্যাচানো লাগতে পারে। তবে এর মর্মার্থ গভীর। আমি হয়তো বাবার মতো এত গুছিয়ে বলতে পারিনি, তবে চেষ্টা করেছি। কেন যেন এখনো আমার কথা-বার্তা এলোমেলো, ঠিক গুছিয়ে বলতে শিখিনি। লিখতে পারব, তবে মানুষের সাথে চেনা-জানা না হলে আমার কথা বলা মুশকিল হয়ে পড়ে।
নিশীথ ভাই এ বিষয়ে কোনোপ্রকার কথা না বলে ভেতরে চলে গেলেন। আমি দেখিয়ে দিলাম দোতলার ডানপাশের ইউনিটটি আমাদের।
ইতি আপা নিশীথ ভাইকে আমার ঘরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন না। আমাকে দেখিয়ে দিবে বসার ঘরেই। আমি ভাইয়াকে অপেক্ষা করতে বসিয়ে গেলাম বই আনতে। আপা ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে ঢুকেছে। আজ আমি নিজে থেকেই শরবত বানিয়ে রেখেছি আপার জন্য, তার ঝাড়ি শোনা থেকে আজকের মতো বাঁচা গেল।
বই নিয়ে যখন ফিরলাম তখন দেখলাম নিশীথ ভাইয়ের নজর আমার বুকশেল্ফের দিকে। বুকশেল্ফটা আমার রুমে থাকার কথা হলেও আপা বসার ঘরেই রেখেছে। বুকশেল্ফ নাকি বসার ঘরটা আরও সুন্দর করে তুলেছে। আমি বসতেই ভাইয়া বলল,
–“সাইন্সের স্টুডেন্টের ঘরে ইতিহাসের বই? স্ট্রেঞ্জ!”
আমি মিনমিন করে বললাম,
–“আমার ইতিহাস ঘাটাঘাটি করতে ভালো লাগে।”
–“তাহলে সাইন্স পড়ার কি দরকার?”
এর উত্তর আমার দেওয়া হলো না। নিশীথ ভাইয়ার তখনো ভ্রু কুঁচকানো। আমাদের মাঝে আর আলাপ হলো না। খুব দ্রুত পড়াশোনায় ঢুকে যেতে হলো। মিনিট বিশেকের মাঝেই উনি আমার অসংখ্য ভুল ধরে কপাল কুঁচকে ফেলল। যেন আমাকে পড়ানোর নামে বিরাট বড়ো বোঝা কাঁধে তুলে নিয়েছে। এর মাঝে আপা আসল সন্ধ্যার নাস্তা নিয়ে। আপার চোখ-মুখে আশা। যেন সে আশা করছে নিশীথ নামক মানুষটার মাধ্যমে আমার ফেইল ঘুচবে। খুব অবাস্তব ভাবে আমিও পদার্থ বিজ্ঞানে টপ করে ফেলব।
ইতি আপা নাস্তা টি-টেবিলের একপাশে রেখে নিশীথ ভাইকে জিজ্ঞেস করল,
–“কী অবস্থা ওর? কী দেখলে?”
–“জটিল সমস্যা, আপু।”
বোধ হয় সরাসরি, প্রথমবারের মতো আপা এবং ভাইয়ার মাঝে কথোপকথন শুনলাম। আপাকে কি দারুণ করে আপু ডাকছে। মনোযোগ দিয়ে মানুষটার দিকে তাকালামও একপলক। নিঃসন্দেহে সে একজন সুদর্শন শ্যামল পুরুষ। শক্ত চোয়াল, হালকা-পাতলা দাঁড়িতে হয়তো মেয়েটা পটে যাবে। আমার বান্ধবী বৃষ্টি দেখলে হয়তো এতক্ষণে মনের সর্বনাশটা করে ফেলত, আর আমাকে দিন রাত জ্বালাত। ভাগ্যিস মেয়েটা দেখেনি।
ইতি আপা চিন্তিত সুরে বলল,
–“সে কি, জটিল?”
–“জি। ইন্টার পরীক্ষা খুব বেশি দেরী নেই। এমতাবস্থায় সিলেবাস কমপ্লিট করাটা খুবই কষ্টসাধ্যের হয়ে যাবে।”
–“দেখো ভাই, কিছু করতে পারো কিনা। ইন্টার পরীক্ষায় তো আর ফেইল আসতে পারে না।”
নিশীথ ভাই এবার মাথা তুলে তাকাল না। বইয়ের ভাজে নজর স্থির করে সময় নিয়ে বলল,
–“একচুয়ালি ওকে জোর করে সাইন্সে পড়ানো উচিত হয়নি। যে যেটাতে আগ্রহী তাকে তাতেই পড়তে দেয়া উচিত। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু রেজাল্টই ভালো আসে না।”
নিশীথ ভাইয়ের খুব স্বাভাবিক, সরল কিছু বাক্য ছিল। অথচ এই সামান্য কথাগুলোই আমার ওপর প্রভাব ফেলল। কেউ সামান্য কথায় প্রেমে পড়ে? আমি পড়েছিলাম। সেদিন, সেই মুহূর্তে। আমার বান্ধবী ‘বৃষ্টি’-র আগে মনের সর্বনাশটা আমারই ঘটে যায়। বোধ হয় সেদিনই এমন হয়েছিল, আমাকে প্রথমবারের মতো কেউ বুঝতে চেষ্টা করেছিল। কেউ আমার হয়ে কথা বলেছিল।
নিশীথ ভাইয়া রোজ পড়াতে আসতেন না। সপ্তাহে সর্বোচ্চ তিন দিন, তাও কম। বেশিরভাগ দুইদিনই হতো। বেচারার হাসপাতালে নতুন চাকরি। ইন্টার্নি না করলে হয়তো এতদিনে এই দুই মিলে পাগল হয়ে বসত। কিন্তু ভদ্রলোক বেশ ধৈর্যশীল। আন্টি বলেছিলেন খুব বোরিং স্বভাবের। কিন্তু আমার কখনোই এমন লাগেনি। যেখানে বান্ধবীরা প্রেমে পড়ে রং বেরঙের শব্দ আওড়াত, আমার তখন এই চুপচাপ, কথা কম বলা মানুষটাকেই রঙিন লাগতে শুরু করল। আঠারোর প্রথম প্রেম, তাকে ঘিরে কল্পকথা লিখতে তো জমানো টাকা দিয়ে একটা ডায়েরীও কিনে নিলাম। এখন অবধি কয়েক পাতার শব্দ লিখেছি।
নিশীথ ভাইয়া আমার পুরোপুরি স্যার, এমনও বলা যাচ্ছে না। তাকে আমি শিক্ষক কম, ভাই ডাকি বেশি। শিক্ষকের চাইতেও বেশি সম্মান নিয়ে তিনি আমার মনে স্থান পেয়েছে। এইতো, সেদিন.. যখন আমি পড়ছিলাম, আমার ফোনে আননোন নাম্বার থেকে কল এলো। ইদানীং এই রং নাম্বার আমাকে বিরক্ত করছে। এটা খুব সম্ভবত কোনো বখাটে। একবার কল রিসিভ করেই বুঝেছিলাম। কিসব সুন্দরী, টিয়াপাখি, রূপবতী বলে ফ্যানা তুলছিল। আমি মুখের ওপর কল কেটে দিয়েছিলাম।
কিন্তু নিশীথ ভাইয়া আমার দিকে জিজ্ঞেস করেছিল,
–“কে?”
–“চিনি না। হবে কোনো বখাটে।”
–“বিরক্ত করে?”
আমি শুধু মাথা নাড়িয়েছিলাম। ভাইয়া তখনই অনুমতি নিয়ে কল রিসিভ করল। ভাইয়ার বেশি কিছু বলতে হয়নি। শুধু তার পুরুষালি শক্ত কণ্ঠস্বরই ছিল ঘটনার ইতি টানার। অগত্যা, সেই নাম্বার থেকে আর কখনো কল এলো না। এরপর থেকে আমিও ছুঁতো পেলাম। রং নাম্বার থেকে কল আসলেই আমি নিজে থেকে মোবাইল এগিয়ে দেই। বাকিটা নিশীথ ভাইয়া নিজ দায়িত্বে বুঝে নেয়। এরপর আরও একটা উপলব্ধি হলো, মানুষটা আমার ভরসারও জায়গা হয়ে গিয়েছেন।
হেনা আন্টির সাথে আমার প্রায়ই বসা হয়। আমি তাদের বারান্দায় যেই। গোলাপবাড়ির এই বারান্দায় বসার স্বপ্ন পূরণ হয় আন্টির সাথে দেখা করতে এলেই। হেনা আন্টিও চোখ চকচক করে বললেন,
–“যাক, আমার কারণে একটু তো তোর মুখের হাসিটা দেখতে পারি।”
আমি হেসে দেই আন্টির কথাতে। আন্টি সেই হাসির উপহারস্বরূপ গুড় হাতে ধরিয়ে দেন। তাদের মানিকগঞ্জের বিখ্যাত গুড়। বাড়ি থেকে কেউ এনে দিলে উনি প্রায়ই আমাদের হাত ধরে দিয়ে দেন। এবং আদেশের সুরে বলেন,
–“বেশি, বেশি গুড় খাবি। মিষ্টি খেলে চাপ কমে।”
আমি শুধু হেসেছিলাম আন্টির উদ্ভট কথায়। নিশীথ ভাইয়া আমার রুটিন সেট করে দিয়েছিল। সেই রুটিন অনুযায়ী আমি পড়া আগাতে লাগলাম। পদার্থ বিজ্ঞান আমি এখনো সেভাবে বুঝি না৷ তবে এটুকু বলতেই পারি.. আগের থেকে কিছুটা উন্নতি অবশ্য হয়েছে।
এসব ঘটনার মাঝে একদিন ইতি আপার হাসবেন্ড জিহাদ ভাই এলেন। ঘুরে গেলেন দুই দিনের মতো। তিনি আসাতে আমার একটুর জন্য হলেও পড়াশোনার থেকে ছুটি মিলেছিল। হেনা আন্টি তো ভাইয়ার আসার খবর শুনে এক দুপুরের দাওয়াত দিলেন আমাদের। ভাইয়াও নতুন মানুষদের সাথে আলাপ করে বেশ সন্তুষ্টই হলেন।
আমার বাবা ইদানীং বাড়ি ফিরেন না। প্রায়ই তাকে সিলেট গিয়ে থাকতে হয়। বাবার ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য মূলত সিলেটেই। ইদানীং যখন আসলেন, দেখলাম বাবার চিন্তিত মুখ। আমাকে দেখলেই কেমন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এই দীর্ঘশ্বাসের কারণ জেনেছি গত রাতে। বাবা আমাকে বিয়ে দিতে চান, হাতে পাত্র আছে ভালো। আমার যেহেতু পড়াশোনা নড়বড়ে.. বিয়ে দিয়ে সংসারমুখী হলে মন্দ কি?
কিন্তু আপা তা হতে দিলেন না। তাদের দুজনের মাঝেই কথা কাটাকাটি হয়েছিল। আমি নীরবে রুমে চলে আসা ছাড়া আর কিছু করতে পারিনি। মায়ের সাদা-কালো ছবিতে চেয়ে শুধু ভাবছিলাম, আমি কী এতটাই বোঝা? সাইন্স নাহয় একটু কম বুঝি, তাই বলে বাবা আমাকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করবেন? আমি টের পাই, বাবা আমাকে নিয়ে সর্বদা দুশ্চিন্তায় থাকেন। আমাকে নিয়ে অনেকেই অনেক কুমন্ত্রণা দেয়, সেটাও জানি। তাই বলে বাবা একবারও কি জানার চেষ্টা করবে না আমি কি চাই? যখন সাইন্স নিতে বলেছিল সবাই তখন তো আমি হাসি-মুখেই মেনে নিয়েছিলাম। এখন এটা একটু কম বুঝলে আমার কী করার আছে? আমি তো চেষ্টা করিই।
সামনে পরীক্ষা। তবুও একদিন এক অকাজ করে বসলাম। হঠাৎ করেই ক্লাস বাংক দিলাম আমি। দিয়েছিলাম মূলত নিজেকে সময় দিতেই। কিন্তু এতেও ঘটে গেল বিপত্তি। আমার এই সুন্দর মুহূর্তে ব্যঘাত ঘটাল সর্বনাশা বৃষ্টি। কলেজ থেকে বের হওয়ার আগেও ধরতে পারিনি আকাশ এমন শত্রুতা করবে আমার সঙ্গে। অগত্যা, ভিজতে ভিজতে এক ছাউনির নিচে দাঁড়াতে হলো। কিন্তু এতেও লাভ হলো না। বাতাসে বৃষ্টির বেগ ঘুরে ছাউনিতেও ভিজে গেলাম। ভাগ্যিস সকালে মেঘলা আকাশ দেখে ব্যাগের বইগুলো পলিতে মুড়িয়ে নিয়েছিলাম। পরে অবশ্য আকাশ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার নামল তুখোড় ঝড়।
বৃষ্টি কিছুটা কমে আসতেই আমি ছাউনি থেকে বেরিয়ে গেলাম। নীরবে হাঁটতে হাঁটতে অদূরে দেখলাম নিশীথ ভাই এদিকেই আসছে। তার নজর আমার ওপর। আমার গা কেমন শিউরে উঠল। মানুষটা এপ্রোন পরা। যেন সদ্যই হাসপাতাল থেকে ফিরছে। হেনা আন্টির থেকে শুনেছি তার নাইট ডিউটি ছিল। এখন ঘড়িতে বোধ হয় দেড়টার মতো বাজছে। উনি এই সময়ে বাড়িতে না গিয়ে রাস্তায় কি করছে?
নিশীথ ভাইয়া আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
–“ভিজছ কেন?”
–“মন্দ লাগছে না!”
–“তাই বলে একা? কলেজ নেই?”
আমি আমতা আমতা করে বললাম,
–“আপনিও তো ভিজছেন।”
–“আমার হিসেব আলাদা। তুমি কলেজে না গিয়ে এখানে কী করছ?”
–“বা-বাঙ্ক দিয়েছিলাম।”
নিশীথ ভাইয়া আমার ভেজা মুখটায় তাকাল। এরপর কী যেন ভেবে তিনিও আমার পাশে হাঁটতে শুরু করল। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম,
–“আপনি আমার সাথে যে?”
–“কেন? থাকতে পারি না? মা যদি জানতে পারে তার প্রিয় সঙ্গীকে আমি বৃষ্টির মাঝে একা ছেড়েছি আমাকে বাড়ি ছাড়া করবেন।”
–“কিন্তু আপনি তো সারা রাত ডিউটি করে ক্লান্ত।” আমার এটুকু কথাতেই ওনার জন্য আকাশসম চিন্তা বৃষ্টির মতো ঝরছিল। কিন্তু হুঁশ ফিরতেই জিভ কাটলাম। ছি, কী বলে ফেললাম?
নিশীথ ভাইয়া সেই প্রসঙ্গে না গিয়ে বলল,
–“নীলক্ষেত গিয়েছিলাম। বৃষ্টিতে ক্লান্তি আসছে না।”
আমরা পাশাপাশি হাঁটলাম। একসময়ে আমাদের রাস্তা পার হবার সময় হলো। নিশীথ ভাইয়া আমার দিকে ফিরে বলল,
–“আমার হাতের ব্যাগটা ধরে নাও। রাস্তা পার হবো!”
আবারও সারা গায়ে কম্পন খেলে যায় আমার। নিশীথ ভাইয়া চাইলেই আমার হাত ধরার অনুমতি চাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। আমি লাজুক মুখ নিয়েই ওনার হাতের ব্যাগ ধরে, ওনার পিছুপিছুই রাস্তা পার হলাম৷ আমার মনে হচ্ছিল কলেজ বাঙ্ক দিয়ে ভুল কিছু করিনি। বরং সেরা সিদ্ধান্তটাই নিয়েছি। নয়তো তার সাথে আমার এই কাকতালীয় দেখা হওয়া সম্ভব হতো?
–“এখনই বাড়ি ফিরে যাবে?”
–“না! আরও ঘুরতে চাই।”
কে জানে কেন, নিশীথ ভাইয়া আমার ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিল। হয়তো তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন.. আমার পড়াশোনার থেকে কিছুটা বিরতি দরকার। তাই ঘুরলেই বরঞ্চ ভালো হবে।
–“বেশ, তবে বাড়িতে কল করে বলে দাও.. আজ ফিরতে দেরী হবে। আমিও মাকে বলে দিই। ছাত্রীর এটুকু ইচ্ছেতে যদি রেজাল্ট ভালো হয়, তবে তাই সই।”
আমার কী হলো কে জানে। আমি খিলখিল করে রাস্তার মাঝেই হেসে ফেললাম, যা আমার নিত্যদিনের আচরণের সম্পূর্ণ বিপরীত। কী সুন্দর করে বলল মানুষটা, “বাড়িতে কল করে বলে দাও, আজ ফিরতে দেরী হবে।” আমি একবার কেন, বারবার বলতে রাজি আছি যে.. ডাক্তার সাহেব।
আমাদের ঘুরোঘুরি হলো বিকাল অবধি, ভেজা শরীরেই। ব্যাগে ভাইয়ার এক্সট্রা এপ্রোন ছিল। তিনি সেটাই আমাকে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন,
–“এটা পরে নাও।”
এটা দেওয়ার সময় নিশীথ ভাইয়া আমার দিকে তাকাননি। তখন আশেপাশে মানুষও তেমন ছিল না। অথচ তার এই ছোটো ছোটো যত্ন আমাকে আরও গলিয়ে দিল মানুষটার প্রতি। শুকনো এপ্রোনটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে আমি রিকশায় চড়লাম। আড়ালে এপ্রোন থেকে নিশীথ ভাইয়ার ঘ্রাণ নিতেও ভুললাম না। প্রেমে পড়া যদি বাচ্চামো হয়, আমি তবে সেই বাচ্চাটাই হয়ে যাই কিছু সময়ের জন্য।
ঘুরোঘুরি শেষে নিশীথ ভাইয়া নিজেই বাড়ির সামনে পৌঁছে দিলেন।
–“এপ্রোন দিতে হবে না। তুমি আপাতত বাড়ি যাও। ও হ্যাঁ..”
বলেই ভাইয়া তার ব্যাগ থেকে একটা বই এগিয়ে দিল। এটি মোনালিসার ছবি সংক্রান্ত এক বই। আমি অবাক হলাম। অস্ফুট স্বরে বলে বসলাম,
–“এটা আনতেই নীলক্ষেত গিয়েছিলেন?”
–“হ্যাঁ। ভাগ্যিস ভিজেনি খুব একটা। বইটা শুকিয়ে নিয়ো। আসি!”
বলেই নিশীথ ভাইয়া চলে গেল আমাকে একরাশ ভালো লাগায় ডুবিয়ে। আমি বাড়িতে ঢুকেই বইয়ের ভেতরটা দেখলাম। অবাক হয়ে দেখলাম প্রথম পৃষ্ঠায় নিশীথ ভাইয়ার হাতের লেখা। ডাক্তারদের লেখার ছিড়িঁবিড়ি আমার কখনোই পছন্দের না। এরা কোনোমতে প্রেসক্রিপশন লিখেই খালাশ। হাতের লেখা বুঝল কি বুঝল না সেটা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। নিশীথ ভাইয়ার লেখাটাও ওই সকল ডাক্তারদের মতোই। তবে তাদের চাইতে এক চিমটির মতো পরিষ্কার। বৃষ্টির পানির কারণে লেখার কালি কিছুটা ছড়িয়ে গেছে। সেখানে লেখা,
“অরিত্রী,
ইতিহাস পড়তে পছন্দ করো বিধায় এই সামান্য উপহার। এবার অন্তত পাশ করে আমার সম্মানটা বজায় রেখো। নয়তো মা আমাকে অপদার্থ শিক্ষক বলে উত্ত্যক্ত করবেন।
নিশীথ ইউসূফ~~”
১১ আগস্ট ২০০৭
————————————-
একদিন হুট করেই ইতি আপা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। নিশীথ ভাইয়া আমাদের সাহায্য করলেন আপাকে হাসপাতালে নিতে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রিপোর্টে এলো আপা অন্তঃসত্ত্বা। সেই সম্পর্কে আপা খুশি হওয়ার বদলে কাঁদছেন বেশি। আপার এই কান্না আমাকে আর বাবাকে ভড়কে দিল।
–“আপা, এভাবে কাঁদছ কেন? খুশির সংবাদে কাঁদতে হয় নাকি? আমাদের বাড়িতে যে নতুন সদস্য আসছে।”
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~
