“আকাশ যেমন করে হাসে” – [০২]
লাবিবা ওয়াহিদ
[কপি অন্যত্র সম্পূর্ণ নিষেধ]
ফ্রড?? বাড়িতে আসার পর থেকে আমার মাথাতে এই একটা শব্দই ঘুরপাক খাচ্ছে। সঙ্গে আকাশসম বিস্ময়! আমি কল্পনাও করতে পারছি না হেনা আন্টি সত্যি সত্যি আমাদের এলাকাতেই শিফট করবেন। আন্টির নাম হাসনাহেনা, আমাকে হেনা আন্টি বলতে বলেছিলেন।
কিন্তু তারা তো মানিকগঞ্জে ছিল। ঢাকার এই মফস্বলে কী করছে? ব্যাপারটা এতই আমাকে মুশকিলে ফেলল যে আমি ভাত অনেকটা নরম করে ফেললাম। ভর্তা ভর্তা যাকে বলে! এই নরম ভাতই আমার দুপুরে গিলতে হলো। ইতি আপা জানলে কপালে দুঃখ আছে। কিন্তু তবুও, গোলাপবাড়ির ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে বের হচ্ছে না।
গোলাপ বাড়িটা এই মফস্বলের অন্যতম তিন তলা বাড়ি। বাড়ির চাইতেও বাড়ির আশেপাশ খোলামেলা। সাজানো-গোছানো গাছ-পালা। এমনকি ছোটোখাটো পানির ফোয়ারাও রয়েছে। উঁচু দেয়াল পেরিয়ে ভেতরে মনে হবে অন্য এক দুনিয়াতে চলে যাই। শখ করে মালিক বাড়ির নাম “গোলাপবাড়ি” রাখলেও তার বাড়িতে অঝোর ধারার গোলাপ নেই। নিতান্তই শখের বসেই নামটা দেওয়া। অথচ নাম শুনলে যে কেউ ভেবে বসবে অনেক গোলাপে ভরপুর। যেমন হেনা আন্টির ভুল ধারণা হয়েছিল। তিনি ভেবে ফেলেছিলেন গোলাপবাড়ি মানেই অসংখ্য গোলাপে ভর্তি হবে হয়তো।
বাড়ির মালিক ভীষণ সৌখিন, তাই তার সবকিছুতেই সৌখিনতার ছোঁয়া। শুরুর দিকে যখন বাড়ি হয়েছিল, তিনি সম্ভবত ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি কখনো বাড়ি ভাড়ায় দিবেন না। ওনারা তিনতলায় শুরু থেকেই থাকে। অথচ কিছুদিন আগে থেকে ভাড়া দেওয়া শুরু করল। এখানেও বলা হলো যে দোতলা ভাড়া দেবেন না। অথচ দোতলার সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ ওই বড়ো বারান্দা। ওখানটা দিনে যতটা সুন্দর দেখায় রাতে ঠিক ততটাই ভুতূড়ে লাগে। কারণ ওই বারান্দায় আলো জ্বালানোর মতো কেউ ছিল না। কিন্তু এখন সম্ভবত আছে। আমাদের বারান্দা দিয়ে দেখেছি সেই বারান্দায় হেনা আন্টিকে। তিনি বেশ খুশিমনে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছিলেন।
আমি রয়েসয়ে আবারও আমাদের বারান্দায় এলাম। রাস্তার ওপারের, দুই বাড়ি পরেই গোলাপবাড়িটা মাথা তুলে দাঁড়ানো। হেনা আন্টি এখনো বারান্দায় বসা। সম্ভবত এই অচেনা মফস্বলকে চেনার চেষ্টা করছেন। আরেকটু ভালো করে তাকালে দেখা যাবে ওনার সেই নাম না জানা ছেলে মালপত্র টানতে বাকিদের সাথে হাত দিয়েছে। এই পরিবারে কী তবে সদস্য সংখ্যা দুজন?
আবারও মাথায় “ফ্রড” শব্দটা নড়ে উঠল। উফ, এই লোকের বলা কথাগুলো এমন কাঁটার মতো ফুটছে কেন শরীরে? আমাকে বিশ্বাস না করাটাই তো স্বাভাবিক। ওরা তো আমার মতো বোকা নয় যে রং নাম্বারে যাকে তাকে ঠিকানা দিয়ে বসবে।
আমি আবারও নিজেকে চিমটি কাটলাম। নাহ, এটা কোনো অংশে স্বপ্ন কিংবা ভ্রম নয়। রং নাম্বার আসলেই প্রতিবেশি হয়ে গিয়েছে। তাও আবার আমার সবচেয়ে প্রিয় ঘরটার। ভয়ে আমার বুক কাঁপছে। যদি আপা কখনো জানতে পারে আমি রং নাম্বারে কাউকে এই এলাকার ঠিকানা দিয়েছি আপা তো আমাকে সোজা বাড়ি ছাড়া করবে। আমি ভয়ে মোবাইল বন্ধ করে রাখলাম।
সন্ধ্যার সময়ে ঘুম ভাঙল কলিংবেলের শব্দে। দ্রুত উঠে দরজা খুলে দিতেই দেখি আপা ঘর্মাক্ত মুখে আমার দিকে গরম চোখে চেয়ে আছে। আমি ভড়কে গেলাম।
–“কখন থেকে বেল চাপছি কানে শুনিস না?”
আমার মুখ ছোটো হয়ে গেল।
–“ভুল হয়ে গেছে আপা। আমি ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।”
ইতি আপা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে তর্ক করল না আমার সাথে। বসার ঘরের ফ্যান চালু করতে করতে বলল,
–“মোবাইল কোথায়? সেটা বন্ধ কেন গর্ধব?”
–“চা-চার্জ নেই!”
আপা বেশি জিজ্ঞাসাবাদের আগেই আমি ছুটলাম শরবত বানাতে। আজও আপা একই গান লাগিয়ে রেখেছে। সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমাই তাই ফেইল করি৷ আপার জন্য সামান্য এক গ্লাস শরবত বানানো যায় না। আমি দম খিঁচে শুনে গেলাম। অন্তত আমি যা অকাজ করেছি, তা যাতে ধরা না খাই আমার সেই প্রত্যাশা।
শরবত খেয়ে আপা বুঝি কিছুটা ক্ষান্ত হলো। নিজের ঘরে চলে যেতেই আমিও ছুটে গেলাম আমার ঘরে পড়তে বসতে। আপার আদেশ, সে ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আমি পড়তে বসি। আমার পদার্থ বিজ্ঞানের ফেইলের কারণে আপা টিভির লাইনও কেটে দিয়েছে, আমার অবসর কাটানোর সবচেয়ে বড়ো উৎসটাও আমার খুয়াতে হয়েছে।
ঘণ্টাখানেকও হয়নি, হঠাৎ আপা আমার রুমে এসে হাজির। আমি আপাকে দেখে আবারও ভড়কে গেলাম। অজানা কারণে ঘামছি, অথচ ফ্যান দিব্যি চলছে। ইতি আপা সন্দেহের চোখে তাকাল।
–“অরিত্রী?”
–“জ-জি?”
–“কোনো অকাজ করেছিস?”
গলা শুকিয়ে গেল আপার প্রশ্নে৷ যা ভেবেছিলাম তাই। আবারও আপার হাতে ধরা খেলাম। কিন্তু এবার কিছুতেই মুখ খুলতে চাইলাম না। আপা জানলে আমারই বিপদ। আমি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস আনার চেষ্টা করলাম। আমতা আমতা করে অস্বীকার করলাম,
–“কই, না তো? কিসব বলছ আপা?”
–“খবরদার মিথ্যে বলবি না। তোর চোখ-মুখই বলে দিচ্ছে কিছু তো করেছিস। সত্যি বলবি নাকি গরম খুন্তিটা আনব?”
এবার আমার কাঁদো কাঁদো অবস্থা হলো। আপা আমাকে এক দণ্ড ছাড় না দিয়ে একই স্থানে দাঁড়ানো। চোয়াল শক্ত। ক্লান্ত মুখটায় একফোঁটা দয়ার ছাপ নেই। আমি বাধ্য হয়ে বললাম,
–“একটা ভুল হয়ে গেছে আপা।”
–“সেটা কী?”
–“আমি একটা রং নাম্বারে কথা বলে ফেলেছিলাম। এক আন্টির সাথে। হেনা আন্টি মানিকগঞ্জের ছিল। ওনাকে আমি ভুল করে গোলাপবাড়ির সম্পর্কে বলে দিয়েছিলাম। আজ দেখি আন্টি ওই বাড়ির দোতলায় উঠেছে।”
–“তুই কীভাবে জানলি যে ওরাই সেই বাড়িতে উঠেছে?”
আমি শুকনো মুখে বললাম,
–“কলেজ থেকে ফেরার পথে আমি ভুল করে তাদের কথোপকথন শুনে নিয়েছিলাম। আমার নাম নিয়েছিল আন্টিটা। এমনকি তার কণ্ঠও একই। বিশ্বাস করো আপা। আমি ওদের বলিনি এখানে আসতে। আমি জানতামও না চলে আসবে। আমাদের তো কথাবার্তাও বন্ধ ছিল অনেকদিন। আমি পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম!”
আমি ভাবলাম আপা আমার এসব গল্পকে মিথ্যা মনে করবেন। করাটাই স্বাভাবিক। এমন নাটকীয় ঘটনা তো সিনেমাতেই হয়, বাস্তবে হয় নাকি? তাও আমি আশায় রইলাম যে আপা আমাকে বিশ্বাস করবে। সত্যিই করল। কিন্তু আপা খুব রেগে যায়। ইতি আপা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“আহাম্মক একটা! মানুষ করতে পারলাম না এখনো।”
ঠিক পরেরদিন রাতে ইতি আপা এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। সে নুডুলস রান্না করে আমাকে ডেকেছে যেন মাথায় ঘোমটা দেই। আমি মাথায় ঘোমটা দিতে দিতে বলি,
–“কোথাও যাচ্ছি?”
আপা একটি টিফিনবক্সে নুডুলস নিয়ে বলল,
–“হুঁ! গোলাপ বাড়ি।”
আমি চরম অবাক হলাম।
–“কিন্তু কেন?”
–“তুই যেই অকাজ করেছি তা ভালো মতো ঘেটে দেখতে। কাদের সাথে রং নাম্বারে ভাব করেছিস সেটাও তো জানা দরকার।”
বলেই আপা আমাকে টেনে নিয়ে গেল গোলাপ বাড়ি। যেই বাড়িতে আসার জন্য আমি সর্বদা উৎসুক হয়ে থাকতাম, আজ সেই বাড়িটা আমার কাছে কেমন জমের বাড়ি মনে হচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছে এই বাড়ি থেকে বহুদূর পালিয়ে যাই। আমাদের পা জোড়া থামল দোতলার এক ফ্ল্যাটের মুখে। বেল বাজাতে গিয়ে বুঝলাম বেল নেই। তাই বদ্ধ দরজাতেই কড়া নাড়তে হলো। কিছু সময়ের ব্যবধানে স্বাস্থ্যবতী এক ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দিলেন। আমার তাকে চিনতে অসুবিধা হলো না যে ইনিই হেনা আন্টি। আমি আপার পেছনে থাকার চেষ্টা করলাম।
ইতি আপা বাড়িতে যতটা বদমেজাজী, বাড়ির বাইরে ঠিক ততটাই আন্তরিক। আপা খুব সুন্দর করে সালাম দিয়ে বলল,
–“আসসালামু আলাইকুম আন্টি। আমি ইতি, আপনাদের প্রতিবেশি। শুনলাম আপনারা নতুন এসেছেন, তাই দেখা করতে এসেছি।”
হেনা আন্টি বোধ হয় খুশি হলেন আপাকে পেয়ে। তখনো আন্টি আমাকে সেভাবে লক্ষ্য করেননি।
–“ওয়া আলাইকুম আসসালাম, ইতি। আসো আসো। ভেতরে আসো।”
ইতি আপা সৌজন্যতার সাথে ভেতরে প্রবেশ করল, আন্টিকে সাথে নিয়ে আসা নুডুলসও দিল। আন্টি এতে হেসে দিয়ে বললেন,
–“আরেহ, এখনো পরিচিতই হলাম না— খামাখা এটা আনার কী প্রয়োজন ছিল মেয়ে? এসো বসো। প্রথমেই দুঃখিত বলে নিই, বাড়ি কিন্তু এখনো সেভাবে গোছাতে পারিনি। আমরা আন্টির সাথে বসতেই আমার অদূরে নজর আটকাল। রান্নাঘরের কাছাকাছি সেই যুবক অর্থাৎ আন্টির ছেলে ফিল্টার বসানোর কাজে ব্যস্ত। হেনা আন্টি আমার দিকে তাকালেন।
–“কী মিষ্টি মেয়ে তুমি! নাম কী তোমার?”
আমি এবার নার্ভাস হয়ে আপার দিকে তাকালাম। নাম বললেই তো চিনে ফেলবে। আপা আড়ালে চোখ রাঙানি দিল। এর অর্থ হলো আমি যেন ভদ্রমহিলাকে নিজের পরিচয় দেই। আমি কী মনে করে আবার সেই ছেলেটার দিকে তাকালাম। এবার কেন যেন ভদ্রলোকও আমার দিকে তাকাল। আমি অনুভব করলাম আবারও আমার গলা শুকিয়ে গেছে। আমতা আমতা করে বললাম,
–“অ..অরিত্রী।”
হেনা আন্টি চমকে গেলেন। অস্ফুট স্বরে বললেন,
–“তুমি অরিত্রী? রং নাম্বারে আমার কথা বলার সঙ্গী?”
আমি মাথা নাড়াই। মনে হলো আন্টিকে পরিচয় দিয়ে ভুল করিনি। আন্টি তৎক্ষণাৎ আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলেন,
–“আহ, অরিত্রী! কত মিষ্টি দেখতে তুমি, একদম কল্পনার বাইরে। ভাবতেই পারিনি তোমার সাথে এভাবে দেখা হবে। তোমার ফোন বন্ধ বলছিল কেন? কাল থেকে চেষ্টা করছি।”
গতকাল থেকে আমি মোবাইল বন্ধ করে রেখেছিলাম আতঙ্কে। এটা তো আর বলতে পারি না। আন্টি সেই বিষয়ে বিশেষ কিছু জানতে চাইলেন না। তিনি উলটো ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কীভাবে আপ্যায়ন করবেন। আমি আবারও ছেলেটার দিকে তাকালাম, সে আমার দিকে একপলক তাকিয়ে আবারও নিজের কাজে ধ্যান দিয়েছে। যেন আমার প্রতি ওনার কোনোরূপ আগ্রহ নেই। উলটো আমি যেন তার বিরক্তির কারণ। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগল না, তবে আপার ব্যাপারটা পছন্দ হলো। ছেলেটা আমাদের দিকে তেমন তাকাচ্ছে না। এর মানে এই ছেলেকে নিয়ে তার ভয়ের কারণ নেই। ইতি আপা আবার খুব মানুষ পড়তে জানে।
হেনা আন্টি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, চানাচুর, চা-বিস্কুটের ব্যবস্থা করে ফেললেন। ইতি আপা সৌজন্যতা বজায় রেখে বলল,
–“এসবের কী প্রয়োজন ছিল আন্টি?”
–“ধুর, কী বলো। তোমরা এসেছ নিজে থেকে এতে আমি খুব খুশি হয়েছি। ইতি বোধ হয় অরিত্রীর বড়ো বোন হও। তাই না?”
–“জি আন্টি।”
ওনাদের মাঝে অল্প সময়ের মাঝেই খুব ভাব হয়ে গেল। কথাবার্তার ফাঁকে হেনা আন্টি তার ছেলেকে ডাকলেন,
–“আসো তোমাদের সাথে পরিচিত করিয়ে দেই। ও আমার একমাত্র ছেলে, নীশিথ। বাবা, সালাম দাও আপুকে।”
নীশিথ নামের মানুষটা সালাম দিল। বুঝলাম, আপার থেকে বয়সে ছোটো। আন্টি আবারও বলল,
–“নীশিথ ডাক্তারি পড়েছে। সবেই ইন্টার্নি শেষ, এখন বেসরকারি এক হাসপাতালে চাকরি পেল। আমার গর্ব আমার ছেলে। বড়ো এক মেয়ে আছে। ওর শ্বশুরবাড়ি ঢাকাতেই।”
বলেই এবার আন্টি আমার দিকে তাকালেন।
–“দুঃখিত আমাদের মাঝে অনেকদিন যোগাযোগ হয়নি। আসলে হয়েছে কি, হঠাৎই আমি অসুস্থ হয়ে যাই। আমাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এতদিন মেয়ের বাসাতে থেকেই বাকি চিকিৎসা নিয়েছি। এরপর তোমার দেওয়া ঠিকানার কথা মনে পড়ে যায়। অনেক চড়াই-উতরাই করে শেষমেষ এই গোলাপ বাড়িতেই ঠাঁই হলো। কোথায় ভাবলাম কল দিয়ে তোমাকে সারপ্রাইজ দিব, উলটো তুমি সারপ্রাইজ করে দিলে.. অরিত্রী।” ভদ্রমহিলার মুখে হাসি।
এর মাঝে আপার সাথে ওনার আলোচনা আরও বাড়ল। যেই ইতি আপা সবসময় বলে বাইরের মানুষের কাছে বেশি কথা বলা ঠিক না, সেই আপাই আজ ওনাকে আমাদের পরিবারের কথা জানাল। দুজন দুই পরিবার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারল। আপা একসময় আমার পদার্থ বিজ্ঞানের ফেইল করার রেকর্ডও ভাঙা রেডিওর মতো করে ঝেড়ে দিলেন।
–“আর বলবেন না আন্টি, এই মেয়েকে নিয়ে থাকা যাচ্ছে না। সবসময় পদার্থ বিজ্ঞানে ফেইল করবে। কোনো কোচিং, কোনো টিচারই ওকে ঠিক করতে পারছে না। কী যে দুশ্চিন্তার মাঝে পড়েছি।”
হেনা আন্টি দুঃখ প্রকাশ করলেন। কিন্তু আমার এদিকে মাথা হেট হয়ে গেল। আপার কী দরকার ছিল প্রথম দিনেই আমার এভাবে অসম্মান করার? ফেইল করেছি বলে কি এটা সবাইকে বলে বেড়াতে হবে? এগুলো কি কাউকে বলার মতো? ছি, কী জঘন্য লজ্জা। রান্নাঘরে নীশিথ নামের লোকটা। অনুভব হলো, এই লোকটাও আপার এসব ঠোঁটকাটা কথাবার্তা শুনে নিয়েছে। আমার কান দিয়ে এবার ধোঁয়া বেরুতে শুরু করল।
হেনা আন্টি আমার সমস্যার কথা শুনে আগ বাড়িয়েই বললেন,
–“আমার ছেলেও তো সাইন্সের স্টুডেন্ট ছিল। পড়াশোনায় বেশ ব্রাইট। ওকে বলব নাহয় যখনই সময় পাবে অরিত্রীকে সমস্যাগুলো দেখিয়ে দিয়ে আসবে। কী বলো অরিত্রী? আপত্তি নেই তো?”
শেষ! যেটুকু বেঁচে থাকা সম্মান ছিল, সেগুলোও হেনা আন্টি আপার সাথে তাল মিলিয়ে শেষ করে দিলেন। মুখের ওপর কে না করতে পারে? তাও আমার মতো মানুষ? হেনা আন্টি বড়ো আশা নিয়ে আমার দিকে চেয়ে। আমার হয়ে আপাই উত্তর দিল,
–“অনেক ধন্যবাদ আন্টি, বড্ড উপকার করলেন।”
পরেরদিন সন্ধ্যার আগে দিয়ে আমার বাড়ির সামনে দাঁড়াতে হলো। আপা কল দিয়ে জানিয়েছে আসার পথে নীশিথ ভাইয়াকে ডেকে আনবে। আপা তাদের জানিয়ে দিয়েছে যখন আপা বাসায় উপস্থিত থাকবে শুধু তখনই নীশিথ ভাইয়ার আসার অনুমতি আছে। আমি তো এটাই ভেবে পাচ্ছি না এই গোমড়ামুখো ডাক্তার আমাকে পড়াতেই বা রাজি হলো কোন সুখে? সে তো দিব্যি ডাক্তারি করছেনই। আন্টির থেকে যতটুকু শুনেছি ভাইয়া নিতান্তই বোরিং মানুষ। তাকে দিয়ে আমাকে পড়ানো অসম্ভবের কাতারেই পড়ে। সেখানে এই লোকটা সেই অসম্ভব কাণ্ডটাই করছে। জীবনে আমার আর কত কি দেখা লাগবে আপার বৌদলতে?
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম আপা নীশিথ ভাইকে নিয়ে আসছে। আপা তার স্বভাব অনুযায়ী আগে আগে হাঁটলেও উনি পিছনে আছেন। দুই পকেটে হাত গুজে তাড়া ছাড়াই আস্তে-ধীরে আসছে। আপা আমাকে বলল,
–“নীশিথকে ভেতরে নিয়ে আয়, আমি আগে আগে গিয়ে কাজগুলা সেরে নিই।”
নীশিথ ভাই আমাদের গেটের সামনে এসে থেমে গেল। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমাদের বাড়ির নামটা দেখা যাচ্ছে। আমাদের বাড়ির নাম “ছুটি”। মূলত সেটা দেখেই তার থমকে যাওয়া। ভাইয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“বাড়ির নাম “ছুটি” যে?
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~
