#হঠাৎ #দেখা (অন্তিম পর্ব )
তিয়াসার বন্ধুরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল, আর ক্যাফের অন্য প্রান্তের মানুষগুলো হয়তো এক জোড়া মানুষের পুনর্মিলনের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল। সৌরনীল তিয়াসার সামনের চেয়ারটা টেনে দিয়ে বসাল। তিয়াসার হাত দুটো তখনো কাঁপছিল। সৌরনীল বলল, “আগে একটু শান্ত হও। বিশ্বাস করো, আমার মনে হচ্ছে আমি কোনো উপন্যাসের পাতায় ঢুকে পড়েছি।”
তিয়াসা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, “উপন্যাসই তো! যে উপন্যাসে নায়ক কোনো এক অজ্ঞাত কারণে নায়িকাকে কোনো হদিশ না দিয়েই হারিয়ে যায়। তুমি কি জানো সৌরনীল, গত দু-বছরে কতবার আমি ওই একই নীল কুর্তিটা পরে ডালহৌসি গিয়েছি? যদি তোমার চোখে পড়ে যাই সেই আশায়।”
সৌরনীল অপরাধবোধে মাথা নিচু করল। “আমি খুব নিরুপায় ছিলাম তিয়াসা। ট্রান্সফারের অর্ডারটা এমনভাবে এল যে নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকু ছিল না। কলকাতায় আমার কোনো বন্ধুকেও বলে আসতে পারিনি যে তোমার খোঁজ করতে। শিলিগুড়িতে এসে প্রথম কয়েক মাস আমি পাগলের মতো ছটফট করেছি। তুমি রোজ রাতে আমার স্বপ্নে আসো।”
তিয়াসা হেসে বলল, “তুমি তো অন্তত জানতে আমি কোথায় থাকি। মানে কলকাতা শহরটার নাম তো জানতে। কিন্তু আমি? আমি তো তোমার অফিসের নামটাও জানতাম না। শুধু জানতাম তুমি ডালহৌসিতে কাজ করো। ওই বিশাল চত্বরে হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে আমি শুধু একটা ছায়াকে খুঁজেছি।”
সৌরনীল এবার তিয়াসার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব দৃঢ় গলায় বলল, “আর খুঁজতে হবে না। এবার আমি হাতটা ছাড়ব না। তিয়াসা, তোমার বাড়ির ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা দাও। এবার আমি আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।”
তিয়াসা ব্যাগ থেকে কলম বের করে সৌরনীলের ডায়েরির শেষ পাতায় নিজের নম্বরটা লিখে দিল। তারপর হেসে বলল, “এবারও যদি হারিযে যাও, তবে কিন্তু আমি আর পাহাড় ডিঙিয়ে খুঁজতে আসব না।”
সৌরনীল হাসল। সে বলল, “এবার পাহাড় নয়, আমি নিজেই কলকাতায় ফিরে যাব। আমার এই প্রজেক্টের কাজ প্রায় শেষ। আগামী মাসেই আমি রি-ট্রান্সফারের আবেদন করছি। আমি ফিরে আসছি তিয়াসা, আমাদের সেই পুরনো কলকাতায়।”
তিয়াসার বন্ধুরা তখন ধীরে ধীরে ওদের টেবিলের কাছে এগিয়ে এল। অভিষেক মজা করে বলল, “তিয়াসা, আমাদের তো আলাপ করিয়ে দিলি না! আমরা ভাবলাম নির্ঘাত কোনো পুরনো ঝগড়া মেটাচ্ছিস।” তিয়াসা লাজুক হেসে সৌরনীলের সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিল। ওই বিকেলে ক্যাফে থেকে বেরোনোর সময় আকাশটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ের বুক চিরে রোদের একটা রেখা দেখা দিচ্ছিল।
পরের এক মাস দুজনের কাটল ফোনের ওপর নির্ভর করে। রোজ রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা। দু-বছরের না বলা সব কথা যেন ফুরোতেই চাইছিল না। তিয়াসা বলত তার গানের গল্প, আর সৌরনীল শিলিগুড়ির প্যাকিং করার মাঝেই শোনাত তার ফেরার প্রস্তুতির কথা। তিয়াসা জানতে পারল সৌরনীল ওর জন্য একটা ডায়েরি ভর্তি করে চিঠি লিখেছে, যা কোনোদিন ওকে শোনানো করা হয়নি।
অবশেষে সেই দিনটা এল। হাওড়া স্টেশনে যখন ট্রেন থেকে সৌরনীল নামল, সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল তিয়াসা। সেই প্রথম দেখা হওয়ার দিনের মতো আকাশটা আজও একটু মেঘলা। কিন্তু আজ আর ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। সৌরনীল কাছে এসে তিয়াসার হাতটা ধরল।
তিয়াসা বলল, “চলো, আজ আবার একসঙ্গে অনেকটা পথ হাঁটি ।”
সৌরনীল মাথা নাড়ল। “না, আজ আর হাঁটব না। আজ সোজা তোমার বাড়িতে যাব। তোমার বাবার সাথে কথা বলব। এই দু-বছরের পাওনা গণ্ডা সব বুঝে নিতে হবে তো!”
কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় তখন ট্যাক্সির হর্ন আর মানুষের চিৎকার। কিন্তু তিয়াসা আর সৌরনীলের কাছে পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল। যে মিলনের জন্য ওরা দু-বছর অপেক্ষা করেছে, সেই মিলন আজ সার্থকতা পেল। গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে সৌরনীল তিয়াসার কানে কানে বলল, “মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়া ভালো তিয়াসা, না হলে খুঁজে পাওয়ার এই তীব্র আনন্দটা হয়তো কোনোদিন অনুভব করতে পারতাম না।”
তিয়াসা শুধু মাথাটা সৌরনীলের কাঁধে রাখল।কলকাতার রাস্তায় আবার বৃষ্টি নামল, কিন্তু এবার সেই বৃষ্টিতে বিরহ নয়, আছে এক ভালোবাসার ছোঁয়া।
সমাপ্ত
কলমে -#SupriyaGhosh
