#হঠাৎ #দেখা (পর্ব ৩)
শিলিগুড়ির পাহাড়ী রাস্তায় যখন তিয়াসাদের গাড়িটা লাটাগুড়ির জঙ্গল ছেড়ে মহানন্দা ব্রিজের দিকে এগোচ্ছিল, তিয়াসার মনের ভেতরটা এক অদ্ভুত অস্থিরতায় ভরে উঠছিল। জানলার কাঁচ নামিয়ে ও বাইরে তাকাল। তিস্তার চঞ্চল জলরাশি আর দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো যেন ওকে কিছু একটা বলতে চাইছিল। তিয়াসার সাথে ওর অফিসের আরও চারজন বন্ধু ছিল— অনন্যা, সুমিত, রিদি আর অভিষেক। ওরা সবাই পাহাড়ের এই রূপ দেখে হইচই করছিল, কিন্তু তিয়াসা ছিল একদম শান্ত। ওর ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করে ও একবার সেই দুই বছর আগের তারিখটা দেখল। আজ থেকে ঠিক দু’বছর আগে ঠিক এই দিনটিতেই ও কলকাতার সেই ফুটপাতে সৌরনীলের সাথে ধাক্কা খেয়েছিল।
অভিষেক পিছন থেকে ডেকে বলল, “কিরে তিয়াসা, নর্থ বেঙ্গল এসেও তুই গুম মেরে আছিস? চল, সেভোক রোডের ওই বড় ক্যাফেটায় গিয়ে কফি খাই”।
তিয়াসা ম্লান হেসে বলল, “চল।” ও ভাবছিল, ফিরে তো যেতেই হবে সেই চেনা শহরে, যেখানে প্রতিটা মোড় ওকে সৌরনীলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এদিকে সৌরনীল তখন শিলিগুড়ির সেই একই ক্যাফেতে বসেছিল। ওর হাতে ছিল একটা ফাইল।ও ভাবছিল আজ অফিস থেকে ফেরার পথে একটা লাল গোলাপ কিনবে। যদিও ও দেওয়ার মতো কাউকে পাশে পাবে না, তবুও ওই একটা গোলাপের গন্ধ ওকে তিয়াসার সান্নিধ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। সৌরনীল কফিতে চুমুক দিয়ে জানলার বাইরে দেখছিল— আকাশটা আজ ঠিক কলকাতার সেই বিকেলের মতো মেঘলা। ও নিজের মনেই হাসল, “আজকের দিনটাতেই তো আমার জীবনটা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্যাফের কাঁচের দরজা ঠেলে তিয়াসারা ভেতরে ঢুকল। ক্যাফেটা বেশ ভিড় ছিল, তাই তিয়াসা আর ওর বন্ধুরা একদম মাঝখানের একটা টেবিল দখল করল। তিয়াসা যখন জ্যাকেটটা খুলে চেয়ারে রাখল, ওর চোখ গেল জানলার ধারের শেষ টেবিলটার দিকে। সেখানে নীল শার্ট পরা একজন মানুষ মাথা নিচু করে ফাইল দেখছিল। তিয়াসার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধকধক করতে লাগল।কেমন একটা চেনা অনুভূতি কাজ করলো।নাকি আবার সেই চোখের ভ্রম?
সুমিত মেনু কার্ড হাতে নিয়ে বলল, “তিয়াসা, কী খাবি বল?”
তিয়াসা কোনো উত্তর দিল না। ও সম্মোহিতের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অনন্যা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিরে, কোথায় যাচ্ছিস?” তিয়াসা কোনো কথা শুনতে পাচ্ছিল না। ও শুধু দেখছিল সেই চেনা মানুষটাকে। ধীর পায়ে ও এগোতে লাগল কোণটার দিকে।
সৌরনীল তখন একটা হিসেব মিলাচ্ছিল। হঠাৎ ওর টেবিলের ওপর একটা ছায়া পড়ল। ও ভাবল হয়তো কোনো ওয়েটার এসেছে। মাথা না তুলেই ও বলল, “এক কাপ ব্ল্যাক কফি প্লিজ।”
কিন্তু কোনো উত্তর এল না। শুধু একটা খুব চেনা, কাঁপা কণ্ঠস্বর কানে এল— “ব্ল্যাক কফি খেলে কি আগের কথাগুলো সব ভুলে যাওয়া যায় সৌরনীল?”
সৌরনীল যেন বাজ পড়ার মতো চমকে উঠল। ও ধীরে ধীরে মাথা তুলল। ওর চোখের সামনে এখন তিয়াসা দাঁড়িয়ে। ঠিক দুই বছর আগের সেই মুখটা, শুধু চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ, যা দীর্ঘ অনিদ্রা আর অপেক্ষার সাক্ষ্য দিচ্ছে। সৌরনীল কয়েক সেকেন্ড পাথরের মতো বসে রইল। ওর মনে হলো ও কি কোনো অলৌকিক জগতে পৌঁছে গিয়েছে? ও তো ভেবেছিল তিয়াসা কেবল ওর ডায়েরির পাতায় বন্দি এক চরিত্র হয়ে থেকে যাবে।
ও অস্ফুট স্বরে বলল, “তিয়াসা? তুমি এখানে? আমি… আমি স্বপ্ন দেখছি না তো?”
তিয়াসার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ও হেসে বলল, “না, এটা স্বপ্ন নয়। আপনি আমায় না বলে হারিয়ে গিয়েছিলেন, আমি শুধু সেই চেনা মানুষটাকে খুঁজতে এসেছি। কলকাতায় পারলাম না, তাই পাহাড় আমায় পথ দেখাল।”
সৌরনীল তিয়াসার হাতটা ধরতে গিয়েও থেমে গেল। ওর সারা শরীর কাঁপছিল। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। “তিয়াসা, আমি পরদিনই শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। কতবার ভেবেছি তোমার ফোন নম্বরটা নিলে আজ হয়তো এই দুই বছরের যন্ত্রণা সইতে হতো না। আমি তোমায় কত খুঁজেছি জানো?”
তিয়াসা চোখের জল মুছে বলল, “আমিও তোমায় খুঁজেছি সৌরনীল। ডালহৌসির প্রতিটি গলি আমি চিনে ফেলেছি তোমার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে। আমি জানতাম, আমাদের গল্পটা এভাবে শেষ হতে পারে না। বিধাতা আমাদের জন্য অন্য কোনো সমীকরণ লিখে রেখেছিলেন।”
ক্যাফের বাকি লোকজনের দিকে ওদের খেয়াল ছিল না। তিয়াসার বন্ধুরা দূরে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিল দৃশ্যটা। ওদিকে সৌরনীল আর তিয়াসা যেন সময়ের একটা নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। সৌরনীল এবার গভীর আবেগে তিয়াসার দিকে তাকিয়ে বলল, “তিয়াসা, সেবার স্টেশনে দাঁড়িয়ে যা বলা হয়নি, এবার বলছি— আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই দু’বছর তোমার প্রতিটি কথা আমার কানে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।”
তিয়াসা ম্লান হেসে উত্তর দিল, “আমিও তোমায় অনেক খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। কিন্তু মনের একটা কোণে তুমি চিরকাল ছিলে আর থাকবে। এবার আর আমি তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না।”
বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শিলিগুড়ির সেই ক্যাফেটা যেন এক টুকরো কলকাতা হয়ে উঠল। যে বিচ্ছেদ দুই বছর আগে শুরু হয়েছিল, আজ পাহাড়ের কোলে তার একটা মধুরেণ সমাপয়েৎ হওয়ার পথ তৈরি হলো। কিন্তু জীবন তো এত সহজ নয়, আগামী দিনগুলোতে তাদের এই হঠাৎ পাওয়া সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে?
চলবে…… (অন্তিম পর্ব আজকেই চাইলে কমেন্টে জানাবেন)
কলমে -#SupriyaGhosh
