#হঠাৎ #দেখা (পর্ব ১)
অফিসের ফাইলগুলো ব্যাগে ভরে সৌরনীল যখন ডালহৌসির মোড়ে দাঁড়াল, তখন ধর্মতলার দিকে যাওয়ার রাস্তাটা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। ভিড় কাটিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎই একটা ধাক্কা। পাশ থেকে একটা মেয়ে বলে উঠল, “আরে! সাবধানে, একটু দেখে চলবেন তো।”
সৌরনীল থমকে দাঁড়িয়ে দেখল একটা মেয়ে বেশ বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির হাতে একটা বড় ঝোলা ব্যাগ, কপালে হালকা ঘামের বিন্দু। সৌরনীল অপরাধবোধ নিয়ে বলল, “খুব সরি, আসলে ট্রেনের তাড়া ছিল তো, খেয়াল করিনি।”
মেয়েটি একটু শান্ত হয়ে বলল, “ট্রেনের তাড়া তো সবারই আছে। আমিও শিয়ালদহ যাচ্ছি, ট্রেন না ধরলে মামার বাড়িতে আজ আর পৌঁছানো হবে না।”
সৌরনীল হাসল। “তাহলে তো আমরা একই পথের যাত্রী। আমিও ওদিকেই যাচ্ছি। চলুন একসাথে হাঁটা যাক, একা হাঁটার চেয়ে গল্প করতে করতে হাঁটা ভালো।”
মেয়েটি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, “আমি তিয়াসা। আপনি?”
“সৌরনীল। আপনি কি এই কলকাতাতেই থাকেন?”
তিয়াসা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “না, আমি পড়াশোনার জন্য পিসির বাড়ি থাকি। ছুটিতে মামার বাড়ি যাচ্ছি। আপনার অফিস বুঝি এখানেই?”
সৌরনীল ঘাড় নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, এই একঘেয়ে অফিস। সারাদিন শুধু ফাইল আর কম্পিউটার। সত্যি বলতে, আপনার সাথে এই ধাক্কাটা না লাগলে আজকের সন্ধেটাও সেই ক্লান্তিতেই কাটত।”
তিয়াসা হেসে ফেলল। “বলেন কী! ধাক্কা খাওয়াটাও কি তবে আপনার কাছে আশীর্বাদ?”
সৌরনীল সপ্রতিভভাবে উত্তর দিল, “কিছু কিছু ধাক্কা মানুষকে থামিয়ে দিয়ে নতুন কিছু ভাবতে শেখায়। আপনার বাড়ি কোথায়?”
তিয়াসা উত্তর দিল, “আমার বাড়ি আসলে অনেক দূরে, মফস্বলে। কিন্তু কলকাতার এই ব্যস্ততা আমার বেশ লাগে। দেখুন না, চারদিকে কত আলো, কত মানুষ, অথচ সবাই কত একা।”
ওরা লেনিন সরণি ধরে হাঁটছিল। সৌরনীল জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি গান ভালোবাসেন? আপনার কথা বলার মধ্যে একটা ছন্দ আছে।”
তিয়াসা অবাক হয়ে তাকাল। “কী করে বুঝলেন? আমি ছোটবেলা থেকে গান শিখি। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার খুব প্রিয়।”
সৌরনীল উৎসুক হয়ে বলল, “তাই নাকি? আমার খুব প্রিয় গান ‘এ পথে আমি যে চলি’। আজ আপনার সাথে হাঁটতে হাঁটতে গানটার কথা খুব মনে পড়ছে।”
তিয়াসা গুনগুন করে দু-কলি গাইল। রাস্তার কোলাহল যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সৌরনীলের কাছে। সে বলল, “আপনি এত সুন্দর গাইতে পারেন, আগে বললে তো পুরো রাস্তাটাই গান শুনতে শুনতে আসতাম।”
তিয়াসা লজ্জিত হয়ে বলল, “রাস্তার মাঝে গান গাইতে লজ্জা করে। আচ্ছা সৌরনীল বাবু, আপনি কি খুব একা?”
সৌরনীল একটু থমকে গিয়ে বলল, “কেন বলুন তো?”
“আপনার চোখে কেমন একটা খোঁজার নেশা আছে। মনে হয় আপনি কিছু একটা খুঁজছেন কিন্তু পাচ্ছেন না।”
সৌরনীল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হয়তো তাই। আসলে এই শহরে আমরা সবাই কিছু না কিছু খুঁজি। আজ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, একটা মানুষের সাথে এত সহজেও কথা বলা যায়।”
তিয়াসা হাসল। “মানুষের সাথে কথা বলাই তো জীবনের আসল আনন্দ। আমরা তো যন্ত্র হয়ে যাচ্ছি দিন দিন।”
কথায় কথায় ওরা শিয়ালদহ স্টেশনের মুখে চলে এল। তিয়াসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “ওরে বাবা! আমার ট্রেনের সময় হয়ে এসেছে। ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে যেতে হবে।”
সৌরনীল বলল, “আমি আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।”
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ভিড়ের মাঝেও ওরা আরও অনেকক্ষণ কথা বলল। তিয়াসা বলছিল তার মামার বাড়ির আমবাগানের গল্প, আর সৌরনীল বলছিল তার ছোটবেলার হারানো দিনগুলোর কথা। স্টেশনের মাইকে ঘোষণা হচ্ছিল ট্রেনের। তিয়াসা কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, “আজকের এই হাঁটাটা মনে থাকবে সৌরনীল।”
সৌরনীল বলল, “আবার নিশ্চয়ই দেখা হবে। কলকাতা ছোট শহর।”
তিয়াসা শুধু একবার হাত নাড়ল। ট্রেন চলতে শুরু করল। সৌরনীল প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, তিয়াসার চোখের ওই শেষ চাউনিটা যেন অনেক কিছু বলে গেল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে সৌরনীল হঠাৎ চমকে উঠল। সে খেয়াল করল, এত কথা হলো, অথচ তিয়াসার ফোন নম্বরটা নেওয়া হয়নি। এমনকী সে কোথায় থাকে বা তার পুরো নাম কী, কিছুই জানা হলো না।
পরদিন সকালে একরাশ আনন্দ নিয়ে সৌরনীল অফিসে গেল। মনে মনে ঠিক করল, তিয়াসা যখন ফিরবে, ঠিক ওই সময়টায় স্টেশনে গিয়ে অপেক্ষা করবে। কিন্তু ডেস্কে বসতেই বড় সাহেব ডেকে পাঠালেন।
“সৌরনীল, তোমার জন্য একটা খারাপ খবর আর ভালো খবর দুই-ই আছে। তোমার প্রমোশন হয়েছে, কিন্তু তোমাকে আজ রাতেই শিলিগুড়ি রওনা হতে হবে। নর্থ বেঙ্গল ব্রাঞ্চে ইমার্জেন্সি ট্রান্সফার।”
সৌরনীল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। “স্যার, আজই?”
“হ্যাঁ, অর্ডার চলে এসেছে। তোমাকে ওখানকার চার্জ নিতে হবে।”
সৌরনীল নিজের সিটে ফিরে এসে জানলার বাইরে তাকাল। তিয়াসার মুখটা বারবার ভেসে উঠছিল। সে তো জানত না তিয়াসার বাড়ি কোথায়। একবার দেখা হওয়ার বা কথা বলার কোনো উপায় আর রইল না। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াতে হলো তাকে, আর পেছনে পড়ে রইল কলকাতার সেই মায়াবী সন্ধে আর তিয়াসার না বলা কথাগুলো।
চলবে…… (পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
কলমে -#SupriyaGhosh
