#ছোটো গল্প
#সন্দেহের চোরকাঁটা
মাহবুবা বিথী
প্রথম পর্ব
মাহিন অফিস থেকে ফিরে নিজের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করে। সোফার উপর ব্যাগটা দেখে বুঝতে পারে মিরা ওর আগেই এসে পড়েছে। হা ঐ তো ওয়াশরুমে পানি পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। মিরা গুন গুন করে গানের সুর ভাঁজছে আর শাওয়ারের পানিতে নিজেকে ভেজাচ্ছে। হঠাৎ মাহিনের শরীরটা গুলিয়ে উঠলো। কেন যেন মনে হলো, মিরা কি নিজেকে কারো কাছে বিলিয়ে দিয়ে এসেছে? তারপর ঘরে এসে শাওয়ারের হালকা গরম পানিতে নিজেকে ধুয়ে সাফ সুতরো করছে? মাহিনের হঠাৎ মনে হলো,মিরাকে নিয়ে এরকম নোংরা কথা ও কিভাবে ভাবতে পারলো? এই মেয়েটাকেই তো ও পাগলের মতো ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো। মিরার পবিত্রতা ওকে মুগ্ধ করতো বলেই ওকে ছাড়তে পারেনি। পারিবারিক বাঁধা সত্বেও মিরাকে বিয়ে করে নিজের করে নিয়েছে। মিরার সাথে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে পরিচয় হয়। প্রথম দেখাতেই মাহিন নিজেকে মিরার মাঝে বন্দী করে ফেলে। মাহিন অবশ্য প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলো। কিন্তু মিরা রাজী হয়নি। ওর এক কথা প্রেম যদি করতেই হয় তাহলে বিয়ের পর স্বামীর সাথে করবে। অথচ আজ সেই মিরার উপর ও সন্দেহের বিষবাস্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এই সন্দেহটা জবে ঢুকার পর শুরু হয়েছিলো।
মিরা আর মাহিনের বিয়ের বয়স পাঁচ বছর। প্রথমদিকে ওদের দুজনার মাঝে আবেগ উছলানো প্রেম ছিলো। তখন মিরার পুরোটা সময় জুড়ে মাহিনের বিচরণ ছিলো। মাহিন যা খেতে পছন্দ করে মিরা সেটাই রান্না করে। বাবার বাড়ীতে খুব একটা রান্না ওর করা হয়নি। তাই বিয়ের পর অনেক যত্ন নিয়ে মাহিনের জন্য রান্না করতো। কিন্তু মাহিন মিরার এই পরিশ্রমকে মুল্যায়ন না করে উল্টো রান্নার সমালোচনা করতো। কিন্তু মিরা কিছু মনে করতো না। ও ভাবতো রান্না খারাপ হলে মাহিন দু,কথা বলতেই পারে। এতে মন খারাপ করার কিছু নেই। অথচ সেই মিরাকে মাহিন এখন কিছু বলতেই পারে না। মাহিন একটা কিছু বললেই মিরা পাঁচ কথা শুনিয়ে দেয়। মাহিনের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। মিরাতো গোসল করছে। এই মুহুর্তে মোবাইলটার ম্যাসেঞ্জার হোয়াটসঅ্যাপ চেক করে দেখা যায়। মনে মনে মিরাকে গাল দিয়ে বলে,”মাগী কার সাথে নষ্টামী করে সেটা বের করতেই হবে।” কিন্তু মাহিন কোথাও মিরার মোবাইল খুঁজে পায় না। নিশ্চয় ঐ শয়তানী মোবাইল বাথরুমে নিয়ে গিয়েছে। নিজের উলঙ্গ ছবি তুলে নাগরের কাছে পাঠাবে। মাহিনের মাথার দুপাশের শিরাগুলো দপ দপ করছে। যতটুকু জানে আজ মিরার গাজীপুরে একটা রিসোর্টে কনফারেনস ছিলো। আসলেই কি কনফারেন্স ছিলো নাকি নাগরের সাথে ডেট করেছে কে জানে?
মাহিন নিজের চোয়াল শক্ত করে বেডরুমের রকিং চেয়ারটায় বসে ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে আছে। মাথায় টাওয়েল পেঁচিয়ে বাথরোব গায়ে জড়িয়ে মিরা মোবাইল টিপতে টিপতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। মাহিন সদ্য গোসল করা মিরার দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিমোহিত হয়। ফর্সা পা দুটো ওর অপরুপ সুন্দর। বাথরুবের ভিতর থেকে বুকের কাছটা দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ মিরার সাথে আই কন্ট্রাক হলে বিদ্রুপের হাসি হেসে মাহিন বলে,
–আজকাল ওয়াশরুমের ভিতরেও মোবাইল লাগে?
মিরা মাহিনের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলে,
—তুমি কখন এলে? না,মানে একটা জরুরী ফোন আসার কথা ছিলো। তাই মোবাইলটা সাথে রাখতে হয়েছে।
মাহিন তাচ্ছিল্যে ভরে বলে,
—নাকি ওয়াশরুমের ভিতরেও নাগরকে ফোন দিতে হয়? নিজের নগ্ন শরীরটাকে মোবাইলের মাধ্যমে তার কাছে উম্মুক্ত করো। সেটা আমি ভালোই বুঝতে পারি।
সাথে সাথে মিরার চোখ দুটো ধ্বক করে জ্বলে উঠে। এরপর কঠিন স্বরে বলে,
—সবার সাথে নিজেকে মেলাতে যেও না। তোমার সাথে কথা বলতে আমার রুচিতে বাঁধে। মুখ যেন নয় নর্দমার পাইপ একটা।
মাহিনও চিৎকার করে বলে,
—মুখ সামলে কথা বলো মিরা। আমাকে খেপিও না। আমি খেপে গেলে পরিস্থিতি কিন্তু সামলাতে পারবে না। সত্য কথা শুনতে সবারই তিতা লাগে। আমি ভুল কি বলেছি? কিছু বুঝিনা মনে করছো? এই যে প্রতিদিন নিয়ম করে জিমে যাও। নিজেকে আজকাল যেন মডেল বানানোর দৌড়ে নেমেছো। অথচ আমাকে একটু সময় দেওয়ার প্রয়োজন মনে করো না।
মিরা অবজ্ঞা ভরে বলে,
–কেন মনে নেই মালয়শিয়া ঘুরতে যাওয়ার সময় তোমার কাছে একটা ফেইড জিন্স কেনার জন্য আবদার করেছিলাম। তুমি কি বলেছিলে মনে আছে? আমার মতো হোদল কুতকুতের গায়ে নাকি এগুলো মানায় না। তারপর এরকম বহুবার আমার বডি সেমিং করেছো। আমার শরীরের বাঁকে বাঁকে নাকি চর্বি। এও বলেছো, তোমার বাবা তোমাকে ভাতছাড়া কিছু খাওয়াইনি? মানছি আমি গ্রামের মোটা গৃহস্থ বাড়ীর মেয়ে। কিন্তু মেধায় তোমার থেকে কোন অংশে কম? সেটা তোমার চোখে পড়ে না। আমিও এখন একটা প্রমিন্যান্ট কোম্পানীতে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করছি।
—আমার মুখটা খুলিও না। তোমাদের অফিসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কি যেন নাম আরহাম চৌধুরী। উনি তো তোমাকে ফেবার করে চাকরিটা দিয়েছিলেন। কোনো ইন্টারভিউ দিতে হয়নি। আজ বুঝি এমনি এমনি উনি তোমাকে চাকরিটা দেননি। সত্যিকরে বলতো আরহাম চৌধুরীর সাথে তোমাকে কতবার বেড শেয়ার করতে হয়েছে?
মিরা চিৎকার দিয়ে বলে,
–তোমার ঐ নোংরা মুখে ফেরেশ্তার মতো মানুষটার নাম নিও না। তোমার অপবিত্র মুখে ঐ মানুষটার নাম শোভা পায় না।
মাহিন নিজের অবস্থান থেকে উঠে এসে মিরাকে পাঁজা কোলা করে তুলে বিছানায় ছুড়ে মারে। এরপর মিরার উপর উঠে বসে। মিরা হাত পা ছোড়াছুড়ি করছিলো। কিন্তু কিছুতেই মাহিনের সাথে পেরে উঠছিলো না। মিরা জানে,মাহিন এখন ওর পুরো শরীরটাকে কামড়ে আঁচড়ে আহত করবে। ও ইদানিং সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ওর সাথে এমনই করে। মিরার আর্তনাদ যন্ত্রনা কিছুই মাহিনের কর্ণে পৌঁছায় না। একসময় মিরা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মাহিন ওর কাম লালসা ক্ষোভ মিটিয়ে মিরাকে নিস্তেজ করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। বারান্দায় গিয়ে নিকোটিনের ধোয়া ছাড়ে। হা মিরা ওকে বহুবার ছেড়ে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু পারেনি। আসলে ওর বাবা মা ভাই ওর এই বিয়েটাকে মেনে নেয়নি। মাহিনকে ছেড়ে এতোবড় ঢাকা শহরে ও কোথায় থাকবে। যেখানে প্রতিনিয়ত নারীদের হেনস্থা করতে মানুষরুপী নরপশুগুলো ওঁত পেতে থাকে। সামান্য একটু ভুলে কোথায় কোন খাদের কিনারে পৌঁছে যাবে যার কোন ইয়ত্তা নেই। ওর বাবা স্কুলের ধর্ম শিক্ষক। খুব রক্ষণশীল পরিবারে ওর বেড়ে উঠেছে। তাছাড়া নিজের এই অপমানের মুখ আপনজনদের দেখাতে মন চায় না। বিয়ের পর মাহিন মিরাকে সন্দেহ করতো না। কিন্তু একটু খিঁটখিটে স্বভাবের ছিলো। মিরা সেটা মেনেই নিয়েছিলো। কিন্তু গত দুবছর থেকে মাহিন ওকে সন্দেহ করা শুরু করে। বিশেষ করে চাকরিটা হওয়ার পর থেকেই মাহিনের এই পরিবর্তন। আরহাম ভাইকে একদম সহ্য করতে পারে না। অথচ আরহাম ভাইয়ের সাথে প্রথম যখন দেখা হয় তঝন ভুয়সী প্রশংসা করেছে। সোসিওলজিতে মাস্টার্স করা মিরাকে আরহাম ভাই চাকরিটা অফার করেছিলো। মিরা প্রথমে একটু দ্বিধাদন্দে ছিলো। কিন্তু মাহিনের উৎসাহে অবশেষে চাকরিতে যোগ দেয়। তারপর থেকে মাহিনের কি যে হলো মিরা বুঝতে পারে না।
তাছাড়া মাসছয়ের আগে আরহাম ভাইয়ের বাসায় মিরার দাওয়াত ছিলো। ওর আর মাহিনের দুজনের যাওয়ার কথা ছিলো। অফিসের মিটিং এর ছুঁতায় মাহিন যায়নি। সেদিন মাহিন ওর অফিসের কলিগ চাঁদনীর সাথে লং ড্রাইভে বের হয়েছিলো। গাজীপুরে একটা রিসোর্টে আরহামভাই ওদের দুজনকে দেখেছে। ভাবীও শুনে মিরাকে বললো,
—মিরা,আমার ধারণা তোমাদের সন্তান হলে মাহিন তখন ঘরমুখো হবে।
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
—চেষ্টা তো কম করলাম না। না হলে আমার কি করার আছে?
ভাবী তখন সাথে সাথে মিরাকে বলে,
—আমার একজন পরিচিত গাইনি ডাক্তার আছে। তুমি চাইলে তাকে একবার দেখাতে পারো।
চলবে
