#ছোট গল্প
সন্দেহের চোর কাঁটা
মাহবুবা বিথী
কিচেনে গিয়ে এক কাপ কফি বানিয়ে মিরা বারান্দায় গিয়ে বসে। যতই মাহিন মাফ চেয়ে নিক ওর এরকম পশুর মতো আচরণ মিরা মন থেকে মেনে নিতে পারে না। একবার ভেবে ছিলো সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাবে কিনা? কিন্তু মিরা জানে, মাহিন এ কথা শোনার সাথে সাথে প্রচন্ড অশান্তি করবে। বলবে ওকে ইচ্ছে করে মিরা পাগল সাব্যস্ত করছে। মনটা আজ ওর বড্ড বিষন্ন হয়ে আছে। কখনও ভাবেনি মাহিনের এরকম রুপ ওকে দেখতে হবে? আজ দুবছর থেকে ওর এই পরিবর্তন। বিশেষ করে চাকরিটা শুরু করার পর থেকে ওর এই আচরণ মিরাকে হজম করতে হচ্ছে। প্রথম এতোটা প্রকট ছিলো না। কিন্তু এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এদিকে চাকরি ছাড়ার উপায় নেই। মাহিনের উপর মিরা আস্থা রাখতে পারছে না।
ফজরের আযান শোনা যায়। মিরা ওয়াশরুমে গিয়ে ওজু করে এসে নামাজে দাঁড়ায়। তারপর প্রান খুলে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহপাকের কাছে প্রার্থনা করে। আল্লাহপাক যেন ওর শুন্য কোল ভরিয়ে দেন আর মাহিনকে যেন পরিবর্তন করে দেন। নামাজ শেষ করে চোখের পানি মুছে কিচেনে গিয়ে দুধ গরম করে নেয়। তাতে ওটস ভিজিয়ে নাস্তার পর্ব সেরে নেয়। আজ আর রুটি সবজি বানানোর সময় নেই। আজকের প্রেজেন্টেশনের উপর এই বছরের ফান্ড পাওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করবে। মোবাইলটা বেজে উঠলো। মিরা স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখে আরহাম ভাই ফোন দিয়েছে। রিসিভ করে মিরা বলে,
—ভাইয়া,আমি আসছি।
—গাড়ী কিন্তু তোমার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
—ঠিক আছে।
মিরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডী হতে থাকে। একটা কালো রঙের নকশী কাঁথা স্টিচের আড়ংএর সিল্ক শাড়ী পরে নেয়। তার সাথে ম্যাচ করে ফুল স্লিপ কালো রঙের ব্লাউজ সাথে কালো রঙের হেজাব মাথায় পিন দিয়ে ভালে করে আটকে নেয়। এদিকে ফোনের শব্দে মাহিনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। মনে মনে বলে,”ব্যাটা তোর তর সইছে না।”পরের বউকে নিয়ে লটরফটর তোর আর করতে হবে না। আজকেই সব শেষ হয়ে যাবে। মাহিন ঘুম জড়ানো কন্ঠে মিরাকে আহ্লাদ করে বলে,
—বাবু,গাড়ীর চাবিটা ডাইনিং টেবিলে রাখা আছে। গাড়ীটা আজ তুমি নিয়ে যাও।
মিরা অবাক হয়ে যায়। গাড়ীটা যদিও দুজনের টাকায় কেনা হয়েছে আজ অবদি মাহিন মিরাকে দেয়নি। মিরা বহু শখ করে দশ হাজার টাকা খরচ করে ড্রাইভিং শিখেছিলো। একবছর হলো গাড়ী কিনেছে। কিন্তু মাহিন একদিনের জন্য ওকে গাড়ীটা চালাতে দেয়নি।
আজ আবার মাহিনের কি হলো? মিরা কিছু না বলেই ঘর লক করে বেরিয়ে পড়ে। মাহিন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের প্রেয়সীর মৃত্যু দেখার জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু এ ও কি দেখছে? ওতো লুইচ্ছাটার গাড়িতে করে যাচ্ছে। মাহিনের মাথার চাঁদিটা প্রচন্ড গরম হয়ে গেল। অফিসে যেতে ইচ্ছা করছে না। মনে মনে মীরাকে কিভাবে মেরে ফেলবে তার প্লান করতে থাকে। মাহিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নেয়। আরহাম চৌধুরীর উপর মাহিন প্রচন্ড রেগে আছে। মনে হচ্ছে ঐ ব্যাটাকেই আগে ফাঁসিতে ঝুলাতে পারলে ওর ভীষণ ভালো লাগতো। কফি মেকার দিয়ে এক মগ কফি বানিয়ে মাহিন বারান্দায় গিয়ে রকিং চেয়ারটায় বসে। আর মনে মনে ভাবতে থাকে। মিরাকে বিষ খাইয়ে মারবে নাকি গলায় ফাঁস দিয়ে ফ্যানে ঝুলিয়ে দিবে। নাকি ইলেকট্রিক শক দিয়ে মারবে। একের পর এক সিগারেট ধরিয়ে মাহিন ভেবেই যাচ্ছে। কিন্তু কোনো কিছু মাথায় ঠিকমতো আসছে না। পুরো বারান্দায় আধখাওয়া সিগারেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আজকে ময়নার মাকেও মাহিন কাজ করতে দেয়নি। দরজা থেকেই বিদায় দিয়েছে। প্রচন্ড অস্থিরতা ওর অন্তরে বিরাজ করছে। একসময় উদভ্রান্তের মতো বাইরে গিয়ে নাইলনের দড়ি কিনে আনে। যা করার আজ রাতেই করতে হবে। মাহিন নিজের মাথাটাকে স্থির করে নেয়। কারণ অস্থির মস্তিস্কের কাজগুলো ভজগট পাঁকিয়ে যায়। মিরা আসার আগেই বারান্দা ঝাড়ু দিয়ে সিগারেটে পোড়া অংশগুলো বেলচা দিয়ে তুলে বিনে ফেলে দেয়। এর মাঝে মাহিনের ফোনটা বেজে উঠে। স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখে মিরা ফোন দিয়েছে। সাথে সাথে ফোনটা রিসিভ করে গলায় মধু মাখিয়ে বলে,
—তোমার পাহাড় সমান ব্যস্ততার মাঝে আমার কথা অবশেষে মনে পড়লো?
মিরা হালকা অনুযোগ করে বলে,
—আমাকে খোঁচা মেরে কথা না বললে তোমার পেটের ভাত হজম হয় না তাইনা?
মাহিন হেসে বলে,
—তোমার সাথেই তো একটু হালকা পাতলা দুষ্টমী করি। কি বলতে ফোন দিয়েছো বলে ফেলো।
—আমার প্রেজেন্টেশন ভীষণ ভালো হয়েছে। মনে হচ্ছে এ বছরের ফান্ড আমরা পেয়ে যাবো। এই উপলক্ষে আরহাম ভাইয়া আজকে হোটেল রেডিসনে পার্টি দিচ্ছে। তুমি আমি দুজনেই আমন্ত্রিত।
মাহিন একটু বিরক্ত হয়ে বলে,
—আমাকে আবার টানাটানি করছো কেন? জানো তো এ ধরণের অনুষ্ঠানে যেতে আমার একদম ভালো লাগে না।
—কেন ভালো লাগবে না? আমি যখন চাকরি করিনি তখন তোমার অফিসিয়াল অনুষ্ঠানে আমি যাইনি? ল্যাজ নাড়তে নাড়তে আমিও তো গিয়েছি। হাজার মানুষের সামনে তোমার মুখে তোমার ফিমেল কলিগদের প্রশংসা শুনেছি। আজকের পার্টিটা বলতে পারো আরহাম ভাইয়া আমার উপলক্ষে দিয়েছে। সেখানে তোমাকে আসতে বলা হয়েছে। দেখি তুমি আসো কিনা? ফোন রাখছি।
ফোনটা রেখে মাহিন কিছুক্ষণ ভাবে। এরপর সিদ্ধান্ত নেয় মিরার আজকের অনুষ্ঠানে ও যোগ দিবে। কেননা আজ রাতেই ও যেহেতু মিরাকে খুন করবে সে কারণে সন্দেহ করার মতো এমন কিছু করা ঠিক হবে না। মিরাকে ম্যাসেজ দিয়ে জানিয়ে দেয় ও রেডিসনে আসছে। মিরার ফোনটা টুং করে বেজে উঠে। তাকিয়ে দেখে মাহিন ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। ও আজ অনুষ্ঠানে আসছে। মিরা মনে মনে ভীষণ উৎফুল্ল। মিরাও ওকে ম্যাসেজে জানায়,ব্যস্ততার কারণে ও অফিস থেকেই রেডিসনে চলে যাবে। মাহিন যেন সন্ধা সাতটার মধ্যে রেডিসনে চলে আসে। ম্যাসেজটা সিন করার সাথে সাথে মোবাইল অফ হয়ে যায়। মাহিন ম্যাসেজটা দেখে ক্রুর হাসি হাসে আর মনে মনে বলে,
“যুদ্ধে জিততে হলে দুপা পেছাতে হয়। সে কারণে আমিও ল্যাজ নাড়তে নাড়তে তোমার অনুষ্ঠানে যাবো। তবে এটাই প্রথম আর এটাই আমার শেষ যাওয়া।” মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়াতে অফ হয়ে গিয়েছে। দ্রুত চার্জে দিয়ে মাহিন গোসল করতে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। আধ ঘন্টা ধরে কুসুম কুসুম গরম পানিতে শাওয়ার নেয়। এরপর শরীরে টাওয়েল জড়িয়ে বের হয়ে আসে। অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য রেডী হতে থাকে। ড্যাপার থেকে বানানো ক্রিম কালারের স্যুটটা ক্লসেট থেকে বের করে। তার সাথে জাম কালারের ফুল স্লিপ শার্টটা বের করে পরে নেয়। মোবাইলটা অন করে কোর্টের পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। এর পর পুরো রেডী হয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ওর মোবাইলটা আবার বেজে উঠে। মোবাইলের শব্দে মাহিন বলে,
“আমার প্রিয়ার যেন আর দেরী সইছে না।” বলে পাগলের মতো অট্টহাসি দেয়। কিন্তু ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে অফিস থেকে এসেছে। মানে বস ফোন দিয়েছে। দ্রুত রিসিভ করে হ্যালো বলতেই,
জামশেদ চৌধুরী গম্ভীর হয়ে বলেন,
—তোমাকে কখন থেকে ফোন দিয়ে যাচ্ছি বার বার সুইচ অফ বলছে, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না? আজ আবার অফিসে আসলে না। মাঝে মাঝে তোমার কি হয় আমি বুঝতে পারি না। চাকরির প্রয়োজন না হলে করার দরকার নেই। কিন্তু দায়িত্বশীল পদে থেকে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেওয়া ঠিক নয়।
—সরি স্যার,আসলে মোবাইলে চার্জ ছিলো না। সে কারণে মোবাইলটা বন্ধ ছিলো।
—আবারও মুর্খের মতো কথা বললে।তোমার ফোন বন্ধ কেন থাকবে? যাক তোমার সাথে যতই কথা বলবো ততই আমার মেজাজের বারোটা বাজবে। তার থেকে প্রয়োজনীয় কথাটা বলে ফোন রেখে দেওয়াই উত্তম। তোমাকে আজ রাতেই কক্সবাজারে যেতে হবে। এয়ারে যাবে। টিকিট কাটা হয়েছে। ইতিমধ্যে তোমার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানে কাল সকাল আটটায় ব্যায়ারদের সাথে তোমাকে মিটিং করতে হবে। রাত ন’টায় তোমার ফ্লাইট।
কথা শেষ করে জামশেদ চৌধুরী ফোনটা রেখে দিলেন। এদিকে মাহিনও কথা শেষ করে রাগে ফোনটা সোফার উপর ছুঁড়ে মারে।
তৃতীয় পর্ব
চলবে
