#ছোট গল্প
সন্দেহের চোরকাঁটা
মাহবুবা বিথী
—তুমি কবে আসছো?
মিরার কথা শুনে মাহিন বলে,
—কেন, আমার আদর খেতে ইচ্ছে করছে?
—কি যা তা বলছো? কেউ শুনলে তোমাকে কি ভাববে?
—শুনলে শুনবে,আমি আমার বউয়ের সাথে মজা করছি।
—তুমি আসছো কবে?
মাহিন তখনি মনে মনে মিরাকে সন্দেহ করতে শুরু করে। ওর কেন এতো জানার আগ্রহ,ও কবে আসছে? নাকি আজকের রাতটা নিজের নাগরের সাথে কাটাবে বলে ঠিক করেছে। মাহিনের নিরবতায় মিরা বলে,
—চুপ করে গেলে কেন?
—-দেখি কবে আসি। হুট করে এসে তোমাকে সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয় বলোতো?
মিরা হেসে বলে,
—ভালোই হয়। তবে আমিও তোমাকে সারপ্রাইজ দিবো।
—তাই নাকি?
—-হুম,তুমি এতোটাই খুশী হবে যা কখনও কল্পনাও করতে পারবে না।
মাহিন মনে মনে বলে,
—তোমার জন্য বিশাল সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার ফল তোমাকে অবশ্যই পেতে হবে। ফোন রাখছি।
—ওকে।
ফোনটা রেখে মিরা কিচেনে চলে যায়। কলিং বেলটা বেজে উঠে। দরজা খুলে দেখে ময়নার মা এসেছে। মিরা ময়নার মাকে ভিতরে আসতে বলে নিজের ঘরে চলে আসে। ওদিকে ক্যামেরায় কলিং বেলের শব্দ শুনে মাহিন তটস্থ হয়ে দেখতে থাকে। ময়নার মা রুমে এসে মিরাকে বলে,
—আইজকা কি রান্না করবেন?
মিরা বারান্দা থেকে শুকনো কাপড়গুলো তুলে এনে ভাঁজ করে ক্লসেটে তুলে রাখে। ময়নার মাকে ফ্রীজ থেকে খাসির মাংস বের করতে বলে। ওর মন বলছে, মাহিন আজই চলে আসবে। মনে মনে ঠিক করে, আজ সে খাসির মাংস আর ভুনা খিচুরি রান্না করবে। ওদিকে ময়নার মা পেঁয়াজ কেটে আদা রসুন ঝিরা বেটে রেডী করে রাখে। এরপর ঘরদোর ঝাড়ু দিয়ে মুছে সব কাজ শেষ করে বাসায় চলে যায়। এরমাঝে আসরের আযান হয়ে যায়। মিরা রান্না শেষ করে ওয়াশরুমে গিয়ে ওজু করে এসে নামাজ আদায় করে নেয়। সাথে দু রাকআত শোকরানার নামাজ আদায় করে। কতদিনের অপেক্ষার ফল আল্লাহপাক দিলেন। নিজের পেটে হাতটা বুলায়।
এরপর ডাইনিং রুমে এসে খাসির মাংস দিয়ে খিচুরি খেয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয়। মাহিন হোটেল থেকে ওকে দেখতে থাকে। মিরা মোবাইলে কার সাথে যেন হেসে হেসে কথা বলতে থাকে। মাহিনের সাথে সাথে মাথার চাঁদিটা আবার গরম হয়ে উঠে। কেন যেন মনে হয় মিরা ঐ লুইচ্চাটার সাথে কথা বলছে। তবে আরহাম লুইচ্ছা হেব্বি সেয়ানা। ফাঁকা বাসা পেয়েও অভিসারে আসলো না। আসবে কেন? যেখানে বাইরে নষ্টামী করার বহুত সুযোগ আছে। প্রায়তো গাজীপুরে যায়। মিরাকে জিজ্ঞাসা করলে বলে,
—কারখানা ভিজিটে যাই।
মিরার কাজ তো সমাজের অবহেলিত বঞ্চিত নারীদের নিয়ে। কারখানায় ওর কি কাজ মাহিন বুঝে পায় না। তবে একবার মাহিন দেখার জন্য লোক লাগিয়ে রেখেছিলো। সেই লোক এসে বলেছে, ও কারখানার মহিলা শ্রমিকদের সাক্ষাতকার নেয়।
আসলে মিরার নিজের প্রতি এতোটা যত্ন মাহিনের ভালো লাগে না। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ইদানিং যত্ন করে। প্রথমে মাহিন ভাবতো, মিরার এই সচেতনতা ওর জন্য। সে কারণে একদিন আবেগ মিশ্রিত কন্ঠে মাহিন জিজ্ঞাসা করেছিলো,
—তুমি কি আমার জন্য নিজেকে এমন ফিটফাট রাখো?
সাথে সাথে মিরা গম্ভীর হয়ে বলেছিলো,
—না,আমি আমার নিজের জন্য নিজেকে সাজিয়ে রাখি। তাছাড়া অফিসে যেতে হয়। সেখানে পরিপাটি না থাকলে কি চলে?
সেই থেকে মাহিনের ভিতর লুকিয়ে থাকা সন্দেহের বীজটা ডালপালা ছড়াতে থাকে। মাহিন আর কিছু ভাবতে পারে না। মনে মনে বলে,”তোমার সৌন্দর্য শুধু আমার জন্য। আর তা যদি আমার না হয় তবে এই পৃথিবীর আর কেউ তা উপভোগ করতে পারবে না। তোমার রক্তিম অধর আমার জন্য,তুমি কাজল পরবে আমার জন্য,তুমি খোপায় ফুল পরবে আমার জন্য,তোমার মেদহীন শরীরের উষ্ণতা আমার জন্য। আমি তোমাকে কারো হতে দিবো না।” রাত নটায় ফ্লাইট। আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। এখন সন্ধা ছ’টা বাজে। আসিফ দুপুরেই চলে গিয়েছে। মাহিন ইচ্ছে করেই রাতের ফ্লাইটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাসায় পৌঁছাতে প্রায় রাত এগারোটা বেজে যাবে। গভীর রাতে ওর প্লান সফল করতে সুবিধা হবে। ফোন অফ করে মাহিন হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ে। যথারীতি রাত ন,টার ফ্লাইটে রাত দশটার সময় ঢাকায় পৌঁছে যায়। এয়ারপোর্ট থেকে একটা উবার নিয়ে বাসার পথে রওয়ানা দেয়। এগারোটার সময় বাসায় পৌঁছে যায়। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে যখনি তালাটা আস্তে করে খুলে ফেলে তখনি বিদ্যুৎ চলে যায়। মাহিন মনে মনে আবারও বিরক্ত হয়। কেন যে বার বার বাঁধা চলে আসে? ঘরে ঢুকে ড্রইংরুমের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। একটু পরেই জেনারেটর চালু হলে ঘরে কারেন্ট চলে আসে। খট করে শব্দ হওয়াতে মিরা ফোন হাতে দরজার কাছে চলে আসে। দরজার লকটা দেখে আবার রুমের ভিতর চলে যায়। মিরার ফোনটা বেজে উঠে। মাহিন কান খাঁড়া করে রাখে। গোপন জায়গা থেকে লাইলনের দড়িটা বের করে। ফাঁস দেওয়ার জন্য সেটা রেডী করে। ফাঁস দিয়েই ওকে ফ্যানে ঝুলিয়ে দিবে। তারপর চিৎকার করে দারোয়ানকে ডাকবে। এমনভাব করবে বাসায় এসে মিরাকে ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায় পেয়েছে।
মিরা হাসতে হাসতে ফোনে বলে,
—কি জানি মাহিনের কাছে এই সংবাদ সারপ্রাইজ হবে কিনা আমি জানি না। কারণ ও আমাকে সন্দেহ করে। হয়তো চাকরিটা ছেড়ে দিতাম। কিন্তু বাসায় বসে থাকলে আমাকে ডিপ্রেশন গ্রাস করে। সে কারণে চাকরিটা করছি। এখন যেহেতু কনসিভ করেছি শরীর পারমিট না করলে চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারি। তবে এটাও ঠিক মাহিন যদি নিজের সন্তানকে অস্বীকার করে তাহলে চাকরিটা ছাড়বো না। আমার পরিচয়ে ওকে আমি বড় করে তুলবো।
কথাটা বলে মিরা খাট থেকে নেমে জানালার কাছে দাঁড়ায়। আকাশে আজ রুপালী থালার মতো চাঁদ উঠেছে। মিরার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। ফোনের ওপাশ থেকে ডাক্তার আপু মিরাকে বলে,
—এতো ভেবো না। আল্লাহপাকের কাছে দোয়া করো দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মিরা ইমোশনাল হয়ে সিক্ত গলায় বলে,
—আপু তুমি তো আমার জার্ণিটা দেখেছো। একটা সন্তানের জন্য আমি নিজেকে ভেঙ্গে চুড়ে গড়েছি। অফিস করে জিমে গিয়ে নিজের শরীরের বাড়তি মেদ ঝরিয়েছি। ডায়েট করেছি। আমি কতদিন পর আজ শান্তি করে খিচুরি খেলাম। ভাত খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। এমন সময় মাহিন পিছন দিক থেকে মিরাকে জড়িয়ে ধরে। অকস্মাৎ এভাবে জড়িয়ে ধরাতে মিরার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়। মাহিন মিরাকে পাঁজা কোলা করে কোলে তুলে নেয়। এরপর ওর গালে চুমু খেয়ে বলে,
—তুমি আমাকে একি শোনালে! আমিও শুধু এই সংবাদ শোনার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে থেকেছি। তোমার জিম করা দেখে ভাবতাম সংসারের দিকে তোমার কোনো টান নেই। ডায়েট করা দেখে সন্দেগ করতাম। মিরা আমাকে তুমি মাফ করে দাও। আমার মতো শয়তানকে তুমি যা শাস্তি দিবে আমি তা মাথা পেতে নিবো। শুধু তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।
ডাক্তার ওদের কথপোকথন শুনে মুচকি হেসে ফোনের লাইনটা কেটে দিয়ে আল্লাহপাকের কাছে শোকরিয়া আদায় করে।
মাহিন মিরাকে বিছানায় আলতো করে শুইয়ে দেয়। মিরা মাহিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
—চলে যাবার হলে অনেক আগেই চলে যেতাম। আমি শুধু শেষটা দেখতে চেয়েছিলাম। আল্লাহপাকের উপর আমার ভরসা আর বিশ্বাস ছিলো,আল্লাহপাক তোমাকে ঠিক আমার কাছে ফিরিয়ে দিবেন। আমি তো তোমার সাথে প্রতারণা করিনি।
কিন্তু মাহিন নিজের হাত মুঠি করে দেওয়ালে ঘুষি মেরে বলে,
—তুমি জানো না আমার এই হাত কত জঘন্য কাজ করতে যাচ্ছিলো?
মাহিনের হাতের চামড়া ছিলে গিয়ে সেখান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। মিরা সেটা দেখে দৌড়ে গিয়ে ফাস্টএইড বক্সটা এনে হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে বলে,
—তোমার পাগলামী করার স্বভাবটা আর গেলো না?
মাহিন মিরার দিকে তাকিয়ে ভাবে,
—ও কি করতে যাচ্ছিলো। তিনটা জীবন নষ্ট হয়ে যেতো।
মিরার ফোনটা বেজে উঠে। স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখে আরহাম ফোন দিয়েছে। মিরা মাহিনের দিকে তাকায়। মাহিন সাথে সাথে মিরাকে বলে,
—হা করে কি দেখছো? ভাইয়ার ফোনটা ধরো।
মিরা ফোনটা রিসিভ করার সাথে সাথে ওপাশ থেকে আরহাম বলে,
—তোমার ভাবীর কাছে সংবাদটা শুনলাম। ডাক্তার ফোন করে মহুয়াকে জানিয়েছিলো। ভীষণ খুশী হয়েছি। সন্তান না থাকার যন্ত্রনা আমি আর মহুয়া খুব ভালো করে জানি। মাহিনকে ট্রিট দিতে বলবে। রাখছি।
মাহিন মিরার কাছে এসে আবারও ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
সমাপ্ত
