#যাঁতাকল (পর্ব ১)
SupriyaGhosh
রাত আটটা বেজে দশ। শিয়ালদহ মেইন লাইনের ঠাসা ভিড়, ঘামে ভেজা মানুষের গায়ের গন্ধ আর ট্রেনের কামরার অসহ্য গুমোট কাটিয়ে যখন নীলাদ্রি স্টেশনে নামল, ওর পা দুটো যেন আর চলছিল না। শার্টের কলারটা ঘামে নেতিয়ে কালচে হয়ে গেছে। কাঁধের ল্যাপটপ ব্যাগটার ফিতে যেন চামড়া চিরে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। স্টেশনের বাইরে আসতেই কলকাতার চেনা আর্দ্র ভ্যাপসা বাতাস ওকে অভ্যর্থনা জানাল। অটো থেকে যখন পাড়ার মোড়ে নামল, তখন ওর মাথার ভেতর ঘুরছে বিকেলের কনফারেন্স কলের বসের কড়া কথাগুলো — *”নীলাদ্রি বাবু, গ্রাফটা দেখছেন? নিচের দিকে যাচ্ছে। এই মাসে যদি ইনসিওরেন্স পলিসির টার্গেট মিট না হয়, তবে কিন্তু কোম্পানিকে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে।”*
বাজারের থলিটা হাতে নিয়ে গলির মোড় থেকে কিছু সবজি কিনল ও।” কলিং বেলটা টিপে নীলাদ্রি দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।বেল টেপার পর দরজা খুলল রিয়া।
রিয়ার মুখটা থমথমে। পরনের নাইটিটা ঘামে মাখামাখি। নীলাদ্রি ভেতরে পা রাখতেই কোনো রিয়া শুরু করলো, “জুতোটা অন্তত স্ট্যান্ডে রাখো। ঘরে পা রাখার জায়গা নেই, তার ওপর মা সারা দুপুর ড্রয়িং রুমে পুরোনো খবরের কাগজ স্তূপ করে রেখেছেন। আমি গোছাতে গেলে বললেন— উনি নাকি ওগুলো দিয়ে ঠোঙা বানাবেন। এই বয়সে ঠোঙা বানিয়ে উনি কোন রাজপ্রাসাদ গড়বেন আমি জানি না, কিন্তু আমার ঘরটা যে নোংরা হয়ে যাচ্ছে সেটা দেখার কেউ নেই!”
নীলাদ্রি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্যানটা ফুল স্পিডে চালাল। সোফায় বসতে গিয়ে দেখল সত্যি ছোট ছোট কাগজের কুচি ছড়িয়ে আছে।ব্যাগটা নামিয়ে রাখতেই ভেতর ঘর থেকে সুমিত্রা দেবী বেরিয়ে এলেন। বয়স হয়েছে, হাঁটুতে ব্যথা, তাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেন। হাতে একটা স্টিলের গ্লাস, তাতে জল। কিন্তু মুখে একরাশ বিরক্তি।
“এলি? এই নে জল খা। ও তো তোকে জলটুকুও দেবে না। তোর বউকে বললাম একটু চা করতে, তা উনি তখন ফোনের ওপারে কার সাথে যেন সিরিয়ালের গল্প করতে ব্যস্ত। আমি দুবার বলার পর মুখ ঝামটা দিয়ে বলল— ‘নিজে করে খান না কেন?’ তা বাপু, আমার কি এই শরীরে দাঁড়িয়ে চা করার ক্ষমতা আছে?”
রিয়া রান্নাঘর থেকে খুন্তি নাড়ার আওয়াজের মাঝেই চিৎকার করে উঠল, “আমি কখন মুখ ঝামটা দিলাম মা? আমি শুধু বলেছিলাম ডালটা ফুটছে, এই সময় গ্যাস ছেড়ে নড়লে ডাল উথলে পড়বে। আপনি তো তিল থেকে তাল করতে ওস্তাদ।”আর শুনুন আমি সারাদিন এই সংসারের পিছনে খেটে মরি, যদি দুদন্ড শান্তির জন্য একটু গল্প করি তাতে আপনার গা জ্বালা কিসের শুনি??
“শুনলি তো নীলু? আমার কথার কোনো দাম নেই এই বাড়িতে। তুই আসার আগেই নালিশের ডালি সাজিয়ে বসে থাকে। আমি যেন এই বাড়িতে উটকো উৎপাত,” সুমিত্রা দেবী গ্লাসটা টিপয়ের ওপর সশব্দে নামিয়ে রাখলেন, জলের ছিটে নীলাদ্রির ল্যাপটপ ব্যাগের ওপর পড়ল।
নীলাদ্রি দুহাতে মাথা চেপে ধরল। অফিসে আজ তিনটে ‘প্রস্পেক্ট’ রিজেক্ট হয়েছে। একজন তো মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।অপমান আর টার্গেট না হওয়ার ভয়ের ওপর এই পারিবারিক কিচকিচ ওর সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। ও মৃদু স্বরে বলল, “মা, রিয়া সারাদিন রান্নাঘরে থাকে, ও হয়তো ব্যস্ত ছিল। আর রিয়া, মা তো একটু বলতেই পারেন। উনি একটু চা খেতে চেয়েছেন, তাতে এত রিয়্যাক্ট করার কী আছে?”
রিয়া তেড়ে এল রান্নাঘর থেকে, হাতে ধরা খুন্তি, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, “রিয়্যাক্ট করব না? আজ দুপুরে ঝিঙের তরকারিতে নুন কম হয়েছে বলে তোমার মা থালা ঠেলে উঠে গেলেন। অথচ কাল রাতে উনি নিজেই ডাক্তার দেখিয়ে এসে বললেন— ‘বউমা, নুন কম দিও, আমার প্রেশার বাড়ছে।’ আমি কোনটা শুনব? ওনার মর্জি মতো চলব নাকি ডাক্তারবাবুর কথা শুনব? আমি তো আর জাদুকর নই যে তুড়ি মারলে সব ঠিক হয়ে যাবে!”
মা এবার মোড়ার ওপর বসে পড়লেন, গলায় কান্নার সুর এনে বললেন, “আমি কি মিথ্যে বলছি নীলু? তুই নিজে খেয়ে দেখিস তো তরকারিটা মুখে তোলা যায় কি না। আমি বুড়ো মানুষ, একটু স্বাদ করে খেতে চাওয়াটাও কি আমার অপরাধ? আর আমি কি থালা ঠেলেছি? আমি তো শুধু বললাম রিয়া একটু নুন দাও, তাতেই তোর বৌ আমায় নানান কথা শোনাতে শুরু করে দিলো ।”
“কথা কেন শোনাবো না মা?” রিয়া এবার ড্রয়িং রুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল, “সকালে যখন আমি কলতলার বালতি নিয়ে ঘর মুছছিলাম, তখন আপনি পাশের বাড়ির কাকিমাকে ডেকে বললেন— ‘দেখো দিদি, আমার বউমার লক্ষ্মীশ্রী, বাইরের বালতি দিয়ে ঘর মুছছে,, আচার বিচারের ছিটেফোঁটাও নেই ।’ এটা কি বলা খুব দরকার ছিল? পাড়ার লোকে শুনলে কী ভাববে?”
সুমিত্রা দেবী আকাশ থেকে পড়লেন, “আমি আবার কখন বললাম? আমি তো শুধু বললাম বালতিটা সাবধানে রেখো, কারুর পায়ে লাগতে পারে। ব্যাস, এইটুকু বলাতেই উনি ওনার মরা বাবার প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। আমার তো এখন মুখ খোলাই দায়।”
বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। নীলাদ্রি দেখল ওর মোবাইলে একটা হোয়াটস্যাপ নোটিফিকেশন এল— কাল সকাল সাড়ে আটটায় বসের পার্সোনাল কেবিনে হাজিরা দিতে হবে। অর্থাৎ আজ রাতে ওকে অন্তত দশটা নতুন ক্লায়েন্টের লিস্ট বানাতে হবে।
নীলাদ্রি উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা হাতে নিল, “তোমরা কি বুঝতে পারছ আমার কন্ডিশনটা? অফিসে আমাকে রোজ কুকুর-বেড়ালের মতো কথা শোনায়। ট্রেনের লোকগুলো ধাক্কা মারতে মারতে প্রায় মেরে ফেলে। আমি এই বাড়িতে আসি একটু শান্তির আশায়, একটু শান্তিতে দুটো ভাত খাব বলে। কিন্তু এখানে ঢুকলেই মনে হয় আমি কোনো রণক্ষেত্রে এসেছি। মা তুমি যেমন একচুল ছাড়বে না, রিয়া তুমিও ঠিক তাই।”
রিয়া গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে ফিরে গেল, “হ্যাঁ, সব দোষ আমার। আমি তো এই বাড়ির কাজের লোক, আমার তো কোনো মন নেই।”
মা ওঘর থেকে চেঁচিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, আমিই তো সব নষ্টের গোড়া। তুই আমাকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আয় নীলু, তাহলেই তোর ঘর শান্ত হবে।”
নীলাদ্রি নিজের শোওয়ার ঘরে গিয়ে দরজাটা জোরে বন্ধ করে দিল। ও জানে একটু পরেই মা ঠাকুরঘরে গিয়ে জোরে জোরে ঘন্টা বাজিয়ে নিজের দুঃখ জানাবেন, আর রিয়া বাসনপত্রের ওপর রাগ ঝাড়বে। আলমারি থেকে জামাকাপড় বার করার সময় রিয়া ওটা ধড়াম করে বন্ধ করবে। ডাইনিং টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া থাকলেও কারুর খিদে নেই, আছে শুধু একে অপরকে মানসিক ভাবে ক্ষতবিক্ষত করার এক অদম্য জেদ।
নীলাদ্রি অন্ধকার ঘরে ফ্যানটা চালিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। এসি চালানোর সামর্থ্য নেই, তাই এই গরমেই ঘামতে ঘামতে ওকে ভাবতে হচ্ছে কালকের টার্গেট আর মাসের শেষে ইলেকট্রিক বিলের কথা। ওর মনে হলো, বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে হয়তো শহরের ধুলো ধুয়ে যায়, কিন্তু ওর এই ছোট্ট সংসারের তিক্ততা ধোয়ার মতো কোনো বৃষ্টি আজও পৃথিবীতে আসেনি।
চলবে…….
