#যাঁতাকল (অন্তিম পর্ব)
পরদিন সকালে যখন নীলাদ্রির ঘুম ভাঙল, ঘরের ভেতরটা এক মায়াবী স্তব্ধতায় ডুবে ছিল। রোজকার মতো জানলা দিয়ে আসা রোদটা আজ যেন একটু বেশিই উজ্জ্বল। রান্নাঘর থেকে আসা বাসনের টুংটাং আর ভাজা মশলার সুবাস নীলাদ্রিকে মনে করিয়ে দিল যে পৃথিবীটা বদলে গেছে। ও ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে যখন আয়নায় নিজের মুখটা দেখল, দেখল চোখের নিচের সেই কালিগুলো যেন আজ অনেকটা ফিকে। চাকরি থাকবে কি থাকবে না—সেই অনিশ্চয়তা তো আছেই, কিন্তু মনের ভেতর সেই পরিচিত যুদ্ধের দামামাটা নেই।
নীলাদ্রি ড্রয়িং রুমে আসতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। মা আর রিয়া দুজনে মিলে সোফায় বসে আছেন।রিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে মাকে ফোনের কোনো একটা অ্যাপ ব্যবহার করা শেখাচ্ছে।
মা হেসে বললেন, “দেখ নীলু, বউমা আমাকে বলছে এখন নাকি ফোনেই ট্রেনের টিকিট কাটা যায়! আমাকে নাকি ট্রেনে করে কোথাও গেলে আর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।”
রিয়া নীলাদ্রিকে দেখে মুচকি হাসল। ওর চোখে এক অমোঘ প্রশান্তি। ও উঠে গিয়ে নীলাদ্রির জন্য এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর দুটো বিস্কুট নিয়ে এল। আলতো করে নীলাদ্রির কাঁধে হাত রেখে বলল, “আজ একদম চিন্তা করবে না। যা হবে দেখা যাবে। আমি ঠিক করেছি, যদি খুব অসুবিধা হয়, আমি বিকেলে কিছু টিউশনিও ধরব। আমরা দুজনে মিলে ঠিক টেনে দেব।”
নীলাদ্রি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অনুভব করল, এই স্বাদের কাছে পৃথিবীর সব দামী পানীয় তুচ্ছ। ও ধীরস্থির পায়ে অফিসের দিকে রওনা দিল। বাসে ভিড় ছিল, রোদের তেজও ছিল প্রখর, কিন্তু নীলাদ্রির মনে হচ্ছিল ও যেন এক বর্ম পরে আছে—পরিবারের ভালোবাসার বর্ম।
অফিসে ঢুকতেই পরিবেশটা থমথমে লাগল। বসের কেবিনে ঢোকার আগে ও বুকভরে একটা শ্বাস নিল। বস চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, “নীলাদ্রি বাবু, আপনার ফাইলটা আমার সামনে। পারফরম্যান্সের যা হাল, তাতে টার্মিনেশন লেটারটা সই করা ছাড়া আমার উপায় নেই। কোম্পানি আপনার মতো ‘ডেড উড’ বয়ে বেড়াতে পারবে না।”
নীলাদ্রি আজ ভেঙে পড়ল না। ও স্থিরভাবে বসের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার, আমি জানি আমার ওপর আপনার ক্ষোভ যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু আপনি কি জানেন, ওই সল্টলেকের ক্লায়েন্ট কেন শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গিয়েছিলেন? ওনার পরিবারে একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আমি গতকাল রাতেও ওনার সাথে কথা বলেছি। ওনারা পলিসিটা করবেন, তবে ১৫ দিন সময় চেয়েছেন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি স্যার, আগামী ১৫ দিনে আমি শুধু ওই ক্লায়েন্ট নয়, আরও তিনটে নতুন লিড ক্লোজ করে দেখাব। আমার ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়টা থিতিয়ে গেছে, এখন আমি তৈরি।”
নীলাদ্রির এই দৃঢ় আত্মবিশ্বাস দেখে বস কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। সাধারণত ছাঁটাইয়ের মুখে কর্মীরা কান্নাকাটি বা অজুহাত দেয়, কিন্তু নীলাদ্রি দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছে। বস কিছুক্ষণ গুম হয়ে থেকে বললেন, “ঠিক আছে। আপনাকে ১৫ দিনের ‘নোটিশ পিরিয়ড’ দিচ্ছি। যদি এই সময়ের মধ্যে রেজাল্ট না পাই, তবে কোনো কথা শুনব না। এবার যান।”
কেবিন থেকে বেরিয়ে নীলাদ্রির মনে হলো ও যেন এক বিশাল যুদ্ধ জয় করেছে। সারাটা দিন ও পাগলের মতো খাটল। কলকাতার রাজপথ, গলি, মানুষের ভিড়—সবকিছুই ওকে শক্তি দিচ্ছিল। বিকেলের দিকে ও একটা বড় কর্পোরেট পলিসি সই করাতে সফল হলো, যা ওর টার্গেটের অনেকটা অভাব পূরণ করে দিল।
ফিরতি পথে নীলাদ্রি লেক মার্কেটের সামনে নামলো।ও গেল একটা নার্সারি তে । মায়ের জন্য কিনল একটা গন্ধরাজের চারা, কারণ মা গাছ খুব ভালোবাসেন কিন্তু রিয়ার সাথে অশান্তির ভয়ে আর নতুন গাছ বসাননি। আর রিয়ার জন্য কিনল ওর প্রিয় মাটির তৈরি এক জোড়া কানের দুল আর রাস্তার ধারের প্রিয় ভেলপুরি।
রাত আটটায় নীলাদ্রি যখন বাড়ির কলিং বেল টিপল, দরজা খুলল মা। নীলাদ্রি গন্ধরাজের চারাটা মায়ের হাতে দিয়ে বলল, “এটা জানলার ধারে বসিয়ে দিও মা। এটার গন্ধে তোমার খুব ভালো ঘুম হবে।”
মা আবেগে আপ্লুত হয়ে চারাটা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রিয়া ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতেই নীলাদ্রি ওর হাতে ভেলপুরির প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, “আজ আমরা একসাথে বসে চা আর ভেলপুরি খাব।”
সেদিন ডিনারের টেবিলটা ছিল একদম অন্যরকম। মা নিজে হাতে রিয়াকে মাছের কাঁটা বেছে দিচ্ছিলেন, আর রিয়া মাকে বলছিল— “মা, কাল আপনি যখন ঠোঙা বানাবেন, আমাকেও শেখাবেন তো? আপনার হাতের কাজ খুব সুন্দর।” নীলাদ্রি দেখল, শাশুড়ি বৌমার মান -অভিমান আজ হাসিতে ধুয়ে গেছে।
নীলাদ্রি জানলার বাইরে তাকাল। আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে। ও বুঝতে পারল, সংসারের সুখ শুধু ব্যাঙ্কের ব্যালেন্সে বা অফিসের ইনসেন্টিভে নেই; সেটা লুকিয়ে থাকে একে অপরের দুর্বলতাকে ঢেকে রাখা আর শক্তির পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর মধ্যে। মধ্যবিত্তের জীবন হয়তো চিরকালই একটা টার্গেট পূরণের লড়াই, কিন্তু সেই লড়াইয়ে যদি আপনজনরা সাথী হয়, তবে হারার ভয় থাকে না।
আজ নীলাদ্রির টার্গেট পূর্ণ হয়েছে—অফিসের খাতায় হয়তো কিছুটা বাকি, কিন্তু জীবনের খাতায় ও আজ ১০০ তে ১০০। এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটা আজ আর নরক নয়, বরং এক টুকরো স্বর্গের মতো শান্ত আর নিরাপদ। মা, বউ আর নীলাদ্রি—তিনটে জীবনের সুর মিলেমিশে এক সুন্দর সমবেত সঙ্গীতে পরিণত হলো।
সমাপ্ত
