#গৃহশিক্ষিকা (অন্তিম পর্ব )
পুরো ড্রয়িংরুমে তখন এক অসহ্য নিস্তব্ধতা। ঘড়ির কাঁটার শব্দটাও যেন হাতুড়ির মতো বাজছে। সুমনা দেবী এতক্ষণ ধরে যে দাপট দেখাচ্ছিলেন, তা যেন তাসের ঘরের মতো ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়েছে। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “না মানে সৌমি, আমি আসলে অতটা খারাপ ভাবে বলিনি… ওই তিতলির রেজাল্ট দেখে মাথাটা গরম ছিল। তুমি রেকর্ডিং-এর কথা কেন আনছো? ওটা কি ঠিক হচ্ছে?”
সৌমি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “মাথা গরম হলে মানুষের আসল রূপ বেরিয়ে আসে কাকিমা। আপনি আমাকে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ বলেছিলেন বিদ্রূপ করে, আজ আমি আপনাকে প্রমাণ করে দিয়ে গেলাম যে একজন শিক্ষক চাইলে অহংকারী মানুষের শিরদাঁড়াও নাড়িয়ে দিতে পারে। আপনার কাছে শিক্ষা মানে হলো একটা পণ্য, যেটা কিনলে আপনি ভাবেন তার বিক্রেতাকে যা খুশি বলা যায়। কাল আপনি আমাকে এক কাপ চা পর্যন্ত দেননি , অথচ আপনার স্বামী কিন্তু কালই বাজারে গিয়ে কয়েক হাজার টাকার ইলিশ মাছ কিনে এনেছেন। আপনাদের ফ্রিজ ভরা খাবার থাকতে পারে, কিন্তু আপনাদের মনটা বড্ড ছোট। আভিজাত্য দামী সোফায় থাকে না কাকিমা, আভিজাত্য থাকে ব্যবহারে।”
অখিলবাবু এবার পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে নোটগুলো গুনতে শুরু করলেন। “এই নাও মা, তোমার ২৫০০ টাকা। আর এই নাও আরও ৫০০ টাকা, কাল তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার হয়েছে তার জন্য এটা আমার তরফ থেকে ক্ষমা। তুমি প্লিজ তিতলিকে পড়ানোটা ছেড়ো না। সামনেই পরীক্ষা, ও তোমাকে খুব মান্য করে। তুমি চলে গেলে ওর ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”
সৌমি ২৫০০ টাকাটা খুব শান্তভাবে গুনে ব্যাগে ভরল। কিন্তু বাড়তি ৫০০ টাকার নোটটা টেবিলের ওপর ফেরত দিয়ে দিল। “কাকু, আমি ভিক্ষা নিতে আসিনি। আমি আমার মেহনতের টাকা নিয়েছি। আর এই যে বইটা, এটা তিতলিকে আমি উপহার হিসেবে দিয়ে গেলাম। এটা পড়ে যদি ওর মানুষ হওয়ার ইচ্ছে জাগে, তবেই আমার পরিশ্রম সার্থক হবে। কিন্তু আপনার এই বাড়তি ৫০০ টাকা আমি নেব না, কারণ আমার আত্মসম্মান ৫০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি হওয়ার মতো সস্তা নয়।”
সুমনা দেবী এবার সত্যিই লজ্জিত হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে আজ তিনি হেরে গেছেন। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে সৌমীর হাতটা ধরতে চাইলেন। “সৌমি, শোনো মা… তুমি যেও না। তিতলির সামনে পরীক্ষা, এই সময় তুমি চলে গেলে ওর খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি কথা দিচ্ছি, এরপর থেকে তোমাকে বাড়ির বড় মেয়ের সম্মান দেব। তোমার জন্য দামী কাপে চা হবে, তোমাকে আর এক মিনিটও বেশি পড়াতে হবে না। মাইনেও বাড়িয়ে দেব দুহাজার টাকা। তুমি কাল থেকে এসো লক্ষ্মীটি, তিতলি তোমায় ছাড়া অংক বুঝবে না।”
সৌমি তার ব্যাগটা কাঁধে ঝোলাল। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো ঘুরে তাকাল। সুমনা দেবীর চোখে চোখ রেখে সে বলল, “সম্মানটা যখন হৃদয় থেকে আসে না কাকিমা, তখন সেটা টাকার বিনিময়ে বা দামী কাপে চায়ের বিনিময়ে কেনা যায় না। কাল পর্যন্ত আমি আপনাদের কাছে একজন ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ ছিলাম, আজ হঠাৎ বিপদে পড়ে ‘বড় মেয়ে’ আর ‘লক্ষ্মী’ হয়ে গেলাম? আসলে আপনারা আমাকে নয়, তিতলির রেজাল্ট খারাপ হওয়ার ভয়টাকে সম্মান দিচ্ছেন। আপনাদের এই ভালোমানুষিটা আমার সহ্য হচ্ছে না।”
সুমনা দেবী এবার প্রায় কান্নাকাটি শুরু করলেন, “কিন্তু ওর পরীক্ষা! ওর কী হবে? তুমি যা চাইবে আমি তাই দেব সৌমি, প্লিজ যেও না। আমি হাত জোড় করছি।”
সৌমী খুব শান্ত কিন্তু কঠোর গলায় বলল, “এই শহরে অভাবী শিক্ষিকা অনেক পাবেন কাকিমা, কিন্তু যে শিক্ষক নিজের সম্মান বিকিয়ে দিয়ে পড়াতে আসে, সে ছাত্রকে কোনোদিন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শেখাতে পারে না। আমি আজ চললাম। তিতলির অংক আপনি যাকে দিয়ে খুশি শেখান, কিন্তু ওকে মানুষ করার জন্য আগে নিজেরা মানুষ হওয়ার চেষ্টা করুন। আশা করি এরপর যে শিক্ষক আপনার বাড়িতে আসবে, তাকে অন্তত মানুষ হিসেবে গণ্য করবেন। দয়া নয়, প্রাপ্য সম্মানটুকু দেবেন।”
সৌমী মিত্র বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। চারদিকে এক স্নিগ্ধ হাওয়া বইছে। রাস্তার জমা জলে ল্যাম্পপোস্টের আলোটা প্রতিফলিত হচ্ছে। আজ আর সৌমীর শরীর ম্যাজম্যাজ করছে না, বরং একরাশ হালকা ভাব কাজ করছে। সে জানে, কাল থেকে তাকে আবার নতুন টিউশনি খুঁজতে হবে, আবার সেই বাসের জ্যামে লড়াই করতে হবে। কিন্তু আজ রাতে সে যখন তার বাবার সামনে দাঁড়াবে, তখন আর তাকে চোখ নামিয়ে মিথ্যে বলতে হবে না। আজ সে মাথা উঁচু করে তার বাবার জন্য ওষুধ কিনে নিয়ে যেতে পারবে।
মিত্র বাড়ির জানলা দিয়ে সুমনা দেবী তাকিয়ে দেখলেন, আত্মসম্মানে বলীয়ান এক অসামান্য তেজস্বী মেয়ে বীরদর্পে রাজপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। যার কাছে টাকার চেয়ে নিজের ব্যক্তিত্বের দাম অনেক বেশি। সুমনা দেবী জানতেন, তিনি আজ শুধু একজন শিক্ষক হারাননি, বরং তাঁর সাজানো আভিজাত্যের প্রাসাদের ভিতটাই আজ কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে এক সাধারণ মেয়ে। এই শহরে রোজ হাজারো সৌমি অপমানিত হয়, কিন্তু আজ একজন সৌমি দেখিয়ে দিয়ে গেল যে মেধা আর ব্যক্তিত্বের কাছে টাকার দম্ভ চিরকালই নতমস্তক হতে বাধ্য।
সমাপ্ত
