#গৃহশিক্ষিকা (পর্ব ৩)
পরের দিন বিকেল পাঁচটা বাজার ঠিক দশ মিনিট আগে মিত্র বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়াল সৌমি। আজ তার চোখেমুখে কোনো ক্লান্তির ছাপ নেই, বরং এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। ঠিক ৫টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে সে কলিং বেল টিপল। সুমনা দেবী দরজা খুলেই ঘড়ি দেখলেন। তারপর একটা বাঁকা হাসি হেসে বললেন, “বাঃ! আজ দেখছি সময়ের হুঁশ হয়েছে।ভেতরে এসো, তিতলি বসে আছে। আর শোনো, কাল আমরা বাড়ি থাকবো না, তোমাকে পড়াতে আসতে হবে না, তাই আজ একটু বেশিক্ষন পড়িয়ে দিও ।”
সৌমি ভেতরে ঢুকল, কিন্তু পড়ার ঘরের দিকে না গিয়ে সোজা ড্রয়িংরুমের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে তিতলির কতগুলো নোট বের করে সেন্টার টেবিলের ওপর সজোরে রাখল। শব্দটা শুনে সুমনা দেবী ঘুরে তাকালেন।
“কী হলো? ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে যাও!” সুমনা দেবীর গলায় হুকুমের সুর।
সৌমি খুব শান্ত গলায় বলল, “কাকিমা, বসার ঘরে কাকুকে একবার ডাকুন। আমি যা বলব, আপনাদের দুজনকেই শুনতে হবে।”
সুমনা দেবী অবাক হলেন। “কাকুকে কেন?তোমার কাকুর এসব ছোটখাটো বিষয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। তুমি কি এখন আমার নামে নালিশ করবে নাকি?”
“নালিশ নয় কাকিমা, আমি আজ আপনাদের একটা বিশেষ শিক্ষা দিতে এসেছি, যেটা তিতলিকে দেওয়ার আগে আপনাদের দুজনের শেখা খুব জরুরি। আর আপনি যেটাকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ বলছেন, সেটা আসলে আপনাদের আভিজাত্যের কঙ্কালটা বের করে দেবে।” সৌমির গলার স্বরে এমন এক আত্মবিশ্বাস ছিল যে সুমনা দেবী ভেতরে ভেতরে একটু কুঁকড়ে গেলেন। তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও অখিলবাবুকে ডেকে আনলেন। অখিলবাবু সোফায় বসে ভুরু কুঁচকে তাকালেন।
সৌমি শুরু করল, “কাল আপনি আমাকে অনেক কিছু বলে অপমান করেছিলেন না কাকিমা? বলেছিলেন আমি এখানে সময় বিক্রি করতে আসি। একদম ঠিক বলেছিলেন। আমি আমার সময় আর মেধা বিক্রি করি, কিন্তু আমার আত্মসম্মান নয়। এই যে বইটা কাল নিজের টাকা দিয়ে কিনে এনেছিলাম, এটার দাম ৫০০টাকা। আর গত মাসের মাইনে ২০০০ টাকা। মোট ২৫০০ টাকা আমি আপনাদের কাছে পাই। আপনারা টাকা দিয়ে ‘সার্ভিস’ কেনেন, তাই তো? কিন্তু সেই সার্ভিস দেওয়ার জন্য যে মানুষটাকে প্রয়োজন হয়, তাকে ন্যূনতম সম্মান দেওয়ার ক্ষমতা আপনাদের নেই।”
অখিলবাবু বলতে গেলেন, “দেখো খুকি, টাকা তো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে না। তুমি অহেতুক তিলকে তাল করছো…”
সৌমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “থামুন কাকু। আগে আমার কথা শেষ করতে দিন। আপনারা টাকার দম্ভে ভুলে গেছেন যে মানুষ আর মেশিনের তফাত কী। কাকিমা কাল আমাকে অনেক ছোট বড়ো কথা বলছিলেন।আপনারা ভাবেন টাকা দিয়ে শিক্ষক কেনা যায়? না কাকু, টাকা দিয়ে সময় কেনা যায়, শিক্ষক নয়। আপনাদের মতো মানুষেরা শিক্ষাকে মনে করেন একটা ‘কমোডিটি’ আর শিক্ষককে মনে করেন ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’। এটা আপনাদের বাড়ির দোষ নয় কাকু, এটা আপনাদের মানসিকতার দৈন্য।”
সুমনা দেবী চিৎকার করে উঠলেন, “তোমার এত বড় সাহস! আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকেই অপমান করছো? তোমার মতো মেয়েদের আমল দিলে মাথায় চড়ে বসে। অভাব আছে বলেই তো টিউশনি করো, নাকি? অভাব না থাকলে কি আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে পড়াতে আসতে?”
সৌমি এক পা এগিয়ে এল। সুমনা দেবীর চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল, “অভাব আমার সংসারে থাকতে পারে কাকিমা, কিন্তু আমার স্বভাবে নেই। আপনি যে আভিজাত্যের অহংকার করছেন, সেটা আসলে আপনার স্বামীর উপার্জিত টাকার ওপর দাঁড়িয়ে। আপনার নিজের অর্জন কী? কাল আপনি তিতলিকে নিয়ে যে কথাগুলো বলছিলেন, তাতে ওর শিক্ষা নয়, আপনার কুরুচি প্রকাশ পাচ্ছিল। আপনি বলেছিলেন তিতলি অংকে টেনেটুনে পাস করেছে বলে আপনি আমার মাইনে দেবেন না। আপনার মেয়ে সারাদিন ল্যাপটপে গেম খেলে আর আপনি সারাদিন সিরিয়াল দেখেন, সেটা কি আমার দোষ? একজন শিক্ষক রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু হাঁটতে হয় ছাত্র বা ছাত্রীকেই। তিতলি যে অংক পারে না, তার দায় যতটা আমার, তার চেয়ে বেশি আপনার— কারণ আপনি ওকে পড়ার পরিবেশ নয়, বরং টাকার দম্ভ শিখিয়েছেন। আর শোন তিতলি—” সৌমি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা তিতলির দিকে তাকাল, “তোর মা তোকে শেখাচ্ছে টাকা থাকলে মানুষকে চাকর ভাবা যায়। কিন্তু মনে রাখিস, টাকা আজ আছে কাল নেই, শিক্ষাটাই আসল। তোর মা যদি এতই শিক্ষিতা হতেন, তবে একজন শিক্ষককে অপমান করার আগে দশবার ভাবতেন। বড় হচ্ছিস তিতলি, এই বিষটা নিজের ভেতরে নিস না। আজ যে মা একজন শিক্ষিকাকে অপমান করছে, কাল সেই মা যদি বৃদ্ধ হয়, তুইও তাকে একই নজরে দেখবি— কারণ তুই তো এটাই শিখছিস!”
সৌমী ব্যাগ থেকে নিজের ফোনটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। সুমনা দেবীর দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “কাল আপনি যা যা বলেছেন কাকিমা, সব আমার ফোনে রেকর্ড করা আছে। ‘মাগনা পড়াতে ডাকিনি’, ‘ভালো নাম্বার না পেলে মাইনে দেবো না ‘— এই কথাগুলো যদি আমি আপনাদের এই পাড়ার লোকেদের শোনাই, আপনাদের ওই তথাকথিত আভিজাত্য কি আর থাকবে? লোকে যখন জানবে মিত্র বাড়ির গিন্নির ভেতরে এতটাই কুরুচি যে তিনি একজন শিক্ষিকাকে এইরকম বাজে কথা বলে অপমান করে। আপনাদের এই সাজানো ড্রয়িংরুমের আভিজাত্য তখন নর্দমায় গিয়ে পড়বে। আপনি আমাকে সময় বিক্রি করার কথা বলছিলেন না? এবার দেখুন আপনার এই আভিজাত্যটা বাজারে কত দামে বিক্রি হয়!”
সুমনা দেবী আর অখিলবাবু একে অপরের দিকে তাকালেন। তাঁদের চেহারায় এবার লজ্জার ছাপ স্পষ্ট। তাঁরা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেননি এই শান্ত, গোবেচারা মেয়েটা এতটা রুখে দাঁড়াবে এবং পাল্টা আঘাত হানার মতো অকাট্য যুক্তি আর প্রমাণ তৈরি করে আসবে। সুমনা দেবীর এতক্ষণের দম্ভ যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করেছে।
চলবে……
