#গৃহশিক্ষিকা (পর্ব ১)
কলমে -#SupriyaGhosh
বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট । শোভাবাজারের মিত্র বাড়ির কলিং বেলটা পরপর দুবার টিপলো সৌমি। ভেতর থেকে সুমনা দেবীর গলা শোনা গেল, “আসছি বাবা, দোরটা ভেঙে ফেলো না।” দরজা খুলতেই সৌমিকে দেখে তাঁর মুখটা কুঁচকে গেল। সৌমি ভেতরে ঢুকতে যেতেই সুমনা দেবী দরজার পাল্লাটা আটকে দিয়ে দেওয়াল ঘড়িটার দিকে আঙুল দেখালেন।
“৫টা ১৫ বাজে সৌমি। তোমার আসার কথা ছিল ৫টায়। টাইম এর কোনো হিসাব জ্ঞান নেই নাকি?”সৌমি কপাল থেকে ঘাম মুছে বলল, “কাকিমা, খুব জ্যাম ছিল রাস্তায়। বিধান সরণির মোড়ে একটা লরি উল্টে সব বাস দাঁড়িয়ে। আমি শেষমেশ বাস থেকে নেমে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটেই আসছি।”
“হেঁটে আসো কি হামাগুড়ি দিয়ে আসো সেটা তোমার ব্যক্তিগত সমস্যা, আমার নয়।” সুমনা দেবী ড্রয়িংরুমের সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর রাখা খবরের কাগজটা ভাঁজ করতে করতে বললেন। “আমরা তো বাপু মাগনা পড়াতে ডাকিনি। মাসের শুরুতে গুনে গুনে টাকাটা তো ঠিক চাও। অথচ আসার বেলা জ্যামের দোহাই! আমার মেয়ে তিতলির সামনে পরীক্ষা, এই ১৫ মিনিট যদি সিলেবাস পিছিয়ে যায় তার দায়িত্ব তুমি নেবে? ১৫ মিনিট মানে অনেক সময়।”
সৌমি ব্যাগ থেকে বই বের করতে করতে নিচু স্বরে বলল, “১৫ মিনিট আমি আজ পুষিয়ে দেব কাকিমা। আজ দরকার হয় ১৫ মিনিট দেরি করেই বেরোব।”
সুমনা দেবী এবার গলা চড়ালেন। “পুষিয়ে দেবে মানে? তুমি কি আমাদের ওপর দয়া করছো? শোনো সৌমি, সোজা কথা বলি, আমি তোমার কাকাবাবু কে বলেছি আজ থেকে তোমার এই ১৫ মিনিটের হিসেব করে করে মাসকাবারি থেকে মাইনে কাটা হবে। তুমি এখানে সময় বিক্রি করতে আসো, সেই সময়টা যদি দিতে না পারো তবে পয়সাও পাবে না।ঠিকঠাক সময়ে পড়াতে আসবে , তবেই টাকা।”
সৌমির শরীরটা অপমানে রি রি করে উঠল। সে বলল, “কাকিমা, আমি তো একজন শিক্ষিকা। আমাকে কি এই ভাবে বলাটা ঠিক হচ্ছে? আমি তো মানুষ গড়ার কাজ করি।”
সুমনা দেবী একটা বিদ্রূপের হাসি হাসলেন। “শিক্ষিকা! ওরে বাবা! তুমি কি কলেজে চাকরি করো? নাকি স্কুলে? বাড়ি বাড়ি ঘুরে কয়েকটা ছাত্র পড়িয়ে নিজেকে মহান ভেবো না। টাকা দিচ্ছি তাই পড়াতে আসছো, যেদিন টাকা দেব না সেদিন এই শিক্ষা কোথায় থাকবে জানি। আমাদের কাছে তুমি একজন সার্ভিস প্রোভাইডার। তার বাইরে আর কোনো সম্মান এখানে পাবে না। সোজা ভেতরে গিয়ে তিতলিকে পড়া ধরো। আজ যেন এক মিনিট আগে ছুটি না হয়। এক মিনিট আগে ছুটি হলে কিন্তু সেটারও টাকা কাটব।”
সৌমি আর কোনো কথা না বলে তিতলির পড়ার ঘরে ঢুকে গেল। তিতলি সামনে ইতিহাসের বই নিয়ে বসে আছে। সৌমি বইটা হাতে নিল, কিন্তু তার হাত কাঁপছিল। তার মনে হচ্ছিল এই টেবিল, চেয়ার, আলমারি—সব যেন তাকে দেখে হাসছে। যে মা তার সন্তানের শিক্ষার জন্য শিক্ষক রাখেন, তিনিই সেই শিক্ষককে এভাবে অপমান করছেন। এই শহরে হাজার হাজার সৌমি এভাবেই অপমানের তেতো ঘাম গিলে বেঁচে থাকে।
পড়ানোর মাঝখানে সুমনা দেবী একবার ঘরে উঁকি দিলেন। “তিতলি, ঠিকঠাক পড়ছে তো? নাকি শুধু গল্প করে সময় কাটাচ্ছে? আমি বাইরে থেকে কিন্তু কথা বলার আওয়াজ পাচ্ছি না।”
সৌমি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “পড়ছে কাকিমা, আমি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি ও উত্তর দিচ্ছে।”
“একদম ফাঁকি দেবে না বলে দিলাম।” সুমনা দেবী দরজার গোড়া থেকে সরলেন না। “আগের মাসে যে নামী স্কুল টিচার তিতলিকে পড়াতেন, তিনি এক মিনিটের জন্য মুখ বন্ধ করতেন না। তোমাদের জেনারেশন তো ফাঁকি দিতে ওস্তাদ। আর শোনো, কাল যেন আবার জ্যামের গল্প না শুনি। ৫টা বাজার ৫ মিনিট আগে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে।”
সৌমি কোনো উত্তর দিল না, শুধু তিতলির খাতার ওপর কলমটা জোরে চেপে ধরল। তিতলি ফিসফিস করে বলল, “দিদিমণি, মা কিন্তু আজ খুব রেগে আছে।” সৌমি শুধু ম্লান হাসল। সে জানত, সুমনা দেবী রেগে নেই, তিনি আসলে নিজের টাকার দম্ভ দেখাচ্ছেন। পড়ার ঘরে ফ্যানটা ঘুরছে কিন্তু সৌমির কপালে ঘাম শুকোচ্ছে না। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বিদ্রূপ তার ভেতরে এক একটা ক্ষতর মতো বসে যাচ্ছে।
এক ঘণ্টা পড়ার পর সৌমি যখন ব্যাগ গুছিয়ে বেরোচ্ছে, সুমনা দেবী আবার পথ আগলে দাঁড়ালেন। “কাল আসার সময় তিতলির জন্য ওই নতুন রেফারেন্স বইটা কিনে নিয়ে আসবে। টাকা আমি আগামী মাসের মাইনের সাথে অ্যাডজাস্ট করে দেব।”
সৌমি বলতে যাচ্ছিল যে তার কাছে অত টাকা নেই, কিন্তু সুমনা দেবী তার আগেই মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলেন। সৌমি দেখল তার ব্যাগে মাত্র ১০০ টাকা পড়ে আছে।সে আর দাঁড়িয়ে না থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
চলবে…..
#গৃহশিক্ষিকা (পর্ব ২)
পরের দিন বিকেলে সৌমি যখন মিত্র বাড়িতে ঢুকল, তার শরীরটা খুব একটা ভালো ছিলোনা । আগের রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। সুমনা দেবীর কথামতো নিজের টাকা দিয়ে তিতলির জন্য দামী রেফারেন্স বইটা কিনে নিয়ে এসেছে সে। ভাবল, বইটা দিলে হয়তো কাকিমার মেজাজ আজ একটু নরম থাকবে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল পরিবেশ অন্যরকম। সুমনা দেবী সোফায় বসে তিতলির স্কুলের রিপোর্ট কার্ড দেখছিলেন। সৌমিকে দেখেই তিনি বইটা টেবিলের ওপর আছাড় দিয়ে ফেললেন।
“এই নাও তোমার শিক্ষার দৌড়! তিতলি অংকে টেনেটুনে পাস করেছে। আমরা কি তোমাকে এই নাম্বার পাওয়ার জন্য মাইনে দিচ্ছি?” সুমনা দেবী বেশ কড়া মেজাজেই বললেন ।
সৌমি ব্যাগ থেকে বইটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। “কাকিমা, বইটা এনেছি। আর তিতলির অংকের কথা বলছেন তো? ও তো বাড়িতে প্র্যাকটিসই করে না। আমি যে হোমওয়ার্ক দিই, সেগুলো ও হাতই দেয় না।”
“খবরদার!” সুমনা দেবী চিৎকার করে উঠলেন। “নিজের অযোগ্যতা ঢাকার জন্য আমার মেয়ের ওপর দোষ চাপাবে না। তুমি পড়াতে আসো কেন? ও যদি নিজের বুদ্ধিতেই সব পারত, তবে তোমাকে ডাকার দরকার ছিল কি? আসলে তোমাদের মতো মেয়েদের নিজেদেরই বেসিক নলেজ নেই। তোমরা জাস্ট সময়ের দোহাই দিয়ে ঘণ্টা পার করে টাকা হাতিয়ে নিতে আসো। তিতলি যদি পরের পরীক্ষায় আশির ওপরে না পায়, তবে জেনে রেখো, তোমার এক পয়সাও মাইনে তুমি পাবে না। আমরা এমনি এমনি পয়সা কাউকে কোথাও ইনভেস্ট করি না ।”
সৌমি অপমানটা গিলে নিয়ে ধীর গলায় বলল, “কাকিমা, পড়াশোনা তো কোনো ব্যবসা নয় যে ইনভেস্টমেন্ট আর লসের হিসেব হবে। ও যদি না খাটে, আমি একা কী করব?”
সুমনা দেবী এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। সৌমির একদম মুখের সামনে এসে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, “বেশি কথা বলবে না সৌমি। আজ মাসের দশ তারিখ। তুমি নিশ্চয়ই মাইনে চাইতে এসেছ? কিন্তু আমি ঠিক করেছি, তিতলির রেজাল্ট যতদিন না শুধরোচ্ছে, ততদিন তোমার পেমেন্ট হোল্ডে থাকবে। আর এই যে বইটা আনলে, এটার টাকাও এখন দিচ্ছি না। পরের মাসে দেখা যাবে।”
সৌমির মাথায় রক্ত চড়ে গেল। তার ঘরে ল্যান্ডলর্ড ভাড়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছে, বাবার প্রেসারের ওষুধের ফাইল শেষ। সে মরিয়া হয়ে বলল, “কাকিমা, এটা আপনি করতে পারেন না। আমি গত এক মাস কষ্ট করে পড়িয়েছি। আর বইয়ের টাকাটা আমার নিজের পকেট থেকে দেওয়া, ওটা অন্তত দিয়ে দিন।”
সুমনা দেবী একটা বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, “ন্যাকামি করো না তো! তোমাদের মতো মেয়েদের এই এক ঢং। টাকা চাইলে অসুস্থ বাবা আর সংসারের গল্প শুরু করো। অভাব থাকলে টিউশনি করতে এসেছ কেন? অন্য কোথাও কাজ নিলেই তো পারতে। সেখানেও তো খাটতে হয়। আর শোনো, টাকাটা যদি খুব দরকার হয়, তবে কাল থেকে দুবেলা করে পড়াতে আসবে,,, দুঘন্টার জায়গায় তিন ঘন্টা পড়াবে তারপর নাহয় ভেবে দেখবো “।
সৌমি দেখল সুমনা দেবীর চোখে এক অদ্ভুত পৈশাচিক আনন্দ। তিতলি পাশের ঘর থেকে সব শুনছিল, কিন্তু তার চোখেও কোনো সমবেদনা নেই। সেও যেন মায়ের শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে যে, টাকা থাকলে মানুষকে যা খুশি বলা যায়। সৌমির ইচ্ছে করছিল তিতলির বইগুলো গুছিয়ে নিয়ে তখনি বেরিয়ে যেতে, কিন্তু পকেটের শূন্যতা তাকে দরজার কাছে আটকে দিল। সে শুধু ভাবল, একটা মানুষ কতটা নিচ হলে একজন শিক্ষিকাকে কাজের লোকের মত আচরণ করতে পারে।
“কী হলো? দাঁড়িয়ে কেন? পড়ার ঘরে যাও।” সুমনা দেবী এবার টিভির রিমোটটা হাতে নিলেন। “আর হ্যাঁ, আজ চা হবে না। বাড়িতে দুধ কম আছে। শুধু জল খেয়েই পড়ানো শুরু করো। আমাদের এখানে আতিথেয়তা পেতে হলে আগে রেজাল্ট ভালো করতে হয়।”
সৌমি টলতে টলতে তিতলির ঘরে গিয়ে ঢুকল। তার চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল খাতার ওপর টপ টপ করে পড়ল। সে তাড়াতাড়ি ওটা মুছে নিল যাতে তিতলি দেখতে না পায়। কিন্তু মনের ভেতরে সে নিজেকে একটা কথা বারবার বলছিল—’এই অপমান আমি সুদে-আসলে ফেরত দেব। শুধু একটা দিন, একটা সুযোগের অপেক্ষা।’ সেদিন পুরো দুই ঘণ্টা সৌমি এক ফোঁটা জলও মুখে দেয়নি, শুধু তিতলির খাতার পাতায় নিজের জেদ আর যন্ত্রণার অক্ষরগুলো পিষে দিয়ে এসেছিল।
চলবে…..
