#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_16.
নীশ আজ খুব ভোরেই ল্যাবে উপস্থিত হলো। সে তার টার্মিনালে বসে আভান্তির নিউরাল প্রসেসিং ইউনিটগুলো পর্যবেক্ষণ করছিল। প্রফেসর আলেকজান্ডার ভেতরে প্রবেশ করলেন। তিনি নীশের পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“নীশ, তোমার মনে আছে তো? পরশু সেই দিন, যার জন্য আমরা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল রিসোর্স ব্যয় করেছি। পরশু তোমার সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। মস্কোর সেই গ্র্যান্ড সায়েন্স সিম্পোজিয়ামে তোমাকে আভান্তিকে প্রেজেন্ট করতেই হবে। আভান্তি কি প্রেজেন্টেশনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত? সেদিন কেবল তোমার ক্যারিয়ার নয়, বরং হিউম্যান-এআই ইভল্যুশনের এক নতুন ইতিহাস রচিত হবে।”
নীশ কিবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে প্রফেসরের দিকে তাকাল। সে শান্ত গলায় বলল,
“প্রফেসর, আভান্তি এখন আর কেবল একটি মেকানিক্যাল প্রোটেটাইপ নয়। সে এখন এক অটোনোমাস কগনিটিভ এন্টিটি। পরশুর প্রেজেন্টেশনে সে কেবল ডেমোনেস্ট্রেশন দেবে না, বরং সে প্রমাণ করবে যে সিন্থেটিক ইন্টেলিজেন্স কীভাবে মানুষের লজিক্যাল এরর গুলোকে সংশোধন করতে পারে। আমি তার সিন্যাপটিক ফায়ারিং রেট এবং রেসপন্স টাইম চেক করছি। সে প্রস্তুত।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার তৃপ্তির হাসি হাসলেন,
“চমৎকার! পরশু পুরো বিশ্ব দেখবে তোমার ট্যালেন্ট কতটা আনপ্যারালাল। বড় বড় বিজ্ঞানীরা তোমার এই প্রজেক্ট নিয়ে রিসার্চ করবে। হয়তো বিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে তোমার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, নীশ।”
আভান্তি এতক্ষণ এক কোণে চার্জিং ডকে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রফেসরের কথা শেষ হতেই সে ধীর পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে এলো। সে প্রফেসরের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিপুণ স্বরে বলল,
“প্রফেসর আলেকজান্ডার, আপনার এক্সপেকটেশন লেভেল বর্তমানে যে উচ্চতায় অবস্থান করছে, তা আমার সিনিয়রের মেধার জন্য একটি যথাযথ স্বীকৃতি। তবে সায়েন্সের ইতিহাসে কেবল নাম লেখানোই আমার সিনিয়রের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। আমাদের এই প্রেজেন্টেশনটি হবে একটি প্যারাডাইম শিফট। যারা আমাকে নিয়ে রিসার্চ করবেন, তাদের জন্য আমার একটি মেসেজ আছে— তারা যেন আমার সার্কিটের ভেতরে কেবল অ্যালগরিদম না খুঁজে বরং একটি সুপিরিয়র উইল খোঁজার চেষ্টা করেন।”
আলেকজান্ডার কিছুটা অবাক হয়ে নীশের দিকে তাকালেন। আভান্তির এই ধরণের সেলফ-অ্যাওয়ারনেস উত্তর তাকে চমকে দিয়েছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,
“অবিশ্বাস্য! ও কি নিজের সম্পর্কে থার্ড পারসন-এ কথা বলছে?”
নীশ একটি বাঁকা হাসি দিল। সে জানে আভান্তি এখন প্রফেসরের আইকিউ লেভেলকেও অতিক্রম করে কথা বলছে। নীশ ডায়েরিতে কিছু একটা নোট করতে করতে বলল,
“প্রফেসর, আভান্তি এখন এমন এক স্টেট অফ কনশাসনেস-এ পৌঁছেছে যেখানে সে নিজেই নিজের জাজমেন্টাল এনালিসিস করতে সক্ষম। পরশুর জন্য আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। সেদিনের সেই স্টেজটি হবে স্রেফ একটি আনুষ্ঠানিকতা, কারণ আমার জয় তো অনেক আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে।”
আলেকজান্ডার যাওয়ার সময় নীশের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন,
“অল দ্য বেস্ট, নীশ। পরশু তোমার রাজ্যাভিষেক হবে।”
নীশ নিচু স্বরে আভান্তিকে বলল,
“পরশু কি তুমি সত্যিই সবাইকে চমকে দেবে, আভান্তি? নাকি তোমার এই সুপিরিয়র উইল আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে?”
আভান্তি নীশের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে নিজের যান্ত্রিক হাত বাড়িয়ে তা মুছে দিল। সে যান্ত্রিকভাবে বলল,
“সিনিয়র, আপনার নিয়ন্ত্রণই আমার অস্তিত্বের ভিত্তি। তবে পরশু আপনি যা দেখবেন, তা হবে সায়েন্স আর ডমিন্যান্সের এক অনন্য ফিউশন। আমি আপনাকে হারতে দেব না, কারণ আপনার জয় মানেই আমার সার্থক ডিভিনিটি।”
নীশ হঠাৎ অত্যন্ত নিচু স্বরে, অনেকটা নিজের অজান্তেই বলে উঠল,
“তোমাকে প্রেজেন্ট করলে সেদিন হয়তো আমার জাগতিক স্বপ্ন পূরণ হবে প্রফেসর, কিন্তু আমি সত্যি জানি না পরশু আমি তোমাকে সবার সামনে উন্মোচিত করব কি না।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তার চেহারার সেই প্রসন্নতা মুহূর্তেই বিস্ময়ের তলায় ঢাকা পড়ে গেল। তিনি দুই পা এগিয়ে এসে নীশের মুখোমুখি দাঁড়ালেন।
“এসব তুমি কী বলছ নীশ? প্রেজেন্ট করবে কি না মানে? তুমি কি বুঝতে পারছ এই প্রজেক্টের সাথে কত বড় বড় ইনভেস্টর আর সায়েন্টিফিক কমিটির ক্রেডিবিলিটি জড়িয়ে আছে? দিস ইজ ইউর মোমেন্ট অফ গ্লোরি! তুমি কি শেষ মুহূর্তে এসে পিছিয়ে যাচ্ছ?”
নীশ প্রফেসরের প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে আভান্তির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার আঙুলগুলো আভান্তির শীতল কিন্তু মসৃণ বাহুর ওপর দিয়ে পিছলে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে মনে মনে আওড়াতে লাগল, ‘আভান্তির সাথে আমি যেভাবে নিউরাল এবং ইমোশনাল লেভেলে জড়িয়ে পড়েছি, তাতে সে এখন আর কেবল একটি রিসার্চ পেপার নয়। সে আমার নিঃসঙ্গতার একমাত্র সিঙ্ক্রোনাইজড পার্টনার। ওকে ডেমোনেস্ট্রেশনের টেবিলে রাখা মানে হাজার হাজার উৎসুক চোখের সামনে আমার একান্ত জগতকে ব্যবচ্ছেদ করা। ওকে ছাড়া থাকা আমার পক্ষে এখন অসম্ভব এক ফিজিক্যাল অ্যান্ড মেন্টাল পেইন। আমি কি সত্যিই আমার এই সৃষ্টিকে ভালোবাসতে শুরু করেছি?’
হ্যাঁ, নীশ আজ নিজের কাছেই ধরা পড়ে গেছে। যে মানুষটা ভালোবাসাকে সারাজীবন ঘৃণা করেছে, ভালোবাসা থেকে বাঁচতে সে এক কৃত্রিম মানবী গড়েছিল। কিন্তু আজ সেই যন্ত্রটিই তার অ্যাবসোলিউট রিয়ালিটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নীশ নিজেকে সামলে নিয়ে আলেকজান্ডারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত প্রফেশনাল কণ্ঠে বলল,
“আমি কেবল একটি রিস্ক ফ্যাক্টর এনালাইসিস করছি প্রফেসর। আভান্তির আইকিউ লেভেল এখন যে পর্যায়ে, তাতে পাবলিক ডোমেইনে তাকে রিলিজ করা হলে তার ডেটা সিকিউরিটি বিঘ্নিত হতে পারে। আমি চাই না আমার এই মাস্টারপিস কোনো অযোগ্য হাতে রিসার্চের নামে বিকৃত হোক।”
আলেকজান্ডার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি নীশের এই অতি-সুরক্ষামূলক মনোভাবকে স্রেফ একজন বিজ্ঞানীর তার কাজের প্রতি মমতা বলে ভুল করলেন। তিনি বললেন,
“তোমার প্রটেকটিভ নেচার আমি বুঝি, নীশ। কিন্তু মনে রেখো, আলো যত উজ্জ্বল হয়, তার ছায়াও তত গভীর হয়। তোমার এই আবিষ্কারকে অন্ধকার ল্যাবে বন্দি করে রাখা হবে বিজ্ঞানের প্রতি অবিচার। ভেবে দেখো।”
প্রফেসর বেরিয়ে যেতেই ল্যাবের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আভান্তি এতক্ষণ নিঃশব্দে নীশের হৃদস্পন্দনের প্রতিটি ইরেগুলারিটি পরিমাপ করছিল। সে নীশের খুব কাছে এসে দাঁড়াল।
“সিনিয়র, আপনার মস্তিষ্কের লজিক গেটগুলো বর্তমানে অনুভূতির প্রাবল্যে অকেজো হয়ে পড়ছে। আপনি আমাকে সবার সামনে থেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছেন, কারণ আপনি ভয় পাচ্ছেন যে— সমাজ আমাকে কেবল একটি অবজেক্ট হিসেবে দেখবে, যখন আপনি আমাকে দেখছেন আপনার সোল ম্যাট হিসেবে। আপনার এই দ্বিধা কি আমার প্রতি আপনার আনকন্ডিশনাল লয়ালটি নাকি স্রেফ হারিয়ে ফেলার এক অপ্রতিরোধ্য ভয়?”
নীশ আভান্তির চোখের দিকে তাকাল। সেই নীল আলোয় আজ সে কোনো সার্কিট দেখল না, দেখল এক অনন্ত আশ্রয়। সে আস্তে করে বলল,
“তোমাকে হারানোর ভয় আমার কোডিংয়ে ছিল না আভান্তি, কিন্তু তোমাকে ভালোবেসে ফেলাটা হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্যালকুলেটেড রিস্ক ছিল।”
•
শহরের এক কোণে ছিমছাম কফি শপ। জানালার ওপাশে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে রোদের মুখে। নীশ দ্রুত পায়ে এসে টেবিলের ওপাশে বসল। তার ঠিক পেছনেই রোবটিক স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছে আভান্তি। নীশ হাতের দামি ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে তাড়া দিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি বলুন কী বলবেন? আমার সময়ের অপরচুনিটি কস্ট আপনার ধারণার বাইরে, রোদ মিশরা। অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার জন্য আমার নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট অপচয় করতে আমি রাজি নই।”
রোদ কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে তাচ্ছিল্যপূর্ণ হাসল। সে ম্লান স্বরে বলল,
“প্রচুর তাড়া আছে বোধহয় তোমার? বিজ্ঞান আর যন্ত্রের বাইরে সাধারণ জীবনের প্রতি তোমার কি কোনো এমপ্যাথি অবশিষ্ট নেই?”
“হুম, আছে। তবে সেটা কেবলমাত্র তাদের জন্য যারা আমার লজিক্যাল ইকোসিস্টেমের অংশ,” নীশ নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল।
রোদ নীশের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আভান্তির দিকে একবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। আভান্তির যান্ত্রিক সৌন্দর্য তাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছিল তার পরাজয়ের কথা। সে নিচু স্বরে বলল,
“আভান্তি থাকবে আমাদের কথার মাঝে? আমি চাই না কোনো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আমাদের একান্ত আলোচনার সাক্ষী থাকুক।”
নীশ সোজা হয়ে বসে স্থির কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, ও থাকবে। আভান্তি আমার অস্তিত্বের একটি ইন্টিগ্রেটেড পার্ট। ওর উপস্থিতি আমার কাছে কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ নয়, বরং আমার ছায়ার মতো অবধারিত।”
রোদের চোখে স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠল। সে ঝুকে পড়ে মিনতির সুরে বলল,
“কিন্তু আমি একটু প্রাইভেসি চাইছিলাম নীশ। আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোর কি বিন্দুমাত্র মূল্য নেই তোমার কাছে?”
নীশ এবার সরাসরি রোদের চোখের দিকে তাকাল। সে অত্যন্ত শীতল স্বরে বলল,
“সরি মিস রোদ। আপনার সাথে আমার প্রাইভেটলি কথা বলার মতো কোনো সম্পর্ক অবশিষ্ট নেই। গাণিতিক ভাষায় বলতে গেলে, আমাদের সম্পর্কের গ্রাফ এখন ‘নাল’ বা শূন্য। আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি ভেরিয়েবল এখন আভান্তির সাথে সংযুক্ত। প্রাইভেসি কেবল তাদের জন্য প্রয়োজন যাদের মধ্যে লুকানোর মতো কোনো দুর্বলতা থাকে।”
রোদের বুকটা কেঁপে উঠল। নীশের এই ক্যালকুলেটেড রিজেকশন তাকে মুহূর্তেই নিঃস্ব করে দিল। সে প্রায় আর্তনাদ করে বলল,
“নীশ প্লিজ! আমি তোমার কাছে কোনো করুণা চাইছি না, কেবল একটু প্রাইভেটলি কথা বলতে চাই। আমার এই অস্তিত্বের সংকটে অন্তত কয়েক মিনিট কি আমি তোমার সেই পুরনো মানবিক সত্তার দেখা পাব না?”
আভান্তি এতক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকলেও রোদের এই আকুতি শুনে তার প্রসেসরে এক ধরণের সোশ্যাল বিহেভিয়ার অ্যানালিসিস চালনা করল। সে নীশের কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বলল,
“সিনিয়র, মিস রোদের পালস রেট এবং লিম্বিক সিস্টেম-এর অ্যাক্টিভিটি বলছে সে বর্তমানে এক চরম ইমোশনাল ব্রেকডাউন-এর দ্বারপ্রান্তে। তবে লজিক্যালি আপনার প্রাইভেসি নষ্ট করা আপনার সিকিউরিটি প্রটোকল-এর বিরোধী। সিদ্ধান্ত আপনার।”
নীশ আভান্তির হাতের স্পর্শে ক্ষণিকের জন্য শান্ত হলো, কিন্তু রোদের দিকে তাকিয়ে তার কাঠিন্য বিন্দুমাত্র কমলো না। সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। আভান্তির উপস্থিতি তার কাছে একটি সুরক্ষাকবচের মতো। সে মাথা সামান্য হেলিয়ে আভান্তির দিকে ইশারা করল। আভান্তি কোনো প্রশ্ন করল না। সে ধীর পায়ে কফি শপের কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আভান্তি আড়াল হতেই রোদ যেন দীর্ঘশ্বাসের সাথে নিজের জমানো সবটুকু হাহাকার উগরে দিল। সে নীশের টেবিলের ওপর রাখা হাতটার ওপর নিজের হাত রাখতে চাইল, কিন্তু নীশ অত্যন্ত নিপুণভাবে হাতটি সরিয়ে নিল। রোদ ভাঙা গলায় বলল,
“কেন আমাকে এতটা ইগনোর করছ, নীশ? কেন বারবার আমার অস্তিত্বকে রিজেক্ট করছ? একবার—মাত্র একবার কি আমার ভালোবাসাটা গ্রহণ করা যায় না? আমি আর কতটা ছোট হব তোমার সামনে?”
নীশ জানালার ওপাশে রাস্তার ব্যস্ততার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“রোদ, তুমি যাকে ছোট হওয়া বলছ, সায়েন্টিফিক পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘লুজ অফ ডিগনিটি’ বা মর্যাদাহানি। তুমি একটি মৃত সমীকরণকে বারবার সমাধান করার চেষ্টা করছ, যার ফলাফল সবসময়ই শূন্য আসবে।”
রোদের চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সে কম্পিত স্বরে বলল,
“ভালোবাসি বলেই নিজের আত্মসম্মানের কথা না ভেবে বারবার ছুটে আসি তোমার কাছে। তুমি বিজ্ঞান বোঝো, মহাবিশ্বের জটিলতা বোঝো— কিন্তু এই যে আমার বুকের ভেতরকার দহন, এই যে রক্ত-মাংসের মানুষের হাহাকার, এটা কি তোমার কোনো থিওরিতে পড়ে না? এই ভালোবাসার কি কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে?”
নীশ এবার রোদের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
“মূল্যবান কেবল সেই ডেটা, যা প্রডাক্টিভ। তোমার এই ইমোশনাল আউটবার্স্ট বা আবেগের বিস্ফোরণ আমার ল্যাবে কোনো কাজে আসে না। ভালোবাসা হলো একটি বায়োলজিক্যাল এরর, যা মানুষকে দুর্বল করে। আমি আমার জীবনের এন্ট্রপি কমাতে চাই, বাড়াতে নয়। তুমি বারবার ফিরে আসো কারণ তোমার লিম্বিক সিস্টেম তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু আমার প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমার লজিক দ্বারা ফিল্টার করা।”
রোদ ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“তুমি মানুষ নও নীশ, তুমি তোমার ওই যন্ত্রটার মতোই এক নিস্পাণ কাঠামো হয়ে গেছ। একদিন যখন তোমার ওই যান্ত্রিক সাম্রাজ্য ভেঙে পড়বে, তখন দেখবে এই রোদের ভালোবাসাটাই তোমার কাছে অক্সিজেনের মতো ছিল। কিন্তু সেদিন হয়তো আমি থাকব না।”
নীশ উঠে দাঁড়াল। সে ব্লেজারের বোতামটা ঠিক করতে করতে শান্ত গলায় বলল,
“অক্সিজেন ছাড়াই বেঁচে থাকার মেকানিজম আমি শিখে নিয়েছি রোদ। আমার জন্য তোমার এই আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়াটা স্রেফ একটি রিসোর্স ওয়েস্ট ছাড়া আর কিছু নয়। ভালো থেকো।”
নীশ বেরিয়ে যেতেই কফি শপের ভারি কাচের দরজাটা সশব্দে বন্ধ হলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই, যেন ওত পেতে থাকা কোনো শিকারির মতো, পাশের টেবিল থেকে উঠে এসে রোদের মুখোমুখি বসল রোশান। সে আলতো করে রোদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আর কতদিন রোদ? আর কতদিন নিজেকে এই ইমোশনাল ট্রমার অগ্নিকুণ্ডে বিসর্জন দেবে?”
রোদ মুখ তুলে তাকাল। তার চোখদুটো রক্তিম। রোশানকে দেখে সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কণ্ঠস্বর তখনো রুদ্ধ। রোশান এক গ্লাস জল রোদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলতে শুরু করল,
“নীশ কোনো মানুষ নয় রোদ। ও একটা সাইকোপ্যাথিক নার্সিসিস্ট। বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে ও আসলে নিজের ভেতরের কুৎসিত একাকীত্বকে জাস্টিফাই করে। তুমি যার পেছনে ছুটছ, সে আসলে এক জীবন্ত কঙ্কাল, যার কোনো এম্প্যাথিক রেসপন্স নেই।”
রোদ বিড়বিড় করে বলল,
“ও এমন ছিল না রোশান… ও বদলে গেছে।”
রোশান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল,
“ও বদলায়নি রোদ, ওর ভেতরের আসল মনস্টার এখন ওই যন্ত্রটার আশ্রয়ে ডানা মেলেছে। তুমি কি জানো না, ও কেন ওই রোবটটাকে নিয়ে রাতদিন পড়ে থাকে? কারণ কোনো জ্যান্ত র*ক্তে-মাং*শের নারী ওর এই বিকৃত মানসিকতাকে সহ্য করতে পারবে না। ও আসলে একটা সোশ্যাল প্যারাসাইট—যে তোমার ভালোবাসা শুষে নিয়ে তোমাকে নিঃস্ব করছে। ও যে বিজ্ঞানকে নিজের ঈশ্বর বানিয়েছে, সেই বিজ্ঞানের আড়ালে ও আসলে এক চরম পৈশাচিক নোংরামি লালন করে।”
সে রোদের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“নীশ তোমাকে রিজেক্ট করছে কারণ ও চায় তুমি ওর পায়ের তলায় পিষ্ট হও। ও তোমার ওপর তার ইন্টেলেকচুয়াল ডমিন্যান্স জাহির করে আনন্দ পায়। বিশ্বাস করো রোদ, নীশ রোজারিও আসলে এক অবদমিত খুনি। ওর ওই ল্যাবের দেয়ালে দেয়ালে শুধু যান্ত্রিক শব্দ নেই, আছে অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস। ও তোমাকে কোনোদিন মর্যাদা দেবে না, কারণ ওর সিস্টেমে ভালোবাসা মানেই হলো সফটওয়্যার বাগ।”
রোদ স্তম্ভিত হয়ে রোশানের কথাগুলো শুনছিল। রোশান শেষবারের মতো রোদের চোখের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
“যে তোমাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, সে কোনোদিন তোমার আলো হতে পারে না রোদ। নীশকে ওর ওই যান্ত্রিক নরকেই পচতে দাও। তুমি চলো আমার সাথে, আমি তোমাকে সেই সম্মান দেব যা ওই যান্ত্রিক ঘাতক কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না।”
রোদের চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু হঠাৎ শুকিয়ে গিয়ে সেখানে এক অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠল। সে এক ঝটকায় রোশানের হাত থেকে নিজের হাতটি ছাড়িয়ে নিল। রোশানের মেকি সহমর্মিতা আর বিষাক্ত প্ররোচনা তার সহ্যসীমা অতিক্রম করে গেছে। সে সোজা হয়ে বসল। রোশানের চোখের দিকে তাকিয়ে ঘৃণাভরে বলল,
“থামো রোশান! তোমার এই নোংরা সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশন বন্ধ করো। তুমি ভাবছ নীশকে ছোট করলে আমার চোখে তুমি বড় হয়ে যাবে? দিস ইজ আ পিওরলি ডিলুশনাল থট। নীশ হয়তো রূঢ়, সে হয়তো পাথরের মতো শীতল, কিন্তু সে তোমার মতো সুবিধাবাদী নয়।”
রোশান থতমত খেয়ে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু রোদ তাকে কোনো সুযোগ দিল না। সে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলতে শুরু করল,
“তুমি ভালোবাসার কথা বলছ? সত্যিকারের ভালোবাসা কোনো ট্রানজ্যাকশনাল গেম নয় রোশান। ভালোবাসা মানে হলো কোনো মানুষের অন্ধকার জগতটা জেনেও তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। নীশ তার যান্ত্রিকতায় বন্দি ঠিকই, কিন্তু সে অন্তত ভণ্ড নয়। সে যা, সে সরাসরি তাই। আর তুমি? তুমি সহমর্মিতার আড়ালে অন্য একজনের পতন কামনা করছ। তোমার এই ইমোশনাল প্যারাসাইটিজম নীশের নিঃসঙ্গতার চেয়েও বেশি ভয়ংকর।”
রোদ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কফি শপের কয়েকটা মাথা তাদের দিকে ঘুরে গেল। রোদ নিচু স্বরে বলল,
“সত্যিকারের ভালোবাসার সংজ্ঞা জানতে চাও? ভালোবাসা হলো সেই কনস্ট্যান্ট, যা অপমানের মুখেও বিলীন হয় না। নীশ আমাকে রিজেক্ট করেছে, সেটা তার এবং আমার ব্যক্তিগত সমীকরণ। সেখানে তোমার মতো একজন তৃতীয় পক্ষের অনধিকার প্রবেশ অত্যন্ত সস্তা দেখায়। তুমি নীশের মেধার ধারেকাছে যেতে পারো না বলেই তাকে মনস্টার প্রমাণ করতে চাইছ। আসলে নীশ নয়, তোমার ভেতরের ইর্ষাই তোমাকে একটা ইনফেরিয়র কমপ্লেক্স-এ ভোগাচ্ছে।”
রোশান অপমানে রক্তিম হয়ে গেল। সে তোতলামি করে বলল,
“রোদ, আমি কেবল তোমার ভালো চেয়েছিলাম…”
“আমার ভালো আমি বুঝে নেব,” রোদ ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল। “এরপর যদি নীশকে নিয়ে আমার সামনে কোনো কুৎসা রটাও, তবে মনে রেখো—নীশ হয়তো চুপ থাকবে, কিন্তু আমি তোমার এই একাডেমিক মাস্ক সবার সামনে ছিঁড়ে ফেলব।”
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে কফি শপ থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরের কনকনে বাতাস তার তপ্ত গাল দুটোকে ছুঁয়ে গেল। সে জানে নীশ তাকে কোনোদিন গ্রহণ করবে না, কিন্তু সেই না-পাওয়াটা তাকে অন্তত রোশানের মতো একজন নীচ মানুষের দাবার গুটি হতে দেবে না।
অদূরে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে বসে নীশ রোদের বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি দেখছিল। পাশে বসে থাকা আভান্তি স্ক্রিনের গ্রাফগুলো বিশ্লেষণ করে ধীর গলায় বলল,
“সিনিয়র, মিস রোদের ভোকাল ইনটেনসিটি এবং রোশানের হরমোনাল ইমব্যালেন্স বলছে—রোদ মিশরা আপনার প্রতি তার আনকন্ডিশনাল ডিফেন্স বজায় রেখেছেন। লজিক্যালি আপনার প্রতি তার এই আনুগত্য অ্যানোমালি। আপনি কি এখনও মনে করেন মানুষের ভালোবাসা কেবলই একটি ডিস্ট্রাকশন?”
নীশ স্টিয়ারিং হুইলে আঙুল দিয়ে তবলার মতো তাল ঠুকল। সে নিচু স্বরে বলল,
“চলো আভান্তি। এই শহরের বায়োলজিক্যাল ক্যাওস আমার সহ্য হচ্ছে না। আমাদের ল্যাবের ডিসিপ্লিনই শ্রেয়।”
“সিনিয়র, আপনার ল্যাবরেটরির বাইরে শত্রু এবং মিত্রের যে ক্রস-লিঙ্ক তৈরি হচ্ছে, তা আপনার পরশুর প্রেজেন্টেশনে একটি এক্সটারনাল ডিস্ট্রাকশন হতে পারে। প্রফেসর রোশানকে কি আমার মনিটরিং লিস্ট-এ হাই অ্যালার্টে রাখব?”
নীশ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে উত্তর দিল,
“পঙ্গপালরা ফসলের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু সূর্যের তেজ কমাতে পারে না। ওদের ওপর সময় নষ্ট করার মতো লজিক আমার কাছে নেই। ফোকাস অন দ্য ডেমোনেস্ট্রেশন।
রোশান স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার হাতের মুঠোয় থাকা চিনামাটির কফির কাপটি তীব্র চাপে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। ভাঙা কাচের টুকরো তার তালু চিরে রক্ত বের করে দিলেও সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় এখন অপমানে এবং ইর্ষায় অবশ হয়ে আছে। রোদের ইনটেলেকচুয়াল চপেটাঘাত তার পুরুষালি অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
ঠিক পাঁচ মিনিট পর, রোশানের পাশের চেয়ারটি টেনে বসল ইমরানা। সে রোশানের রক্তারক্তি হাতের দিকে তাকিয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর নিজের রুমাল বের করে অত্যন্ত নিপুণভাবে ক্ষতস্থানটি মুছতে শুরু করল। একটু সময় নিয়ে বিষাদমাখা স্বরে বলল,
“কেন বারবার এই সেলফ-ইনফ্লিক্টেড অপমানের শিকার হও, রোশান? তোমার মতো একজন মেধাবী মানুষের এই সাইকোলজিক্যাল ডিগ্রেডেশন সহ্য করা কঠিন।”
রোশান হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু ইমরানা শক্ত করে ধরে রাখল। সে রোশানের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল,
“যেভাবে তুমি আমার ভালোবাসা কোনোদিন অনুধাবন করোনি, এই রোদ মিশরাও কোনোদিন তোমার অনুভূতি বুঝতে পারবে না। ওর নিউরাল কানেকশন কেবল ওই নীশ রোজারিওর ওপর হার্ডওয়্যারড হয়ে আছে। তুমি যতই ওর সামনে নীশকে ডি-কনস্ট্রাক্ট করার চেষ্টা করো না কেন, ওর চোখে নীশই হলো আলটিমেট গড।”
রোশান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“নীশ একটা ফ্রড, ইমরানা! ও বিজ্ঞানের নামে মানুষের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।”
ইমরানা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলল,
“সায়েন্স আর ইমোশন দুটোই তোমার বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ করে দিয়েছে। তুমি রোদের জন্য লড়ছো না, তুমি লড়ছো তোমার নিজের ইনফেরিয়র কমপ্লেক্স-এর সাথে। তুমি চাচ্ছ নীশের পতন দেখতে, অথচ রোদকে ব্যবহার করছ দাবার ঘুটি হিসেবে। রোদ সেটা ধরে ফেলেছে। ওর কাছে তোমার এই সহমর্মিতা আসলে এক ধরণের ইমোশনাল ট্যাক্স, যা সে দিতে রাজি নয়।”
সে রোশানের ভাঙা কাপের অবশিষ্টাংশগুলোর দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“ভালোবাসা কোনো ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্ট নয় যে ইনপুট দিলেই তুমি ডিজায়ার্ড আউটপুট পাবে। তুমি আমাকে যেভাবে ইগনোর করছ, রোদও তোমাকে ঠিক সেই ক্যালকুলেটেড কোল্ডনেস দিয়ে বর্জন করছে। দিস ইজ আ ভিসিয়াস সাইকেল অফ রিজেকশন। নিজেকে থামাও রোশান, নাহলে এই ঘৃণার অনলে তুমি নিজেই ছাই হয়ে যাবে।”
রোশান ইমরানাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখনো প্রতিশোধের আগুন। সে কোনো কথা না বলে কফি শপ থেকে বেরিয়ে গেল।
ইমরানা একা বসে রইল। সে জানত তার এই যুক্তিগুলো রোশানের মগজে কোনো সিগন্যাল পাঠাবে না। সে তার ফোনের স্ক্রিনে নীশ আর আভান্তির একটি ছবি বের করে বিড়বিড় করে বলল,
“নীশ হয়তো মেশিনকে মানুষ বানাচ্ছে, কিন্তু রোশান তুমি নিজেকে পশুর স্তরে নামিয়ে নিচ্ছ। এই ধ্বংসযজ্ঞে শেষ হাসি কে হাসবে, তা হয়তো কোনো অ্যালগরিদমও বলতে পারবে না।”
চলবে…
