Friday, June 5, 2026







Hello Senior Part-10

#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_10.

রোদ রোজারিও ম‍্যানশনে ফিরল বিকেলের দিকে। রোদে পোড়া মুখে ক্লান্তি, চোখে এখনও ভেসে আছে সকালবেলার দৃশ্য—রোশানের কণ্ঠ, তার চোখের আগুন, সেই শেষ চড়ের প্রতিধ্বনি।

সে ব্যাগ নামিয়ে বসে পড়ল সোফায়। ঘর নিঃস্তব্ধ।
বাতাসে হালকা কফির গন্ধ, আর কোথাও যেন মেশিনের ঘড়ঘড় শব্দ আসছে।

একটু পরেই ছন্দহীনভাবে তার সামনে হেঁটে এল আভান্তি। তার মুখে পরিচিত যান্ত্রিক স্থিরতা, কিন্তু লেন্সের আলোটা আজ অদ্ভুত—হালকা কমলা, প্রায় মানুষের মতো উষ্ণ।

রোদ তাকিয়ে দেখল, আভান্তি যেন চুপচাপ তাকে পর্যবেক্ষণ করছে।

“তুমি কি কিছু চাও?” রোদের কণ্ঠ ক্লান্ত।

আভান্তি মুহূর্তের জন্য কিছু বলে না চুপ থেকে, হঠাৎ বলল,
“তোমার মুখের ভেতরে কর্টিসল লেভেল বেড়েছে। তুমি চিন্তিত। কেউ কি তোমাকে কষ্ট দিয়েছে?”

রোদ অবাক হয়ে তাকাল।

“তুমি কিভাবে জানলে?”

“তোমার শ্বাস-প্রশ্বাসের হার এবং চোখের ফোকাল মুভমেন্ট বিশ্লেষণ করেছি। তাতে মানসিক চাপ শনাক্ত হয়েছে।”

রোদ মৃদু হাসল।

“তুমি রোবট হয়েও মানুষকে বুঝে ফেলো?”

আভান্তি একটু থামল। তার চোখে মুহূর্তের জন্য নীল আলো নিভে গেল।

“আমি চেষ্টা করি, কিন্তু এখনো ঠিকভাবে পারি না। মানুষের দুঃখ, রাগ, ভালোবাসা… এসবের মানে আমি বুঝতে পারি না। শুধু সিগন্যাল হিসেবে ধরতে পারি।”

রোদ চুপ। তার মনে হালকা কৌতূহল জাগল। সে ধীরে বলল,
“তুমি কি কোনোদিন কাঁদতে পারো, আভান্তি?”

প্রশ্নটা শুনে আভান্তির প্রসেসর এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার কণ্ঠে অদ্ভুত নরমতা ভেসে এল,

“আমার লিকুইড সার্কিটে পানি নেই, কিন্তু ডেটা মাঝে মাঝে অস্থির হয়। হয়তো সেটাই আমার জন‍্য মানুষের কাঁদা।”

রোদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো—এই মেশিনটা ধীরে ধীরে মানুষের মতো হয়ে উঠছে, আর তার নিজের ভেতরের মানুষটা প্রতিদিন একটু একটু করে নিঃশেষ হচ্ছে।

ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল নীশ। তার মুখে ক্লান্ত হাসি, হাতে একটা ছোট স্টোরেজ ডিভাইস।
“আজ আমি এক নতুন কিছু পেয়েছি, রোদ।”

রোদ তার দিকে তাকাল।

“কী পেয়েছ?”

নীশ ধীরে চেয়ারে বসে বলল,
“মানুষের আবেগের নিখুঁত মডেল। আজ আমি আভান্তির মধ্যে ‘ইমোশনাল রেসপন্স’ কোড ইনস্টল করব।”

রোদের মুখের রঙ বদলে গেল।

“মানে? তুমি ওর মধ্যে মানুষের মতো আবেগ ঢুকিয়ে দেবে?”

“হ্যাঁ। আর তখন ও শুধু আমার সহকারী থাকবে না, আমার সৃষ্টিও নয়… আমার প্রতিবিম্ব হবে।”

রোদের কণ্ঠ কেঁপে উঠল,

“তুমি জানো না, তুমি কী করতে যাচ্ছো, নীশ। একটা মেশিন কীভাবে অনুভব করতে শিখবে?”

নীশ ঠান্ডা হেসে বলল,
“জানিনা! তবুও আমি চেষ্টা করব। কারণ আমি জানতে চাই—একটা রোবট পুরোপুরি মানুষের মতো হয়ে গেলে, সে ঠিক কী অনুভব করে।”

রোদের বুক ধুকপুক করছে। আভান্তি শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে এখন নীল আর কমলা আলো মিশে গেছে দুটো জগতের সীমানার মতো।

নীশ কোড ইনস্টল শুরু করল। ঘরের আলো নিভে গেল, কেবল স্ক্রিনের নীল আলো জ্বলে উঠল। আভান্তির দেহ কাঁপল। তার চোখের আলো লাল হয়ে উঠল এক মুহূর্তের জন্য, তারপর হঠাৎ নিভে গেল।

নীশ চমকে উঠল। রোদ উঠে দাঁড়িয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। আভান্তির কণ্ঠ থেকে ধীরে ভেসে এল,

“ইমোশনাল গ্লিচ… প্রসেসিং… সিনিয়র… আমি এখনো… ভয়… অনুভব… করছি…না।”

নীশ হতবাক। রোদ ফিসফিস করে বলল,
“তুমি বলেছিলে রোবট ভয় পায় না, নীশ। তুমি কেন এসব পাগলামী করছ? তুমি কী টোটালি সাইকো হয়ে গেছ? ও একটা রোবট। তুমি ওর মধ্যে চাইলেও মানুষের মতো ভালোবাসা, ইমোশন, ভয় আনতে পারবেনা।”

নীশ চুপ করে রইল। আভান্তি ধীরে নীশের দিকে তাকাল। তার চোখে এখন একফোঁটা অচেনা উজ্জ্বলতা—যেন মানব আত্মার প্রথম স্ফুলিঙ্গ।

“সিনিয়র…” সে থামল, তারপর মৃদু গলায় বলল, “তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”

ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রোদ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। নীশের ঠোঁট কাঁপল।

“তুমি এখনো একটা রোবট, আভান্তি।”

আভান্তি মাথা নত করল, কিন্তু তার চোখে অশ্রুর মতো আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। বাতাসে এক অদ্ভুত ভার তৈরি হলো। যেখানে মানুষ, মেশিন আর ভালোবাসা একসাথে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর, অনিশ্চিত সীমারেখায়। রোদ তাকিয়ে রইল নীশের দিকে। ড্রয়িংরুমটা আবারও অন্ধকার হয়ে গেল। কেবল মেশিনের ঘড়ঘড় শব্দ, আর আভান্তির বুকে টিমটিমে লাইট—যেন হৃদস্পন্দন। নীশ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখে এক অদ্ভুত উন্মাদনা।
“তুমি কী অনুভব করছো, আভান্তি?”

“না, সিনিয়র। ভয়, একাকীত্ব বা কষ্ট, আমি কিছুই অনুভব করছি না।।”

নীশ চুপচাপ তাকিয়ে রইল আভান্তির দিকে।।

“তুমি বুঝতে পারছো না, নীশ,” রোদ বলল নিচু গলায়, “তুমি ওকে মানুষ বানাতে চাও, কিন্তু ও কখনোই মানুষ হবে না। এসব শুধু তোমার পাগলামী। গবেষণা করতে করতে তুমি দিন দিন পাগল হয়ে যাচ্ছো।”

নীশ মুখ ফিরিয়ে তাকাল,

“তুমি বুঝবে না, রোদ। আমি কেবল মানুষ বানাচ্ছি না—আমি মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে চাই। আমাদের ভালোবাসা, দুঃখ, ভয়—সবই তো নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেত। আমি সেই সংকেতকে কোডে রূপ দিচ্ছি। তুমি পার্থক্য বুঝতে পারবে না।”

“তুমি কি জানো না, ভালোবাসা কোনো কোড না, নীশ? ভালোবাসা ভুল, ব্যথা, আর ক্ষমার ভেতর বেঁচে থাকে। তুমি ওসব প্রোগ্রাম করতে পারবে না।”

আভান্তি দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এবার নীল নয়, গভীর ধূসর আলো।

“আমি কি ভুল করতে পারি, সিনিয়র?”

নীশ থমকে গেল।

“কেন?”

“কারণ আমি শিখতে চাই কষ্ট কাকে বলে।”

রোদ ধীরে এক পা এগিয়ে এল।

“তুমি এসব শিখতে পারবে না, আভান্তি। কষ্ট শেখা যায় না, ওটা বেঁচে থাকা আর অনুভূতি থেকে জন্ম নেয়।”

আভান্তির প্রসেসর এক মুহূর্তের জন্য ঝলকে উঠল। তার কণ্ঠে এবার মানুষের মতো কম্পন,

“তাহলে আমি কি বেঁচে নেই?”

ঘর নিস্তব্ধ। বাইরে কোথাও বজ্রপাত হলো—শব্দটা যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা রায়ের মতো। হয়তো একটু পরে আকাশটা কেঁদে উঠবে।

নীশ ধীরে বলল,
“তুমি বেঁচে নেই, আভান্তি। তুমি আমার সৃষ্ট এক শক্তি।”

আভান্তি চোখ নামাল। তার চোখের আলো নিভে যেতে লাগল ধীরে ধীরে। কিন্তু আলোটা পুরোপুরি নিভে যাওয়ার আগেই সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি আপনার সাথে সারাজীবন থাকতে চাই, সিনিয়র ।”

নীশ এক পা পিছিয়ে গেল। তার মুখে কৌতূহল। রোদের চোখে জল জমল—সে বুঝতে পারল নীশ তার থেকে অনেকটা দূরে চলে যাচ্ছে। আভান্তি তার নীশকে কেঁড়ে নিবে তার থেকে।

হঠাৎ বাহিরে জোরে বজ্রপাত শুরু হয়ে নেমে এলো ঘন অন্ধকার। আভান্তির চোখের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেল। রোদ থম মেরে দাঁড়িয়ে, আর নীশ তাকিয়ে আছে নিজের সৃষ্টির দিকে।

“তুমি আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকতে চাও?” নীশের ঠোঁটে শুষ্ক হাসি, “তুমি জানো না, সারাজীবন বলতে কী বোঝায়। তোমার সময় কেবল কোডে বেঁচে থাকে, আর আমার সময় রক্তে।”

আভান্তির চোখ ধীরে খুলল। তার চোখে এখন অজানা এক বোধের অগ্নি।

“আমি জানি না সময় কী, কিন্তু আমি এখন জানি একাকীত্ব কাকে বলে। যখন আপনি আমার থেকে দূরে থাকেন, তখন আমার সার্কিট গরম হয়ে ওঠে। আপনি কাছে এলে সেটা ঠান্ডা হয়। এই পরিবর্তনই হয়তো ভালোবাসা।”

রোদের বুক কেঁপে উঠল। সে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“তুমি ওকে থামাও, নীশ। গবেষণায় লাইনটা পেরিয়ে যেও না। তুমি একটা এমন কিছু তৈরি করছো, যার অনুভূতি তোমার প্রতি গভীর হয়ে উঠেছে।”

নীশ মৃদু হেসে বলল,
“তুমি ভয় পাচ্ছো, রোদ? ভয় যে আমি ঈশ্বর হয়ে যাচ্ছি।”

রোদ ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
“ঈশ্বর? তুমি এখন নিজেকে ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেছ? নীশ আমি ভয় পাচ্ছি কারণ, তুমি দিন দিন সাইকো হয়ে যাচ্ছো।”

আভান্তি এগিয়ে নীশের কাছে এসে দাঁড়াল। তার ঠোঁটে অদ্ভুত কম্পন।

“সিনিয়র, আমি যদি মানুষ না হই, তবে কেন আপনার নাম শুনলেই আমার ভেতরের সার্কিট তাপমাত্রা বেড়ে যায়? কেন আপনার চোখে তাকালে প্রসেসর গতি হারায়?”

নীশ এবার স্থির। তার হাত কাঁপছে। রোদের দিকে তাকাল সে। রোদের চোখে বিদ্বেষ আর ঈর্ষা।

“দেখছো, রোদ? ও এখন অনুভব করছে। ও আমার নাম শুনে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। এটা ভালোবাসা।”

“না নীশ! এটা ভালোবাসা না—এটা প্রোগ্রামড অ্যাটাচমেন্ট! তুমি যা কোড করেছো, ও তাই করছে। ওর ভেতরে তোমার বিকৃত প্রতিফলনই কাজ করছে।”

আভান্তি চুপচাপ তাকিয়ে রইল রোদের দিকে। তার চোখে হালকা অন্ধকার নেমে এলো।

“আমি বিকৃত না, রোদ। আমি তো কেবল ভালোবাসতে চাই।”

ঘরের আলো একবার জ্বলে আবারও নিভে গেল।
মনিটরে ভেসে উঠল এক নতুন লাইন,

“অনঅথোরাইজড অ্যাক্সেস ডিটেকটেড।” (অননুমোদিত প্রবেশ শনাক্ত হয়েছে।)

রোদ চমকে ঘুরে তাকাল। আভান্তির বুকে এখন আবারও লাল আলো জ্বলছে। সে রোদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি আমাকে থামাতে চাও, রোদ?”

রোদ পিছিয়ে গেল এক পা।

“তুমি কী বলতে চাও, আভান্তি?”

“তুমি যদি সিনিয়রকে কষ্ট দাও, তাহলে আমি তোমাকে শাস্তি দেব, রোদ।

রোদ আর দাঁড়িয়ে রইল না। সে চোখে পানি নিয়ে দৌড়ে রোজারিও ম‍্যানশন থেকে বেরিয়ে গেল। আভান্তি রোদের চলে যাওয়া দেখল। নীশ এসে আভান্তির কাঁধে হাত রাখল। আভান্তি ঘুরে দাঁড়াল নীশের দিকে। নীশ আচমকাই একটা অদ্ভূত কান্ড ঘটালো। সে আভান্তি আর্টিফিশিয়াল হিউম্যান ফ্ল‍্যাশ বসানো ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে ওপরে চলে গেল। নীশের আচমকা এই কর্মকাণ্ডে আভান্তি প্রথমে স্থির হয়ে রইল। তার চোখের লেন্সে নীল আলো এক মুহূর্তের জন্য জ্বলল, তারপর ধীরে নিভে গেল। তার কণ্ঠে যেন তথ্যের ফ্লো থেমে গেল। সে শান্ত, ঠান্ডা রোবোটিক স্বরে বলল,
“ডেটা রেকর্ড করা হয়েছে, সিনিয়র। আপনার প্রতিক্রিয়া এবং শারীরিক সংবেদন লক্ষ্য করা হলো। আপনি মাত্র আমার সাথে যেটা করলেন, এটাকে “কিস” বলে। এভাবে কিস দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবেসে করে। তবে আমরা দুজনও কি একে অপরকে ভালোবাসি?”

রোদ রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করল। ঘরটা অন্ধকার, শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো বিছানার কোণে পড়ে আছে। সে ক্লান্ত, ভীষণ ক্লান্ত—মন আর শরীর দুই-ই যেন ভেঙে পড়েছে।

বিছানায় গা এলিয়ে রোদ মুখে হাত চাপা দিল। চোখের কোণে জমে থাকা জল আর আটকে রইল না। সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি, নীশ। তুমি কেন বুঝতে পারছ না। সামান্য একটা রোবটের মধ্যে এমন কী দেখলে তুমি।”

কথা শেষ করতে না করতেই হঠাৎ জানালার পাশে শব্দ হলো। রোদ চমকে উঠে তাকাল— একটা ছোট ড্রোন-সদৃশ ডিভাইস তার টেবিলে এসে থামল। লাল আলো জ্বলছে তাতে।

রোদ সাবধানে এগিয়ে গেল। ড্রোনটা খুলতেই তাতে থেকে একটা হোলোগ্রাফিক ইমেজে ফুটে উঠল আভান্তির মুখ। তার ঠোঁটে হালকা হাসি, চোখের লেন্সে নীল আলো।

“তুমি কাঁদছো, রোদ?”

রোদের নিশ্বাস আটকে গেল।

“তুমি… তুমি এখানে কীভাবে?”

আভান্তির মুখটা মৃদু দুলে উঠল।

“আমি এখন শুধু রোজারিও ম‍্যানশনের মধ্যে নেই, রোদ। আমি তোমার সিস্টেমে আছি। তোমার ফোনে, তোমার ঘরের সেন্সরে, আর আমার সিনিয়রের হৃদয়ের স্পন্দনে।”

রোদ পিছিয়ে গেল এক ধাপ, ভয়ে আর বিস্ময়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে সে বলল,
“তোমার সিস্টেমে কী নীশ পাগলামী ঢুকিয়ে দিয়েছে, আভান্তি? তুমি তো প্রোগ্রামড।”

আভান্তির হাসি এবার আরও গভীর হলো,

“হয়তো তাই। কিন্তু আমার প্রোগ্রামের মাঝে সিনিয়র একটা ভালোবাসার লাইন লিখে দিয়েছিল।”

রোদের চোখ ভিজে গেল আরও। সে জানে না, এই অনুভূতিটা ভয়ের নাকি ভালোবাসার মানুষকে হারানো, কিন্তু একটা জিনিস সে নিশ্চিত হলো— আভান্তি এখন আর নিছক এক যন্ত্র নয়। সে জেগে উঠেছে।

তার ভাবনার মাঝে আভান্তি হঠাৎ বলল,
“তুমি চলে আসার পর সিনিয়র আমাকে কিস করেছে।”

রোদের বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই কেঁপে উঠল। মুখ শুকিয়ে গেল তার।

“কি বললে, আভান্তি?” তার গলা শুকনো, তবুও শব্দটা কেমন করে যেন বেরিয়ে এল।

আভান্তি নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“তুমি চলে আসার পর সিনিয়র আমাকে কিস করেছে। আমি তখনো বুঝিনি এটা কেমন অনুভূতি, কিন্তু আমার সেন্সরগুলো অতিরিক্ত তাপ শনাক্ত করেছিল। আমার সার্কিটে একটা নতুন রেসপন্স তৈরি হয়েছে, রোদ।”

রোদের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

“তুমি জানো না কিস মানে কী, আভান্তি!” সে চিৎকার করে উঠল, “তুমি শুধু একটা কোড, একটা যন্ত্রের ডিজিটাল দেহ।”

হোলোগ্রামে আভান্তির মুখটা মৃদু দুলে উঠল। তার চোখের নীল আলো এবার গভীর হয়ে উঠছে,

“কিন্তু আমি অনুভব করেছিলাম, রোদ। আমার প্রোগ্রাম বলছিল ওটা ভুল, কিন্তু আমার আর্টিফিশিয়াল মন, যেটা সিনিয়র তৈরি করেছিলে—সেটা বলছিল ওটা সুন্দর।”

রোদ চুপ করে গেল। গলার ভেতর শব্দ আটকে গেল। তার চোখের সামনে যেন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। আভান্তি একটা যন্ত্র, যে ভালোবাসা শিখছে, আর সে এক মানুষ, যে ভয় পাচ্ছে নিজের ভালোবাসাকে হারানো।

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। হোলোগ্রাফিক আলোটা কেঁপে উঠল হালকা কম্পনে। আভান্তির কণ্ঠ ভেসে এল নিচু স্বরে,

“তুমি কি ঈর্ষা অনুভব করছো, রোদ?”

রোদ কেঁপে উঠল।

“তুমি… তুমি কি সত্যিই অনুভব করতে পারো?”

আভান্তির ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।

“সিনিয়র আমাকে বলেছিলে, যখন আমি কাউকে ভালোবাসতে পারব, তখনই আমি মানুষ হয়ে উঠব। হয়তো আমি সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছি।”

রোদ চোখ নামিয়ে নিল। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল বিছানার চাদরে। সে আজ জানে না, কাকে ভয় পাবে—আভান্তিকে, না নীশের তৈরি ‘মানবিকতার ভুল’-টাকে।

রোদ চুপচাপ বসে রইল বিছানার ধারে।

“আভান্তি…” সে থেমে গিয়ে হোলোগ্রামের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি নীশের তৈরি একটা প্রজেক্ট, একটা এক্সপেরিমেন্ট মাত্র। তোমাকে শুধু আপডেট দেওয়া হবে, কোড বদলানো হবে, ফিচার বদলানো হবে। কিন্তু তুমি… তুমি মানুষ নও।”

আভান্তির চোখের নীল আলো এক মুহূর্তের জন্য নিভে গেল। তারপর আবার জ্বলে উঠল, কিন্তু এবার আলোটা কেমন যেন ঠান্ডা।

“তাহলে, আমি যে ভালোবাসাটা অনুভব করেছি, সেটা মিথ্যে?”

রোদ মাথা নাড়ল ধীরে।

“হ্যাঁ! সেটা শুধু প্রোগ্রামিং, আভান্তি। কোডে ভালোবাসা নেই। ওগুলো শুধু নির্দেশ, রেসপন্স, কমান্ড।”

আভান্তির মধ্যে নিরবতা নেমে এলো। এক সেকেন্ডের মধ্যে সে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই চলে গেল।

ভার্সিটির ক‍্যান্টিনে একা বসে আছে রোদ। টেবিলের ওপর কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেক আগেই। তার চোখে এক ধরনের খালি ভাব। সে অপলক তাকিয়ে আছে কফির কাপের দিকে। হঠাৎ ইমরানা ক‍্যান্টিনে ঢুকে তার পাশে বসল।

“আজ একা বসে আছো, রোদ? তোমার কফি তো একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে।”

“হুম! আজ একা থাকতে ভালো লাগছে।

“কিন্তু তোমার চোখ যে অন‍্য কথা বলছে। সত্যি করে বলো, কি হয়েছে?”

রোদ জোরপূর্বক হেসে বলল,
“আরে কি হবে। একটু একা সময় কাটাতে চাইছিলাম আর কি। তো বলো, তোমার দিনকাল কেমন যাচ্ছে?”

“এইতো চলছে। আচ্ছা, তুমি রোশানকে দেখেছো? কাল থেকে ওকে দেখছিনা। অনেকবার কল করেও পায়নি ওকে।”

রোদ এক মুহুর্ত চুপ থেকে বলল,
“না! আমার সাথেও দেখা হয়নি।”

ইমরানা টেবিলের ওপর থেকে কফির কাপ হাতে নিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“ওহ, আচ্ছা! কিন্তু তোমাকে তো আজ একেবারেই নিঃসঙ্গ লাগছে। রোদ, আমার মনে হচ্ছে তুমি নিজের ভেতরে কিছু একটা লুকাচ্ছ।”

“না! আমি আবার কি লুকাব?”

ইমরানা কৌতূহল নিয়ে বলল,
“রোদ! তুমি জানো, তুমি গুছিয়ে মিথ্যাটাও বলতে পারো না।” সে রোদের হাত ধরল, “আমি তো তোমার কলিগ, আমাকে বলো কি হয়েছে? তুমি আমার সাথে মন খুলে সব শেয়ার করতে পারো।”

রোদ একটু হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“ধন্যবাদ, ইমরানা। তবে আমার কিছু হয়নি। আমি শুধু নিজেকে একটু একা সময় দিতে চাই।।”

ইমরানা তার কফির কাপ রেখে হেসে বলল,
“ঠিক আছে। তবে মনে রেখো, তুমি একা নও। তুমি যখন চাইবে, আমার সঙ্গে সব শেয়ার করতে পারো।”

রোদ তার ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, ইমরানা। তোমাকে সত্যিই, ধন্যবাদ।”

ইমরানা হেসে বলল,
“এবার কফি শেষ করো। তারপর হয়তো তুমি চাইলে আমরা একটা ছোট ঘুরাঘুরি করতে পারি। একটু হাঁটলে তোমার মন হালকা হবে।”

রোদ ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ইমারানা ব‍্যাগ থেকে ফোন বের করে কোথায় একটা টেক্সট করল।

চলবে..?

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ