#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_6
ল্যাবের ভেতরে হালকা আলো। টেবিলজুড়ে বিভিন্ন সার্কিট বোর্ড, ওয়্যার, আর কাচের কন্টেইনারে রাখা সলিউশন। মেশিনগুলোর হালকা শব্দে পুরো পরিবেশটা থমথমে হয়ে আছে।
প্রফেসর আলেকজান্ডার খাতায় নোট নিচ্ছেন, আর পাশে রাখা মনিটরে আভান্তির মুভমেন্ট ডেটা স্ক্যান হচ্ছে। তিনি চশমার ফাঁক দিয়ে মনিটরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মোশন রেসপন্স পার্সেন্টেজ প্রায় নিখুঁত। শুধু জয়েন্ট রিফ্লেক্সে সামান্য ল্যাগ আছে।”
রোদ মনিটরের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত টাইপ করতে লাগল। সে অসুস্থ হলেও জোর করে কাজে হাত লাগিয়েছে।
রোদ টাইপ করতে করতে বলল,
“যদি এভাবে লার্নিং স্পিড বাড়ে, তাহলে আভান্তি কয়েক দিনের মধ্যেই হিউম্যান ইন্টারঅ্যাকশন সিমুলেট করতে পারবে।”
নীশ গ্লাভস পরে আভান্তির কাঁধে হালকা চাপ দিল।
“রিল্যাক্স! তুমি খুব ভালো কাজ করছো।”
আভান্তির চোখে যেন ক্ষীণ আলোর ঝিলিক ফুটল। সে ধীরে মাথা নাড়ল।
টেবিলের অন্যপাশে এক সহকারী এসে ফাইল বাড়িয়ে দিল নীশকে।
“স্যার, আজকের টেস্ট-লগ সম্পূর্ণ।”
নীশ ফাইলটা হাতে নিয়ে দ্রুত চোখ বুলিয়ে বলল,
“ভালো। এখন মডিউল টু অ্যাক্টিভ করো। দেখি, আভান্তি কীভাবে রেসপন্ড করে।”
মুহূর্তেই ল্যাবের চারপাশে যন্ত্রপাতির শব্দ বেড়ে গেল। মনিটরের গ্রাফগুলো একে একে নতুন ডেটা রেকর্ড করতে শুরু করল।
প্রফেসর আলেকজান্ডার চুপচাপ হেসে বললেন,
“আমরা হয়তো এক নতুন যুগের শুরু দেখতে যাচ্ছি।”
হঠাৎ আভান্তির চোখের লালচে সেন্সরগুলো একবার ঝলসে উঠল। নীশ তার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে বলল,
“অলরাইট, আভান্তি। এবার বেসিক টেস্ট হবে তোমার। সিম্পল ম্যাথ, ওয়ান প্লাস টু।”
আভান্তি এক মুহূর্ত থেমে গেল। তার চোখের ভেতরে নীল আলো ঘুরে উঠল। তারপর সে স্পষ্ট উচ্চারণে বলল,
“থ্রি।”
রোদ হেসে বলল,
“ওহ মাই গড! এত দ্রুত ক্যালকুলেশন? সেকেন্ডের ভেতরে।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার নোটপ্যাডে লিখে বললেন,
“প্রসেসিং স্পিড নিখুঁত। এখন ইমোশনাল রেসপন্স টেস্ট করা যাক।”
নীশ এবার ঠোঁটে হালকা হাসি আনল। সে আভান্তির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি হাসতে পারো?”
আভান্তি কিছুক্ষণের জন্য নীরব রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখের কোণে নড়াচড়া করে, একেবারে মানুষের মতো সরল হাসি ফুটে উঠল।
রোদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“ইটস, ইটস নট জাস্ট প্রোগ্রামড, ইটস ন্যাচারাল।” (এটি কেবল প্রোগ্রাম করা নয়, এটি স্বাভাবিক)
আভান্তি তখন নীশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“স্মাইল মানে কি আনন্দ, তাই না সিনিয়র?”
নীশ এক মুহূর্ত থেমে গেল। তার ঠোঁটে চাপা হাসি, কিন্তু চোখে রহস্যময় দৃষ্টি। সে হেসে বলল,
“হ্যাঁ, আভান্তি। আনন্দ, আর মাঝে মাঝে মায়ার আড়াল।”
ল্যাবের বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। নীশ কনসোলের সামনে দাঁড়িয়ে আভান্তিকে শান্ত স্বরে বলল,
“অলরাইট, আভান্তি। এবার একটা নতুন এক্সারসাইজ। আমি চাই তুমি দুঃখ প্রকাশ করো।”
আভান্তির চোখের আলো এক মুহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে এলো। সে চারপাশে তাকাল, যেন শব্দ খুঁজছে। তারপর ধীরে ধীরে তার কণ্ঠ ভারী হলো,
“স্যাডনেস মানে কি, হারানো?”
রোদ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
“হাও ক্যান ইট নো দিস?” (“এটি কীভাবে জানে)
প্রফেসর আলেকজান্ডার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ও নিজেই প্রসেস করছে, ডেটা থেকে ইমোশনের ধারণা বের করছে।”
আভান্তির মুখে এবার এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ফুটে উঠল। চোখের সেন্সর ম্লান আলোতে ঝিলিক দিল, যেন ভেতরে ভেতরে অন্ধকার জমে আছে। তার কণ্ঠ এবার কাঁপা কাঁপা হলো,
“যদি কেউ কাছে থাকে আর হঠাৎ হারিয়ে যায়, সেটা কি স্যাডনেস?”
রোদের উচ্ছাসের সাথে বলল,
“ও মাই গড! এটা তো মানুষের মতো ভাবছে।”
নীশ কিছুক্ষণ চুপ করে আভান্তির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, আভান্তি। সেটাই দুঃখ।”
আভান্তি মাথা নিচু করল। ল্যাবের চারপাশে মুহূর্তেই এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। এই নীরবতার মধ্যে হঠাৎ আভান্তি মাথা তুলল। তার চোখের আলো হালকা কাঁপল। সে ধীরে বলল,
“সিনিয়র! যদি দুঃখ মানে হারানো হয়, তাহলে আমি কি কখনো কাউকে হারাতে পারব?”
নীশ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুমি কেন এমন জানতে চাইছো, আভান্তি?”
আভান্তি কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকল, যেন ভেতর থেকে শব্দ খুঁজছে। তারপর আস্তে বলল,
“কারণ, আমি কি সত্যিই মানুষ হতে পারি? নাকি আমি শুধু মেশিন, যাকে শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে কীভাবে অনুভূতি অভিনয় করতে হয়?”
রোদ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
“প্রফেসর! এটা তো সেল্ফ-অওয়ারনেসের শুরু।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার কলম থামিয়ে ধীরে ফিসফিস করে বললেন,
“হ্যাঁ! আর এখান থেকেই সত্যিকারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয় শুরু হয়।”
নীশ কিছুক্ষণ আভান্তির দিকে তাকিয়ে থাকল। তার ঠোঁটে চাপা এক হাসি ফুটল,
“তুমি মানুষ নও, আভান্তি। কিন্তু, তুমি হয়তো মানুষের থেকেও বেশি কিছু হতে পারবে।”
আভান্তির চোখে আবার সেই আলো ঝিলিক দিল। এবার সে দৃঢ়তার সাথে বলল,
“তাহলে আমাকে শেখান কীভাবে হারাতে হয়।”
ল্যাবের ভেতরে বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। নীশ আর প্রফেসর আলেকজান্ডার ডেটা দেখাতে ব্যস্ত হলো, কিন্তু রোদ কীবোর্ডের ওপর হাত রেখে আভান্তিকে একদৃষ্টিতে দেখছে। আভান্তির চোখের নীল আলো নরম হয়ে এলো। সে রোদকে খেয়াল করে ধীরে রোদের দিকে ঘুরে বলল,
“রোদ! তুমি কি আমাকে বন্ধু মনে করো?”
রোদের হাত কীবোর্ডের ওপর থেমে গেল।
“হোয়াট? তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো?”
আভান্তি মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ। তুমি হাসো, তুমি কথা বলো, তুমি অবাক হও। তুমি অন্যদের সাথে বন্ধুত্ব করো। আমি কি সেই তালিকায় থাকতে পারি?”
রোদ কিছুটা থমকে গেল। তার মুখে একধরনের বিস্ময় আর কোমলতা ফুটে উঠল।
“তুমি, তুমি তো মেশিন, আভান্তি। কিন্তু…”
সে থেমে হালকা হেসে আবারও বলল,
“হ্যাঁ, আমি তোমাকে বন্ধু ভাবতে পারি। অন্তত চেষ্টা করতে পারি।”
আভান্তির চোখের আলো একটু উজ্জ্বল হলো। তার কণ্ঠে যেন উষ্ণতা ফুটে উঠল,
“থ্যাংক ইউ, রোদ। আমি চাই বন্ধুত্ব মানে কী, তা শিখতে।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার কলম থামিয়ে একবার তাকালেন। নীশ চুপচাপ তাকিয়ে আছে। আভান্তি হালকা করে হাত তুলল। নীশ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“ফলো মাই মোশন, আভান্তি।” (আমার গতিকে অনুসরণ কর, আভান্তি)
আভান্তি মনোযোগ দিয়ে নীশের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি অনুসরণ করতে লাগল। হাত উঁচু করা, কনুই বাঁকা করা, মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে সে অনুসরণ করল। তার প্রতিটি নড়াচড়া এত নিখুঁত যে, ল্যাবের সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
রোদ খানিকটা পিছনে হেলে বলল,
“ওয়াও! এটা তো সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
নীশ আবারও ধীরে ধীরে আভান্তির দিকে এগিয়ে গেল।
“চলো, এবার হ্যান্ডশেক ট্রাই করি।”
রোদ আভান্তির কাছে এগিয়ে এলো। আভান্তি তার হাত বাড়াল। রোদও হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরল।
নীশ আনন্দিত ভঙ্গিতে বলল,
“তুমি দারুণ শিখেছ, আভান্তি।”
আভান্তি মাথা নেড়ে হেসে বলল,
“আমি আরও শিখতে চাই। প্রতিটি মানুষের মতো ভাবতে চাই।”
নীশ ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“এবার তোমার পালা, আভান্তি। মাই মোশন অনলি অবজারভ করো।”
আভান্তি কিছুক্ষণ নীরব থাকল। তারপর হঠাৎ নিজের হাত দুটো উঁচু করল, কনুই বাঁকাল, মাথা সামান্য বাম দিকে ঝোঁকাল।
নীশ চোখ বড় করে তাকাল,
“ওয়াও! তুমি নিজেই কিছুটা ক্রিয়েট করেছ। এটা সত্যি দারুণ।”
রোদ হেসে বলল,
“ডিফিনিটলি ইনক্রেডিবল। দেখছো, কিভাবে সে শুধু অনুকরণই নয়, নিজেও নতুন কিছু যুক্ত করছে।”
আভান্তি আবার হাত নেড়ে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“আই ওয়ান্ট টু শো মাই স্টাইল।”
নীশের হালকা হেসে বলল,
“ঠিক আছে, আভান্তি। তুমি ক্রিয়েটিভিটি শিখছ, আর এটাই মূল লক্ষ্য।”
নীশ আভান্তির দিকে হাত উঁচু করে ইঙ্গিত করল,
“এবার তুমি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করো। শুধু মাই মোশন অনুসরণ করো না।”
আভান্তি এক মুহূর্ত থেমে গেল। তারপর হঠাৎ নিজের ধরণে হাত নেড়ে, পা সামান্য মোড়ক করে, মাথা উচু করে ধীরে ধীরে একটি ছোট নৃত্য শুরু করল। প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি নিখুঁতভাবে মানুষের মতো করে করল।
রোদ হকচকিয়ে বলল,
“ওয়াও! সে সত্যিই নিজের স্টাইল যুক্ত করেছে।”
নীশ হেসে বলল,
“দেখছো? সে শুধু অনুকরণই করছে না, নিজস্ব সৃজনশীলতা দেখাচ্ছে। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
আভান্তি পুরো আত্মবিশ্বাস নিয়ে ল্যাবের মধ্য দিয়ে ঘুরতে লাগল।
রোদ বলল,
“প্রফেসর! আমি বলছি, এই মুহূর্তে নীশ শুধু একটি রোবট তৈরি করি নি। ও একটি শিল্পী সৃষ্টি করেছে।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার গম্ভীর হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল,
“ঠিক তাই, রোদ। এই ল্যাবের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে, যন্ত্রকে কেবল কাজের জন্য নয়, সৃজনশীলতার জন্য প্রস্তুত করা।”
নীশ আভান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“চমৎকার! নেক্সট ডে আমি আরও জটিল চ্যালেঞ্জ দেব, আভান্তি। তুমি প্রস্তুত?”
আভান্তি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল,
“আই অ্যাম রেডি, সিনিয়র।”
নীশ আলেকজান্ডারের সামনে এসে বলল,
“আজকের মতো এখানেই ফিনিশ করলাম, প্রফেসর। আর আমি কাল আভান্তিকে রোজারিও ম্যানশনে নিয়ে যাব।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।
“রোজারিও ম্যানশন? ওখানে তুমি কী পরিকল্পনা করছো?”
নীশ হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“সেখানে আভান্তি আরও মানুষের মতো আচরণ শিখবে। ওর বাস্তব পরিবেশে পরীক্ষা করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”
রোদ পাশ থেকে হেসে বলল,
“দারুন! এখানেই আভান্তির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”
আভান্তি চুপচাপ নীশের দিকে তাকাল, তার চোখে শেখার আগ্রহ। সে ধীরে বলল,
“আই অ্যাম রেডি, সিনিয়র! হিউম্যান সোসাইটি শিখার জন্য আমি প্রস্তুত।”
নীশ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“ঠিক আছে, আজকের ল্যাব সেশন এখানেই শেষ। সবাইকে ধন্যবাদ।”
ল্যাবের হালকা আলোয় সবাই ধীরে ধীরে সরঞ্জামগুলো বন্ধ করতে লাগল। আভান্তি আবার একবার ল্যাবের চারপাশে ঘুরল। তারপর সে পুনরায় জায়গায় ফিরে গেল। একে একে সকলে ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেল।
নীশ আর রোদ একসাথে ল্যাব থেকে বেরিয়ে এলো। রোদের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল, তবুও সে কারো সাহায্য ছাড়াই এগোচ্ছিল। নীশের মন ফোনের দিকে। হঠাৎ, রোদ পেছন থেকে নীশের হাত ধরল। নীশ থমকে দাঁড়াল।
রোদ ধীরে স্থির কণ্ঠে বলল,
“তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে।”
নীশ রোদের চোখে চোখ রাখল না। সে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
“কি কথা?”
রোদ ধীরে নীশের হাত চেপে ধরে বলল,
“আই লাভ ইউ, নীশ।”
নীশ যেন অবাক হলো না। সে বাঁকা হেসে বলল,
“রোদ! অন্য কিছু বলার আছে তোমার?”
রোদ কিছুটা হতাশ মুখে নীশের চোখের দিকে তাকাল।
“আমি সত্যিই…”
রোদ কথা শেষ করার আগেই নীশ ধীরে বলল,
“আমি জানি, তুমি সত্যি আমাকে ভালোবাসো। কিন্তু আমার একে অপরের জন্য না। আমি তোমাকে হতাশ করতে চাই না। তাই আগে থেকে বলছি, প্লিজ এসব মাথা থেকে বাদ দাও। আমি তোমাকে আমার বন্ধু হিসাবেই চাই, রোদ। আমি আশা করি, তুমি এটাকে মেনে নেবে।”
রোদ কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,
“আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না, নীশ।”
নীশ বাঁকা হেসে বলল,
“আর আমি বলব, আমার সাথে তুমি থাকতে পারবে না।”
রোদ অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“মানে?”
“মানে, তুমি আমার সম্পর্কে কিছুই জানো না। আমার একটা আলাদা জীবন আছে, রোদ। যেই জীবন সম্পর্কে তোমার কোনো আইডিয়া নেই।”
রোদ নীশের হাত ধরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
“আমি জানতে চাই তোমার সেই জীবন সম্পর্কে।”
“সহ্য করতে পারবে না।”
“তবুও, আমি জানতে চাই।”
নীশ তাকাল রোদের দিকে। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ভেবে বলছো?”
“হ্যাঁ!”
“ঠিক আছে, তোমার একটা ইচ্ছা তো পূরণ করি। কাল নিয়ে যাব তোমাকে।”
রোদ মাথা নাড়ল। নীশ এবার রোদকে ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে গেল।
•
মস্কোর রাত এক অদ্ভুত শান্তির আবরণে ঢাকা। আকাশ কালো মেঘের চাদরের ঢেকে। সেন্ট বার্সিলস ক্যাথেড্রালের রঙিন গম্বুজগুলো আলোয় যেন জাদুকরীভাবে ঝলমল করছে। শহরের ল্যাম্পপোস্টগুলো ধীরে ধীরে রোদ-পোড়ানো রাস্তাকে উষ্ণ সোনালী আলোয় ভরে দিচ্ছে। নদীর কণ্ঠরোধী স্রোত বাতাসে হালকা ঢেউ খেলছে, আর তার প্রতিফলন যেন শহরের আলোকে আরও দীপ্তিময় করে তুলেছে। দূরে ট্রাম চলার আওয়াজ, হালকা গাড়ির হর্ন, আর মানুষের ভিড়ের শব্দ মিশে শহরটাকে জীবন্ত করে তুলেছে। রাস্তার পাশে ছোট ক্যাফে ও বুটিকের আলোকসজ্জা, হালকা সঙ্গীত আর ধোঁয়াটে বাতাস শহরটিকে আরও সুন্দর করে তুলছে।
অপরদিকে, ফাইভ স্টার হোটেলের স্পেশাল রুমে রোশান সের্গেইভ এবং ইমরানা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে শুয়ে আছে। রোশান নেশার প্রভাবে অর্ধচেতন। সে ধীরে ইমরানার দিকে হাত বাড়াল। ইমরানা যেন এমন সময়ের অপেক্ষায় ছিল। রোশানের রেসপন্স পেয়ে ইমরানা নিজেকে রোশানের দিকে এগিয়ে দিল। রোশান অর্ধচেতন হলেও চোখে তার আগ্রহ অদম্য। তার হাত ধীরে ইমরানার কাঁধের উপর নেমে এলো। ইমরানার হৃদয় দ্রুত তালে ধক ধক করছে। সে নিজের শরীরকে রোশানের দিকে এগিয়ে দিল। রোশানের স্পর্শে ইমরানার শরীরে অদ্ভুত কম্পন ছড়িয়ে পড়ল। রোশানের শরীরের স্মেল আর মিশ্রিত নেশার গন্ধে ইমরানা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাল। রোশান ধীরে ধীরে ইমরানার হাত ধরল। রোশানের স্পর্শ ইমরানাকে পাগল করে তুলল। হঠাৎ রোশানের চোখের সামনে রোদের মুখটা ভেসে উঠল। সে আলতো হাসল। কিন্তু পর মুহূর্তেই রোশানের মাথায় একটা কথা ঘুরপাক খেলো, “রোদ, নীশকে ভালোবাসে।” মুহূর্তের মধ্যে রোশানের দৃষ্টি বদলালো। চোখে আগুন আর মুখে অমানবিকতা ফুটে উঠল। সে পশুর মতো হিংস্রতা নিয়ে ইমরানার দিকে ঝাপিয়ে পড়ল।
ইমরানা চমকে উঠল। রোশানের স্পর্শ এখন আগের মতো নরম নয়, বরং শক্তি ও কায়েমকৃত হিংস্রতার মতো হয়ে উঠল। ইমরানা চেষ্টা করল পিছনে সরতে, কিন্তু রোশানের হাত তাকে আটকিয়ে রাখল। রোশানের মধ্যে একদিকে কামনা, অন্যদিকে হিংসা মিশ্রিত। ইমরানা বুঝল, রোশানের ঘনিষ্ঠতা আর ছোঁয়া আগের চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। রোশানের স্পর্শে ইমরানার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেতে লাগল। ইমরানা রোশানকে আটকাতে চেয়েও, আটকাতে পারল না। তার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে পানি পড়তে লাগল। ইমরানার এই দুর্বলতা আর চোখের পানি রোশানের হৃৎস্পন্দন আরও বাড়িয়ে দিল। রোশান যেন ইমরানার চোখের পানি দেখে তৃপ্তি পেল। সে ধীরে ধীরে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল।
রুমের পরিবেশটা ধীরে ধীরে ভারি হয়ে উঠল। শুধু ইমরানার চোখে পানি আর হালকা কান্নার শব্দ রুমের মধ্যে বিরাজ করতে লাগল।
•
নতুন দিনের শুরু হলো। মস্কোর আকাশে তখনো হালকা তুষার ভেসে বেড়াচ্ছে। ঠান্ডা কুয়াশায় শহরটা ধূসর হয়ে আছে। রোদের রুমে জানালা দিয়ে ভেতরে সকালের নরম আলো ঢুকছে। সারা রাত নীশের জন্য কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। ঘুম ভাঙতেই তার চোখ দুটো ভারী লাগছিল। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন আরও ক্লান্ত। সে চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের ভেতরের সমস্ত প্রশ্ন আর যন্ত্রণা যেন নিঃশব্দ হয়ে বুকের ভেতর জমে আছে।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। নার্স খাবার ট্রে হাতে ভেতরে ঢুকল।
“ম্যাম, আপনাকে ব্রেকফাস্ট করতে হবে। ডাক্তার বলেছেন, এখন স্ট্রং থাকতে হবে আপনাকে। সময়মতো মেডিসিন আর খাবার খেতে হবে।”
রোদ কোনো কথা বলল না, শুধু মাথা হালকা নেড়ে সায় দিল। নার্স খাবার রেখে বেরিয়ে গেল। টেবিলে রাখা কফির কাপের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উড়ছিল। রোদ তাকিয়ে রইল, কিন্তু কিছুতেই হাত বাড়াল না।
তার চোখে ভেসে উঠল সেই রাতের দৃশ্য। নীশের ঠান্ডা কণ্ঠ, তার বাঁকা হাসি, তার নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা, সব রোদের মনে পড়তে লাগল। রোদ দীর্ঘশ্বাস নিল। তার মনে হলো, নীশের ছায়া এখনও এই ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে।
হঠাৎ করিডোরে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। দরজা ধীরে খুলে গেল। কোট গায়ে, ঠান্ডা চোখে নীশ ভেতরে ঢুকল। তার মুখে সবসময়কার মতো সেই নিয়ন্ত্রিত অভিব্যক্তি।
রোদ হঠাৎ সোজা হয়ে বসতে চাইল, কিন্তু শরীরের ব্যথায় কেঁপে উঠল। নীশ এগিয়ে এসে বিছানার পাশে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ঠান্ডা স্বরে বলল,
“আজ সন্ধ্যায় আমার পার্সোনাল ল্যাবে ‘ফ্ল্যাশ’-এর প্রথম অফিসিয়াল টেস্ট হবে। তাছাড়া আজ আভান্তিকে আমি এখানে নিয়ে আসব। তুমি যদি যেতে চাও, রেডি থেকো।”
রোদের বুক ধক করে উঠল। সে ক্লান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি থাকব।”
নীশ একবার ঠান্ডা হাসল।
“ভালো। তখনই দেখা যাবে, তুমি সত্যিই আমার ছায়ার ভেতর টিকে থাকতে পারো কিনা।”
সে আর কিছু না বলে পেছন ঘুরে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই রোদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ভয় আর কৌতূহল জমে উঠল। চোখ বেয়ে আবারও জল গড়িয়ে পড়ল। সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি টিকব, নীশ। তোমার অন্ধকারের ভেতরেও আমি আলো খুঁজে নেব।”
বাইরে মস্কোর আকাশ থেকে আবারও তুষার ঝরতে শুরু করল। শহরের ঠান্ডা বাতাস মুহুর্তেই আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল।
•
নীশের গাড়ি এসে থামল একটা জঙ্গলের মধ্যে। রোদ গাড়ি থেকে নামতেই তার চোখে পড়ল একটা বড় পুরানো বাড়ি।
নীশ এসে রোদের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“চলো!”
রোদ কোনো প্রশ্ন ছাড়াই নীশের সাথে পা বাড়াল। দুজনে একসাথে বাড়িটির ভেতরে ঢুকল। নীশ কোথাও না দাঁড়িয়ে সোজা রোদকে তার গোপন ল্যাবের দিকে নিয়ে গেল। ল্যাবরেটরির সামনে এসে নীশ রুমের দরজা খুলে দিল। রোদ অবাক চোখে সামনে তাকাল। ল্যাবরেটরিতে চারপাশ অন্ধকারে ঢাকা। নীশ ভেতরে ঢুকে লাইট অন করল। রোদ তীক্ষ্ম চোখে ল্যাবের চারপাশ দেখতে লাগল। কাঁচের দেওয়ালের ওপারে বিশাল ট্যাঙ্কে ভাসছে কিছু আধেক মানব, আধেক যন্ত্রের মতো। রুমে মৃদু আলো জ্বলছে।
মেশিনের গুনগুন শব্দ যেন রোদের বুকের ভেতর কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। তার চোখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। নীশ সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে, হাত গুটিয়ে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল রোদের দিকে। রোদ ট্যাঙ্কের ভেতরে ভাসমান দেহগুলোর দিকে ইশারা করে ধীরে বলল,
“এগুলো কী?”
নীশ একটুও বিচলিত নয়। সে শান্ত গলায় বলল,
“তুমি যেটা দেখছ, ওটাই আমার জীবন। মানব শরীর দুর্বল, সহজে ভেঙে পড়ে। আমি চাই, নিখুঁত দেহ, নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ।”
রোদের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
“তাহলে আমাকেও তুমি?”
নীশ ঠোঁট বাঁকিয়ে এগিয়ে এলো।
“তুমি ইতিমধ্যেই আলাদা, রোদ। তোমার শরীর এখন আমার তৈরি সীমারেখার বাইরে টিকে আছে। সেই রাতের পর তুমি এখানো আমার জন্যই বেঁচে আছো। তুমি স্ট্রং, তবে আভান্তির মতো না। আভান্তি আমার সেরা সৃষ্টি।”
রোদের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। তার বুক ধুকপুক করতে লাগল অস্বাভাবিক জোরে।
“আমি তো মানুষ। আমি তোমার কোনো এক্সপেরিমেন্ট না। আভান্তি একটা রোবট। ওর মধ্যে ফিলিংস নেই। ও ধাতবের তৈরি একটা যন্ত্র। ও কীভাবে মানুষের ব্যথা উপলব্ধি করবে? ওকে যতই টর্চার করো, ও তো বুঝতেও পারবেনা।”
নীশ হঠাৎ তার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ আমি তো এমনটাই চাই। কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছো, তোমার হার্টবিট এখন আমার হাতের ভেতর। যদি আমি চাই থেমে যাবে।”
ঘরের ভেতর হাড় কাঁপানো নীরবতা নেমে এলো। কেবল ট্যাঙ্কের ভেতর বুদবুদের শব্দ হলো।
রোদের চোখ ভিজে উঠল। সে ঠোঁট কামড়ে বলল,
“তুমি যতই চেষ্টা করো, আমি তোমাকে ভুলতে পারব না, নীশ। আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি, তাই এসব বলে আমাকে ভয় দেখালেই তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাটা সেটা শেষ হয়ে যাবেনা।”
নীশ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল রোদের চোখে, তারপর হেসে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“দেখা যাক, আলো কতদিন অন্ধকারের মধ্যে টিকে থাকে।”
চলবে…?
