#প্রতিদান (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
লোক মুখে শুনছিলাম আব্বা আরও একটি সংসার পালেন। যেহেতু কর্মসূত্রে ঢাকা থাকেন। আম্মা এবং আমরা তিন ভাই বোন গ্রামের বাড়িতে থাকে। বয়স যখন পনেরো তখনই এই কথাটা কানে এসেছে, আব্বা ঢাকা শহরে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। সেখানে দিব্যি সংসার করছেন। এই কথাটা আম্মার কানেও এসেছে। তবে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। আমরা যদি কখনো আম্মাকে বলতাম,“আম্মা আব্বা নাকি আমাদের ভালোবাসে না? তিনি আরও একটা ঘর করছেন, সেই ঘরের সন্তানদের ভালোবাসেন।”
“বাজে কথা।”
আম্মা এক কথায় এভাবে জবাব দিতেন। আমরাও তাই মেনে নিতাম। তবে মাঝে মাঝে অবাক লাগতো, সেই দশ বছর বয়স থেকে দেখছি আব্বা আমাদের সঙ্গে কোন একটা ঈদ কাটাতেন না। হ্যাঁ ঈদের আগে এসে ঈদের পোশাক দিয়ে যেতেন। আমাদের নিয়ে ঘুরে যেতেন। কিন্তু ঈদে তাকে আমরা পেতাম না। যদি ফোন দিয়ে বলতাম,“আব্বা আপনি আসলেন না কেন? আমাদের সব বন্ধুরা বাবা, মায়ের সঙ্গে একত্রে ঈদ উৎযাপন করছে। আর আপনি দূরে। আমরা আপনাকে খুব মিস করছি আব্বা। আপনি আসেন।”
“কাজের অনেক চাপ বাবা।
এই বছর হবে না। তবে চিন্তা করো না কুরবানির ঈদ তোমাদের সঙ্গে কাটাবো।”
এভাবে এক ঈদ গেলে অন্য ঈদ একত্রে কাটানোর স্বপ্ন দেখাতেন। কিন্তু আসতেন না। অনেক লোক বলতো, প্রতি ঈদ আব্বা দ্বিতীয় পরিবারের সঙ্গে কাটান। আম্মাকেও মাঝে মাঝে কাঁদতে দেখতাম। তবে সেই কান্নার কারণ কখনো জানতে পারিনি। এভাবে আমার বয়স বিশে এসে দাঁড়ায়। আমার পর আমার একটা বোন। তার বয়স বারো বছর। আমার জন্মের আট বছর পর সে বোন টিনা হয়। তার চার বছর পর ছোট ভাই মুন্না হয়। এখন মুন্নার বয়স আট। আর এই বয়সে এসে আমরা ধাক্কা খাই। জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খাই।
মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। যদিও আগে ছোটখাটো অসুস্থ হতেন। কিন্তু কখনো ডাক্তার দেখাননি। গ্রামের ফার্মেসি থেকে ঔষধ কিনে কাজ চালাতেন। তবে এবার মারাত্নক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেজন্য আমরা আব্বাকে ফোন দেই। সে সামনের সপ্তাহে আসবে বলে জানায়। কিন্তু আম্মার অবস্থা ভালো নয়। এতটা সময় দেওয়া যাবে না। তাই আব্বার থেকে টাকা নিয়ে আমি পাশের ঘরের এক চাচীকে নিয়ে আম্মাকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। টিনা এবং মুন্নাকে তাদের ঘরে রেখে যাই।
সে এক দুঃস্বপ্নের মতো দিন। সকাল হতে আম্মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফুপু, মামীকে ফোন দেই। তবে তাদের কাজ রয়েছে। তারা আসতে পারবে না। কত হাতেপায়ে ধরেছি। অনুরোধ করেছি। কেঁদেকেঁদে বলেছি,“আম্মার অবস্থা ভালো নয়। সত্যি ভালো নয়। একটু আসেন।”
কিন্তু না। কেউ আসেনি। তাদের সময় হয়নি। তখন আম্মাকে নিয়ে আমাদের তিন ভাইবোনের দিশেহারা অবস্থা। তিনজনে আম্মাকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছি। আমাদের অবস্থা দেখে পাশের ঘরের চাচীর মায়া হলো। সে এর আগেও মায়া করেছে। আমাদের রান্নাবান্না করতে সাহায্য করেছে। আম্মার দেখাশোনাও সাহায্য করেছে। তবে তার স্বামী একটু কঠোর মানুষ। তাই আমাদের সঙ্গে যাবার জন্য সাহস করতে পারেনি। শেষে কোন আত্মীয় না আসায় সে আমার সঙ্গে যেতে রাজি হয়। চাচা এখন অফিসে। সন্ধ্যায় ফিরে আসবে। তার আগে সে বাসায় ফিরে আসবে। এই খারাপ সময়ে এতটুকু ক’জন করে। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষা ছিলো না।
অতঃপর আমরা হাসপাতালে গেলাম। ডাক্তার নানারকম টেস্ট ছিলো। আব্বা পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলো। আমার জমা ছিলো তিন হাজার। ছয় হাজার দিয়ে টেস্ট করালাম। টেস্ট রিপোর্ট ডাক্তার দেখে জানালো, ক্যান্সার। এতদিন কোথায় ছিলাম? শেষ সময়ে এসেছি।
আম্মার ক্যান্সার শুনেই তো আমি ভেঙে পড়লাম। প্রচন্ড ভেঙে পড়ি। তার মাঝে এত খারাপ অবস্থা শুনে তো শেষ। দ্রুত আব্বাকে ফোন দিলাম। কান্নাকাটি করলাম। আব্বা আম্মার এমন খারাপ অবস্থা শুনে সেদিনই গাড়িতে ওঠে। কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে আসে। সে সোজা হাসপাতালে আসে। মাকে এতক্ষণে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। ডাক্তার যতটা তাদের সাধ্য রয়েছে ততটা চিকিৎসা করছে। যেহেতু ক্যান্সার সেহেতু আমাদের আশা রাখতে বারণ করে দেয়। আমরা তো অবুঝ নই। সবটা বুঝি। তবে আমাদের খারাপ সময়ের এটা শুরু ছিলো। ডাক্তার আম্মাকে ঢাকায় ট্রান্সফার করার কথা বললেও আব্বা রাজি হয় না।
তার মতে, আম্মা তো বাঁচবে না। সেহেতু শুধু শুধু টাকা নষ্ট করার কোন মানে হয় না। সে রাজি নয়। তাই ছুটি নিয়ে বাসায় আসে। যেসব ঔষধ দেওয়া হয়েছে তা দিয়ে যতটা যায়। আমি তো উপস্থিত ছিলাম। সবই দেখেছি। সব শুনেছি। কিন্তু কিছু বলতে পারিনি। পয়সা যে নেই। তাও বলতে চাইছিলাম। তবে আম্মা দেয়নি। আম্মার শরীরটা ভীষণ দূর্বল। তার কথা বলতে কষ্ট হয়। তবুও সে বলে,“এটা আমার ভাগ্য বাবা। আমি এটা মেনে নিয়েছি। তুমিও নাও।”
অতঃপর ভাগ্যকে মেনে নেই। আম্মাকে নিয়ে বাসায় চলে আসি। টিনা, মুন্না আম্মাকে দেখে জড়িয়ে কাঁদে। আম্মার এমন অবস্থা আমাদের কারোরই সহ্য হচ্ছিলো না। তাই আলাদা করে আবার আব্বাকে অনুরোধ করে বললাম,“একবার আম্মাকে ঢাকা নিয়ে যাই। আল্লাহ চাইলে তো সম্ভব। হতেও পারে আল্লাহ আমাদের ডাক শুনে আম্মাকে রেখে গেলেন।”
আব্বা ছেলে মানুষের আবেগ ধরে কথাটার গুরুত্ব দেননি। আমাকে উল্টো বোঝালেন, এটা দিবা স্বপ্ন। এসব নিয়ে না ভেবে আম্মাকে যতদিন পারি সেবা করি। এটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
আম্মার অবস্থা ভালো নয়। যত সময় যায় তত অবস্থা খারাপ হয়। আম্মা প্রায় সময় আমাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের তার সামনে বসিয়ে রাখেন। আমরাও বসে বসে আম্মাকে দেখি। আম্মার চেহারার উজ্জ্বলতা আর নেই। তবুও আমাদের কাছে সে সুন্দর। কখনো তাকে কুৎসিত মনে হয় না। আমরা তো মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। এভাবে ক’টা দিন কেটে যায়। আব্বার ছুটি শেষ। সে ঢাকা যেতে চায়। আমরা অনুরোধ করে রাখি। টিনা তো পায়ে পড়ে যায়। এই দুঃসময়ে আব্বা যাতে আমাদের ছেড়ে না যায়। আব্বার আমাদের উপর মায়া হয়। সে আমাদের সাথে থাকতে রাজি হন। সেদিন রাতে আব্বা বাহিরে থাকার সময় আম্মা আমাকে কাছে ডাকেন। সেদিন আমার সঙ্গে সে তার একটা দুঃখ শেয়ার করেন। আম্মা প্রথমে বলেন,“তোর আব্বাকে আটকাস না। সে যাক। কাজ করুক।”
কথাটা বলতে গিয়ে আম্মা কেঁদে দেন। আমি তার চোখ মুছিয়ে দেই। তার কাছে বারবার জানতে চাই, কোথায় কষ্ট হচ্ছে? আম্মা কেন কাঁদছে? এক সময় আম্মা বলেন,“সেবার শীতের সময় পনেরো দিন অসুস্থ ছিলাম মনে আছে তোর বাবা?”
“হ্যাঁ।”
আমি মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলাম। আম্মা কাঁদতে কাঁদতে বলে,“সেবার তুই বারবার জানতে চাইছিলি না আমি হাসপাতালে কেন যাচ্ছি না? কেন ফার্মেসি থেকে উল্টাপাল্টা ঔষধ এনে খাই? কেন জানিস? কারণ টাকার অভাবে। তোর আব্বা আমাকে মাসে খরচ পাঠানো বন্ধ করে দেয় পাঁচ বছর ধরে। ছয় মাসে মন চাইলে হাজার পাঁচ, আট টাকা পাঠাতো। সেটায় কি সংসার চলে? ভাগ্যিস হাঁস মুরগি পালণ করতাম। তাই তো সংসারটা টিকে রয়েছে। কিন্তু ঐ টাকা দিয়ে তো সংসারই চলে না। সেখানে কিভাবে চিকিৎসা করাতাম বাবা।”
আম্মা আজ কতটা কষ্ট পেয়ে এই কথাটা বলেছেন তা বুঝতে বাকি নাই আমার। এতদিন এভাবে কত অজস্র কথা না পেটে গোপন করে রেখেছেন। অথচ আব্বা ভালো চাকরি করে। তাও প্রতিদিন মাছ মাংস পাই না আমরা। এই অভিযোগে মুন্না, টিনা কতবার খাবার না খাওয়ার বায়না করেছে? আম্মা তখনও বুঝতে দেননি এই কষ্ট। আমাদের চোখে আব্বাকে হয়তো ছোট করতে চাননি। এটা বোধহয় স্ত্রীর ধর্ম। তবে আজ যখন তার স্বামীকে তার এই অবস্থায় সন্তানদের পা ধরে রাখতে হচ্ছে তখন কষ্টটা বুকে চেপে রাখতে পারলেন না। বলে দিলেন। অথবা এই ঘটনাটা বলে আম্মা আকারে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিয়েছেন, তার স্বামীর জন্য তার এই অবস্থা। সেবার চিকিৎসার জন্য বারবার টাকা চেয়েছে। কিন্তু পাঠায়নি। এভাবে সবসময় রোগকে অবহেলা করে গিয়েছে আম্মা। বাধ্য হয়েছে। অথচ এই আম্মা যখন ইন্টারে আমার খরচ আমাকে চালাতে বলেছেন, মাঝে মাঝে আমার টিউশনির টাকা থেকে টাকা চাইতেন তখন কতই না কষ্ট পেয়েছি? আম্মার উপর রাগও দেখিয়েছি।কারণ আমি তো জানতাম আব্বা আমাদের খরচ পাঠায়। তাতে আমরা বেশ চলতে পারি। তবে নিজের খরচ নিজেকে বহন করতে হবে কেন? এত কষ্টেই বা থাকতে হবে কেন? আমাদের জীবনে বাবার অবদান ঐ রমজানের ঈদের তিন মাস আগে এসে জামাকাপড় দেওয়া অবধিই ছিলো। হয়তো আগে সংসার খরচ দিতোও। তবে আম্মার কষ্টের সামনে সেই খরচ তুচ্ছ।
এক জীবনে আম্মা বহুত কষ্ট পেয়েছেন। তবে তার কষ্ট পাওয়া আরও বাকি ছিলো। তাই তো তার এই অবস্থায় তার সতীন এসে হাজির হয়। লোক মুখে শোনা কথা সত্যি হয়ে যায়। আব্বার দ্বিতীয় স্ত্রী তার এগারো বছরের বাচ্চাকে নিয়ে হাজির হয় এক সন্ধ্যায়। এটা দেখে আমাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। ভর সন্ধ্যে বেলায় পয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছরের এক মহিলা তার এগারো বছরের বাচ্চাকে নিয়ে হাজির হন। তার কড়া নাড়ার শব্দে আমিই দরজা খুলি। দরজা খুলে তাকে দেখে অবাক নাহলেও তার বলা কথা শুনে অবাক হই। তিনি বলে,“নাসির বাড়ি রয়েছে? তাকে বলো তার বউ এসেছে।”
’
’
চলবে,
