#প্রতিদান (২)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
“তার বউ এসেছে।”
কথাটা একজন সন্তানের জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক হ’তে পারে সেটা আমি তখন উপলব্ধি করি। আমি বিষ্ময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সে আমার পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র বোঝার চেষ্টা না করে ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। আব্বা তখন বাহিরে ছিলো। বাড়িতে হুলস্থুল কান্ড ঘটে যায়। সবাই আমাদের ঘরে আসে। আমরা একটি বাড়িতে প্রায় পাঁচ গৃহস্থ থাকে। মানে পাঁচটি ঘর রয়েছে। আমার আব্বা চাচাতো ভাইদের ঘর। তারা সবাই এসে ঘরে ভিড় জমায়। মহিলা নির্দ্বিধায় সবাইকে নিজের পরিচয় দেয়। তার নাম মাহমুদা। তার ছেলের নাম পলাশ। সে নাসির খানের বউ। এতদিন ভাড়া বাসায় ছিলো। এখন নিজ ঘরে থাকার সময় এসেছে। সেজন্য গ্রামে চলে আসছে।
এসব কথা শুনে আমার এক চাচী জানতে চায়,“আপনাদের বিয়ের বয়স কত?”
“বারো বছর।”
মহিলা বেশ স্বাভাবিক গলায় জবাব দেয়। এসব কথা মাঝের ঘরে থাকা আমার আম্মা এবং ভাই বোনরা শুনছিলো। আম্মা টিনা এবং মুন্নাকে জড়িয়ে রেখেছে। তাদের সামনের ঘরটায় আসতে দিচ্ছে না। আম্মা বোধহয় এবার মৃ ত্যুর আগেই মৃ ত্যু যন্ত্রণা উপভোগ করলেন। তার নিরব কান্নায় সেটাই প্রমাণ পায়।
আব্বাকে খবর পাঠানো হয়েছে। খবর শুনে সে দ্রুত বাসায় ফেরে। মহিলাকে দেখে খুশি হননি। বরং বিরক্তি নিয়ে বলেন,“তুমি এখানে কেন এসেছো? আমি বারণ করছিলাম না?”
“হয় স্বামী এখানে পড়ে থাকবো আর আমি ঢাকায় বসে থাকবো, এটা হয়? তাছাড়া আমার ছেলের তো একটি ভিটে লাগবে। কতকাল ভাড়া বাসায় থাকবে?”
মহিলার সহজ সরল মত। লোকজন বেশি কিছু করতে পারলো না। তারা শুধু শুনেই যায়। দুই এক কথা আব্বাকে বলছিলেন। তবে বেশিক্ষণ পারলো না। আব্বা তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন,“আপনাদের একেক জনের ঘরে রঙ তামাশা কম নাই। তাই এখানে দাঁড়িয়ে সার্কাস না দেখে নিজেদের ঘরে যান।”
আব্বার কথাটা বড্ড অপমানজনক ছিলো। সেটা সবাই বুঝতে পারে। অপমানটা নিতে না পেরে সবাই চলে যায়। তবুও আব্বার দুই ভাই থেকে যান। তারা ঠান্ডা মাথায় আব্বার সঙ্গে বসার প্রস্তাব দেন। আব্বা স্পষ্ট ভাষায় বলেন,“বিয়ে করেছি। এটা তো পাপ না। হারাম না। তাহলে সমস্যা কোথায়? আমি তো দু’টো সংসার দিব্যি চালাচ্ছি?”
আব্বা এরকম নানা বুঝ দিয়ে তার ভাইদের পাঠিয়ে দেন। এরা অবশ্য আপন ভাই নন। চাচাতো ভাই হন। আব্বার আপন ভাই নাই। বোন রয়েছে তিনটা। দু’জন মারা গিয়েছে। একজন আছে। তাকেও ইতিমধ্যে খবর পাঠানো হয়। তাতে অবশ্য বিশেষ কোন লাভ হবে না। এসে ভাইয়ের পুরুষত্বের গুনগানই গাইবেন। তবে আমি আর এসব নিতে পারলাম না। শক্ত গলায় বললাম,“আব্বা এসব কি? আপনার আরও একটা সংসার আছে? আপনি আমাদের ঠকিয়েছেন? তাও এত বছর ধরে?”
“ঠকানো হয়নি। তোমরা ছোট ছিলে তাই জানায়নি। এটা জানানো এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না, মারুফ।”
আব্বার কথা শুনে আমার ভীষণ রাগ হয়। কেমন দ্বায়সারা জবাব দিচ্ছে। অথচ আমার আম্মা ভেতরের ঘরে শেষ হয়ে যাচ্ছেন। আমি অনেকটা রাগী গলায় বললাম,“আমার আম্মার এত বছরের ভালোবাসার প্রতিদান আপনি এভাবে দিলেন আব্বা? আপনি ঠিক করেন নাই।”
“মারুফ রাগ করো না।
তোমার আম্মা এটা সম্পর্কে জানতেন।”
এটা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এতদিন আমি জানতাম লোক মুখে আমার মতোই আম্মা শুনেছেন। এটার নিশ্চয়তা নাই। কিন্তু না। এটা নয়। আম্মা সব জানতেন। আব্বা তো তাই বলছে। আব্বা আরও বলেন,“তোমার আম্মা সব মেনেও নিয়েছে। আমি এত বছর দু’টো সংসারই যথাযথ ভাবে সামলানোর চেষ্টা করেছি।”
এটা শুনে আমি কয়েক পা পিছিয়ে যাই। পরক্ষণে আম্মার কাছে ছুটে যাই। আম্মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদি। না কোন প্রশ্ন করি, না কোন শব্দ। শুধু নিরবে কেঁদে যাচ্ছি। আম্মাও তাই করছেন। আমার আম্মা এসব জানতেন। তাই তো প্রায় প্রায় তার ভেজা চোখ দেখতাম। রাতে ঘুম ভাঙলে আম্মাকে বারান্দায় বসে চোখের পানি মুছতে দেখতাম। এসব যে কতবড় যন্ত্রণার তা তো জানতাম না।
____
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। আমরা সত্যটা মেনে নেই। তবে ঐ মহিলা এই ঘরে থাকবে সেটা মানতে চাই না। কিন্তু মহিলা যাবে না। তার স্পষ্ট জবাব,“এত বছর আমি আমার হক ছেড়েছি। আর নয়। এবার আমার সন্তানের ভিটের দরকার। আমার স্থায়ী মাথা গোজার ঠাই দরকার। আমি এখান থেকে যাবো না।”
“আব্বা তাকে নিয়ে চলে যান। আমরা এসব সহ্য করতে পারছি না।”
আমি খুব রাগ নিয়ে কথাটা বলি। ওপাশে টিনা আর মুন্না কাঁদছে। চোখেমুখে ভয়, বিষ্ময়। তারা একটু একটু ঘটনা বুঝলেও সেভাবে বুঝতে পারছে না। কথা বা ভাষার মাধ্যমে তারা তাদের হৃদয়ের কথা বোঝাতে পারছে না। আমি বড় ভাই। আমি সবই বুঝি। এদিকে আব্বাও চাচ্ছেন না মহিলা এখানে থাকুক। পলাশকে নিয়ে চলে যেতে বলেন। কিন্তু তিনি যাবেন না। অতঃপর আব্বা হার স্বীকার করেন। তাকে এখানে থাকতে বলেন। এটা শুনে আমি রেগে যাই। আব্বা আমাকে শান্ত করতে বলে,“তোমার আম্মা অসুস্থ। তার দেখাশোনা করতেও তো কাউকে লাগবে। থাকুক ও। তাছাড়া তোমার আম্মা তো সব জানতো।”
“আমার আম্মার সেবা করতে কাউকে প্রয়োজন নেই। আর হ্যাঁ আম্মা জানতো। কিন্তু কখনো ঐ মানুষটাকে দেখেনি। আজ তার জীবনের অন্তিম সময়ে এসে ঐ মহিলা না আসলে খুব ক্ষতি হতো না? ম রার আগে অন্তত এতটুকু সুখ নিয়ে ম রতো, তার দু’চোখ তার সতীনকে দেখেনি। কানে হয়তো শুনেছে। কখনো হয়তো ভেবেছে, এটা মিথ্যে। কানে শোনা কথা সত্য হয় না। এটা ভেবেই নাহয় ম রতো। এতটুকু সুখ তো আমার আম্মা ডিজার্ভ করে। আপনার সংসারে এতটা বছর এত লাঞ্ছণা বঞ্চনা, বেঈমানীর পরও টিকে থাকার প্রতিদান হিসাবেও তো এমনটা তার পাওয়া উচিত নয়। তাও দিলেন এমন ভয়ংকর প্রতিদান। এখন আবার তার যন্ত্রণা হিসাবে তাকে সারাদিন চোখের সামনে রাখতে চাচ্ছেন। বাহ্! কি চমৎকার! কত সুন্দর!”
আমার রাগান্বিত গলায় বলা কথাগুলো শুনে আব্বা কিছুটা দমে যায়। সে কোন জবাব দেয় না। এদিকে মহিলা এসব শুনে বলে,“তোমাদের বাপ ছেলের নাটক রাখো। এটা আমার অধিকার। আমি আমার স্বামীর ঘরে থাকবো। থাকবোই। কোন পরিস্থিতিতে আমি আমার এই সিদ্ধান্ত বদলাবো না।”
এটা বলে মহিলা তার ছেলের হাত ধরে বারান্দার ঘরে চলে যায়। সেই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। আমি এদিকে আব্বার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে যাই। এরই মাঝে মুন্না ‘আম্মা’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। আমরা থেমে যাই। আমি ছুটে আম্মার কাছে যাই। আম্মা সেদিন রাতে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যায়। আমরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো এটা, আম্মা সেদিন রাতে মা রা যায়।
আম্মার ক্যান্সার ছিলো। তার ক্যান্সারে ম রার কথা ছিলো। কিন্তু না। ভাগ্য তাকে হার্ট অ্যাটাকে মৃ ত্যু ছিলো। হাসপাতালে নেওয়ার পরই আম্মার মৃ ত্যু হয়। ডাক্তার চিকিৎসা করার সুযোগ পায় না। আম্মা চলে যায়। তার সাজানো গোছানো সংসারের ধ্বংস দেখে পৃথিবীর মায়া ছাড়ে। যাবার সময় গাড়িতে শুধু এতটুকু বলতে পারছিলো,“তোর ভাই বোনকে দেখে রাখিস বাবা।”
বহু কষ্টে কথাটা বলছিলো। আম্মা আরও কিছু বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু পারেনি। তার ভাগ্য তাকে সেই সময় দেয়নি। সেই সুযোগ দেয়নি। আম্মার মৃ ত্যুতে আব্বাও কাঁদলো। তবে তার কান্না আমার কানে বিঁষের মতো বিধছিলো। আমার আব্বার কান্না লোক দেখানো মনে হয়েছিলো। শুধু আমার নয়। অনেকের এমন মনে হয়েছে। আম্মার মাথার পাশে বসে নিরবে কাঁদছিলাম। সেই সময়ে আশেপাশে মানুষের কথা কানে এলো। তারা বলছে,“বউকে ঠকিয়ে এত বছর আর একটা বিয়ে করে সংসার করেছে৷ এখন এই বউয়ের জন্য কত কষ্ট পাচ্ছে?কাঁদছে দেখো? যতসব।”
“লোক দেখানো কান্না।
এত ভালোবাসলে অসুস্থ মহিলা জানার পর ঐ বউকে বাসায় নিয়ে আসতে পারতো? ম রছে তো ঐ বউ আসার শোকেই।”
তাদের কথা আমার কথা। আমাদের কথা। এটাই তো সত্যি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেভাবেই ভাবি না কেন? এটাই তো সত্যি। আমি আর এসব ভাবতে পারছিলাম না। অন্যদিকে টিনা এবং মুন্না খুব কাঁদছে। তাদের চাচীরা সামলাচ্ছে। কিন্তু পারছে না। মামী, ফুপুও এসেছে দেখি? লাশ দেখার জন্য আসলো? বাহ্! অথচ হাসপাতাল যাওয়ার জন্য এদের পাইনা। এখন এসেছে লাশ বিদায় দিতে। এসব মানুষকে অনেককিছু বলতে ইচ্ছে করছিলো। তবে মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না। আজ মুখটা কেমন বন্ধ হয়ে রয়েছে। কন্ঠ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। হাত, পা কেমন অবশ হয়ে রয়েছে। ইচ্ছে করছে আব্বাকে ধাক্কা মেরে আম্মার পাশ দিয়ে সরিয়ে দেই। কিন্তু পারছি না। হাত, পা নাড়াতে পারছি না। তবে খুব ইচ্ছে করছে। ভীষণ ইচ্ছে করছে।
’
’
চলবে,
