পর্ব : ০৭
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখিকা: #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা)
“বলো মা কবুল”
“….!”
” বলো… কবুল”
“মেহুল কবুল বল তারাতারি ”
” কিরে মেহুল বলছিস না কেন?”
“………! ”
” কবুল..”
আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।
—-
মেহুল….এই মেহুল?
মেহুল দরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠলো। তার কাজিন সারা তাকে ডাকছিল।
” এটা কোন সময়ে ঘুমাচ্ছিস তুই? একটু পর বিয়ে আর মহারানীর ঘুমই শেষ হয় না এখনও। ”
কাল সারারাত ঘুমাতে পারে নি সে। তাই তিনটার দিকে ঘর থেকে সবাই আস্তে আস্তে বের হয়ে গেলে তারও চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল। মাত্র দেখা জিনিস টা যে সপ্ন ছিল সেটা ভেবে মেহুল একটু শ্বাস ছাড়লো। তারপর আবার ভাবলো একটু পর তো এটাই হবে তার সাথে।
” সরি রে চোখ টা একটু লেগে গিয়েছিল। কয়টা বাজে রে সারা? ”
” চার টা বাজবে প্রায়। ”
” কিহ্! বরযাত্রীর খাওয়া ও কি শেষ? ”
” বলে কি মেয়ে। আরে এখন অব্দি তো বরযাত্রীই আসলো না৷ ”
” মানে? এখনও আসে নি মানে?”
” হ্যা তাদের তো তিন টার আগেই আসার কথা ছিল কিন্তু চার টা বেজে গেছে এখনও আসছে না। ওখানে ফোন করা হচ্ছে ফোনও তুলছে না তারা । তাইতো খালা-খালু সহ সবাই টেনশন করতাছে। ”
এবার মেহুলেরও চিন্তা হতে লাগলো। গ্রামের বিয়ে তো তারাতারি হয়। বরযাত্রী দুপুরেই চলে আসে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বউ নিয়ে ফিরে যায়। আর তার বেলায় এমন দেরি হচ্ছে কেন! দিনও এখন ছোট একটু পরই তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
—
মাগরিবের পরপর যখন মেহুলের বাবা চিন্তায় অবস্থা খারাপ হয়ে বর অর্থাৎ সোহেলদের বাড়িতে কি হয়েছে জানতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলো তখনই খবর এলো মেহুল বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছে। ছেলে মেহুলকে বিয়ে করবে না বলেই তারা আসেনি। ছেলের চাচা যিনি এই বিয়ের প্রধান অভিভাবক + ঘটক দুইটাই ছিলেন ওনিই কল দিয়ে এ কথা জানালেন। মেহুলের বাবা কারণ জানতে চাইলে সে জানায় –
” কারণ জানতে চায়েন না মিয়া তাইলে পরে আপনেই লজ্জা পাইবেন।”
” আমি কেন লজ্জা পামু আপনি কারণ বলেন”
মেহুলের বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছে এটা শুনার পরও মেহুলের বাবা যথেষ্ট শান্ত থেকে কারণ টা জানতে চাইলেন।
” আপনার মেয়ের তো চরিত্র ভালা না। ঢাকায় নাকি তার প্রেমিক আছে ওই প্রেমিকে সোহেলের নাম্বার জোগার কইরা তাগোর ছবি পাঠাইছে। ছিঃ ছিঃ কি ছবি। মাইয়ারে ঢাকায় কি এইসব করবার লাইগা পাঠাইছিলেন নাকি? আপনার মাইয়ার কি একটায় হয় না! প্রেমিক রাইখা আবার আমার ভাতিজা রে বিয়া করতে লইছিল।”
ওপাশ থেকে ফোনে ওই লোক আরো অনেক কিছু বললো মেহুলের বাবা কে। এসব বিষয় রকেটের গতিতে ছরিয়ে গেলো। আত্মীয়রা সবাই মেহুলকে নিয়ে সমালোচনা করতে লাগলো৷ তার ছোট খালা তো বলেই বসলেন সেই প্রেমিক নাবিল কি না! নাবিলের ছেলেকে নিয়ে মেহুল যে সব করে সেটা দেখে নাকি নাবিলকেই সন্দেহ হয় ওনার। সবার এতো হাঙ্গামায় রুমা বেগম একদম ভেঙে পরলেন। সাবিহা জাহান ওনাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন।
মেহুল যখন এসব শুনলো তখন সে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসলো। রুমা বেগম কে খুঁজে সে ওনার সামনে গিয়ে বসলো
” মা ও মা… কি শুনছি এসব মা? সবাই কি সব বলছে? ”
রুমা বেগম কোন টু শব্দ করলেন না । মেহুল আরো বলতে লাগলো-
” মা বিশ্বাস করো এসব মিথ্যা মা৷ আমার এখন কোন প্রেমিক নেই। মা…. মা তুমি তো আমাকে অবিশ্বাস করো না প্লিজ। ”
মেহুল কান্না করতে লাগলো। সে বুঝতে পারছে না কিভাবে কি হয়ে গেলো। রুমা বেগম এবার কথা বললেন-
” বার বার তোরে জিজ্ঞাসা করছি তোর কোন পছন্দ থাকলে বল কিন্তু তুই কিছু কস নাই। তোর নাকি কেউ নাই তাইলে আজকে এই সর্বনাশ কেমনে হইলো মেহুল…..?”
” মা সত্যি আমার কেউ নাই ”
মেহুলের মামি বললো-
“তুই কইলেই হইবো নাকি কেউ নাই পোলার মেবাইলে তোর প্রেমিকে তোগোর ছবি পাঠাইছে। এই দেখ তোর কেউ না থাকলে এই পোলা কেডা?”
মেহুলের মামি ছবি দেখালো যা ছেলের চাচা মেহুলের বাবার মোবাইলে মাত্রই পাঠিয়েছে।
মেহুল তাকিয়ে দেখলো ছবিতে সে আর রাফি। কিহ্ রাফি! রাফি এসব করেছে?
” মা সত্যি বলছি আমি এটা তো আগের অনেক। মা এটা রাফি তোমাকে আমি একবার বলেছিলাম না আমাকে একজন পছন্দ করে এটাই ও। ওর সাথে আমার সম্পর্ক ছিল ঠিক আছে কিন্তু অনেক আগেই ব্রেকআপ হয়ে গেছে আমাদের। এখন আমাদের মধ্যে কিচ্ছু নেই মা সে জন্যই তো তোমাদের কথায় বিয়েতে রাজি হয়েছি আমি। এর বেশি আমি সত্যিই কিছু জানি না মা।”
—
মেহুলের দোষ না থাকলেও বিয়ে তো ভেঙ্গে গিয়েছেই। একবার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে মানে তার আবার বিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনিতেই ওর বয়স বেশি তার উপর বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া মেয়েকে কে করতে চাইবে বিয়ে। এমব কারণে বিয়ে ভাঙ্গলো যে এখন মেহুলের চরিত্র নিয়ে মানুষ কাঁদা ছিটাবে।
রাফি ওই দিনের থাপ্পড়ের বদলা এতো জঘন্য ভাবে নিবে এটা মেহুল কোনদিনও ভাবতে পারে নি। ওই দিন থাপ্পড় দেওয়ার পর রাফি আর ওর মু-লাগতে আসে নি তাই ও ভেবেছিল এ অধ্যায় ওখানেই শেষ হয়ে গিয়েছে কিন্তু রাফি তো ছিল সুযোগের অপেক্ষায়। বিয়ের কথা মেহুল ওর ফ্রেন্ড সিনহাকে বলেছিল৷ মুলত সে সিনহা কে দাওয়াত দিয়েছিল বিয়েতে আসার জন্য কিন্তু এতদূর ও আসতে পারবে না বলে জানায়। মেহুলের বিয়ের কথা শুনে প্রথমে সিনহা প্রচুর খুশি হয়েছিল। খুশির ঠেলায় ও ওদের ক্লাস গ্রুপে এ কথাটা বলে দেয়। তারপরে মেহুলকে গ্রুপের অনেকে শুভেচ্ছা জানায়। মেহুলও এতে খুশি হয়েছিল। হয়তো তাদের ক্লাসের কারো থেকেই রাফি জানতে পেরেছিল মেহুলের বিয়ের কথা৷ সে তার এতো বড় সর্বনাশ টা কিভাবে করতে পারলো!
মেহুল কাল রাত অব্দি চেয়েছিলো বিয়েটা যদি কোন ভাবে না হতো কিন্তু এখন যখন সত্যি সত্যি ভেঙে গিয়েছে তখন মেহুল এটা সহ্য করতে পারছে না। বাবা- মা’র এতো অপমান হচ্ছে তার জন্য এটা ভেবেই কান্নায় ভেঙ্গে পরছে মেয়েটা।
মেহুল তার ফোন টা হাতে নিলো রাফির সাথে কথা বলবে ভেবে তখনই দেখলো রাফির নাম্বার থেকে আরো এক ঘন্টা আগেই একটা মেসেজ এসেছে।
” দ্বিতীয় সারপ্রাইজ টা কেমন লাগলো জান? আমাকে ওই দিন আপমান করেই তুমি শান্ত হও নি বরং থাপ্পড় ও মেরেছো৷ ভেবেছিলা আমি সব ভুলে যাবো এতো সহজে? রাফি কোন কিছু সহজে ভুলে না জান এটা ও কি বুঝতে পারো নি এতো বছর রিলেশনে থেকে? আজ তোমাকে যেই সারপ্রাইজ দিলাম এটা দিতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে সেই কষ্টের ফল হিসেবে তুমি সারাজীবন এটা মনে রাখবে৷ ওপস্ আজ না তোমার বাসর রাত! হ্যাপি বাসর। ”
—-
মেহুলের মা-বাবার অবস্থা খারাপ, মেহুলের বাবা বারান্দায় বসে আছেন চুপচাপ আর রুমা বেগমের চিন্তা আর কান্না করার কারণে প্রেসার লো হয়ে গেছে। মেয়েটার জীবন শেষ এটা ভেবেই তিনি একটু পরপর ডুকরে কেঁদে উঠছেন। একটা মাত্র আদরের মেয়ে তাঁদের। ওনারা যখন আশার সব আলো বন্ধ ভেবেছেন তখনই তাদের দিকে হাত বাড়ালেন সাবিহা জাহান। তিনি রুমা বেগম কে বললেন-
” ভাবি আপনি এভাবে ভেঙ্গে পড়লে কীভাবে হবে এখানে মেহুলের তো কোনো দোষ নেই। ”
” কেমনে নিজেরে সামলামু আপা একটা মাত্র মাইয়া আমার। ওর দোষ না থাকলেও তো দুনিয়া ওরেই দোষবো। আজ বিয়া না হইলে মাইয়া টার আর জীবনেও বিয়া হইবো না। ”
সাবিহা উঠে গেলেন ঘর থেকে। বাইরে গিয়ে মেহুলের বাবা কে ঘরে ডেকে আনলেন। তারপর দু’জনের সামনে বললেন-
” ভাবি-ভাই যদি আমি আপনাদের একটা প্রস্তাব দেই আপনারা কি সে বিষয়ে একটু ভেবে দেখবেন?”
সাবিহার কথায় ওনার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন রুমা।
“কিসের প্রস্তাব আপা?”
” আপনারা কি ভাববেন জানি না কিন্তু মেহুলকে যদি আমি আমার ছেলের জন্য নিতে চাই আপনারা কি রাজি হবেন? ”
রুমা বেগম এমন প্রস্তাবের জন্য রাজি ছিলো না কখনোই । তিনি নাবিলকে অনেক পছন্দ করেন কিন্তু নাবিল আগে বিবাহিত ছিলো। যদি প্রস্তাব টা ওনি আগে দিতেন তাহলে তাদের আদরের নাবালিকা মেয়ে কে বিবাহিত ছেলের সাথে বিয়ে দিতে ওনি আগে কখনো রাজি হতেন না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন । রুমা বেগম মেহুলের বাবার দিকে তাকালের৷ কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেহুলের বাবা সাবিহা কে বললেন-
” আপনার ছেলে কি এ বিষয়ে রাজি?”
ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় সাবিহা বললেন-
” নাবিলের কোন সমস্যা হবে না। আমি যা বলি আমার ছেলে তাতেই রাজি। ”
” তবুও আপনে নাবিলের সাথে কথা বলুন আগে নাবিল রাজি হইলে আমি কাজি ডাকমু৷ ”
সাবিহা খুশি হয়ে নাবিলকে খুজতে চলে গেলেন। ওনি যেতেই রুমা বললেন –
” আপনি বিবাহিত ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিবেন মেহুলের বাবা?”
” তাইলে কি করমু তুমি সমাধান দেও। আজ মাইয়াটার বিয়া না হইলে জীবনে হইবো আর? আমি বাজারে যাইতে পারমু লজ্জায়! তুমি, মাহিন বের হইতে পারবা বাড়ি থাইকা ? ”
এবার চুপ হয়ে গেলেন রুমা বেগম। আসলেই তো আজ বিয়ে না হলে তো লজ্জায় তারা আর বের হতেই পারবে না বাড়ি থেকে। নাবিলও ছেলে হিসেবে খারাপ না আর সাবিহাও তো অনেক ভালো মানুষ।
—
সাবিহা জাহান যখন মেহুলের মা-বাবাকে প্রস্তাব দিচ্ছিলো তখন বাইরে থেকে তার খালা,মামি রা আড়ি পেতে ছিল কথা শোনার জন্য। তাই এ কথাটাও দ্রুত গতিতে পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে গেলো।
সারা দৌড়ে মেহুলের ঘরে গিয়ে তাকে এ বিষয়ে সব জানালো। মেহুল অবাক হয়ে তাকালো সাবিহার প্রস্তাবের কথা শুনে৷ নাবিলের জন্য তাকে চাচ্ছেন সাবিহা৷ মেহুল কান্না থামিয়ে এবার চিন্তা করতে লাগলো কিছু একটা।
সাবিহা যখন মেহুলকে বিয়ে করার কথা নাবিলকে বললো তখন নাবিলের মনে হচ্ছিলো সে সপ্ন দেখছে। মেহুলের বিয়ে ভাঙ্গা থেকে শুরু করে সব কিছু ই নাবিল দেখেছে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল সে। মেহুলের ভেঙে পরা তার পক্ষে দেখা সম্ভব নয় বলে সে ঘরে যায় নি। দোয়া করছিল মেহুল যেন ঠিক থাকে, সে যেন নিজের কোন ক্ষতি না করে বসে৷ সাবিহার কথায় তার কাছে সব সপ্ন সপ্নই লাগছে।
” মা মেহুল রাজি…! ”
” হ্যা ও রাজি তুই রাজি কিনা বল বাবা তাহলেই কাজি নিয়ে আসা হবে। ”
” মা ওনি রাজি থাকলে আমারও কোন সমস্যা নেই কিন্তু…! ”
” কিন্তু কি?”
” কিন্তু বিয়ের আগে আমি ওনার সাথে একটু কথা বলতে চাই।”
—-
রুমা বেগম যখন মেহুলের ঘরে আসলেন মেহুল তখন বিছানায় বসে ছিল। ওনি মেহুলকে কিছু বলবেন তার আগেই মেহুল বললো-
” আমার কোন সমস্যা নেই মা। ”
” মেহুল আরেকবার ভেবে দেখ মা৷ নাবিলকে বিয়ে করতে আমরা তোকে জোর করছি না। তোর মন মানলেই রাজি হোস। ‘
” আমি রাজি ওনাকে বিয়ে করতে । ”
***
মেহুল জানালা ধরে দাড়িয়ে আছে আর তার পিছনে নাবিল এসে দাঁড়ালো । বাইরে মানুষের কথা শুনা গেলেও মেহুলের ঘরের ভিতরে চারিদিকে নিস্তব্ধতা । রাত বাজে প্রায় আট টা। নাবিল মেহুলের সাথে কথা বলতে এসেছে। তার মনে হচ্ছে মেহুল পরিস্থিতির শিকার হয়ে বাদ্য হয়ে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে কিন্তু সে এটা চায় না। আস্তে করে সে ডাকলো-
” মেহুল! ”
” বলুন…. শুনছি ”
“মেহুল আপনার উপর কোনো জোর নেই। আমাকে বিয়ে করতেই হবে এমনও কোন কথা নেই আপনার। আপনি ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন। আমি আগে বিবাহিত ছিলাম, একটা চার বছরের ছেলেও আছে আমার তাই ভালো করে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন। এটা আপনার জন্য সারাজীবনের ব্যাপার। ”
চলবে….?
