#ব্যাকবেঞ্চার (৬)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
সময় পেরিয়ে যায় বহু বছর। ফারিশ বড় হয়। তার ছোটবেলার মতো বড়বেলাও খারাপ কাটে। না শুরুতে নয়। ঘরের মধ্যে এমন কথা শোনা, পক্ষ পাতিত্ব। তার থেকে তার বাবা-মা ভাই বোনকে বেশি ভালোবাসছে। তাদের চাওয়ার গুরুত্ব দিচ্ছে, সব তো ছিলোই। এসবের সঙ্গে ফারিশ অভ্যস্ত হয়ে যায়।
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে শান্ত হয়ে যায়। যায় চুপ হয়ে। সবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে নেয়। একসাথে থেকেও একা থাকা হয়। অন্যকে খুশি করতে আর কিছুই করে না ফারিশ। উচ্চ মাধ্যমিকের পর পড়ালেখাটাও ছেড়ে দেয়। তার এটা নিয়ে কোন গতি নাই। তাই ফারিশ সেটা ছেড়ে দেয়। জীবনের একটা লক্ষ্য ঠিক করতে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তার বাবার মতে, তার দ্বারা এটা হবে না। তার মায়ও ভরসা পায় না। সেজন্য টাকা দেয় না৷ তাই ফারিশের ব্যবসা করা হয় না। এখানে তার বড়বেলাটাও শেষ হয়ে যায়।
তার ব্যবসা করার উদ্দেশ্য ছিলো, একটা ভালো ক্যারিয়ার গড়ার। যেহেতু পড়ালেখা হয়নি, তাই ভালো চাকরি পাবে না। যদি ব্যবসা করে কিছু হতো। সত্যি বলতে সে তার বাবার ব্যবসায় বসতে চাচ্ছিলো। তবে সরাসরি সেটা বলেনি।যদিও তার বাবা বুঝেছে। তাই টাকাও দিবে না, সঙ্গে তার ব্যবসায় ফারিশের কোন অধিকার নাই জানিয়ে দেয়। ব্যবসায় ফারাজ বসবে। ভবিষ্যতে তার সম্পদের অধিকাংশ ফারাজ এবং ফাইজা পাবে। তার বোনটাও বেশ মেধাবী। তাছাড়া একটি মেয়ে। তাই তার প্রতিও তার বাবার ভালোবাসা ভীষণ। অন্যদিকে মায়ও ভরসা পাচ্ছে না। তাই সেও টাকা দেয় না। আর এজন্য ফারিশের বাঁচার আশাটা ম রে যায়। বড় হতে হতে তার বেঁচে থাকার আশা হিসাবে ধরা দিয়েছিলো জয়া নামে একটি মেয়ে।
‘জয়া’
নামটা উচ্চরণ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে যায় ফারিশ। এটা তার প্রথম প্রেম। তার প্রথম অনুভূতি। না ফারিশ নয়। জয়াই এসেছিলো ফারিশের কাছে। নিজ থেকে। ফারিশ উচ্চ মাধ্যমিকে যে কলেজে ভর্তি হয় সেখানেই জয়ার সঙ্গে পরিচয়। জয়া খুব ভালো স্টুডেন্ট। খুব অল্প দিনে সবার মুখে তার নামটা চলে আসে। ফারিশের অবশ্য এসবে আগ্রহ ছিলো না৷ সে সবার কাছ থেকেই দূরত্ব রাখে। কারো সঙ্গেই তেমন মিশে না। ছোটবেলার মানসিক ট্রমা থেকে এটা হয়েছে। তবে একদিন জয়া ফারিশের কাছে আসে। ফারিশ খুব দূর্বল স্টুডেন্ট। পড়ালেখায় মনোযোগ নাই। কোনরকম আসে যায়। কিছু পড়ে না। তাই জয়া আসে। সে লক্ষ্য করেছে, ফারিশ যেমন কারো সঙ্গে মিশে না। সেভাবে ফারিশের সঙ্গেও কেউ মিশে না।
জয়া মনের দিক দিয়ে খুব ভালো মেয়ে। তাই সে এসেছে ফারিশের সঙ্গে মিশতে। প্রথম দিকে ফারিশ অবশ্য তাকে এড়িয়ে যেতো। মাঝে মাঝে রাগ করেই বলতো,“মেধাবী স্টুডেন্ট তাই এসেছো আমাকে নিয়ে মজা নিতে?”
ফারিশের এই এক বাক্যে জয়া বুঝে যায় ফারিশকে এই বিষয়টা নিয়ে খুব কথা শুনতে হয়েছে। তাই জয়া তার সাধ্য অনুযায়ী বোঝায়, সবার মেধা এক নয়। এটা নিয়ে উপহাসের কিছু নেই। তুমি হয়তো অন্যদিকে ভালো। এসব টুকটাক কথা দিয়ে তাদের মাঝে গল্প শুরু হয়। একটা সময়ে তারা দু’জন খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায়।
ফারিশের এক সময় মনে হয়, ছোটবেলায় জয়ার মতো কেউ যদি থাকতো। তাকে এভাবে বোঝার চেষ্টা করতো। তবে আজ তার জীবন অন্যরকম হ’তে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। তবে এখনো ফারিশ খুব খুশি। তার এই খুশিটা আরও দ্বিগুন হয় যখন সে অনুভব করে ধীরে ধীরে সে জয়ার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। এটা স্বাভাবিক। দু’জন বন্ধুর মতো মিশছে, অনুভূতি তো জন্মাবে। ফারিশেরও জন্মে যায়। তবে সে তার এই অনুভূতি জয়াকে বলতে পারে না।
তার আগে তার কানে খবর আসে, জয়ার পরিবার তার বিয়ের জন্য পাত্র দেখছে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে হয়তো দিয়ে দিবে বিয়ে। সেজন্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত দেখাতে ফারিশ ব্যবসায় বসতে চাচ্ছিলো। কিন্তু তার বাবা তা দেয়নি। এভাবে বাবা, মায়ের সঙ্গে দ্বন্দ নিয়েই মাধ্যমিকটা পার হয়। ব্যবসা না হওয়ায় ফারিশ ছোটখাটো এক চাকরি যোগাঢ় করে নেয়। এটা শুনে তার বাবা আরও রেগে যায়। তার ছেলে এমন নিম্ন মানের জব করবে? এটা নিয়ে বাবা তাকে আবার কথা শোনায়। এবার অবশ্য ফারিশও মুখ খোলে। সে বলে,“আমাকে তো তুমি ছেলে হিসাবেই মানো না। তাছাড়া ব্যবসায় বসতে দাওনি। কিছু করতে না দিলে আমি করবোটা কি? আমার তো কিছু করতে হবে।”
“কিছু করতে হবে। এটা যদি ছোটবেলায় বুঝতে তাহলে তো হয়েই যেতো। আজ এই দিন আসতো না। আর হ্যাঁ তোমাকে আমি সন্তান হিসাবে মানি না। কিন্তু তোমার নামের সঙ্গে তাও আমার নাম জড়িয়ে আছে। আমার দূর্ভাগ্য যে জড়িয়ে আছে। সেজন্য আমি চাইলেও তোমাকে এমন ফালতু কাজ করতে দিতে পারি না।”
ফারিশ আরও কিছু বলতে চায়। কিন্তু তার বাবা বলার সুযোগ দেয় না। সে প্রচন্ড বকাবকি করে তাকে বাড়ি ছেড়ে যা খুশি করতে বলে। তার বাড়িতে থেকে এসব হবে না।
____
ফারিশ সংসারের ঝামেলা এড়িয়ে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় জয়াকে মনের কথা জানাবে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ, এখন জয়ার বাবা মা বিয়ের তোড়জোড় ভালোভাবে করছে। জয়া মনের মতো পাত্র না পাওয়ায় বিয়ের কথা আগাচ্ছে না। তবে খুব শীঘ্রই এগিয়ে যাবে। সেজন্য ফারিশ সিদ্ধান্ত নেয় সে তার মনের কথা জানাবে। তাই জয়াকে দেখা করার জন্য একটি জায়গায় ডাকে। জয়াও আসে। জয়া নির্দিষ্ট স্থানে এসে ফারিশকে দেখতে পায়। শান্ত গলায় বলে,“কি বলবে বলো? এত জরুরি ডাক যে?”
“আচ্ছা জয়া, তোমার কোন পাত্র পছন্দ হচ্ছে না কেন? সবাইকে কেন রিজেক্ট করছো?”
ফারিশ কথাটি বলে জবাব শোনার জন্য আগ্রহী হয়ে যায়। ফারিশের ধারণা জয়াও তাকে পছন্দ করে। সেজন্য হয়তো সবাইকে কোন না কোন কারণ দেখিয়ে রিজেক্ট করছে। তবে না। জয়া সেরকম কিছু বলে না। সে বলে,“তাদের সঙ্গে আমার চাহিদা মিলছে না সেজন্য।”
“তোমার কিরকম ছেলে পছন্দ? তোমার কোন ছেলে পছন্দ রয়েছে?”
ফারিশের এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জয়া জানতে চায়,“তুমি হঠাৎ এসব জানতে চাচ্ছো কেন?”
“দরকার আছে।”
“কি দরকার?”
জয়ার প্রশ্নে এবার ফারিশ সরাসরি জবাব দেয় না। সে আর প্যাঁচায় না। কারণ কেউ একজন বলেছে, ভালোবাসার কথা সবসময় দ্রুত বলতে হয়। এটা না করলে, পরে আফসোস করতে হয়। সে তা চায় না। তাই বলে,“আমি তোমাকে পছন্দ করি জয়া। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আমি কি তোমার পছন্দের পাত্র হতে পারি?”
জয়া অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে ফারিশের মুখে এমন কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলো না। ফারিশ আবারও একই প্রশ্ন করে। জয়া নিজেকে সামলে বলে,“আমি তোমার মুখে এমন কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, ফারিশ। আমি এসব কখনো ভাবিনি।”
“ভাবোনি তবে এখন ভাবো। আমি কি খুব খারাপ ছেলে? আমাকে পছন্দ করা যায় না?”
ফারিশ উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চায়। জয়া শান্ত গলায় বলে,“আমি পরে তোমাকে জবাবটা জানাই ফারিশ। আমাকে একটু ভাবতে দাও।”
“আচ্ছা। কোন সমস্যা নাই।
তুমি যতটা খুশি ভাবতে পারো। সময় নিতে পারো।”
ফারিশ হাসিমুখে বলে। জয়া মাথা নাড়ায়। অতঃপর দু’জন টুকটাক কথা বলে। দু’জন দু’জনার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। জয়া যেহেতু সময় নিয়েছে সেহেতু পজিটিভ কিছু, এটা আশা করছিলো ফারিশ।
অন্যদিকে জয়া ভাবছে তার সঙ্গে ফারিশের কিভাবে আলাপ হলো? ফারিশ সবসময় ক্লাসে পিছনের সিটে বসে শুয়ে থাকতো। কারো সাথে কথা বলতো না। শিক্ষক তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে জবাব দিতো না। কখনো কখনো মন চাইলে জবাব দিতো। তাকে দেখে জয়ার মনে হতো ছেলেটার মধ্যে কিছু একটা সমস্যা রয়েছে। নয়তো এমন আচরণ করবে কেন? তার সবাইকে এড়িয়ে চলা দেখেই জয়া নিজ থেকে তার সাথে কথা বলে। মনের মধ্যে কৌতূহল জন্ম নিয়েছিলো। সেই কৌতূহল থেকেই পরিচিত হওয়া। এক সময় বন্ধু হওয়া। ফারিশের মুখে তার ছোটবেলা শুনে জয়ার খুব খারাপ লাগে। ফারিশ মানসিকভাবে খুব ভেঙে রয়েছে, তার মনের মধ্যে সবকিছু নিয়ে বাজে প্রভাব রয়েছে। সেটা কাটাতে জয়াই সবসময় তাকে মোটিভেট করতো। তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলো। আর সেখান থেকে ফারিশ তার প্রতি অন্যরকম কিছু অনুভব করে। জয়া আজ এটা বুঝতে পেরে কিছুটা অবাক হয়। সে ফারিশের সঙ্গে তেমন কোন আচরণ করেনি, যাতে মনে হয় সে ফারিশের প্রতি দূর্বল। তবে ফারিশ তাকে পছন্দ করলো কেন? জয়া এটাও ভাবে, সে ফারিশকে পছন্দ করে কি-না। হয়তো করে। তবুও জয়া বেশ সময় নিয়ে ভাবে। অনেকটা সময় ভাবার পর জয়া ফারিশকে ফোন দিয়ে বলে,“আমি তোমাকে পছন্দ করি না ফারিশ। আমাদের বন্ধুত্বটা এখানে শেষ করাই ভালো।”
’
’
চলবে,
