#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_১৩ (অন্তিম পর্ব)
এরপর কেটে যায় কয়েকটা বছর।
সময় মানুষের শরীর থেকে শক্তি নেয়, আর মনে ফিরিয়ে আনে শৈশব। সামিরা বেগমও আর আগের মানুষটি নেই। বয়সের ভারে তিনি ধীরে ধীরে যেনো বাচ্চা হয়ে গেছেন। যে বুড়ো মানুষ, সে আবার বাচ্চার মতোই আচরণ করে, কারো কথা শোনে না, নিজের মনটাই হয়ে ওঠে তার দুনিয়া।
সারাদিন তিনি চিল্লাচিল্লি করেন। কখনো কারণ থাকে, কখনো থাকে না। মেহরুন যখন তার ছেলে মাহিদকে বকাঝকা করে, সামিরা বেগম তখন ঠিক সেই কথাগুলোই নকল করে চেঁচাতে থাকেন।
-চুপ কর! এই ছেলে একটা কথাও শোনে না!
কাকে বলছেন, কেন বলছেন সেটা তিনি নিজেও জানেন না।
মেহরুন বিরক্ত হয়,
-আবার শুরু হলো!
কিন্তু সামিরা বেগম থামেন না। বুড়ো গলায়, ভাঙা স্বরে, শিশুসুলভ জেদে কথা বলতে থাকেন।
সবচেয়ে কষ্টের দৃশ্যটা দেখা যায় খাওয়ার সময়। মাহিদের জন্য প্লেটে খাবার দেওয়া হলে, সামিরা বেগম চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকেন। সুযোগ বুঝে তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে নাতির খাবার থেকে তুলে নেন। কখনো মাহিদ কাঁদে,
-দাদী আমার ভাত!
সামিরা বেগম তখন অপরাধীর মতো চমকে ওঠেন, আবার পরক্ষণেই শিশুর মতো জেদ করেন,
-আমি ক্ষুধার্ত, আমিও খাবো!
কখনো আবার রান্নাঘরে ঢুকে পড়েন চুপিচুপি। কেউ দেখছে কি না দেখে নিয়ে চুলোর পাশে রাখা ভাতের হাঁড়িতে হাত ঢোকান। এক টুকরো রুটি, একটু চিনি, কখনো কাঁচা চালও মুখে পুরে দেন।
এই সব বাচ্চামিতে মেহরুনের ধৈর্য ভেঙে যায়।
-এই বয়সে এসব কী! লজ্জা নেই?
কথাগুলো সামিরা বেগমের মাথায় ঢোকে না। তিনি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন, চোখে জল জমে ওঠে, কিন্তু কান্না আসে না।
যে মানুষ একদিন সংসারের ভার বইেছিলেন, আজ তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন সংসারের বোঝা।
ঘরের এক কোণে বসে থাকা এই বুড়ো মানুষটার ভেতরে তখন আর কোনো অভিমান নেই, কোনো হিসেব নেই, শুধু একরাশ শিশুসুলভ ক্ষুধা আর অসহায়তা।
সময় বড় নির্মম। একদিন যে মা সব আগলে রেখেছিল, একদিন তাকেই আগলে রাখার কেউ থাকে না।
সামিরা বেগমকে ঘিরে মেহরুন আর রাব্বির ঝগড়াটা যেনো এখন নিত্যদিনের রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকদিন নয়, অনেকদিন ধরেই এই ঘরে শান্তি নেই। সামিরা বেগমের বদলে যাওয়া ব্যবহার, তার শিশুসুলভ জেদ, অকারণ চিৎকার সব মিলিয়ে মেহরুনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে বহু আগেই।
একদিন ঝগড়ার আগুনটা আর চাপা থাকলো না। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মেহরুন বিষ মাখা গলায় বলে উঠলো,
-তোমার বোন ঠিকই বুঝেছে নিজের সংসারের কথা, শুধু তুমিই বুঝো না! আমাকে যে এত জ্ঞান দাও, তোমার বোন কী করেছে? সেও তো তার বৃদ্ধ শাশুড়ীকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রেখেছিল। তখন তো দোষ মনে হয়নি! সব কিছুর একটা সীমা থাকা উচিত, রাব্বি। তোমার মা সেই সীমা বহু আগেই পেরিয়ে গেছে।
রাব্বি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর বিরক্তির সঙ্গে বললো,
-আর কত সহ্য করবো বলো? সারাদিন চিৎকার, খাবার চুরি, বাচ্চাদের ঝামেলা, আমিও মানুষ মা।
এই ‘আমিও মানুষ’ কথাটার ভার সবচেয়ে বেশি গিয়ে পড়লো সামিরা বেগমের বুকে।
তিনি সব শুনছিলেন। কান যে বধির হয়নি, সেটা তার চোখের জলই বলে দিচ্ছিল।
এরপর থেকে রাব্বিও আর আগের মতো নরম থাকে না। মাঝেমাঝেই রুক্ষ গলায় কথা শোনায়,
-চুপ করে বসে থাকো। এত বাড়াবাড়ি করো কেন? এই বয়সে এসব মানায়?
কথাগুলো সামিরা বেগমের মাথায় ঢোকে না ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতর কোথাও যেনো জমে থাকে। রাতে একা বিছানায় শুয়ে তিনি বিড়বিড় করে কথা বলেন, কাউকে উদ্দেশ্য না করে,
-আমি তো এমন ছিলাম না, আমি তো বোঝা ছিলাম না। একটু ভালোমন্দ খেতেই তো চাই।
কখনো রান্নাঘরের কোণে বসে থাকেন ফ্যালফ্যাল চোখে, যেনো কেউ ডাকবে,
-আসো মা, খেয়ে নাও।
কিন্তু ডাক আসে না।
এই ঘরে এখন তিনি কেবল একজন বুড়ো মানুষ, না মা, না শাশুড়ি, না পরিবারের অভিভাবক।
শুধু একজন অপ্রয়োজনীয় মানুষ, যাকে নিয়ে ঝগড়া হয়, যার জন্য অশান্তি হয়, যার দুঃখ কেউ আর গুনে দেখে না।
এরপর একদিন মেহরুন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটাই নিয়ে ফেললো, সামিরা বেগমকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো হবে। আশ্চর্যভাবে এবার রাব্বিও আর তেমন আপত্তি করলো না। ক্লান্তি,দায়িত্বের ভার সব মিলিয়ে সে নীরব সম্মতিটুকু দিয়ে দিল।
খবরটা নিশির কানে পৌঁছাতেই সে রাগে ফেটে পড়লো। ফোনের ওপাশ থেকে গলার স্বর কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলো,
-কত বড় সাহস তোদের! মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিবি? বাহ! পুরোপুরি বউয়ের আঁচলধরা হয়ে গেছিস দেখছি। বউ বলল আর তুই মাকে ফেলে দিতে রাজি হয়ে গেলি? সেই মাকে, যে তোকে জন্ম দিয়েছে, বুকের দুধ খাইয়ে মানুষ করেছে?
এক নিশ্বাসে কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে নিশি আর কিছু শোনার অপেক্ষা না করেই কল কেটে দিল। বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে, চোখে রাগের পানি। ফোন নামাতেই পেছনে তাকিয়ে দেখে নাহিদ দাঁড়িয়ে আছে মুখে একরাশ তাচ্ছিল্যের হাসি,
নিশি বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
-হাসছো কেনো?
-এই কারণেই হাসছি। যে, নারী তুমি বহুরূপী, তুমিই নষ্টের মূল। তুমি যখন বউ, তখন স্বামী যদি মায়ের কথা শোনে, তাকে বলো মায়ের আঁচলধরা ছেলে। তুমি তখন স্বামীর মন থেকে তার মাকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দাও, অথচ নিজেকে বলো সংসার গুছানো বউ।
আর আজ? আজ সেই একই কাজ যখন তোমার ভাই করছে, তখন তোমার গায়ে আগুন লাগছে। তখন আর বউ ঠিক থাকে না, তখন বউ হয়ে যায় খলচরিত্র। তুমি যখন বউ ছিলে, শাশুড়িরা ছিল অসহ্য, দখলদার। আর আজ তুমি যখন মা, তখন বউয়েরাই সব খারাপ।
নিশি কিছু বলতে চেয়েও পারলো না।
নাহিদ কথাগুলো আরও ভারী করে তুললো,
-মেয়েকে শেখাও স্বামী মুঠোয় রাখতে। কিন্তু ছেলের বউ সেই একই কাজ করলে বলো, আমার ছেলেকে বস করে নিয়েছে। বুঝতে পারো না নিশি, গল্পটা শুধু চরিত্র বদলায়, যন্ত্রণাটা একই থাকে। আজ তোমার মায়ের পালা, কাল হয়তো তোমার। চরিত্রের পালাবদল হয়,
কিন্তু গল্পটা বদলায় না, একই যন্ত্রণা, একই অবহেলা, শুধু মুখগুলো পাল্টে যায়।
নিশি আর নাহিদের দিকে ফিরেও তাকালো না। সেদিনই নিজের বাড়ি ফিরে গিয়ে রাব্বিকে একপ্রকার ঝাঁঝালো ভাষায় বকাঝকা করে সামিরা বেগমকে নিজের কাছে নিয়ে এলো। রাব্বি প্রথমে কিছু বলার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত চুপ করে গেল। হয়তো সে-ও বুঝে ফেলেছিল, এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই।
নাহিদ কিছুতেই বাধা দিল না।
সে শুধু দেখলো। চুপচাপ দেখলো সময় কীভাবে নিজের হিসাব নিজেই মেলাতে থাকে।
আর মনে মনে জমিয়ে রাখলো কথাগুলো যেগুলো সে জানে, সময় এলেই ফেরত দিতে হয়।
দিন যেতে যেতে নাহিদ প্রায়ই খেয়াল করতো সামিরা বেগমের বাচ্চামি স্বভাব। কখনো লুকিয়ে খাবার তুলে নেওয়া, কখনো অকারণে জেদ, কখনো আবার হঠাৎ কান্না। আশ্চর্যভাবে এতে নাহিদের বিরক্ত লাগতো না। বরং বুকের ভেতর কোথাও যেন কেঁপে উঠতো এক পুরোনো স্মৃতি।
মাও তো এমনই হয়ে গিয়েছিলেন শেষ দিকে।
তিনিও বাচ্চা হয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর সেই বাচ্চামিকে কেউ কেউ নাম দিয়েছিল, পাগলামি।
খেতে বসে একদিন নাহিদ হঠাৎ বলে উঠলো,
-এখন আর বিরক্ত লাগে না নিশি?
নিশি চমকে তাকালো,
-কী?
-তোমার মাকে সামলাতে?
নিশি গলা শক্ত করে বললো,
-বিরক্ত লাগবে কেনো?
নাহিদ খুব শান্ত স্বরে বললো,
-আমার মাকে তো খুব বিরক্ত লাগতো তোমার। একঘরে তালা দিয়ে রেখে রেখে তুমিই অর্ধেক পাগল বানিয়ে দিয়েছিলে। মা তো এমন হাত দিয়ে এটা-ওটা খেয়ে নিতো না। মা তো শুধু আমার পাগল ছিলো।
নিশির চোখ জ্বলে উঠলো,
-তুমি খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছো আমার মাকে? এতো ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে না বলে সোজা বললেই হতো। আমি আমার মাকে নিয়ে চলে যেতাম। আমি নিজে এক মুঠো খেলে আমার মাও খেতো।
নাহিদ কোনো উত্তর দিলো না। সে শুধু মৃদু হাসলো।
পাশের ঘর থেকে হঠাৎ করেই তানিয়া আর তাহসানের ঝগড়ার শব্দ ভেসে এলো, কাঁচা গলায় তর্ক, কান্না আর রাগে মেশানো অভিযোগ। নিশি আর নাহিদ একসাথে সে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো কী হয়েছে।
তানিয়া বলল,
-দেখো না মা, তাহসান বলছে মানুষ বুড়ো হয়ে গেলে নাকি বোঝা হয়ে যায়। তখন তাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রাখতে হয়।
আমি বললাম, এমন কথা বলতে হয় না ভাই।
ওমনি ও খেপে গিয়ে বললো, তুই বেশি জানিস? দেখিস নি মা দিদাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসলো, মামি তো নানিকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল।
নিশির চোখ মুহুর্তেই বড় হয়ে গেল। গলার স্বর ভারী হয়ে উঠলো,
-এসব কি সত্যি তাহসান?
তাহসান কোনো উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে চুপসে দাঁড়িয়ে রইলো। সেই নীরবতাই যেনো সব সত্য বলে দিল।
নিশি রাগে ফেটে পড়লো। কথার পর কথা ছুড়তে লাগলো তাহসানের দিকে। কিন্তু নাহিদ ধীরে হাত তুলে তাকে থামাল,
-আহ নিশি, শুধু শুধু ওকে বকছো কেনো? বাচ্চারা যেটা দেখবে সেটাই তো শিখবে। মনে রেখো, বাচ্চারা বইয়ের থেকেও বেশি বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেয়।
নিশি আর কিছু বললো না। হনহন করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
নাহিদ একটু পর তার পেছনে গিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বললো,
-বৃদ্ধ বয়সে কোন আশ্রমে যাবে সেটা কি ঠিক করে রেখেছো নিশি?
নিশি ঘুরে দাঁড়ালো, গলা কাঁপছে,
-মজা নিচ্ছো আমার সাথে? আমার ছেলে মোটেও অমন হবে না।
নাহিদ ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসি এনে বললো,
-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা মানুষ বুঝি খুব খারাপ? তাহলে বুঝো, আমি ঠিক কতটা নিকৃষ্ট।
আর এই নিকৃষ্টতর কাজের পেছনে কার হাত ছিল, সেটা একবার নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো।
নিশি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। নাহিদের পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে গেল।
আজকাল নিশি প্রায়ই নাহিদকে এড়িয়ে চলে। তার এই ধারালো কথাগুলো নিশির বুকে ছুরির মতো বিঁধে থাকে। পালাতে চায়, কিন্তু পারে না, কারণ নাহিদের প্রতিটি কথার ভেতরেই নিশি নিজেরই ফেলে আসা ভুলগুলোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
নিজের প্রতিটি কথায় সে নিজেই ফেসে যায়।
নাহিদ আবার নুরজাহানের কবরের কাছে এসে বসলো। চারপাশে নীরবতা, শুধু বাতাসে পাতার মর্মর, আর বুকের ভেতর জমে থাকা অনুতাপের ভার। সে কবরের মাটিতে হাত রাখলো, আঙুলে মাটি মেখে ফিসফিস করে বললো,
-মা জানো, দুনিয়ার পাপ দুনিয়াতেই ভোগ করতে হয়। কেউ কারও শাস্তি বয়ে নেয় না।
আমি জানি, আমার শেষ বয়সটাও কোনো এক আশ্রমেই কাটবে। তখন আর কোনো অভিযোগ থাকবে না, কোনো প্রশ্নও না। আমি তখন এই আশ্রমটাই বেছে নেব মা, কারণ এখানেই তো তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করেছিলে।
-জানো মা, যখন নিজের ভুলগুলো খুব বেশি মনে পড়ে, তখন আর ছেলে-মেয়েকে ভালোবাসতেই ইচ্ছে করে না। ভয় লাগে এই ভালোবাসাটাও যদি একদিন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়!
তুমিও তো আমায় কত ভালোবেসেছিলে নিঃস্ব হয়ে, নিজের সবটুকু উজাড় করে। বলো তো মা, সেই ভালোবাসার বিনিময়ে তুমি আমার কাছ থেকে কী পেয়েছিলে?
নাহিদের গলা ভেঙে এলো। চোখের পানি কবরের মাটিতে ঝরে পড়লো।
-আমি তোমায় ঘর দিতে পারিনি মা, দিতে পারিনি একটু নিশ্চিন্ত রাত। অথচ আজ এই মাটির নিচে তুমি কত শান্ত! জীবিত থাকতে যে শান্তিটুকুও দিতে পারিনি, মৃত্যুই সেটা দিয়ে গেল।
নাহিদ কবরের মাটিতে হাত বুলিয়ে আবার ফিসফিস করে উঠলো,
-জানো মা, জীবিত থাকতে আমি তোমাকে বোঝা ভেবেছিলাম। আর আজ বুঝছি, বোঝা ছিলাম আমি নিজেই। তোমার বুকভরা ভালোবাসার নিচে আমি শুধু স্বার্থ চাপা দিয়েছিলাম।
নাহিদ কপাল ঠেকাল মাটিতে।
-মৃত্যুই তোমাকে শান্তি দিল মা, যেটা আমি কোনোদিন দিতে পারিনি। এই শান্তিটুকু অন্তত কেউ কেড়ে নেবে না, এই ভেবেই আজ তোমার কবরের পাশে বসে থাকি।
কেটে গেছে বেশ কিছু বছর। সময় তার নিজস্ব নিয়মে সবকিছু ঢেকে দিয়েছে, কিন্তু কিছু ক্ষত ঢাকে না, শুধু সময়ের সাথে সাথে গভীর হয়।
সামিরা বেগম মারা গেছেন আজ দশ বছর হলো। মৃত্যুর পর অবশ্য রাব্বি তাঁকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। দাফনের কাজও সেখানেই সম্পন্ন হয়। মানুষ বেঁচে থাকতে যে বাড়ি তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল, মৃত্যুর পর সেই বাড়িতেই আশ্রয় দিয়েছিল চিরনিদ্রার। কিন্তু তখন আর কিছুই ফিরে পাওয়ার ছিল না, না অভিযোগ, না অভিমান, না ভালোবাসার দাবি।
তানিয়া আর তাহসান বড় হয়ে গেছে। তানিয়ার বিয়ে হয়েছে বছরখানেক হলো, শ্বশুরবাড়ির নিয়মে সে এখন অন্য জীবনের মানুষ। আর তাহসান সে যেন এক অচেনা ঝড়। খুব উগ্র, কারো কথা শোনে না। মা–বাবা, সম্পর্ক, দায়িত্ব কিছুই তার কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না। নিজের পছন্দই তার একমাত্র নিয়ম।
তাহসানের এই আচরণে নিশি দিন দিন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর জমে থাকা চাপা ভয় আর অনুশোচনা মাঝে মাঝেই তাকে অসহায় করে তোলে।
নাহিদ অবশ্য শান্তই থাকে।
-বিনা শাসনে ছেলেটা আজ বেঁকে গেছে। অবশ্য আমার তাতে কোনো আফসোস নেই নিশি। আমার পাপের ফল কোনো না কোনো দিক দিয়ে তো পেতেই হতো।
নিশি থমকে তাকায়। কণ্ঠে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।
-তোমার কি মনে হয় না, আমরা আমাদের পাপের থেকেও বেশি শাস্তি ইতিমধ্যে পেয়ে গেছি?
নাহিদ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। সন্ধ্যার আলো ফুরিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে বলে,
-না নিশি। প্রকৃতির হিসেব বড় কঠিন। সে কারো আবেদনে থামে না, কোনো ছাড়ও দেয় না। সে কারো হিসেব রাখতে পছন্দ করে না, সে ফেরত দেয়। সুদে-আসলে। তুমি যতটুকু করবে, তার থেকেও দ্বিগুণ ফিরে পাবে। ভালো হোক বা খারাপ, কোনোটারই ব্যতিক্রম নেই। আমরা শুধু ভেবেছিলাম সময় সব ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু সময় ভুলায় না নিশি, সময় শেখায়। আর সেই শিক্ষা যখন আসে, তখন শিখবার বয়স আর থাকে না, থাকে শুধু বোঝার দায়।
তাহসান হঠাৎই এসে দাঁড়াল, চোখে কোনো সংকোচ নেই, কণ্ঠে শুধু দাবি।
-টাকা লাগবে।
এক কথায় ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল। নিশি চমকে তাকাল, তারপর দীর্ঘশ্বাসটা আর চেপে রাখতে পারল না। কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ আর অসহায়তা একসাথে বেরিয়ে এলো,
-তুমি জানো তোমার বাবা এখন আর চাকরি করে না। বয়স হয়েছে, শরীর সায় দেয় না। আমাদের খোঁজ নাও না তুমি। কি খাই, না খাই, বেঁচে আছি না মরে গেছি, সেটারও না। শুধু টাকার দরকার হলেই এই দরজাটা খুঁজে পাও।
নিশির চোখ ভিজে উঠল,
-বিয়ে উপযুক্ত ছেলে তুমি। লেখাপড়াও তো শিখিয়েছি। তাহলে এমন অসভ্য হলে কীভাবে? কাজ তো করতেই পারো। মা–বাবার দায়িত্ব না নিলে অন্তত নিজের দায়িত্বটুকু তো নাও। সারাজীবন কি শুধু হাত পেতে থাকবে?
তুমি কি জানো আমাদের সময়টা এখন কেমন যাচ্ছে? তানিয়ার শ্বশুরবাড়ি, ইফতারি, ঈদের জামা-কাপড়, ফসল, নানা কিছু না দিলে ওর শাশুড়ি মেয়েটাকে কথা শোনায়। জামাইও বকাবকি করে। এসব বোঝার চেষ্টা করো না একটুও? তুমি কি বুঝতে পারো না তাহসান?
তাহসান বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, কণ্ঠে শুধু একরোখা স্বর,
-আর কতবার বলবো মা, কাজ করতে আমার ভালো লাগে না।
এই কথাটুকু যেন নিশির বুকের ভেতরটা চিরে দিল। এত বছরের আদর, শাসন, দুশ্চিন্তা সবকিছুর শেষে এই এক লাইনের নিষ্ঠুর স্বীকারোক্তি। সে চুপ করে গেল।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নাহিদ সব দেখছিল।
নিশি গলার সরু স্বর্ণের চেইনটা ধীরে ধীরে খুলে ছেলের হাতে তুলে দিল। হাত দুটো কাঁপছিল, তবু চোখে কোনো অভিযোগ নেই।
তাহসান একবারও অবাক হলো না। কোনো প্রশ্নও করল না। যেন এটাই তার প্রাপ্য। সে নিঃশব্দে চেইনটা পকেটে ভরে বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দে নিশির বুকের ভেতর কিছু একটা চিরে গেল।
নিশি হঠাৎ ভেঙে পড়ে নাহিদকে জড়িয়ে ধরল।
-এই জীবনের চেয়ে তো বৃদ্ধাশ্রমের জীবনই ভালো ছিল। জানো, আমার শরীরটা দিন দিন ভালো লাগছে না,
বলতে বলতে নিশির হাত কাঁপতে লাগল। হঠাৎ অকারণ জ্বর, হাড়ে হাড়ে ব্যথা, অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া, চোখের নিচে গাঢ় কালি সব মিলিয়ে শরীর যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে আমার।
নাহিদ মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
-ছেলেকে নিয়ে অত চিন্তা করছো বলেই এমন হচ্ছে নিশি। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কিছুই ঠিক হলো না।
কয়েকদিনের মধ্যেই নিশির শরীর আরও খারাপ হতে লাগল। নাহিদ নিজের শেষ সঞ্চয় ভেঙে ডাক্তার দেখাল। রিপোর্ট হাতে নিয়ে দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল, বোন ম্যারো ক্যান্সার ধরা পড়েছে।
নিশি ও নাহিদ একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো, দু’জনেই কাঁদছে। সেই কান্নায় কোনো শব্দ ছিল না, ছিল শুধু দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার।
তাহসান খবর পেয়েও খুব একটা বদলাল না। তবে টাকার জন্য আর মা-বাবার দরজায় এল না, এটুকুই তার পরিবর্তন।
তানিয়া ছুটে এলো। মাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। নিজের জমানো সামান্য টাকা নিশির হাতে তুলে দিয়ে বলল,
-মা, এইটুকু রাখো। জানি কিছুই না, তবু।
নাহিদ নিশির দিকে তাকিয়ে খুব ক্লান্ত স্বরে বলল,
-চলো নিশি, আমরা বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাই। হয়তো কোনো সহৃদয় মানুষের চোখে পড়লে তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে। আমার তো আর সামর্থ্য নেই। খাবো কী, কে খাওয়াবে আমাদের? সন্তান থেকেও তো আমাদের আর কেউ নেই।
তারপর তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
-মা, আমাদের সেখানে রেখে আসতে পারবি?
তানিয়া কিছু বলতে পারল না। শুধু কাঁদতে কাঁদতে মাথা নেড়ে রাজি হলো।
সেদিন বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছানোর পর দুজনের জায়গা হলো আলাদা দুই ভবনে। নিয়ম এমনই।
নিশি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, দূরের আরেক জানালায় নাহিদকে দেখতে পেলে একটু শান্তি পেত। নিশির চোখের কালি আরও গাঢ় হয়েছে, শরীর শুকিয়ে কাঠি, দেখলে মনে হয় জীবন্ত কঙ্কাল। রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে শুধু একটাই প্রশ্ন করে, এই যন্ত্রণা থেকে কবে মুক্তি পাবো?
তানিয়া প্রায়ই আসে। কিছুক্ষণ গল্প করে, লুকিয়ে মা-বাবার জন্য রান্না করে আনে।
যাওয়ার সময় চোখ মুছে বলে,
-আমি তোমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতাম মা, কিন্তু কোথায় যাবো? কী খাওয়াবো আমি?
তাহসানও মাঝে মাঝে আসে, দায়িত্বের ভারে, ভালোবাসায় নয়। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, কথা কম বলে, তাড়াতাড়ি চলে যায়।
নাহিদ জানত, এই রোগ ওষুধ চায়, চিকিৎসা চায়। কিন্তু সামর্থ্য নেই।
সে শুধু রাতে নিশির পাশে বসে থাকে, কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে,
-আর ক’টা দিন নিশি, একটু সহ্য করো।
নিশি মৃদু হেসে তাকায়। সেই হাসিতে কোনো আশা নেই, আছে শুধু মেনে নেওয়া।
-সহ্য তো করছি নাহিদ। এবার শেষটা চুপচাপ হলেই ভালো।
দিনের পর দিন নিশি আরও নেতিয়ে পড়ে। খাবার গলায় নামে না, কথা বলতে গেলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে মনে হয়, ওই নীলটুকুই এখন তার শেষ আশ্রয়।
একদিন নিশি নাহিদকে খুব আস্তে ডেকে বলল,
-আজ যদি আমি ঘুমিয়ে পড়ি, আর জাগিও না।
নাহিদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। তবু কিছু বলেনি। শুধু হাতটা শক্ত করে ধরেছিল।
সন্ধ্যার অন্ধকার নামতেই নিশি আর চোখ বন্ধ হয়ে গেলো।
কোনো ডাক্তারি কাগজ, কোনো রিপোর্ট, কোনো হাসপাতালের করিডর কিছুই ছিল না তার মৃত্যুর সঙ্গে। ছিল শুধু দীর্ঘ অবহেলা, অপার কষ্ট।
নাহিদ অনেকক্ষণ নিশির পাশে বসে রইল। চোখে পানি নেই। কান্না করার শক্তিটুকুও যেন শেষ হয়ে গেছে।
আশ্রমের নিয়মমাফিক দাফন হলো। কোনো জাঁকজমক নেই, কোনো শোরগোল নেই।
নাহিদ একা হয়ে গেল। প্রতিদিন নিশির খালি জানালার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে।
মাঝে মাঝে নিজের মনেই বলে,
-প্রকৃতির হিসেব সত্যিই সুদে-আসলে ফেরে।
[নুরজাহানের চরিত্রটি বাস্তব থেকেই নেওয়া। গল্পে নুরজাহানকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো হলেও, বাস্তবে নুরজাহান কখনোই বৃদ্ধাশ্রমে ছিলেন না; তবে তাঁর অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। জীবনের শেষ বয়সে তিনি লতাপাতা কুড়িয়ে এনে নিজেই রান্না করে খেতেন। শুরুতে আশপাশের মানুষজন কেউ কেউ খাবার দিত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সাহায্যও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ ভালো কোনো খাবার পেলে তিনি তা আঁচলের নিচে লুকিয়ে রাখতেন, ছেলে ফিরলে তাকে খাওয়াবেন বলে।
গল্পে নুরজাহানকে একটি সুন্দর মৃত্যু দেওয়া গেলেও, বাস্তবে তাঁর মৃত্যু ছিল খুবই ভয়ংকর ও নির্মম। গল্পে নিশির শাস্তি দেখানো সম্ভব হলেও, বাস্তবে নিশি আজও আয়েশি জীবন যাপন করছে।
গল্পের সমাপ্তি সুন্দর হতে পারে, কিন্তু জীবনের সমাপ্তি সব সময় সুন্দর হয় না।
পুরো গল্প নিয়ে দুই লাইনে আপনার মূল্যবান মন্তব্য রেখে যান। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, ধন্যবাদ। ]
_সমাপ্ত
