গল্প_সন্তান_সুখ
#লেখিকা_Keya_Mukherjee
পর্ব-০১
পর পর দুটো মেয়ের জন্মদিয়ে বাড়ির ঐতিহ্য ই নষ্ট করে দিয়েছো বউ । কি একটা পেট যেই পেটে ছেলে র জন্ম হয় না।
শাশুড়ির এমন কথা শুনে শাহানা অবাক না হয়ে পারে না । এ কেমন কথা ? শান্ত শিষ্ট মেয়েটা মুখের ওপর বলেই বসে ,, ছেলে হয় না এটাও কি আমার দোষ মা ? উপর ওয়ালা যা দেবেন তাই তো হবে মা ।
চোপা করবে না একদম । বাপ ,মা কিছু শিখিয়ে পরিয়ে পাঠায় নি ? রান্না টাও ও তো ঠিক করে পারো না । কোন কাজ ই তো তেমন হয় না তোমার দ্বারা ।
শাহানা আর কিছু বলে না । বলেই বা কি করবে ? যে খানে স্বামী হয়েও দিনের পর দিন কথার বান মারে । সেখানে শশুর বাড়ির অন্য সদস্য দের কথা নয় নাই ধরলাম ।
শাহানা মুখ ভার করে ঘরে আসে । বড় মেয়ে রানী ছোটো বোন এর সাথে খেলা করছে ।
মা কে আসতে দেখেই বড় মেয়ে বলে,, মা মন খারাপ ? আজও কি ঠাম্মা বকা দিলো ?
শাহানা হাসে ।। মেয়ে তাঁর বছর ১০এর অথচ কত বুদ্ধি । ঠিক বুঝে গেছে মায়ের মন খারাপ ।
নারে মা আমি ঠিক আছি । কেও কিছুবলে নি ।
রানী মায়ের কাছে এসে গলা জড়িয়ে ধরে বলে ,, মন খারাপ করে না মা । একদিন দেখো আমি তোমায় এই খান থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যাবো । তুমি আমি আর বোন তিন জন মিলে সুখে থাকবো ।
শাহানা হাসে । মেয়ে কে বুকে আগলে ধরে । মা আর দিদি কে ওভাবে দেখে ছোটো টাও ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে । শাহানা মেয়েদের আদর করে বলে আমার মা রাই আমার সব । কত ভালো বাসে মা কে ।
ছোটো মেয়ে রূপা বয়স পাঁচের ঘরে । দেখলে কেও বলবে না যে রূপা পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে । এই বয়সেই বেশ লম্বা , স্বাস্থ্যবান মেয়ে । দেখলেই আদর করতে মম চায় । শাহানার দুই মেয়েই দেখতে অপরুপা। ভগবান যেন রূপ ঢেলে ঢেলে বানিয়েছে ।
শাহানা মেয়ে দের রেখে উঠে দাঁড়ায় । ঘর থেকে যেতে যেতে বলে,, রানী ,রূপা তোরা বই নিয়ে বস। আমি ছাদে যাই প্রচুর জামা কাপড় আছে ছাদে ।।
সকাল থেকে শুরু করে রাত অবধি কাজের শেষ নেই । বাড়ি তে আরো বউ আছে ।থাকলে কি হবে ছেলে জন্ম দিতে পারে নি বলে নিজের গতর কয়লা করে করে সংসারের ঝি বনে গেছে । তবুও মুখ বুঝে সয়ে নেয়। যাওয়ার ও যে তেমন জায়গা নেই । বাপের বাড়ি বলে কিছুই নেই । মা ,বাবা খুব অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছে শাহানার। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কিছু দিন পর শাহানা র বাবা মা’রা যায় । বাবার শো ক কাটিয়ে উঠতে উঠতেই মা ও পারি দিলো ওপারে। পড়ে রইলো দুই ভাই ।
শাহানার বড় দা সৌমেন সে থাকে বাইরে সেখানেই বিয়ে থাওয়া করে বউ বাচ্চা নিয়ে আছে । আর পড়ে রইলো ছোট ভাই । যে শাহানার থেকে বয়সে ও ছোটো ।
বাবা ,মায়ের মৃত্যুর পর ভিটে মাটি ছেড়ে চলে যায় সুরাট। সোনার কাজ করে সেখানে গিয়ে । খোঁজ খবর নেওয়ার মধ্যে এই ছোট ভাইটাই একটু খোঁজ খবর নেয়।
আজও যেমন ফোন করেছে । ভাগ্নি দের সাথে কথা বলে নিজের দিদির সাথে কথা বলে,,
কেমন আছিস দিদি ?
শাহানা মৃদু হেসে বলে খুব ভালো । তুই কেমন আছিস ভাই ?
সৌরভ বলে ,, এই তো আছি বেশ । পিঠে পার্বণ এর দিন অথচ এত দূরে আছি যে একটাও কপালে জুটলো না ।
শাহানার খারাপ লাগে খুব । আচ্ছা ভাই এই বার এলে তোকে আমি পিঠে করে খাওয়াবো । মন খারাপ করিস না কেমন ?
সৌরভ হেসে বলে ,, তোর মতন দিদি থাকতে আর মন খারাপ করার জো আছে রে ।
দিদি , বোনের ফোন আলাপ এর মাঝে শাহানার বর আসে ।
মলয় কে দেখে শাহানা ভাইকে বলে ,, ভাই তুই রেস্ট নে ঠিক মতন খাওয়া দাওয়া করবি কেমন । তোর জিজু আসছে তাই এখন রাখি ।
সৌরভ ও আচ্ছা বলে কল কেটে দেয় ।
মলয় এসেই হাত পা ধুয়ে বসে খাটে।
বড় মেয়ে জল এনে দেয় ।
মলয় জল খেয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ও ঘরে যাও মা তোমরা । বোন কে নিয়ে ।
রানী ঢোক গেলে,, আজও বুঝি বাবা মায়ের গায়ে হাত তুলবে ?
ভয়ে ভয়ে মায়ের দিকে তাকায় ।
শাহানা চোখ দিয়ে ইশারা করে চলে যেতে।
রানী , রূপা কে নিয়ে পাশের রুমে চলে যায় । যেখানে রানী আর রূপা থাকে।
শাহানা কে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মলয় বলে ,, ঘরের দরজা টা বন্ধ করে আয়।
শাহানা বাধ্য বউ এর মতন দরজা বন্ধ করে এসে দাঁড়ায়।
মলয় শাহানার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে বলে ,, জানিস বউ আমার বন্ধু আলম এর আজ ছেলে বাচ্চা হইসে । কি যে একটা আনন্দ বলার না ।
ওর ও তো বউ এর প্রথম দুইটা মাইয়া । দুই মাইয়ার ঘরে এক ছেলে । সোনায় সোহাগা ।
শাহানা হাসে। বুঝেছে স্বামীর এত ভালো ব্যাবহার এর কারণ কি ?
শাহানা তবুও কিছু বলে না । স্বামীর পরবর্তী কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে ।
মলয় বউ কে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে ,, কি হইলো কিছু বলিস না কেন ?
কি কি বলবো?
শুন না বউ চ না আমরাও আর একটা নেই । এইবার আমি জানি ছেলেই হইবো ।
শাহানা চোখ বড় বড় করে চায় ,, হাত দিয়ে ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয় মলয় কে ।
মুখে বলে ,, কি সব বলো ? তুমি জানো দ্বিতীয় বার মা হতেই আমার মরণ ছিল নিশ্চিত । আর তুমি সেই জোর করো ?
মলয় বউ এর এমন কথা শুনে বলে ,, মরিস তো নি । বেঁচেই আছিস । ওসব ডাক্তার দের ঢং । প্রথম প্রথম ভয় দেখায় অমন।
মলয় তুমি তো জানো সব তাও এমন বলছো ?আর আমার শরীর অত নিতে পারে না ধকল । বাচ্চা নেওয়া মুখের কথা না ।
মলয় এবার তেলে বেগুন এ জ্বলে ওঠে ,, রাগে হিস হিসিয়ে বলে ,, আলম এর বউ এর প্রথম টা নরমাল হলেও পর পর দুই টা সিজার । তবুও সে বর রে খুশি করতে নিসে বাচ্চা । আর তুই( মা,,,) যত নিয়ম করো ।
রাগের বসে শাহানার চুলের মুঠি ধরে গালাগালি দিয়ে হিসহিসিয়ে বলে ,, বর যা চায় তাই দিতে হয় । নয়তো তোর মতন (মা,,,) রে নিয়ে সংসার করার শখ নাই আমার । লা’থি মেরে বার করে দেবো তোরে আর তোর মেয়ে সহ ।
শাহানা কেঁদে দেয়। মলয় এর হাতের ওপর হাত রেখে বলে ,, চুল ছাড়ো । লাগে আমার । চুল ছাড়ো ।
না ছাড়ুম না । এত টাকা পয়সা আমার তুই ম’রলেও তোরে বাঁ’চায় আনার ক্ষমতা আমার আছে । তোর মতন ১০ টা বউ পালার ও ক্ষমতা আমার আছে । আমার এত টাকা পয়সা কি করুম? ছেলে না হইলে বংশ বিস্তার কেমনে হবে ? তুই কি বুঝিস না । পর পর মাইয়া জন্ম দিসিস?
মেয়ে গুলো কি আমি বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি । ওই গুলো তো তোমার ই। তাও দেখতে পারো না কেন ?
কে কইসে দেখতে পারি না ? ওই গুলো আমার রক্ত । তুই আমার মেয়ে দের কানে বি’ষ ঢালিস । তাই তো বাপের কাছে আসতে ভয় পায় ।
শাহানা র চুলের মুঠি ছাড়াতে শাহানা মলয় কে ধাক্কা দিতে থাকে । ছাড়ো লাগছে আমার । ছাড়ো । মেয়েরা পাশের রুমে আছে সব শুনছে ছাড়ো ।
মলয় এর বুঝি টনক নড়ে ছেড়ে দেয় ।
তুই যদি আমার কথা না রাখিস কাল ই বিয়া কইরা বউ আনুম। তোর জেদ আমি কেমনে কি করি দেখ ।
শাহানা কেঁদে স্বামীর পায়ে ধরে । মনে মনে ভাবে মেয়ে গুলোর আমার কী হবে ? এই লোক এর কথা বলা যায় না । যদি সত্যি সত্যিই নতুন বউ নিয়ে ঢোকে ।
মলয় নিজের পা ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয় শাহানা কে । যা ঘর থেকে । এই ঘরে তোর ছায়া আমি যেন না দেখি।
শাহানা যায় না। কিছু সময় কাটে নীরবে । মলয় বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে । চোখের ওপর হাত রাখা ।
শাহানা ভয়ে ভয়ে স্বামীর পাশে বসে । নিজেকে শক্ত রেখে বলে ,, একটা ছেলে হলেই কি আমার সম্মান তোমার বাড়ির মানুষের চোখে দেখতে পাবো ? আর কেও কটু কথা বলবে না তো ?
মলয় চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে দেখে শাহানা কে ,,
বাঙালি মেয়েরা স্বামী অন্ত প্রাণ হয় । খুব ছোট বয়সে বিয়ে দিয়েছিল বাবা । তার পরে তারাও চলে গেলো । এখন আপনার ঘরেই আমার ঠাঁই। আমি বেঁচে থাকতে তোমার দ্বিতীয় বউ দেখতে পারবো না । আমার মেয়ে রা ও মা ছাড়া অনাথ হয়ে যাবে । তাই ভেবেই সিদ্ধান্ত নিলাম বাচ্চা নেবো । তবে তোমায় ও কথা দিতে হবে এবার ও যদি মেয়ে হয় তবে ভগবানের ইচ্ছে ভেবে সব মেনে নিতে হবে ।
মলয় উঠে বসে । শাহানা কে পরখ করে বলে ,, তুই যে দুই বাচ্চার মা তোরে দেখে বোঝার জো আছে ? তুই তো আমার সুন্দরী বউ । এই বার ই লাস্ট আর জোর করবো না । তবে আমার বিশ্বাস আমার ঘরে ও ছেলে আইবো । তুই ও ছেলের মা হবি । দেখবি সবাই তোরে আদরে যত্নে রাখবো ।
কথা শেষ করেই মলয় বউ কে আদর রে ভরিয়ে দেয় । শাহানা আর কিছুই রিয়েক্ট করে না ।রোবট এর মতন পড়ে থাকে ।।
চলবে,,
