||৩||
#তোমার_অস্তিত্ব
#মুসলিমা_ইসলাম
খুব ভরে ঘুম ভেঙে গেলো উঠে পাশে তাকিয়ে দেখি ইমন বিঘোরে ঘুমাচ্ছে। মাথার কাছ থেকে ফোন নিয়ে সময় দেখে নিলাম নামাজের সময় এখনো আছে আমি দ্রুত উঠে পড়লাম।এখন মাঝামাঝি শীত আমার অল্পতেই বেশি শীত লাগে, কোনো রকমে কল পাড়ে এসে অযু করে নামাজ পড়ে নিলাম।ইমনকে বেশ কয়েকবার ডাকলাম উঠার নাম নেই শাশুড়ি ননদ কেউ এখনো উঠেনি।কি করবো ভেবে পেলাম না,দাদির কাছে থাকলে এই সময়টা কুরআন পড়ে কাটাতে হতো আশেপাশে তাকিয়েও পেলাম না খুব ছোট বেলায় ধরা হয়েছিল দাদি এসবের বিষয়ে খুবই কঠিন ছিলো না পড়লে ভাত দিতে চাইতো না।দাদির কথা খুব মনে পড়ছে এতটা দিন আমাকে আগলিয়ে রাখছে মা বাবার অভাব বুঝতে দেইনি, যত সম্ভব চেষ্টা করছে আমাকে ভালো রাখার। মানুষের বাড়ি কাজ করে আমার পড়াশোনা করিয়েছে।মানুষের মুখে কত শুনছি তাদের দাদি ভালো না তাদের দেখে না, কিন্তু আমার দাদি আমার কাছে বেস্ট।আর ভাবতে পারলাম না চোখটা যে কখন ভিজে গেলো টের পেলাম না। উঠে বাহিরে চলে আসলাম এ বাড়ির কোনো কিছু ভালো করে জানা নেই। এদিক ওদিক তাকাতেই ঝাড়ু চোখে পড়লো ঝাড়ু হাতে নিয়ে উঠান ঝাড়ু দিচ্ছি।
একি বউ তুমি এত সকালে ঝাড়ু দিচ্ছো কেন।
হঠাৎ কথা বলাই একটু ভরকে গেলাম পিছনে ফিরে দেখলাম শাশুড়ি।
আম্মা উঠছি অনেকক্ষন তাই ভাবছি উঠান টা ঝাড়ু দিয়ে রাখি।
শাশুড়ি এসে ঝাড়ু নিয়ে নিলো, এসব করতে হবেনা এখন নতুন আসছো কয়দিন থাকো, দেখো পরে করো এই সংসার তো তোমারি আমি আর কতদিন।
আমি আর কোনো কথা খুজে না পেয়ে দাড়িয়ে আছি, আস্তে আস্তে সূর্যের দেখা মিলছে।
আম্মা গরু টা বের করবো?
তুমি পারবে? আগে করছো কখনো।
এসব আমি কখনোই করিনি, সত্যি বলতে আমার ভীষন ভয় করে গরু। তবুও জিজ্ঞাসা করছি এভাবে দাড়িয়ে থাকাটা কেমন দেখাই।
তুমি বরং হাস, মুরগি কয়টা বের করে খেতে দেও রান্না ঘরে দেখো ওদের খাওয়ার আছে।
যেভাবে বললো আমি সেইভাবে সব করলাম, হাত ধুয়ে রুমে এসে দেখলাম এখনো ইমন ঘুমাচ্ছে,আমি আবারও ডাকলাম উঠলো না, তখনি দুষ্টামি করে চিমটি কেটে দিলাম তার পায়ে তখনি হুড়মুড় করে উঠে __
আহঃ, কি হলো কিসে কামড় দিলো,উফস।
কোনো কিছু কামড় দেইনি, কখন থেকে ডাকছি জানেন? উঠার কোনো নাম নেই।
আরে এখনো তো বেশি বাজেনি আরেকটু ঘুমাতে দেও। বলেই আবার শুবে আমি মাথার কাছ থেকে বালিশ নিয়ে নিলাম।
আপনাকে সেই ভর বেলা থেকে ডাকছি, নামাজ পড়তে এখন আর শুয়া যাবেনা। উঠেন হাত মুখে ধুয়ে নেন।
ইমন বেশ বিরক্ত হলো, কিন্তু প্রকাশ করলো না। তার সাধের ঘুম এই জন্য বলে বউ হলে শুধু জীবন না ঘুমও নষ্ট হয়।
কি হলো বসে আছেন কেনো? উঠুন।
বিয়ে করে যে ঘুম হারাম হবে আগে জানা ছিল না, আগে মায়ের ডাকে পাত্তা দিতাম না এখন বউ। ধূর.. ইমন ফিসফিস করতে করতে বাহিরে চলে আসলো।
রাহেলা সকালের জন্য ভাত বসিয়ে গরু বেধে আসলো, তরকারি রাতে যা ছিল হয়ে যাবে। মিনুকে কয়েকবার ডাক দিলো কোনো সারাশব্দ পেলোনা। মহুয়া রুমের ভিতরে গুছিয়ে বাহিরে এসে দাড়ালো ইমন তখনি তার দিকে তাকিয়ে__
এখানে এসে বসো, সুন্দর রোদ উঠছে। মা আপাকে দেখছি না তো।
ডাকলাম তো সকাল থেকে উঠছে না ঘুমিয়ে আছে হয়তো।
আম্মা আমি রুমে যেয়ে ডাকবো? রাহেলা মহুয়ার দিকে তাকালো মেয়েটারে দেখলে তো রেগে যাবে, তবুও মানা করলো না। মহুয়া দাড়িয়ে না থেকে মিনুর রুমের দিকে চলে গেলো।
ইমন উঠে মায়ের কাছে এসে বসলো উদ্দেশ্য কিছু বলার কিন্তু বলতে পারছে না। রাহেলা বুঝে গেলো মায়ের মন সন্তানের মুখের দিকে তাকালেই বুঝে যায়।
কিছু বলবি এমন করছিস যেনো আগে কখনো কিছু বলিস নি।
এমনটা না মা, কথাটা হচ্ছে মহুয়াকে নিয়ে, ওর মা বাবা কেউ নেই ছোট থেকে দাদির কাছে মানুষ হয়েছে। কাকা আছে দুইটা কিন্তু ওরা শহরে থাকে কোনো খোজ খবর নেইনা। ওর দাদি এখন একা তুমি যদি অনুমতি দিতে কয়দিনের জন্য আনতাম, মহুয়ারও ভালো লাগতো।
রাহেলা বুঝতে পারলো কিন্তু ছেলেকে একটু জব্দ করতে__
‘বিয়ে যখন করছিস আমার অনুমতি নিয়েছিস?এখন আবার অনুমতির কি প্রয়োজন।ইমন আর কোনো ভাষা পেলো না কি বা বলবে তার একটু বলা উচিত ছিলো।রাহেলা ছেলের ভাব বুঝে গেলো।
করে যখন ফেলছিস কিছু তো করার নেই, মেনে না নিয়ে উপায় আছে আনিস কয়দিনের জন্য থেকে যাবে।ইমন খুশি হয়ে উঠে গেলো মহুয়াকে নিয়ে যাবে নিশ্চই মহুয়া অনেক খুশি হবে। মহুয়া মিনুর রুমে যেয়ে দেখলো মিনু কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে একটু কাছে যেয়ে শুনছে পেলো__
”আমাকে ছেড়ো না প্লিজ আমি তোমার, তোমার মায়ের সব কথা শুনবো।আমাকে ঘরের এক কোনায় রেখে দিও তবুও ছেড়ে দিও না”।
অস্পষ্ট ভাবে কথা বলছে আমি কান আরো কাছে নিয়ে শুনতে পেলাম মাথায় কিছুই ঢুকলো না, আপা এসব কি বলছে কে আপাকে ছেড়ে দিচ্ছে। আমি একহাত আপার গায়ের উপর দিয়ে ডাকতেই আপা নড়ে উঠলো, আমি সাহস নিয়ে আপার কপালে ছুঁয়ে দিতেই হাতে গরম অনুভব করলাম দ্বিতীয়বার ছুয়ে একরম বুঝতে পারলাম আপার জ্বর এসেছে একটু পর পর কাপুনি দিয়ে উঠছে পাশ থেকে আরেকটা কম্বল গায়ে দিয়ে।
আপা, আপা শুনতে পাচ্ছেন? শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?
মিনু খুব কষ্ট করে চোখ খুলার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না মাথা ব্যাথায় যেনো ফেটে যাচ্ছে, একটু খুলেই সামনে দেখলো মহুয়া বসে আছে তার দিকে তাকিয়ে মুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ,চোখ আবারো বন্ধ করে নিলো, মহুয়া আবার আস্তে করে ডাকলো কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞাসা করলো।
‘মা কে ডেকে আনো, তুমি আসতে গেলে কেনো।
মহুয়া একটু কষ্ট পেলো তবুও কিছু না বলে বাহিরে চলে আসলো।
‘আম্মা আপার গায়ে ভীষণ জ্বর আমি ডাকলাম বললো আপনাকে ডেকে দিতে।রাহেলা বানু সবে ভাত বাড়ছিল মেয়ের জ্বর এসেছে শুনে উঠে পড়লো হঠাৎ জ্বর হলো কেনো।
‘বউ ইমনকে ভাত দেও, আমি দেখে আসছি। মেয়েটার যে কি হলো হঠাৎ। মহুয়া আচ্ছা বলে রান্না ঘরে চলে আসলো ইমন ঘরে ছিলো এসে ভাত খেতে বসলো মহুয়া প্রয়জনি জিনিস সব গুছিয়ে সেও পাশে বসে পড়লো।
‘আপার জ্বর এসেছে আপনি খেয়ে ঔষধ আনবেন।
‘আপার কখন জ্বর আসলো বললে না তো।
‘আমিত মাএ দেখে আসছি আপনি খেয়ে নেন, খাওয়া শেষ করে ইমন রুমে যেয়ে মিনুকে দেখে ঔষধ আনতে চলে গেলো। মহুয়া সব গুছিয়ে রেখে আবারো মিনুর রুমে চলে আসলো,যদি কিছু প্রয়জন পড়ে।রাহেলা মেয়েকে উঠিয়ে বাহিরে নিয়ে আসলো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে হঠাৎ এতো জ্বরের কারন বুঝলো না। পাশের বাসা থেকে কয়েকজন মানুষ এসেছে মহুয়া তাদের চিনে না তাদের বসার জন্য চেয়ার দিয়ে সে পাশেই শাশুড়ির পাশে দাড়িয়ে গেলো।
কি গো বউ এই বুঝি ইমনের বউ।
হ্যাঁ কাকি, কাল এসেছে আজকে আবার মেয়েটার জ্বর আসলো তোমাদের যে বলবো সে সময় পাইনি।মহুয়া ঘর থেকে পানের ডালা টা আনো, পান বানিয়ে দেও এটা তোমার দাদি শাশুড়ি।
আমি শাশুড়ির কথা মতো সব এনে দিলাম,ভালোই কথা বার্তা আমাকে দেখে প্রশংসা করলো, ইমনকে নিয়ে তাদের বাড়ি যেতে বললো।কিছু সময় থেকে চলে গেলো। শাশুড়ি আপাকে নিয়ে ব্যাস্ত আমি একটু পর পর শুনছি কিছু্ লাগবে কিনা।ইমন এসেছে ডক্টর নিয়ে ডক্টরের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ খাওয়ানো পছন্দ না তার। আপাকে শুয়িয়ে রাখা হয়েছে তার রুমে, শাশুড়ি তার পাশে ইমন ডক্টরের পাশে দাড়িয়ে আছে আমি দাড়িয়ে আছি আপার মাথার কাছে। ডক্টর চেকাপ করে ঔষধ লিখে দিলো বেশি চিন্তা করতে নিষেধ করলো। অতিরিক্ত দুচিন্তার জন্য শরীর দূর্বল হয়ে যাচ্ছে খাওয়া দাওয়াও করতে বললো ঠিক ভাবে। ইমন আবারো ডক্টরের সাথে চলে গেলো আসার সময় ঔষধ নিয়ে আসবে।
‘আম্মা কয়টা খেয়ে নেন, চিন্তা করবেন না আপা ঠিক হয়ে যাবে।
‘তুমি খাইছো।
‘না আম্মা, আপনি আপা না খেলে আমি কিভাবে খাই। আপার জন্য কিছু বানিয়ে দিবো। আপা কি খাবেন?
মিনু কিছু বললো না, তার এখন ভালো লাগছে না। শরীর আর কুলাচ্ছে না। মাথা ধরে আছে ভীষন ভাবে সব কিছু বিরক্ত লাগছে। রাহেলা মেয়েকে গুছিয়ে বাহিরে চলে আসলো তার সংসার বউটা সবে এসেছে সব কিছু মানাতে সময় লাগবে তবুও মেয়েটা চেষ্টা করছে মনে মনে খুশি হলো মহুয়ার ব্যবহারে। দুপুরে রান্নার জন্য শাশুড়ি কিছু সবজি কেটে রাখতে বললো উনিই রান্না করবেন বাদ বাকি আমি গুছিয়ে দিলাম ইমন ঔষধ এনে আবার চলে গেলো দোকানে।গোসল শেষে দাড়িয়ে আছি শাশুড়ি হাতে শাড়ি ধরিয়ে দিলো কিন্তু কোনো মতে আমি শাড়ি পড়তে পারিনা সামলাতে ও বেশ হিমসিম খেতে হয়।
‘কি হলো দাড়িয়ে আছো কেনো? শাড়িটা পড়ে নেও।
আম্মা আসলে…
বাকিটা বলতে হলোনা।বুঝতে পারছি শাড়ি পড়তে পারোনা তাই তো।হাত থেকে শাড়ি নিয়ে পড়াতে লাগলো আমি চেয়ে দেখছি মায়েরা মনে হয় এমন হয়? আমিতো সবটা বলিনি তবুও উনি বুঝে গেলেন? আমার মা ওকি বুঝতো। মায়ের ভালোবাসা কেমন আমি জানিনা মা কেমন করে যত্ন করে সকালেও দেখলো মিনুকে কি সুন্দর করে তার শাশুড়ি আগলিয়ে রাখছিল। চোখ ভিজে গেলো রাহেলা শাড়ি পড়ানো শেষে মহুয়ার দিকে তাকাতেই।
‘একি তুমি কাদছো কেনো?
মহুয়া দ্রুত চোখ মুছে নিলো, চেষ্টা করলো স্বাভাবিক হওয়ার। রাহেলা ঠিকই বুঝলো সেও আর কোনো কথা না বলে তার কাজে চলে গেলো, ইমন আসলো দুপুরে খেতে আগে কখনো আসেনি সেটা নিয়ে শাশুড়ি খোচাও দিলো ইমন সেটা পাত্তা না দিয়ে রুমে ঢুকে পড়লো, মহুয়া তখন নিজেকে দেখতে ব্যস্ত শাড়িতে তাকে কেমন লাগছে হঠাৎ পিছন থেকে কারো স্পর্শ পেয়ে লাফ দিয়ে দূরে সরে গেলো।
‘আল্লাহ এমন করে কেউ আসে? একটু বলে আসবেন না?
‘নিজের রুমে বলে আসবো কেনো? আরো এমন সুন্দরী বউ থাকতে।
‘হয়েছে থামেন সারাদিন খোজ নেই, এখন এসে বউ দেখছে। মুখ বাকিয়ে বসে পড়লো মহুয়া ইমনের বেশ লাগছে এমন অভিমানী বউ তার।পকেট থেকে বেলিফুলের মালা বের করে ধরিয়ে দিলো সাথে সুন্দর দুইটা গোলাপ ফুল। মহুয়ার পছন্দ বেলিফুল, ইমনের গোলাপ তাই দুটোই একসাথে এনেছে। মহুয়া খুশি হলো হাতে নিয়ে ঘ্রান নিলো কিছু সময়।
‘আপনার মনে আছে এটা আমার পছন্দ?
নাক টেনে দিয়ে ‘একটাই তো বউ আমার, মনে থাকবে না কেনো হুহ।
হয়েছে, উঠুন গোসল করে খাবেন চলুন। ইমন আরো কিছু সময় থাকতে চেয়েছিল মহুয়া জোর করে উঠিয়ে কলপাড়ে নিয়ে গেলো,ইমন গোসল করছে মহুয়া পানি তুলে দিচ্ছে একটু পর পর ইমন পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে মহুয়ার দিকে, মহুয়া রাগি চোখে তাকাচ্ছে দূর থেকে এটা মিনু খেয়াল করলো, সে উঠে আসছিল একটু হাটবে বলে ভাইয়ের এমন দৃশ্য দেখে তার মনেও একটু শান্তি আসলো, ছোট ভাই তার আদরের সে সুখে থাকলে তার ওতো সুখ। মেয়েটার সাথে ওমন ব্যবহার করার পরও তাকে খেয়াল রাখছে। এতো কিছু না ভেবে আবারো রুমের ভিতর পা বাড়ালো।
চলবে?
