||২||
#তোমার_অস্তিত্ব
#মুসলিমা_ইসলাম
মিনু একের পর এক কথা শুনেয়ে যাচ্ছে তার মা রাহেলা বানুকে, সে কেনো এখন চুলার ধারে এসে রান্না করছে, ছেলে বিয়ে করে আনছে তবুও কেনো সে এসব করতে যাবে। রাহেলা চেয়ে আছে মেয়ের দিকে যত সম্ভব চেষ্টা করছে তাকে থামানোর কিন্তু মিনু কোনো কোথায় শুনছে না।রাহলে আর চুপ থাকতে পারলো না বিরক্ত মুখে বলে উঠলো__
তুই চুপ করবি? বউ টা সবে এসেছে এখনি রান্না করতে বলি কিভাবে? কয়দিন যাক তারপর সব করবে।
হ্যাঁ, এভাবে দিন দিন মাথায় উঠে যাবে মা। তাখন এসে বলোনা মিনু তোর কথা শুনা উচিত ছিলো।
আরো কিছু বলতে যাবে তখনি ইমন আমি একসাথে বেরিয়ে রান্না ঘরের সামনে দাড়িয়ে গেলাম।
ইমন-কি হয়েছে মা, আপা এমন করে চিল্লাচ্ছে কেনো?
মিনু-চিল্লাচ্ছি কি সাদে? দেখতে পাচ্ছিস না মা একা রান্না করছে।তুই বউ নিয়ে ঘরে বসে আছিস। আর তোমার ওকি কোনো আক্কেল নেই, বাজার করে আনছে দেখছো তবুও ঘরের ভিতর বসে আছো। কাজের এতো ভয় তাহলে বিয়ে করছিলে কেনো।
আহা মিনু তুই কিন্তু বেশি করছিস, যা রুমে যা। এমন করে বলছিস যেনো সারাদিনের কাজ তুই করে দিস আমায় শাশুড়ি কথাটা বলে রান্নার জন্য তরকারি কাটতে বসলেন, আমি দাড়িয়ে না থেকে শাশুড়ির পাশে যেয়ে বসে পড়লাম_
‘আম্মা আমার কাছে দেন, আমি কাটছি’
তোমাকে করতে হবেনা।তবুও আমি শুনলাম না বটি নিয়ে তরকারি কাটতে লাগলাম। ননদ আরো কিছু কথা শুনিয়ে রুমের ভিতর চলে গেলো, আমি এখনো কিছু বুঝতে পারলাম না আমার ননদের ব্যবহারের বিষয়ে। শাশুড়ি চুলাই ভাত বসিয়ে দিয়েছে, পাশে তরকারি কেটে ধুয়ে এনে দিয়ে পাশেই বসে পড়লাম ইমন কোনো কথা না বলে আবার বেরিয়ে গেছিলো। বাড়িটাই মানুষ বলতে আমরা চার জন আশেপাশে দু একটা ঘর বেশ ফাকা জায়গা।
‘আম্মা কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতাম’
‘বলো।
‘আম্মা আমাদের বাসায় কি কেউ আসেনা?আশেপাশে কেউত আসলো না।
‘আসবে কালকে তোমরা আসছো তো সকালে ইমন যে বিয়ে করছে এখনো জানাজানি হয়নি তো। দেও তরকারি ভাত হয়ে গেছে। আমি চুপ হয়ে গেলাম আবারো কোনো প্রশ্ন পেলাম না। নতুন আসছি এত কিছু না জানাই ভালো আস্তে আস্তে সব কিছু জানতে পারবো। তবে মনের ভিতর চাপা কষ্ট থেকে গেলো বড় আপার ব্যবহার এমন কেনো? কোনো কারন ছাড়াই কেনো এমন করছে আমার সাথে। রাতে ইমন বেশ রাত করেই বাড়ি আসলো এমন রাত সে কখনোই করে না। শুনছি তার বাবার বড় দোকান ছিলো জামাকাপড়ের, মারা যাওয়ার পর থেকে সেই দায়িত্ব নিয়েছে। পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে সামনে তার অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরিক্ষা। রাতে সবাই একসাথে খেতে বসলেও আমার ননদ আসেনি সে নাকি খাবেনা। আমি চাইলাম ডাক দিতে ইমন মানা করলো তার রাগ কমে গেলে সে নিজেই খাবে। আমি চুপচাপ খেয়ে নিলাম। ইমন আগেই রুমে চলে গেছিল আমি সব গুছিয়ে রেখে রুমে এসে বসতেই ইমন বললো।
‘আপার ব্যবহার এমন ছিল না, হঠাৎ আপার কি হলো সবার সাথে এমন ব্যবহার করছে। তুমি কষ্ট পেও না। আমি তবুও কিছু বললাম না বিছানা গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
মহুয়া জানো ছোট থেকে আমি আপার কাছে বড় হয়েছি, পড়াশোনা, খাওয়া দাওয়া,সব কিছু কোনোদিন আমার গায়ে হাত উঠাইনি।আব্বা যদি কিছু কিনার জন্য টাকা দিতো আপা সেই টাকা দিয়ে আমার জন্য কিনাকাটা করতো, আপার স্বপ্ন ছিল আমি একদিন অনেক বড় হবো হুট করে বিয়ে করছি এসব মেনে নিতে পারছে না।সব ঠিক হয়ে যাবে এসব ভেবে নিজে কষ্ট পেও না জানো তো তুমি কষ্ট পেলে আমারও কষ্ট হয় ভালোবাসি তো।
আমি শুধু শুনে যাচ্ছি, যত যায় বলুক মনে আঘাত লাগলে সেই আঘাত সহজে মিটে না। আপার কথায় আমার মনে দাগ কেটে গেছে। এমন না যে আমি আপার উপর রেগে আছি সে বড় দু কথা শুনানোর অধিকার তার আছে। এসব নিয়ে আর ভাবলাম না মাথা ধরে আছে শুয়ে পড়লাম ইমনও লাইট বন্ধ করে পাশে এসে শুয়ে পড়লো।
____________
মিনু নিরবে চোখের পানি ফেলছে তার জীবনের কথা ভেবে সে তো চাইনি তার সাথে এমন হোক তার কি অপরাধ ছিলো যার শাস্তি সে এভাবে পাচ্ছে। পরিবারের বড় মেয়ে হওয়াতে সে কখনো কোনো সম্পর্কে জড়াইনি,পরিবারের ইচ্ছেতে বিয়ে করেছিলো। মিনু দেখতে খারাপ না হলেও রং ছিল চাপা। কালো চেহেরার যে দাম নেই সেটা বিয়ের পর বুঝে গেছিল সে, বিয়ের আগে তার পরিবার কখনো গায়ের রং নিয়ে কথা শুনাইনি বরং বাবার কাছে রানির মতো ছিলো। বিয়ের কিছুদিন ভালোই যাচ্ছিল মিনুর জীবন তার স্বামি মাহফুজ ভালো ছিল কিন্তু তার শাশুড়ি, ননদ, দেবর আর দেবরের বউ ভালো ছিলনা। তার স্বামির আগেই তার দেবর বিয়ে করে ফেলছিল। কোনো কাজ কাম করতো না। শশুড় আর তার স্বামীর করা আয় বসে খেতো। মিনু যাওয়ার পর পরি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল সংসারে সমস্ত কাজ। ঘড় ঝাড়ু থেকে শুরু করে রান্না বান্না সব কিছুই। ননদ বিবাহিত হলেও সে বাপের বাড়ি থাকতো বেশি সময় রাজত্ব করতো এমন করে যেনো তারই সংসার। ছোট দেবরের বউ ছিল সুন্দরী সেও তার ননদের সাথে মিশে মিনুকে জব্দ করতো। মাহফুজ কাজের জন্য প্রায় বাহিরে থাকতো বউয়ের প্রতি তার দায়িত্ব ছাড়া অন্য কোনো বিষয় সে দেখতো না। নিজের মা যেটা বলতো সেটাই সে শুনতো। মিনু সব বুঝতো ভাবছিল সব ঠিক হয়ে যাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতো। বাবা মায়ের কাছে কখনো কোনো কথা বলতো না তারা কষ্ট পাবে ভেবে।তারা কখনো শুনতে চাইনি তাই হয়ত বলা হয়নি।মুখ বুঝে সয্য করে নিতো সংসার বাচানোর জন্য কিন্তু শেষ রক্ষা কি হলো? সেই তো তাকে…
‘এই মিনু, মিনু! কি রে কখন থেকে ডাকছি।
এসব ভাবতে ভাবতে পিছনে ফিরে দেখে তার মা ডাকছে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তাই হয়তো রাহেলা দেখতে পেলোনা মেয়ের চাপা কষ্ট।
আমি খাবোনা মা কতবার বলবো।
কেনো খাবিনা, তুই দিন দিন এমন হয়ে যাচ্ছিস কেনো মিনু? কি হয়েছে তোর আমাকে বল।
মিনু উঠে দাড়ালো সে বলতে চাইনা, সময় থাকতে তারা তো একটাবার শুনেনি এখন শুনে কি করবে? সোজা হেটে চলে গেলো তার রুমে। রাহেলা ভাত এনে রাখছিল চুপচাপ খেতে শুরু করলো না খাওয়া পযন্ত মা শান্তি দিবেনা সেটা ভালোই বুঝতে পারলো।
রাহেলা বানু শুধু মেয়ের কাজ কর্ম দেখে যাচ্ছে, ডিভোর্সের পর থেকে তার মেয়ে একদম পাল্টে গেছে,মিনু তো এমন ছিলনা। কি হয়েছে তাকে যে করে হোক জানতে হবে। তার মেয়ের এমন ব্যবহার সেও মানতে পারছেনা।মিনুর খাওয়া শেষে শুয়ে পড়লো রাহেলার চোখে ঘুম নেই তার মাথায় মেয়ের জন্য চিন্তা ভিড় করলো মনে মনে দোয়া চাইল আল্লাহর কাছে।
চলবে?
