#শুদ্ধতার_অন্দর —০১
#প্রানেশা_আহসান_শীতল
গ্রামের পঞ্চায়েতের একমাত্র ছেলে ঐহিক বিয়ের আসর থেকে সপ্তদশী শুদ্ধতাকে তুলে নিয়ে বিয়ে করেছে। শুদ্ধতাদের বাড়িতে হইচই তো লেগেই গেছে এদিকে পঞ্চায়েত বাড়ির অবস্থা ভীষণ থমথমে। ঐহিক মেয়েটাকে শুধু বিয়ে করে বাড়িই আনেনি নিজের ঘরে আঁটকে পর্যন্ত রেখেছে৷ এতেই ভীষণ বিরক্ত ও রাগান্বিত ঐহিকের বাবা এনামুল সাহেব। বাড়িতে থমথমে অবস্থা থাকলেও শুদ্ধতাকে ঘরে আঁটকে দিয়ে ঐহিক কোথায় গেছে কেউ জানে না। এর মধ্যে শুদ্ধতার বাবা এসেছে যিনি কিছু কাজের জন্য সকালে গ্রামের বাহিরে গেছিলেন কিন্তু কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসার পর — তিনি শুদ্ধতা তুলে নিয়ে বিয়ে করার ব্যপার শুনে হতভম্ব হয়ে যায়।
গ্রাম প্রধানের ছেলে এমন কাজ করেছে তাই তিনি কোন পদক্ষেপও নিতে পারলেন না। তবে পঞ্চায়েতের সাথে কথা তো বলতে হবে এসব তো আর মানা যায় না? তাই তিনিও নিজের ছেলেকে সিয়ামকে নিয়ে রওনা হলেন পঞ্চায়েতের বাড়ি।
শুদ্ধতার বাবা সুজন সাহেব মুখ থমথমে করে পঞ্চায়েত বাড়ির বিশাল গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সাথে সিয়াম—হাতের মুঠো শক্ত করে ধরা, চোখে আগুন। এমন অপমান তো মেনে নেওয়া যায় না! ঘরে না জানিয়েই মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে? আর কেউ না, স্বয়ং পঞ্চায়েত প্রধানের ছেলে ঐহিক!
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চাকর দ্রুত ভিতরে ঢুকে খবর দিল,
“বাহিরে শুদ্ধতার বাবা আর ওর ভাই এসেছে—আপনার সাথে কথা বলবে বলে।”
এনামুল সাহেব তখন উঠোনে বসে আছেন, চোখ মুখ কষে থাকা। সাদা পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো, মুখে ছেলের প্রতি ক্রোধ আর তার কাজে অপমানের ছাপ।
” নিয়ে আসো তাদের।”
গম্ভীর স্বরে বললেন তিনি।
শুদ্ধতার বাবা উঠনে পা রেখেই বলে উঠলেন,
“এটা কী ধরনের বিচার এনামুল সাহেব? আপনি তো গ্রামের মাথা! আপনার ছেলেই যদি আইন হাতে তুলে নেয়, তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কী করবো?”
সিয়াম ততক্ষণে সামনে এসে পড়েছে, “আমার বোন কোথায়? তার কি মত ছিল এই বিয়েতে? শুদ্ধতাকে তুলে এনে বিয়ে করেছে কেনো ঐহিক ভাই! ?”
এনামুল সাহেব চুপচাপ বসে থাকেন। চোখ তার কঠিন। একসময় ধীরে ধীরে বলেন,
“ওই পোলা আমারেও জানায় নাই। একরোখা, হেডস্ট্রং ছেলে আমার — যা মন চায় তাই করে বসে। কিন্তু… এই কাজের দায় আমি এড়াতে পারি না।”
“তাহলে?” সুজন সাহেবের গলা কাঁপছে রাগে।
“তাহলে আজকেই পঞ্চায়েত ডাকা হবে। সবকিছুর হিসাব হবে প্রকাশ্যে। আমার ছেলের বিচার আগে আমিই করবো।”
বলে উঠলেন এনামুল সাহেব। এই ঘোষণায় চারপাশে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। পঞ্চায়েত ডাকা মানে পুরো গ্রামের সামনে সবকিছু খোলসা হবে। কে দোষী, কে নির্দোষ—তা ঠিক হবে নিয়ম মেনে।
“তবে… ঐহিক কোথায়?”
ঠিক তখনই কেউ একজন দৌড়ে এসে খবর দেয়,
“ছোট বাবু! ঐহিক ভাই বাইরে থেকে ফিরছেন।”
সব চোখ তখন তাকায় বাড়ির প্রবেশদ্বারের দিকে। দেখা যায়, ঐহিক ধুলোমলিন জামা পরে, চোখে ক্লান্তি আর মুখে একরাশ চিন্তা নিয়ে বাড়িতে ঢুকছে। তার হাতে একটি ফাইল। তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ে শুদ্ধতার বাবার চোখে।
সে থেমে যায়। শুদ্ধতা এখন কি করছে? কেউ জানে না, কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি বলে দেয়—এই বিয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা এখনো কেউ জানে না।
ঐহিক বাড়িতে ঢুকেই কারো কথা না শুনে সোজা উঠে গেল নিজের ঘরের দিকে — যেখানে শুদ্ধতাকে আঁটকে রাখা হয়েছে। তার চোখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু মনের গভীরে একটা শান্তি। দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে ধীরে ধীরে দরজা খুলে ঢুকলো। শুদ্ধতা চুপচাপ বিষন্ন মনে বসে ছিল জানালার ধারে। ঐহিককে দেখে চোখের পাতা একটু কাঁপলো, কিন্তু মুখে কিছু বললো না।
ঐহিক ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে ফাইলটা রেখে বলল,
“তোমার কিছুই বোঝার ছিল না, আমি জানি। কিন্তু আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে চাইনি, শুদ্ধতা। এই বিয়েটা… হঠাৎ নয়। এটা আমার বহুদিনের না বলা ভালোবাসার প্রকাশ।”
শুদ্ধতা অবাক হয়ে তাকায়।
” আপনি কী বলছেন এসব? আমরা তো কখনও কথা বলিনি ঠিক করে।”
“তাই তো,” মৃদু হাসে ঐহিক। “তবুও আমি দেখেছি তোমায়… প্রতিদিন সকালে, স্কুলে যাওয়ার পথে… প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে, এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে তোমার ফ্রেন্ডের সাথে গল্প করা… আমি দেখেছি, আর কিভাবে ভালোবেসে ফেলেছি।”
শুদ্ধতা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
“তাহলে হঠাৎ এইভাবে…?”
ঐহিক নিচু গলায় বলে,
“কারণ পাত্রপক্ষ ঠিক হয়েছিল তোমার। তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছিলে আর আমি বুঝলাম—এখন না বললে, আর কখনই বলতে পারবো না। তাই… তুলে নিয়ে এলাম। ভুল করেছি হয়তো, কিন্তু…”
সে থেমে যায়। তারপর আবারো ধরা গলায় বলে—–
“তুমি চাইলে আমি তোমায় ফিরিয়ে দেব। মুক্তি দেব। কিন্তু যদি তুমি থেকো, তবে আমি প্রমাণ করে দেব—এই ভালোবাসা শুধুই আবেগ নয়, দায়িত্বও আছে।”
শুদ্ধতা নিঃশব্দে নিশ্বাস আঁটকে হতবাক মুখে ঐহিকের দিকে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। শুদ্ধতার চোখে জল, ঠোঁটে চাপা কাঁপুনি। এই মানুষটা, যাকে সে ভয় পাচ্ছিল এতক্ষণ, আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে কি… তার নিজের হৃদয়ের মধ্যেও একটু হলেও জায়গা করে নিয়েছে ঐহিক? হয়তো এই ছেলের জন্য গ্রামের মেয়েরা পাগল। সেখানে যে শুদ্ধতা নেই; তেমন নয়! সেও ঐহিককে পছন্দ করে। ঐহিক শুদ্ধতার থেকে কম হলেও নয় থেকে দশ বছরের বড় তাই সে কখনো সাহস করে নি কিন্তু ঐহিক তাকে দেখতো সে জানতো না উল্টো সে নিজেও ঐহিক কে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখতো। ঐহিক যেখানে যেখানে যেতো বান্ধবী মেরিনাকে নিয়ে সেখানের আশেপাশে থাকার চেষ্টা করতো। অথচ লোকটা তাকে ভালোবাসে সেটা শুদ্ধতা টেরই পায় নি?
—————————
গ্রামে পঞ্চায়েত ডাকা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঐহিক তার ভালোবাসার স্বীকারোক্তি আর ফাইলের ভিতর থাকা শুদ্ধতার বিয়ের প্রমাণ এবং যার সাথে বিয়ে ঠিক করা হয়েছিলো তার কিছু কুকর্মের প্রমাণ দেখাতেই সবাই চুপ হয়ে যায়!
ঐহিক সবাইকে পরক্ষ করে শান্ত স্বরপ বলে—
” আমি শুদ্ধতা ভালো ভালোবাসি। কিন্তু ওকে বিয়ের আসর থেকে তুলে আনা আমার ভুল হয়েছে আমি জানি কিন্তু বেশি দেরী করলে খুব বড় একটা ভুল হতো। সুজন আঙ্কেল ছিলেন না; কার সাথে কি বলবো না করবো মাথা কাজ করছিলো না তাই সোজাসুজি শুদ্ধতাকে তুলে এনেছি! তবে বিয়ের ব্যপারটা এমন নয় যে আমি জোর করনি! শুদ্ধতা স্বেচ্ছায় সই করেছে—ভুল করলেও বাধ্য করা হয়নি তাকে।”
সব শুনে দেখানোর পর গ্রামের মানুষ কিছুটা থমকে যায়। পঞ্চায়েত প্রধান এনামুল সাহেব মুখ গম্ভীর করে বললেন—
“বিয়েটা হুট করে হইছে, ভুল হইছে, কিন্তু ঐহিক যদি দায়িত্ব নেয়, শুদ্ধতা যদি এখানে স্বস্তিতে থাকে—তাহলে সমাজও মেনে নিতে পারবে।”
শুদ্ধতা সামনে এসে মাথা নিচু করে বলে—
“আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না। আমি… বুঝে গেছি, এটা কোনো ভুল ছিল না। এটা হয়তো একটা অসমাপ্ত অনুভব ছিল, যেটা শুরু হবার অপেক্ষায় ছিল শুধু।”
সুজন সাহেব একথা শুনে মেয়ের মুখের দিকে রক্তমুখ নিয়ে তাকিয়ে আছেন তবে এতো মানুষের মাঝে কিছুই বলতে পারলেন না।
সাথে গ্রামে ধীরে ধীরে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—
“ঐহিক তো আগেই পছন্দ করতো মেয়েটারে।”
“বউটা দেখতে খুব শান্ত, ভালো মেয়া।”
“ঐহিকের মতো একরোখা ছেলে যদি ভালবাসতে পারে, তাহলে সে বুঝি বদলাচ্ছে।”
——————-
বিয়ের পরের রাতগুলোয় শুদ্ধতা ঐহিকের ঘরে থাকলেও তাদের মাঝে এক চুপচাপ দূরত্ব থেকে যায়। ঐহিক জোর করে না, বরং প্রতিদিন তার জন্য কিছু না কিছু করে — সকালে উঠে শুদ্ধতার সাথে ছাঁদে যায় অথবা বাগানে হাটতে যায়, মাঝে মাঝে তার প্রিয় ফুল এনে টেবিলে রাখে, কখনো চুপিচুপি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তার গাওয়া গান শুনে।
এক রাতে, হঠাৎ শুদ্ধতা খেয়াল করল; ঐহিক নিজের পুরোনো ডায়েরি পড়ছে। সে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বলল,
“ডায়েরিতে কি করছেন?”
ঐহিক চমকে তাকায়, হালকা হাসে—“ এখানে তোমার কথা লেখা আছে এতে। অনেক আগে থেকে।”
শুদ্ধতা বসে পড়ে তার পাশে তারপর অবাক গলায় শুধায় —
“আমার কথা?”
“হ্যাঁ… তোমাকে যখন দেখতাম মনের মাঝে একটা কথাই মনে পড়তো এটা একটা পুতুল। একে এদিক-সেদিক নয় আমার বাসায় সাজিয়ে রাখার জন্য জন্ম হয়েছে। তখনই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম – এই মেয়ে আমার হবে আর, এই মেয়েটাই আমার শান্তি হবে একদিন।”
শুদ্ধত লাজুকমুখে ধীরে ধীরে বলে,
“আমি ভাবতাম আপনি খুব রাগী, ঠান্ডা হৃদয়ের। কিন্তু এখন চমৎকার লোক মনে হচ্ছে!”
—
চলবে?
