#শুদ্ধতার_অন্দর – ০২
#প্রানেশা_আহসান_শীতল
বিয়ে হয়ে গেছে প্রায় দশদিন। ঐহিক আর শুদ্ধতা এখন একই ছাদের নিচে, একই ঘরে, কিন্তু একই মনের মানুষ হয়ে ওঠার যাত্রাটা যেনো মাত্র শুরু হয়েছে। ঐহিক শুদ্ধতার জন্য কখনো বাজার থেকে সাজার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসছে, কখনো তার প্রিয় লাল জবা-ফুল এনে বিছানার পাশে রেখে দিচ্ছে। আবার কখনো সন্ধ্যার পর ছাঁদে বসে তার পড়া কোরআনের আওয়াজ শুনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
শুদ্ধতা মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকে ঐহিকের দিকে। যে পুরুষটাকে এতদিন ভয় পেত, এখন তাকে না দেখে মনে অস্থির লাগে। অথচ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। ঐহিকও যেন ধৈর্য ধরে অপেক্ষায় থাকে—শুদ্ধতা কবে তাকে নিজে থেকে ডাকবে, কথা বলবে, একটু কাছে টানবে।
একদিন দুপুরে বাড়ির সবাই ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ বাইরে থেকে বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ আসতে লাগল। জানালার পাশে বসে শুদ্ধতা কুরআনের আয়াত পড়ছিল। হালকা বাতাসে ওড়না একটু উড়ে যাচ্ছিল বারবার। ঠিক তখনই ঐহিক ঘরে ঢুকলো। জামা ভিজে গেছে, চুলে পানির ফোঁটা, মুখে ক্লান্তি মেশানো হাসি।
“এত বৃষ্টি, বাইরে গিয়েছিলেন?” শুদ্ধতা জিজ্ঞেস করল, চোখ নামিয়ে।
“তুমি যেটা বলেছিলে কাল রাতে, মনে আছে? তোমার বাবার জন্য একটা ফার্মেসি দরকার গ্রামের এই পাশে… তাই জমির মালিকের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম।”
শুদ্ধতা একটু চমকে তাকায়। তার সামান্য কথা মনে রেখেছে ঐহিক?
ঐহিক ভিজে জামাটা খুলে টেবিলের ওপরে রাখে। ভেতরে হাফ হাতা টিশার্ট, ভেজা শরীরটা যেন ঝরনা থেকে উঠে আসা কোনো পুরুষ দেবতা। শুদ্ধতার গলা শুকিয়ে আসে। চোখ সরিয়ে নেয় তাড়াতাড়ি।
“তুমি চাইলেই আমি তোমার সামনে আসবো না, জানো তো?” ঐহিক হালকা কণ্ঠে বলে।
“না… আপনি থাকুন,” গলা কাঁপে শুদ্ধতার। “এই বাড়িতে আপনি ছাড়া আর কে আছে আমার?”
এই কথায় ঐহিকের মুখে গভীর কিছু একটা খেলে যায়। সে ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসে। শুদ্ধতা বুকের মধ্যে চাপা ধুকপুকানিটা থামাতে পারে না। ঐহিক বসে তার সামনে। একেবারে চোখে চোখ।
“ তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছো,” বলে সে মৃদু গলায়।
শুদ্ধতা মুখ নিচু করে হাসে— সে লাজুক লতায় গুটিয়ে ভীষণ নার্ভাস অনুভব করছে।
ঐহিক আবার বলে, “আমি প্রতিদিন সকালে উঠে তোমার শাড়ির রঙটা খেয়াল করি, আজ লাল পরেছো… আমি লাল ভালোবাসি।”
“তাহলে কাল নীল পরবো,” শুদ্ধতা একটু মুচকি হেসে বলে।
ঐহিক থেমে যায়। সে জানে, এই মেয়েটি তাকে মেনে নিচ্ছে একটু একটু করে। ধীরে ধীরে নিজের দেয়াল ভেঙে সামনে আসছে। সে হাত বাড়িয়ে শুদ্ধতার মুখে এক ফোঁটা পানি স্পর্শ করে—চুল থেকে গড়িয়ে পড়া। শুদ্ধতা চোখ বন্ধ করে নেয়, একটা শ্বাস আটকে রাখে নিজের ভেতরে।
“তোমার গালটা ভিজে গেছে,” ঐহিক বলে, কণ্ঠে নিঃশব্দ ভালোবাসা।
“বৃষ্টি থামবে?” শুদ্ধতা জিজ্ঞেস করে, চোখ খুলে।
“আমার ভিতরের বৃষ্টি তো এখনো থামেনি… তুমি থামাতে পারবে?”
শুদ্ধতা হেসে ফেলে। এরপর ধীরে ধীরে মাথা রাখে ঐহিকের কাঁধে। এই প্রথম… নিজের ইচ্ছেতে, লাজুকভাবে, ভালোবেসে। ঐহিক অবাক হয়, কিন্তু তার হাতটা তুলে শুদ্ধতার ওড়নার ওপর রাখে। খুব ভদ্রভাবে, শালীনতায়। যেন অনুমতি চাইছে। শুদ্ধতা নিজেই ঐহিকের হাতটা নিজের হাতে ধরে ফেলে। মৃদু স্পর্শ, তবু তার শরীর কেঁপে ওঠে। এ স্পর্শে কোনো কুপ্রবৃত্তি নেই—শুধু ভালোবাসা। ঐহিক তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
“শুদ্ধতা… তুমি যদি চাও, আজ রাতে আমি বিছানায় তোমার পাশে থাকবো। না চাইলে, মেঝেতেই শোবো।”
শুদ্ধতা চোখ তুলে তাকায়। সে হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বলে না। শুধু ঐহিকের টিশার্টের কোমড়ের কাছের একটু খানি খাঁচছে ধরে টেনে নেয় বিছানার দিকে। বাইরে বৃষ্টি নামে থেমে থেমে। ভিতরে প্রথম প্রেমের বারিধারা।
——
সকাল বেলা। ঐহিকের ঘরের জানালা খুলে রেখেই শুদ্ধতা বিছানা গুছাচ্ছিলো। বাইরে গরুর গাড়ির টুংটাং, মাটির গন্ধ, কলস কাঁধে নদীর ঘাটে যাচ্ছে মেয়েরা। হালকা বাতাসে চুলের কিছু অংশ চোখে এসে পড়ছে বারবার, শুদ্ধতা হাত দিয়ে সরিয়ে নিচ্ছিল। আর তখনই দরজার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঐহিকের চোখে ধরা পড়ছিল এক নিঃশব্দ মোহ।
“ কেনো যেনো মনে হচ্ছে আজকে শাড়ির আচলটা একটু আলগা করে গুঁজে রাখা… উমমম… খুব ভালো লাগছে।”
আচমকা কথায় শুদ্ধতা চমকে তাকায়।
“আহ! আপনি তো সকালে উঠে দুষ্টুমি শুরু করলেন?”
“সকাল বলেই তো!” ঐহিক হাসে, “সকাল যদি তোমার চোখের মতো সুন্দর হয়, তাহলে দুষ্টামি করতেই ইচ্ছে করে।”
শুদ্ধতা চোখ গুটিয়ে হেসে বিছানায় বালিশ ছুঁড়ে মারে ওর দিকে—
“আপনি তো একেবারে পাকা প্রেমিক!”
ঐহিক বালিশ ধরে নেয়, ছুঁড়ে দেয় ফিরিয়ে—শুরু হয় ছোটখাটো বালিশ যুদ্ধ। কেউ কাউকে হার মানায় না। শেষমেশ ঐহিক এক ঝটকায় এগিয়ে গিয়ে শুদ্ধতার দুই কাঁধে হাত রেখে তাকে চমকে দেয়। শুদ্ধতার চোখে লাজ আর নিঃশব্দ ধকধকানি। তার শাড়ির আঁচলটা একপাশে পিছলে পড়েছে, গালজোড়া লাল হয়ে উঠছে।
“তুমি জানো এখন আমি চাইলে…”
“না!” শুদ্ধতা দ্রুত বলে ওঠে, “আমি জানি আপনি কিছুই করবেন না… কিন্তু…”
“কিন্তু?” ঐহিক নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে।
শুদ্ধতা চোখ নিচু করে ফিসফিস করে,
“কিন্তু যদি আপনি আমার আঁচলটা ঠিক করে দেন, তাহলে আমি… ভাববো আপনি আজ আমার খুব আপন।”
ঐহিক বিস্ময়ে তাকায়, তারপর ঠোঁটে একরাশ মিষ্টি হাসি। সে ধীরে ধীরে আঁচলটা ঠিক খরে শুদ্ধতার মাথায় তুলে দেয়, কপালে আলতো ছোঁয়ায় হাত রাখে।
“আল্লাহ তোমায় আমার ছায়া করে রাখুন,” তার মুখ থেকে উচ্চারিত হয় ছোট্ট দোয়া। শুদ্ধতা হঠাৎ চোখ ভিজিয়ে ফেলে—এতটা কোমলতা সে কল্পনাও করেনি।
—
আজকে বাড়িতে বাড়িতে পিঠা তৈরি হচ্ছে। নারকেল কোরা, গুড় গলানো, গরম ভাপে ছাপ দেওয়া পাতলা পাতলা ভাপা পিঠা। ঐহিক উঠনে বসে বাড়ির ব্যবসার হিসেবি খাতা দেখছে। হঠাৎ একখানা ভাপা পিঠা তার পাতার মাঝে এসে পড়ে।
“এই নিন, পরীক্ষা দিন… আমি আজ প্রথমবার নিজে বানিয়েছি।”
শুদ্ধতা দাঁড়িয়ে থাকে দুই হাত কোমরে, একগাল চওড়া হাসি নিয়ে। ঐহিক পিঠা মুখে দিয়ে বলল—“উহ… এটা পিঠা না, এটা গলায় আঁটকে যাওয়ার অস্ত্র!”
“কি??”
শুদ্ধতা রেগে বালতি থেকে পানি ছিটিয়ে দেয় ঐহিকের গায়ে। ঐহিক জোরে উঠে পড়ে, তারপর দৌঁড়ে গিয়ে ধরে ফেলে শুদ্ধতাকে। সে পিছলে যায়, ঐহিকের বুকে আছড়ে পড়ে। মুহূর্তটা থেমে যায়। ঐহিকের বুকের সঙ্গে ঠাসা শুদ্ধতার শরীর, চুল ভিজে গিয়ে তার গালে লেপ্টে আছে। দুইজনেই নিশ্বাস ফেলে। ঐহিক মুখ নিচু করে শুদ্ধতার কানের পাশে ফিসফিস করে বলে—
“এটা গলায় আঁটকে গেলেও, আমি সারাজীবন খেতাম… যদি জানতাম তুমি এমন করে এসে পড়বে আমার বুকের ভেতরে।”
শুদ্ধতা তড়াক করে সরে আসে। তারপর নিজের শাড়ি ঠিক করতে করতে বলে—
“আপনি একদমই ভালো না!”
“তুমি তো ভালোই… এত ভালো যে, তোমার গায়ের ঘ্রাণটা এখন আমার ঘুমের ওষুধ হয়ে গেছে।”
—
শোবার ঘরটা অল্প আলোয় ঝলমল। শুদ্ধতা আয়নায় বসে চুল শুকোচ্ছে। ঐহিক বিছানায় হেলান দিয়ে তার ডায়েরি খুলেছে।
“শোনো, একটা কবিতা পড়াবো?”
“হুম।”
ঐহিক পড়ে—
“তোমার শাড়ির আঁচলে আজ গোলাপের সুবাস
কেন জানি মনে হচ্ছে, তুমি আসবে আজ আমার কাছে।
তোমার চুলে জড়িয়ে আছে আমার প্রিয় নাম,
আমি তোমার নীরবতা ছুঁয়ে জাগবো সারারাত…”
শুদ্ধতা আয়নার সামনে থমকে যায়। ধীরে ধীরে উঠে এসে ঐহিকের পাশে বসে।
“এই কবিতার নাম কী?”
“শুদ্ধতার অন্দর।”
শুদ্ধতা একদম চুপচাপ। চোখে জল টলটল করছে। সে এগিয়ে এসে আরোকটি কাছে ঐহিকের পাশে বসে। ঐহিক শান্ত ভাবে শুদ্ধতাকে দেখে হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। শুদ্ধতা সব অনুভব করে সহজ গলায় শুধায়—
“আপনি এত সুন্দর করে ভালোবাসেন, আমার তো ভয় হয়।”
“ভয় পেও না। ভালোবাসা যদি আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু হয়, সে ভয় নয়… সে ইবাদত।”
শুদ্ধতা ধীরে ঐহিকের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। সে হাত বাড়িয়ে ঐহিকের গালে হাত ছোঁয়ায়। মুখটা কাছে আনে। খুব কাছাকাছি। ঠোঁট ছুঁয়ে যায় কপালে। ঐহিক তার কোমরে হাত রেখে ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দেয় শুদ্ধতার কপাল, এরপর চোখে, নাক এবং খুব আলতোভাবে গালে। এই রাতে ওদের কোনো গর্জন নেই, কেবল দেহজ অনুভূতির এক বিনয়ী, সুশীল ও গভীর স্পর্শ।
—
চলবে—!
