#হিমেল_রাতের_অতিথি।
পর্ব:- দুই।
লেখা:- সিহাব হোসেন।
সকাল বেলা ভেসে আসছিল পুলিশের সাইরেনের তীব্র শব্দ। সায়নের পুরো পাড়াটা যেন একটা নি*ষিদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়েছে। হলুদ ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে পাশের বাড়িটা, যার ভেতরে-বাইরে পুলিশের আনাগোনা। এলাকার মানুষের চোখেমুখে আতঙ্ক আর চাপা কৌতূহল। বাতাসে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিল ফিসফিসানি, পাশের বাড়ির বড় ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের মাথাকা*টা লা*শ নাকি আজ ভোরে রাস্তার ধারে পাওয়া গেছে। এমন নৃ*শংস হ*ত্যাকাণ্ড এই শান্ত এলাকায় আগে কেউ দেখেনি।
সায়ন বাইরের এই অস্থিরতায় না থেকে ঘরে ফিরে এলো। দেখলো, অধরা ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে ব্যস্ত। তার পরনে সেই টিয়া রঙের জামা, খোলা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। এই বিশেষ রঙে অধরাকে বরাবরই অসম্ভব সুন্দর লাগে। এক মুহূর্তের জন্য সায়নের মনে অতীতের হাজারো স্মৃতি যেন হুমড়ি খেয়ে পড়লো। এই রঙের পোশাকটা সায়নের খুব প্রিয় ছিল বলেই অধরা প্রায়ই পরত। সায়ন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। অধরা মসলাদানি থেকে কী একটা নিতে গিয়ে পেছনে ঘুরতেই সায়নকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভীষণ লজ্জা পেল। তার গালের ওপর রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়লো। সায়ন দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিজের ঘরে চলে এলো। নিজের মনেই নিজেকে ধমক দিল সে, “ধুর! কী সব আবোলতাবোল ভাবছি। সে এখন অন্য কারো স্ত্রী।”
অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিল সায়ন। বেরিয়ে আসতেই দেখল, অধরা ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে বিস্ময়।
– “কী ব্যাপার! এত তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলে? খাবে না?”
– “না, আজ খেতে ইচ্ছে করছে না।”
সায়ন জুতো পরতে পরতে বলল,
– “বাইরের ওই সব দৃশ্য দেখে খাওয়ার রুচিটাই চলে গেছে। তোমরা খেয়ে নিও। তুষার ভাই এখনো ওঠেননি?”
– “না। ও আজকাল একটু বেশিই ঘুমাচ্ছে। ঋণের চাপে কত রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছে, তা তো বুঝতেই পারছো।”
– “হুম। নিজের খেয়াল রেখো। কোনো সমস্যা হলে ফোন দিও।”
– “ফিরবে কখন?” অধরার প্রশ্নটা সায়নের বুকে আলতো করে ধাক্কা দিল।
– “ঠিক নেই। ধরে নাও রাত আটটা-ন’টা বেজে যাবে।”
– “এত দেরি?”
– “একটা নতুন প্রজেক্ট পেয়েছি। সেটার পেছনে এখন একটু বেশি সময় দিতে হবে।”
– “আচ্ছা, সাবধানে যেও।”
রাস্তায় সায়নের জন্য অপেক্ষা করছিল রাকিব। সায়নকে দেখেই সে একটা চায়ের দোকানের দিকে ইশারা করলো। ভেতরে বসে রাকিব সরাসরি প্রসঙ্গে এলো।
– “তো, অধরাকে এতদিন পর দেখে তোর অনুভূতিটা ঠিক কেমন হলো?”
– “সেটা আর না-ই বা বলি।” সায়ন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইল।
– “শুনলাম তোর পাশের বাড়ির লোকটা খু*ন হয়েছে। বেশ বড় ব্যবসায়ী ছিল নাকি।”
– “হুম।”
– “আচ্ছা সায়ন, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস? কাল অধরা আর তার স্বামী এলো, আর কাল রাতেই লোকটা খু*ন হলো। ব্যাপারটা কেমন যেন বড্ড বেশি কাকতালীয় মনে হচ্ছে না?”
রাকিবের কথা শুনে সায়ন হেসে উঠলো। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না।
– “তুই এমনভাবে বলছিস, যেন খু*নটা অধরা আর তার স্বামী মিলে করেছে!”
– “হতেও তো পারে। বিপদে পড়লে মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে।”
– “ধুর, বাদ দে তো এসব।” সায়ন প্রসঙ্গটা জোর করে থামিয়ে দিল।
রাতে যখন সায়ন বাসায় ফিরলো, তখন চারপাশ নিস্তব্ধ। সে দেখলো, অধরা আর তুষার তাদের ঘরে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে বসে নিচু স্বরে কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করছে। তাকে দেখেই তুষার ল্যাপটপটা বন্ধ করে হাসিমুখে উঠে এলো।
– “আরে, এত দেরি হলো যে? আমরা তো তোমার অপেক্ষাতেই বসে ছিলাম। ভাবলাম, তিনজন একসাথে ডিনার করব।”
– “আমি তো বাইরে থেকেই খেয়ে এসেছি।”
কথাটা শোনার সাথে সাথেই অধরার উজ্জ্বল মুখটা এক নিমিষে মলিন হয়ে গেল। সেই পরিবর্তনটা সায়নের চোখ এড়ালো না। তুষার প্রায় জোর করার সুরে বলল,
– “সেটা বললে তো হবে না। একটু বসো আমাদের সাথে। আমি আর কোনো কথা শুনছি না।”
তুষারের জোরাজুরিতে সায়ন আর না করতে পারলো না। সে ওদের সাথে খেতে বসলো। পুরো সময়টা অধরা একটা কথাও বলল না, শুধু নিঃশব্দে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল। এই নীরবতা ভাঙলো তুষার।
– “আচ্ছা অধরা, তুমি কাল থেকে এমন চুপচাপ হয়ে আছো কেন?”
– “কই? না তো.।” অধরার সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।
– “তাহলে কথা বলছো না যে?”
– “এমনি। তোমরা তো কথা বলছো, আমি শুনছি।”
– “হুম।”
তুষার সায়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
– “জানো সায়ন, আজ অনেকদিন পর অধরা মাছের ডিমের পেঁয়াজু বানিয়েছে। এটা আমার ভীষণ প্রিয় একটা খাবার। কিন্তু সে এতই অলস যে, একবার বানালে দুই-তিন মাসের মধ্যে আর বানানোর নামও নেয় না।”
তুষারের কথাটা শুনে সায়নের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মাছের ডিমের পেঁয়াজু, এটা তো ছিল সায়নের সবচেয়ে প্রিয় খাবার। অধরা প্রায় দু-একদিন পরপরই এটা বানিয়ে আনত। এই সামান্য খাবারটা বানানোর জন্য সে তার মায়ের কাছে কত বকা খেয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। সায়ন যেটা পছন্দ করত, অধরা পাগলের মতো সেটাই করত। এত গভীর ভালোবাসার পরেও সে কীভাবে এক ঝটকায় তাকে ছেড়ে চলে গেল, এই রহস্যের কোনো কিনারা সায়ন আজও করতে পারেনি।
খাওয়া শেষ করে সায়ন নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়লো। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত, কিন্তু মনটা অশান্ত। মনে মনে ভাবছে, ওদের এখানে আশ্রয় দিয়ে সে কি কোনো ভুল করে ফেললো? এই ক্লান্ত শরীর আর ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারলো না। অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
পরদিন সকাল।
শহরের অন্য এক প্রান্তে আরও একটি খু*নের খবর ছড়িয়ে পড়লো দাবানলের মতো। তবে সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, খুনের ধরনটা হুবহু এক, নৃ*শংস এবং পা*শবিক। সায়ন নিজের ঘরের নীরবতায় ডুবে থেকে খবরের কাগজের পাতায় চোখ বোলাচ্ছিল। তার শান্ত শহরটা হঠাৎ করে কেন এমন মৃ*ত্যুপুরী হয়ে উঠছে? কে বা কারা এই সিরিয়াল কি*লিংয়ের পেছনে? হাজারো প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু কোনো উত্তর মিলছিল না। একটা অজানা ভয় তার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোতের মতো নেমে গেল।
সায়ন যখন অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল, অধরা এসে দরজায় দাঁড়ালো। তার চোখেমুখে গভীর উদ্বেগ।
– “বাইরে যেভাবে মানুষ খু*ন হচ্ছে, সাবধানে থেকো। শুধু এখানেই নয়, আমাদের এলাকাতেও নাকি এমন খু*ন হয়েছে।”
– “ভয় নেই। আমার কিছু হবে না। আর হলেও বা কী যায় আসে?”
একটা নির্লিপ্ত হাসি দিয়ে সায়ন বেরিয়ে গেল। অধরা অসহায়ভাবে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। ঘরের ভেতরে তুষার তখনও ম*রার মতো ঘুমাচ্ছিল। অধরা নিঃশব্দে তার পাশে গিয়ে বসলো। দ্বিধাগ্রস্ত হাতে যেই না তুষারের ফোনটা তুলতে যাবে, অমনি তার হাত বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে তার কব্জিটা চেপে ধরলো। তুষারের চোখ দুটো খোলা, সেই চোখে ঘুম নয়, বরং এক হিং*স্র দৃষ্টি। সেই চাহনি দেখে অধরার বুকের ভেতরটা ভয়ে হিম হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই তুষারের অন্য হাতটা অধরার কোমরের নরম মাংসে এমনভাবে চেপে বসলো যে, য*ন্ত্রণায় তার মুখটা কুঁচকে গেল। তীব্র ব্য*থায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, কিন্তু মুখ ফুটে একটা শব্দও করতে পারছিল না। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। তুষার যেন এই য*ন্ত্রণা উপভোগ করছিল। সে চাপ আরও বাড়ালো। অধরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, তার মুখ দিয়ে একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। তুষারের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক পৈ*শাচিক হাসি। অধরা য*ন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভাঙা গলায় বলল,
– “এত কষ্ট দেওয়ার চেয়ে একবারে মে*রে ফেলো। আমার বাবা-মা’কে তো শেষ করেছো, আমি আর বাকি থাকি কেন?”
তুষার অধরার কোমর ছেড়ে দিয়ে এবার তার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– “এত তাড়াতাড়ি তোকে মা*রলে কি মজাটা থাকবে? তোকে তো মা*রব, তবে সবার শেষে।”
কথাটা বলেই সে অধরাকে একটা ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। অধরা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। তার ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে সবাইকে সব বলে দিতে, বিশেষ করে সায়নকে। কিন্তু সে পারছে না। তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাই এখন সায়ন। তুষার তাকে হুমকি দিয়ে রেখেছে, মুখ খুললে সায়নের জীবনটাও শেষ করে দেবে। তাছাড়া এই পুরো বাড়িতে তুষার গোপনে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে, যা সায়ন নিজেও জানে না। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন নজরবন্দী।
কিছুক্ষণ পর তুষার ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল অধরা ওভাবেই বসে আছে। কর্কশ গলায় ধমক দিয়ে বলল,
– “যা, রান্না কর। এভাবে বসে বসে ঢং করছিস কেন?”
অধরা ওড়না দিয়ে চোখ মুছে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। ঠিক তখনই তুষার তোশকের নিচ থেকে একটা চকচকে ধারালো দা বের করে তাতে শান দিতে শুরু করলো। ধারালো ইস্পাতের ওপর পাথরের ঘর্ষণের সেই ‘শাঁ শাঁ’ শব্দটা যেন অধরার হৃৎপিণ্ডে গিয়ে আঘা*ত করছিল। তার হাত-পা থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো। না জানি আজ রাতে আবার কার জীবন এই দা*য়ের নিচে ব*লি হতে চলেছে। সে আর স্থির থাকতে পারলো না। রান্না থামিয়ে ঘরে ছুটে এসে বলল,
– “দয়া করো, এসব বন্ধ করবে না?”
– “না। আমার দেনা শোধ করার জন্য আমি যেকোনো কিছু করতে পারি।”
– “পারলে তো তুমি আমাকেও বিক্রি করে দেবে!” অধরার কণ্ঠে ঘৃ*ণা আর অসহায়ত্ব।
– “তা আর বলতে! তবে তোকে বিক্রি করব না। কারণ আমি লোভী হতে পারি, কিন্তু এতটা নিচে নামিনি যে নিজের স্ত্রীর শরীরে অন্য পুরুষকে স্প*র্শ করতে দেব।”
অধরা তার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
– “সত্যি করে বলো তো, তুমি কি সত্যিই আমার বাবা-মা’কে মে*রে ফেলেছো?”
তুষার দা-টা পাশে রেখে অধরার দিকে ঝুঁকে এসে ক্রুর হেসে বলল,
– “এখনো মা*রিনি। তবে যতদিন তোর মুখটা বন্ধ থাকবে, ততদিন তারাও বেঁচে থাকবে। মাঝেমধ্যে বলি মে*রে ফেলেছি, তোকে একটু মানসিক যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। এতে বেশ মজা লাগে, জানিস?”
অধরা আর একটা কথাও বলতে পারলো না। তীব্র ঘৃ*ণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সে আবার রান্নাঘরে চলে গেল। তার
জীবনটা যেন এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয়েছে।
চলবে…???
