#লিটল_গার্ল
(পর্ব – ১)
#লেখা_আইজা_আহমেদ
(কপি পোস্ট নিষিদ্ধ )
নিজের হবু বরকে নিজেরই চাচাতো বোনের সাথে দেখে থমকায় রিদা। তার হবু বর, যে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে বিয়ে করার কথা ছিল, অথচ তাঁর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে অন্য কেউ। সেই অন্য কেউ আর কেউ নয়, রিদার আপন চাচাতো বোন, আনিশা।এরপরই শোনা গেল এক তীব্র চড়ের শব্দ।
সুধা বেগম, আনিশার মা, রাগে থরথর করে কাঁপছিলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে। তিনি আনিশার গালে সজোরে হাত তুলে দিয়েছিলেন। আনিশার গাল লাল হয়ে উঠেছে, কিন্তু সে এখনো মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে আছে।
এই ঝড়ের মাঝেও রাফায়েল ঠোঁটে একটুও অনুশোচনা দেখা গেল না। সেও বরং আনিশার হাত আরও শক্ত করে ধরে ফেলল।
সুধা বেগম দেখে চিৎকার করে উঠলেন।
“ছিঃ আমার মেয়ে বলতেও লজ্জা লাগছে তোকে। কিভাবে পারলি এটা করতে? তোর বোনের বরকে ছিনিয়ে নিচ্ছিস?একটুও লজ্জা লাগেনি তোর?”
চারপাশে কেউ কথা বলছে না। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সবার চোখে ঘৃণা আর বিস্ময়। বিয়ের আনন্দ এক মুহূর্তে ভেস্তে গেছে।
আনিশা তখন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল,
“লজ্জা? আমি কেন লজ্জা পাবো, মা? ভালোবাসা কি কারো বাঁধনে বাঁধা যায়? রাফায়েল আমাকে ভালোবাসে। তুমি যতই চড় মারো, সত্যিটা পাল্টাতে পারবে না।”
“চুপ কর, আনিশা। তুই আমার মুখ পুড়িয়ে দিলি। আত্মীয়স্বজন, সমাজ, সবাই আজ আমাদের নিয়ে হাসবে। নিজের রক্ত, আপন বোন হয়ে ওর জীবনটা এভাবে ভেঙে দিতে পারলি?”
আনিশার চোখে এক ফোঁটা অনুতাপ নেই। সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
“ভালোবাসার জন্য মানুষ অনেক কিছুই করে। আর ভালোবাসায় রক্তের সম্পর্কের কোনো দাম নেই।”
সুধা বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, তাঁর মেয়েটা যাকে এত আদরে মানুষ করেছেন। সে এতটা বেহায়া হয়ে গেছে।
ঘরের প্রতিটি মানুষ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
———-
রুমের ভিতর ভারী শূন্যতা ঝুলে আছে। বাইরের এখনো কৌতূহলী আত্মীয়স্বজনদের গুঞ্জন ভেসে আসছে। ভিতরে রুমে কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। লাল-নীল আলো ঝলকাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ঘরে বিষণ্ণতার আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। রিদা তাঁর ঘরের ভেতরে।
রিদার মা, মহফুজা বেগম, শাড়ির আঁচল দিয়ে বারবার চোখ মুছছেন। বুকের ভেতর হাহাকার চেপে রাখলেও, মুখে অসহায় নিস্তব্ধতা। তাঁর পাশে বসা নাজিম সাহেব, গম্ভীর চেহারায়, ভারী চোখ নামিয়ে রেখেছেন। সংসারের এত সম্মান, এত আত্মীয়স্বজন সামনে। সবকিছু এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পাশের সোফায় বসে আছেন রিদার খালা, মালিনী বেগম। তাঁর পাশে সুধা বেগম আর তাঁর স্বামী মফিজ সাহেব। আনিশা ওরা চলে গেছে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে মালিনী বেগম অবশেষে গলা ভাঙলেন।
“এসব নিয়ে কাঁদলেও কোনো লাভ নেই। যা হওয়ার, তা হয়ে গেছে। এখন আমাদের রিদার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে।”
মহফুজা বেগম মাথা নিচু করে বললেন,
“কী করব ভাবছি। মেয়েটা কি সহ্য করতে পারবে এই লজ্জা? বিয়ের দিনই।”
নাজিম সাহেব গভীর নিশ্বাস ফেলে বললেন,
“কিন্তু এভাবে তো আর অনুষ্ঠান থামানো যায় না। এত আত্মীয়স্বজন সবাই চোখে চোখ রাখছে।”
“রিদাকে নিয়ে এত কষ্ট কোরো না। যা হয়েছে, তাতে আমাদের কিছু করার নেই। তবে একটা কথা বলতে চাই, যদি তোমরা রাজি হও। তাহলে আমি আমার ছেলে আদ্রর সঙ্গে রিদার বিয়ে দিতে চাই। আজকের এই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য যদি ও রিদার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে মান-সম্মানও অটুট থাকবে।”
মুহূর্তেই ঘরের নিস্তব্ধতায় নতুন তরঙ্গ বইলো। মহফুজা বেগম আর নাজিম সাহেব দু’জনেই মাথা তুললেন। চোখে অবাক দৃষ্টি তাঁদের।
নাজিম সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,”আদ্র?”
মালিনী বেগম মাথা নেড়ে হাসলেন,
“হ্যাঁ, আমার আদ্র। তুমি জানোই, ওর চরিত্র কেমন। মায়ের একমাত্র ছেলে হলেও আদিখ্যেতা নেই। পড়াশোনায় ভালো, দায়িত্ববান। বোনের মেয়েকে বউ করে আনতে চাই, তাতে আমাদেরও খুশি হবে। আর রিদার মতো মেয়ে আমার সংসারে আসলে, আমি নিশ্চিত আমার আদ্র ভাগ্যবান হবে।”
মহফুজা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বললেন,
“আমাদের মেয়ে যে ভেঙে পড়েছে, ওর বুকের ভেতর যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, সেটা মুছতে পারবে তো তোমার আদ্র?”
মালিনী বেগম গাম্ভীর্যে মাথা ঝাঁকালেন,
“ও যদি রাজি হয়, আমি জানি আদ্র ওর পাশে থাকবে।”
নাজিম সাহেব মৃদু স্বরে বললেন,
“আদ্রকে আমরা চিনি। ভালো ছেলে। আর আমাদের রাজি না হয়ে উপায় কী। সমাজের সামনে মুখ দেখানো দায় হয়ে গেছে।”
মালিনী বেগম একটু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
“একটু দাঁড়াও, আমি আদ্রকে ডেকে আনি।
তিনি করিডরের দিকে এগোলেন। একটা সোফায় আদ্র হেলান দিয়ে বসেছিল। হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিনে চোখ আটকে আছে। মালিনী বেগম এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন সামনে।
মৃদু স্বরে ডাকলেন, “আদ্র।”
ফোন থেকে চোখ তুলে তাকাল আদ্র। গম্ভীর চোখে মায়ের দিকে চাইল। মালিনী বেগম কিছুক্ষণের জন্য নীরব থাকলেন। তাঁর চোখে এখনো উদ্বেগের ছাপ। তারপর বললেন,
“তোর খালার বাড়িতে যা ঘটেছে। সব শুনেছিস নিশ্চয়ই।”
আদ্র গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথায় নাড়ালো। অর্থাৎ সে শুনেছে। মালিনী বেগম ধীরে ধীরে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।
“তুই তো জানিস, রিদা নির্দোষ। আজকের দিনে, ওর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা ভেঙে গেল। যে মুহূর্তটার জন্য সে স্বপ্ন বুনেছিল, সেই মুহূর্তে সে অপমানিত হলো, ভেঙে পড়ল। মেয়েটা একদম ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, আদ্র। আমি চাই, তুই ওর পাশে দাঁড়াস।”
আদ্র কিছু বলল না। শুধু গম্ভীর চোখে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। তবে চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তির রেখা। মালিনী বেগম একটু থেমে আবার বললেন, “আমি চাই, তুই রিদাকে বিয়ে কর।”
———
সারা রুম জুড়ে পায়চারি করছে রিদা। রাগে ফেটে পড়ছে । হাত দুটো কাঁপছে, চোখে লাল রক্তিম রেখা,রাগে থরথর করছে তার শরীর। তার সব হিসেব, সব কৌশল, সব পালানোর পরিকল্পনা ভেস্তে দিল আনিশা। রিদার বুকের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে অগণিত চিন্তা। এখন সে কী করে এখান থেকে পালাবে ? ওর সমস্ত পরিকল্পনা যেটা সে এত কষ্টে সাজিয়েছিল সবকিছু ভেস্তে গেছে আনিশার কারণে। সেই ভাবনার ভারে তার হাঁটাচলা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল।
এই সময় মৃদু কণ্ঠে শোনা গেল, “এখানে একটু বসো আপু।”
রিদা হঠাৎ পায়ের গতি থামিয়ে তাকাল। তার চোখ পড়ল ওয়ারিনের দিকে। ওয়ারিন সোফার কোণে বসে আছে, শান্ত মুখ, নরম চোখ। ওয়ারিন এতিম, অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে, আর নাজিম সাহেবই তাকে এখানে এনেছেন। সেই তেরো বছর বয়স থেকে এ বাড়িতে আছে।
ওয়ারিনের কপাল বেয়ে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। রিদার রাগী চোখের দিকে তাকাতে সাহস পায় না সে।
রিদার গলার স্বর ভারি হয়ে এলো,
“সব শেষ হয়ে যাচ্ছে আমার। এই আনিশার জন্য এখন আমি বিপদে পড়ে গেছি। এখন আমি কী করবো? কিভাবে পালাবো।”
ওয়ারিন হাতের আঙ্গুলগুলো পেঁচিয়ে ধরে। গলার স্বরটা কাঁপছে। পালাতে চাইছে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে।
“আমি যাই, আপু।”
রিদা চিৎকার করে ওঠে, “কোথায় যাবি তুই? এখানে বস, এক পাও নড়বি না। আগে আমাকে পালাতে সাহায্য কর।”
রিদা আর ওয়ারিনের কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ রিদার ফোন বেজে উঠল। তীক্ষ্ণ রিংটোনে ঘরে আরও ভারি হয়ে উঠে। রিদা এক ঝটকায় ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনে পরিচিত নাম।
কাঁপা কাঁপা হাতে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তাড়াহুড়োর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“কী হলো? এখনো আসছো না কেন?”
রিদা চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিল। ঠোঁট কামড়ে বলল, “আমি আসছি,আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো।”
ফোন কেটে দিয়ে সে মুহূর্তেই ভীষণ অস্থির হয়ে পায়চারি শুরু করল রিদা। মুখে ঘাম জমে গেছে। সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছে ও। ওয়ারিন তখন সোফায় বসে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে আতঙ্ক আর বিস্ময়। সে বুঝতেই পারছে না আপুর মাথায় কী চলছে।
রিদা তখন এক পা এগিয়ে এসে ওয়ারিনের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে।
“তুই আমার একমাত্র ভরসা, বুঝলি? তুই আমাকে কথা দিয়েছিলি, মনে আছে তো?এখন আমার কথা তোকে রাখতে হবে।”
ওয়ারিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রিদাকে দেখতে ভয়ঙ্কর লাগছে। সে ভয়ে ভয়ে বলল,
“আপু… তুমি কী বলতে চাইছো?”
“আমার বদলে তুই বউ সাজবি। আজকের বিয়ে তুই করবি।”
কথাগুলো বজ্রপাতের মতো বাজল ওয়ারিনের কানে। শিউরে উঠল সে। তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ।
“কি… কী বলছো তুমি আপু? এটা কীভাবে সম্ভব?”
রিদার মুখ আরও শক্ত হয়ে গেল।
“সম্ভব না? তুই আমাকে কথা দিয়েছিস, তাই না? বলেছিলি আমার পাশে থাকবি? তুই যদি আজ না করিস, আমি শেষ হয়ে যাবো, বুঝলি?”
ওয়ারিন মাথা নাড়ল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গালে।
“আমার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। আদ্র ভাই জানলে… উনি আমাকে মেরেই ফেলবে।”
চলবে………??
