#সুখ_দুঃখ (শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
একদিন মিতু একটি ভুল করে বসে। যদিও সেটা ইচ্ছাকৃত ছিলো না। তবুও সে ভীষণ ভয় পাচ্ছিলো। তাই তৎক্ষনাৎ তার স্বামীর কাছে এসে অনুরোধ করে বলে,“প্লীজ আমাকে মা রবেন না৷ আমার ভুল হয়ে গেছে। স্যরি।”
এটা শুনে তার স্বামী তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলে,“মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। এই সামান্য ভুলের জন্য বকবো কেন? আর মা রবোই বা কেন?”
মিতু অবাক হয়ে তার স্বামীর দিকে তাকায়। এই ভুলের জন্যই সে আশেপাশে কত পুরুষকে চিল্লাপাল্লা থেকে শুরু করে গায়ে হাত তুলতে দেখেছে৷ সেখানে তার স্বামী সবটা স্বাভাবিকভাবে নিলো। শুধু তাই নয়। তার স্বামী বলে,“আর হ্যাঁ স্ত্রী ভুল করতেই পারে। হয়তো অজান্তে অপরাধও করে ফেলে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা উচিত নয়। তাই তুমি এভাবে অনুরোধ করবে না কখনো। বরং ভুলবসত কখনো যদি আমি তোমার গায়ে হাত তুলি তবে তুমি প্রতিবাদ করো। এটা অন্যায়। তুমি যদি ভুলটা শুধরে না দাও তবে আমি বুঝবো কিভাবে আমি ভুল করেছি? সেজন্য ভুলটা তোমাকেই শুধরে দিতে হবে। বুঝলে?”
মিতু বুঝতে পারে না। সে তবুও মাথা নাড়ায়। তার স্বামী বুঝতে পেরে তাকে শান্ত ভাষায় বোঝায়। একজন স্বামীর জন্য তার স্ত্রী তার সম্মান, তার দায়িত্ব, তার কর্তৃব্য৷ কিন্তু বস্তু নয়। সে এমন কোন বস্তু নয় যে তাকে চাইলেই যেকোন সময় তুলে আছাড় মা রা যায়। গায়ে হাত দেওয়া যায়। এটা অন্যায় এবং বেমানান। স্বামী, স্ত্রীর সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বের, ভালোবাসার। এখানে ভুল থাকবে, ঠিক থাকবে, সব থাকবে। তাই বলে একে-অপরের প্রতি অন্যায় অবিচার করা যাবে না। এগুলো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। মিতু এসব শুনে খুশি হয়। সে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি তার স্বামী এত ভালো হবে।
এই তো সেদিন বিয়ের সময়ও তাকে মুরব্বিরা বুঝিয়েছে, স্বামীর কথা শুনে চলতে। স্বামী যা বলবে তাই ঠিক। সে ভুল করতে পারে না। মাঝে সাজে গায়ে হাত দিতে পারে। তাই শরীরটা শক্ত করে নিতে। যাতে সব সয়ে যায়। অথচ তার স্বামী তাকে কত চমৎকারভাবে ভিন্ন এক বানী বোঝালো। এই তো সেদিনই মিতুর খুব ক্ষুধা পেয়েছিলো। কিন্তু তার মা বলেছে, বাড়ির মেয়েরা যখন তখন খেতে পারলেও বৌয়েরা পারে না। তাদের সবার শেষে খেতে হয়। তাই ক্ষুধা পেট চেপে রেখে সে ঘরের কাজ করছিলো। এটা দেখে তার শাশুড়ীই তাকে বলছিলো,“তোমার ক্ষুধা পেয়েছে খেয়ে নিবে৷ এখানে এত ভয়ের কী আছে? অন্যরা কখন খাবে না খাবে সেই হিসাব করে চললে তোমার পেট চলবে?”
সেদিনের পর থেকে মিতুর যখন ক্ষুধা পায় তখনই সে খায়। তার সংসারটা সুন্দরই কাটে। তবে হ্যাঁ মাঝে মাঝে শাশুড়ীর মুখ ঝামটা শুনতে হয়। সে কোন প্রতিবাদ না করলেও এসবে তার স্বামী প্রতিবাদ করে। তার স্বামীর কথা,“আমার বউ ভুল করলে আমি যেমন তাকে শাসন করবো তেমন ভুল না করে কেউ তাকে কথা শোনালে প্রতিবাদও করবো। সে যখন ভুল করেনি তখন তাকে অহেতুক এসব বিষয়ে কথা শোনানো উচিত নয়।”
তার স্বামীর কড়া গলায় বলা কথাগুলো কাজে দেয়। এরপর থেকে শাশুড়ী তাকে কম কথা শোনায়। মাঝে সাজে অবশ্য স্বামীর লাই পেয়ে সে নিজেও শাশুড়ীকে হিংসা করতে শুরু করেছিলো। তখনও তার স্বামী তাকে চমৎকারভাবে বুঝিয়েছে৷ তার স্বামী যেমন তার দায়িত্ব পালণ করছে তেমন মিতুরও নিজের দায়িত্ব পালণ করা উচিত। শাশুড়ী মায়ের মতো। সে হিংসার জিনিস নয়। অতঃপর মিতু ভুল করলে প্রথমে বোঝাতো, বোঝানোয় কাজ নাহলে বকতো। এসবে অবশ্য মিতু কষ্ট পায় না। তার স্বামী তাকে এত চমৎকারভাবে তার ভুলটা বুঝায় যে তার কষ্ট পাওয়ার কোন মানেই হয় না। তার স্বামী সেই সুযোগ তাকে দেয় না। এভাবেই তার স্বামীর নিরপেক্ষ আচরনে তার এবং তার শাশুড়ীর সম্পর্কও সুন্দর হয়। সব মিলিয়ে সে খুব খুশি আছে। হ্যাঁ মাঝে মাঝে সন্তান হয় না দেখে মন খারাপ হয়। এখানে তার শাশুড়ীও যে কষ্ট পায় সে সেটা বুঝতে পারে৷ তবে তার স্বামীর জন্য কিছু বলতে পারে না। আশেপাশের মানুষ এটা নিয়ে বললেই সে চুপ হয়ে যায়। তার মনটা খারাপ হয়। সবই মিতু বুঝে। তারও কষ্ট হয়। তবে তার স্বামী সবাইকে বুঝিয়ে বলেছে, এটা তো আমাদের হাতে নেই। সন্তান যখন হওয়ার তখন হবে। নাহলে কিছু করার নাই। তাই লোকে বাড়ি বয়ে এসে এসব যাতে না বলে। মিতু এবং তার শাশুড়ীকে সে সুন্দরভাবে এসব বুঝায়। সেই সঙ্গে ধৈর্য ধরতে বলে। যখন বাচ্চা হওয়ার তখন হবে।
এসবের মাঝে মিতুর যখনই কোন বিষয় নিয়ে মন খারাপ হয় তখনই তার স্বামী তাকে নিয়ে বাড়ির কাছেই ঘুরতে বের হয়। খুব স্বল্প খরচে তারা দু’জন সুন্দর এক বিকেল কাটায়। মিতুর এসব খুব ভালো লাগে। তার স্বামীর সার্মথ্য অনুযায়ী সে তাকে খুশি রাখার চেষ্টা করে। এটাই মিতুর জন্য বড় পাওয়া। কারণ সে দেখেছে অনেকের অনেক সার্মথ্য থাকা সত্ত্বেও এসব পায় না। যেখানে সে এমনি পেয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান,
মিতু এসব বলতে বলতে খুশিতে হাসে। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকি। সে বাবার বাড়ি আসায় তার স্বামী মনে করে তার জন্য শাড়ী এবং এই চেইনটি নিয়ে আসছে। এই চেইনটি কিনতে তার অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে এবং বেশ সময় ধরে টাকা জমাতে হয়েছে। মিতু গলার চেইন দেখিয়ে বলে। এগুলো তার স্বামী তার হাতে দিয়ে তৎক্ষনাৎ পড়ে নিতে বলেছে। সেও লোকে কী বলবে এসবে গুরুত্ব না দিয়ে তার স্বামীর পছন্দমতো সেজে নিয়েছে। অতঃপর দু’জন ঘুরতে বের হয়। ঘুরেফিরে এখন আসলো। মিতুর সব কথা এবং তার মুখের উজ্জ্বলতা দেখে আমি অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে গেলাম। এমন সুখের জীবন তো আমি কল্পনা করছিলাম। কিন্তু পায়নি।যেটা মিতুর হয়েছে। মিতু গল্প শেষ করে বলে,“আমি খুব সুখে আছি আপু। যদিও আমি জানি এই বিল্ডিং এর অনেকেই চায়নি আমি সুখী থাকি। তবে ভাগ্যটা আসল। যার ভাগ্যে যা আছে তা হবেই। আমার ভাগ্য ভালো ছিলো বলেই আমি আজ এত সুখী। এখন দোয়া করবেন। যাতে আমি আমার স্বামীকে বাবা ডাক শোনাতে পারি। তাহলে আমার জীবন স্বার্থক।”
কথাগুলো বলে মিতু আমার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। আমি তার চলে যাওয়া দেখে ম্লান হাসি। অতঃপর বাসায় চলে আসলাম। ঘরে আসতেই শুনতে পাই ভাবী ভাইকে বলছে,“তোমার বোন কতদিন থাকবে? স্বামীর সঙ্গে ঝামেলা করে চলে আসলো। এখন আমরা এই বোঝা টানবো? গিয়ে তোমার মাকে বলো তাকে চলে যেতে বলতে। এমনিতে দু’দিন পর আমার বাবা, মা বোন আসবে। তাদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। তার আগেই তোমার বোনকে সরাও।”
আমি লক্ষ্য করলাম ভাইয়া ভাবীর কথা শুনে মায়ের কাছে এসে বিনা সংকোচে আমার চলে যাওয়ার কথা বললো। মা কোন কথা বলতে পারিনি। আমি এসব দেখে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সবাই বলে নারী নারীর শত্রু। এক নারী অন্য নারীর ভালো দেখতে পারে না। কথাটা সত্য হলেও এখানে দ্বায়ীটা কিন্তু পুরুষরাই। যদি পুরুষরা সবসময় নিরপেক্ষ থাকতো তাহলে ঘরে ঘরে মিতুর মতো একটি একটি সুখী বউ জন্ম নিতো। কিন্তু সেটা হয় না। এই সমাজে আমার ভাই আছে, আমার স্বামী আছে, আছে মিতুর স্বামী। এই তিন ধরনের মানুষ রয়েছে বলেই চারদিকে এত কলহ। সুখ দুঃখের অদ্ভুত এক মিশ্রন। কারো গল্প সুখের তো কারো দুঃখের।
এসব ভেবে ভাইয়ের বোঝা বাড়াতে চাইনি বলে সেদিনই স্বামীর ঘরে ফেরত আসলাম। আমি জানি আমি নিজে না আসলে আমার স্বামী কখনো আমাকে ফেরত আনতে যাবে না। সেই সাথে তার অন্যায়ের প্রতিবাদও করতে পারবো না। কারণ এটা করলেই ট্যাগ লাগবে ডিভোর্সি। অতঃপর ভাইয়ের বোঝা, সমাজের বোঝা। মুখ খুললেই যে নারী বে……।অথচ যে জীবন পার করছি তার চেয়ে ডিভোর্সি হয়ে বেঁচে থাকা ভালো। কিন্তু উপায় যে নাই। আমাকে তো আমার মতো বাঁচতে দিবে না সমাজ। তাই সব মেনে মানিয়ে চলতে হবে।
পরিশেষে মিতুর সুখের জীবন আরও সুখের হলো। তার কোলজুড়ে পুত্র সন্তানের আগমন ঘটলো। তার সংসারটা সুখেই কেটে যাচ্ছে। অন্যদিকে মায়াকে মানিয়ে গুছিয়ে গায়ে শত শত কালচে দাগ নিয়ে এই অসুস্থ পরিবেশে আরও একটি প্রান নিয়ে এসে সংসার করে যেতে হচ্ছে। মায়ার মাকে তার সন্তান এবং বৌমার ঘরে কোনরকম দিন কাটিয়ে দিতে হচ্ছে। এভাবেই বয়ে চলছে সমাজের মানুষের সুখ দুঃখে গল্প। এটা আমাদের সমাজেরই বাস্তব চিত্র।
(সমাপ্ত)
(লেখা ভালো হয় নাই৷ স্যরি। কষ্ট করে যারা পড়ছেন ধন্যবাদ।)
