#সুখ_দুঃখ (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
সবার আগে খাবার খেতে বসায় শাশুড়ী মা মুখের সামনে দিয়ে প্লেট টেনে নিয়ে গেল। অতঃপর বললো,“শুধু খাই খাই।ঘরের যে পুরুষ মানুষরা কেউ খায়নি সেই খবর আছে? শোন বৌমা বাড়িতে যা করেছো করেছো, এই বাড়িতে এসব চলবে না৷ এই বাড়িতে বৌয়েরা সবার শেষে খায়।”
শাশুড়ী মায়ের কথা শুনে আমি শান্ত গলায় বললাম,“কেন মা? বৌয়েরা সবার শেষে খাবার খাবে কেন? তাদের বুঝি আগে ক্ষুধা লাগতে পারে না?”
শুধুমাত্র এতটুকুই বলেছিলাম। বিয়ের মাত্র দুই মাস হয়েছে৷ এই সামান্য কথাটুকুর জন্য আমার স্বামী এসে আমার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। পরপর দু’টো থাপ্পড় খেয়ে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। অতঃপর আমার স্বামী রাসেল কর্কশ গলায় বললো,“মায়ের মুখে মুখে তর্ক নয়। আমার মায়ের মুখে মুখে কথা বলবি না। আর একদিন যদি এটা দেখি তবে মুখ ভেঙে দিবো।”
রাসেলের কর্মকান্ড এবং কথায় আমার বুকের ভেতরে কেমন একটা ব্যথা অনুভব হলো। আমার চোখ দিয়ে পানি ঝড়তে শুরু করলো। শান্ত গলায় বললাম,“আমার কথাটাই শুনলে, তোমার মায়ের আমার মুখের সামনে দিয়ে খাবারটা কেড়ে নেওয়া দেখলে না?”
আমার মুখে এই কথা শুনে রাসেল আরও একটি থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। অতঃপর বললো,“মেয়ে মানুষের তর্ক আমার পছন্দ না। আর একটা শব্দ উচ্চারণ করবি না। চুপচাপ সবার জন্য খাবার বেড়ে দে।”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। বলতে গেলে নতুন বউ আমি। এরই মাঝে আমার গায়ে হাত তুলতে রাসেল দু’বার ভাবলো না। এটা ভাবনাতে আসতেই কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমি আর কোন শব্দ না করে রাসেলের কথা মতো সবার খাবার দিলাম। সেদিন দুপুরে আর আমার খাওয়া হলো না। বিকালের দিকে কান্না করে মাকে সব ঘটনা বলতে মা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো,“এটাই মেয়েদের জীবন।
মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়া। তুই মানিয়ে নে। জামাই বোধহয় একটু রাগী। তার রাগটা সামলে নে। রাগ উঠলে তুই চুপ করে যাবি। তাহলেই দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মায়ের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো এটাই জীবন। মানিয়ে নিতে হবে। সেদিন কষ্টে রাসেলের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলেও রাসেল সেসবে পাত্তা দেয়নি। সে আমার কষ্টটা বুঝতেই পারেনি। হয়তো বোঝার চেষ্টাও করেনি। অতঃপর এভাবেই সংসার জীবন কাটিয়ে দিলাম। দেখতে দেখতে বিয়ের ছয় মাস কেটে গেল। এর মাঝে রাসেল আমার গায়ে অজস্রবার হাত তুলেছে। ছোট থেকে ছোট বিষয় নিয়ে সে গায়ে হাত তুলতো। এই তো সেদিন, সে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হওয়ার জন্য গামছা চাচ্ছিলো। সেটা দিতে দেরি হওয়ায় সে গামছা আমার মুখে মে রে একটা লাথি বসিয়ে দিলো। রাগী কন্ঠে বললো,“এতক্ষণ লাগে এটা দিতে? সারাদিন বাড়ি বসে করিস কি? শুধু খাও আর ঘুমাও?”
অথচ এই গামছাটি তার সামনেই ছিলো। সে চাইলেই এটা নিজে নিতে পারতো। কিন্তু পারলো না। তার শিক্ষা তাকে জানান দিয়েছে, এগুলো মেয়েদের কাজ৷ সে এটা কেন করবে? তাই আমার কাজটা আমাকেই তো করতে হবে৷ দেরি হলে এভাবেই মা র খেতে হবে। দিনের পর দিন তার গায়ে হাত তোলার পরিমান বেড়ে যায়। এক সময় আমি আর মানিয়ে নিতে না পেরে রাগ করে বাবার বাড়ি আসি। বাবা কয়েক বছর আগে গত হয়েছে। মা এবং ভাই, ভাবী ছিলো বাসায়। আমাকে দেখে তারা কেউ খুশি হলো না। আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ি। তাকে সব ঘটনা খুলে বলে বলি,“মা আমি আর মানিয়ে নিতে পারছি না। আমার দ্বারা সম্ভব না গো মা। সে সবসময় রেগে থাকে। কোন ভুল হওয়ার সময় দেয় না। তার আগেই গায়ে হাত তোলে। শাশুড়ী মা ঠিকমতো খেতেও দেয় না। যে তারকারি দেয় তা দিয়ে আমার পেটভরে ভাত খাওয়া হয় না। মা আমি আর পারছি না।”
“মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিস, সহ্য তো করতেই হবে মা। কিছু করার নাই।”
এটা বলে মা তার জীবনের দুঃখের কথা বলেন। সে কত রাত না খেয়ে পার করেছে৷ কান্না করে গিয়েছে। কিন্তু লাভ নাই। তার স্বামী তাকে কখনো বুঝলো না। এরই মাঝে ভাবী মাকে কর্কশ গলায় ডেকে বলে,“ঘরের কাজগুলো পড়ে রয়েছে৷ সেগুলো কখন করবেন? মেয়ের সঙ্গে গল্প করা কি ফুরিয়ে যাচ্ছে? মেয়ে তো ঘাড়ে এসে উঠেছে। বেশ কিছুদিন থাকবে৷ তাহলে এত গল্প করার তাড়া কিসের।”
ভাবীর এসব কথা শুনে মা তৎক্ষনাৎ উঠে যায়। সে গিয়ে ঘরের কাজ করতে নেয়। আমি গিয়ে মাকে সাহায্য করে তার দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকাই। মা শান্ত গলায় বলে,“কিছু করার নাই মা। তোর স্বামী মা ভক্ত তাই তার মায়ের হুকুমে তোকে চলতে হয়। আর আমার ছেলেটা বউয়ের ভালোবাসা অন্ধ। তাই বৌমার হুকুম আমাকে মানতে হয়। তাই তো তোকে মানিয়ে নিতে বলছি। কারণ একবার ছাড়াছাড়ি হলে এই সংসারে তোর জীবনটা আরও জাহান্নামে পরিনত হবে।”
মায়ের কথা শুনে আমি থমকে যাই। মায়ের সব কথার এক কথা মানিয়ে নে। এটা যে কতটা কষ্ট বুকে চেপে বলছে সেটা বুঝতে পারি।
★
নিজের জীবনের এসব হতাশা নিয়ে ছাদে বসে ছিলাম। সেই সময়ে ছাদে কাপড় নিতে আসে পাশের ফ্লাটের ভাড়াটিয়ার মেয়ে মিতু। সে আমাকে দেখে নিজ থেকে জিজ্ঞেস করে,“মায়া আপু কেমন আছেন?”
“জ্বী ভালো আছি।
তুমি?”
কথাটি বলে আমি মিতুর দিকে তাকাতে অবাক হয়ে যাই। মেয়েটার চোখেমুখে অদ্ভুত এক খুশি। গায়ে জড়ানো জামদানী এক শাড়ী, গলায় মোটা সোনার চেইন, হাতে রেশম চুড়ি, চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া। সব মিলিয়ে খুব সুন্দর লাগছে। সে হাসি মুখে বলে,“ভালো আছি।”
অতঃপর সে এসে আমার পাশে বসে। আমার মুখটা শুকনো দেখে মিতু বলে,“আপনার মন খারাপ আপু?”
আমি মাথা নাড়িয়ে না জানালাম। তবে মিতু বোধহয় বিশ্বাস করলো না। আমার চোখ দেখে হয়তো আমার দুঃখটা বুঝে নিয়েছে। সে শান্ত গলায় বলে,“আপনার কিছু হয়েছে?
আপু এটা ভাববেন না আমি কৈফিয়ত চাচ্ছি। আসলে কাল আপনাকে কান্না করতে করতে আসতে দেখলাম, তাই মনে কৌতূহল জাগলো।”
“এত কৌতূহল ভালো না।
তা তোমার বর কেমন? বিয়ের তো তিন বছর হলো এখনো বাচ্চা নিচ্ছো না যে?”
আমার কথাটি শুনে মিতুর মুখটা শুকিয়ে গেল। সে মলিন গলায় বলে,“নিতে চাই। কিন্তু হচ্ছে না।”
“ওহ।
এটা নিয়ে তোমার স্বামী তোমাকে খুব বকে?”
আমার প্রশ্নটি অনধিকার চর্চা। তবুও করে ফেললাম। দুঃখের সাগরে ভাসা আমি বোধহয় অন্যের দুঃখের গল্প শুনতে চাচ্ছিলাম। তবে মিতু আমাকে তার দুঃখের নয় সুখের গল্প বলতে শুরু করে। সে বলে,“না। আমার স্বামী তেমন মানুষ নয়। সে তো উল্টো আমাকে বোঝায়, যেই সময় হওয়া হবে তুমি এটা নিয়ে দুঃখ পেও না। জানেন আপু, আমি বিয়ের আগে যেটা ভাবছিলাম ও তেমন নয়। খুব ভালো মানুষ।”
একটু থেমে বলে,“বিয়ের আগে সবাই আমাকে এমনভাবে ভয় দেখাচ্ছিলো। আমি ভেবেছিলাম স্বামী মানে গম্ভীর, তার কথামতো কাজ না করলে মা রবে। শ্বশুড়বাড়ি মানে অনেক কাজ আর কাজ। শ্বশুড়, শাশুড়ীর মন পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা তেমন নয়। সবকিছু উল্টা।”
কথাগুলো বলার সময় মিতুর মুখে যে হাসি ফুটে উঠেছে সেটা দেখে আমি অবাক হলাম। এই সেই মেয়ে যে অনেক বেশি চিকন হওয়ায় বারবার রিজেক্ট হচ্ছিলো। শেষে বিয়ে ঠিক হয়েছিলো তারচেয়ে দশ বছরের বড় এক লোকের সঙ্গে। তখন আমরা সবাই বলেছিলাম,“মিতু তোমার তো এই লোকের সঙ্গে বেশিদিন টেকা হবে না। এই লোক তোমাকে কখনো বুঝবে না।”
আড়ালে আবডালে সবাই বলছিলো মিতু নামক বাচ্চা মেয়েটির বিয়ে টিকবে না। প্রথমত অল্প বয়সে বাবা, মা বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তার উপর এত বড় পাত্র। মিতুদের অবস্থাও তত ভালো নয়। যদিও এখানে অবস্থান করা কেউ তেমন অবস্থার নয়। সবাই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত। এমন নাহলে কেউ এমন পুরো, ভাঙাচোরা বিল্ডিং এ থাকতো। তবে সবার মাঝে মিতুরা একটু বেশিই গরিব ছিলো। সেজন্য মিতুর পরিবার অল্প বয়সে তার বিয়ের জন্য উতলা হয়ে উঠছিলো। অতঃপর এতবার রিজেক্ট হওয়া। সব নিয়ে ভয়েই শেষে যেই পাত্রপক্ষ মিতুকে পছন্দ করেছে তার সঙ্গেই বিয়ে দিয়েছে। সেই মেয়েটির মুখে এই সুখময় হাসিটা আমার জন্য কষ্টময় ছিলো। মানুষ মাত্রই হিংসুটে। নিজে দুঃখের সাগরে থেকে অপরের সুখটা যে হজম হবে না তা স্বাভাবিক। তবুও আমি মিতুকে তার সাংসারিক গল্প বলতে বললাম। বিয়ের পর তার জীবনটা কেমন কাটলো। আমি সরাসরি বললাম,“বিয়ের পর তোমার স্বামী তোমার গায়ে কয়বার হাত তুলেছে?”
“একবারও নয়।
কারণ এটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। উহু। এই কথাটা আমি বলিনি। আমার স্বামী বলেছে৷”
এটা বলতে মিতুর মুখের হাসিটা আরও উজ্জ্বল হয়। সে সেদিনের স্মৃতিচারণ করে। যেদিন সে একটি ভুল করে ফেলেছি। ধীরে ধীরে মিতু তার সংসারের গল্পটা বলতে শুরু করে। খুবই মিষ্টি এক গল্প।
অতীত,
’
’
চলবে,
