#সোনার_কানের_দুল
#প্রথম_পর্ব
#অনিন্দিতা_মুখার্জি_সাহা
কলমে অনিন্দিতা
“শুভ, তোমার দেরি আছে? মা ফোন করেছে।”
বাথরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকল দিয়া।
“এই তো বেরোচ্ছি।”বলতে বলতেই স্নান সেরে বেরোল শুভ।এই সময় খুব তাড়াহুড়োতে থাকে শুভ।অফিসে যাওয়ার সময় এটা । তাড়াহুড়োর মধ্যেই তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে হেসে জিজ্ঞেস করল, “কে গো, তোমার মা না আমার মা?”
প্রশ্নটা শুনেই ভ্রু কুঁচকে গেল দিয়ার।বোকার মতো সব প্রশ্ন- “তোমার মা নিচতলা থেকে ফোন করবে?”
রাগী গলায় কথাটা বলেই হাতের মোবাইলটা শুভর হাতে ধরিয়ে দিল সে।
শুভ ফোনটা কানে তুলে বলল,- “বলো, ভালো তো সবাই?”ওপাশ থেকে রীনা দেবীর গলা ভেসে এল।
“হুমম আছি,তোমরা ভালো তো?”শুভ লাউড স্পিকারে রেখে জামা কাপড় পরতে পরতেই বললো – “হুম, ভালো আছি। এই তো অফিস বেরোবো বলে তৈরী হচ্ছি।”
“পরশু কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে এসো। তোমার মাকে বলে দিয়েছি তোমাদের তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিতে।”রিনা দেবী শুভর তাড়া দেখে আর কথা না বাড়িয়ে আসল কথাটা বললো।
“পরশু?” – একটু অবাক হতেই ইশারা করে দিয়া করে বললো জামাইষষ্ঠী। শুভ এমন করে হাসলো যেন লজ্জা পেল! বিয়ের প্রথম বছরের জামাইষষ্ঠী নিয়ে উত্তেজনা কম নাকী ওর। কলিগদের, দাদাদের মুখে এই দিনটার সম্পর্কে অনেক শুনেছে এবার সাধ নেওয়ার পালা শুভর।
রীনাদেবী বললেন ” ওই দিন তো জামাইষষ্ঠী ”
শুভ উদার হয়ে বললো -” আসব, আসব।”
রীনাদেবী জামাইয়ের উদারতায় মুগ্ধ বেশ গেল। গলায় দরদ এনে বললেন – “বেশি দেরি কোরো না কিন্তু।”শুভ হেসে বললো “না না সকাল সকালই বেরিয়ে পড়ব। দশটার মধ্যে ঢুকবো!”
শুভর কথায় খুব খুশী রীনাদেবী। বললেন ” রাখি এখন?সাবধানে অফিস যাও ” শুভও হেসে বললো
“ভালো থেকো তোমরা ” বলেই ফোন রেখে দিলো।
দিয়া চোখ সরু করে শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পুরো কথোপকথন টা শুনলো। ওখানে একবারও “মা” বলে ডাকল না ছেলেটা!
কলেজে পড়ার সময় অন্তত “কাকিমা” বলত। এখন সেটুকুও বলে না। যেন সম্বোধন করাটাই ওর কাছে অপ্রয়োজনীয়।
“কী গো, অমন করে কী দেখছ?”
দিয়ার দৃষ্টি টের পেয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল শুভ।
“না, ভাবছিলাম মা কী এত বলছিল?”
“কী আবার! জামাইষষ্ঠীতে যেতে বলল।”
শুভর মুখে হাসি ফুটে উঠতেই দিয়ার ভেতরে আবার খচখচ করে উঠল।
হুমম! হাসিটা দেখ! যেই খাওয়ার নিমন্ত্রণ, অমনি সব দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। পেটুক একটা! ওদিকে ‘মা’ ডাকতে যত আপত্তি!
তবে মুখে কিছু বললো না। ওর মা কে শুভ মা না ডাকলেও কিছু যায় আসে না। আর সেটা শেখাতে ইচ্ছেও করেনা দিয়ার। মনে হয় এইসব ডাক মন থেকে আসতে হয়! মন না চাইলে ডাকাও উচিত না।দিয়া যে এই যে ঘটা করে মা ডাকে সেটা কি আদৌ মন থেকে? ও যদি মা না ডাকতো শুভর ভালো লাগতো! ধুর এই টপিকটা নিয়ে আলোচনা করতেই ভাল লাগে না!তাই এড়িয়ে গিয়ে বললো
“শোনো, মা-বাবাকে ষষ্ঠীতে কী দেব?”
টাই বাঁধতে বাঁধতে শুভ বলল,”সে কাল দেখা যাবে।”
“কাল দেখা যাবে মানে? প্রথম জামাইষষ্ঠী। ভুলভাল কিছু দিলে হবে না কিন্তু। দিদিভাইরা প্রত্যেকবার নিজের মায়েদের কত সুন্দর সুন্দর গিফট দেয়।”শুভর এড়িয়ে যাওয়া উত্তর দেখে বেশ বিরক্ত দিয়া।
“আচ্ছা হবে, হবে।”কথাটা বলে নিচে নেমে গেল শুভ।
দিয়ার বিয়ে হয়েছে মাত্র দশ মাস।এই দশ মাসেই সে বুঝে গেছে, প্রেমের সময়ের মানুষ আর বিয়ের পরের মানুষ একই শরীরে থেকেও কত আলাদা হতে পারে।
প্রেমের সময় শুভর সবকিছুই যেন দিয়াকে ঘিরে ছিল। এখনো ভালোবাসে, যত্ন করে, খেয়াল রাখে— কিন্তু তার পাশাপাশি আরও অনেক দায়িত্ব এসে গেছে। আর সেই দায়িত্বগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় জায়গাটা জুড়ে আছে শুভর পরিবার।
তিন মাস আগে শুভর মায়ের জন্মদিন ছিল।
সেদিন কী সুন্দর করে নিজের মাকে নিয়ে গিয়ে সোনার কানের দুল কিনে এনে দিয়েছিল শুভ!
অফিসে যাওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়েছিল দুজনে, এরকমই সকাল ছিল, অর্ডার দিয়ে অফিস গেছিলো শুভ আর শুভ্রাদেবী মানে শুভর মা বাড়ি চলে এসেছিলো।দিয়াকেও বলেছিল যাওয়ার জন্য , কিন্তু সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আগে থেকে বেরোনোর প্ল্যান থাকায় যেতে পারেনি ও ।
সন্ধেবেলা যখন ছেলে এসে মায়ের হাতে প্যাকেট টা দিল, শুভ্রা দেবী যখন প্যাকেট খুলে দুলটা দেখালেন, তখন মুখের সেই উজ্জ্বল হাসিটা এখনও চোখে ভাসে দিয়ার।বেশ ভালো লেগেছিলো দিয়ার। ডিজাইন টা ও বেশ সুন্দর।
সেদিন থেকেই হয়তো মনের কোথাও একটা ছোট্ট ইচ্ছে জন্মেছিল।আমিও যদি মাকে এমন কিছু দিতে পারতাম!খুব দূর হওয়ার জন্য চাকরিটা তো বিয়ের পর ছেড়ে দিতে হয়েছে।নিজের কোনো উপার্জন নেই।
এই একটা কথাই বারবার এসে খোঁচা মারে দিয়ার বুকে ।
কিছু টাকা জমানো আছে অবশ্য। দোকানটায় যাবে কি একবার! ওরা তো ডেলিভারিও তাড়াতাড়ি দেয়।কিন্তু কেন যাবে ও! জামাইষষ্ঠীর দায়িত্ব তো জামাইয়ের। এইটুকু সেন্স কি থাকবে না এই বাড়ির লোকেদের।
“দিয়া, খাওয়া হয়ে গেছে। বেরোলাম।”
নিচ থেকে শুভর ডাক শুনে চমকাল।
“আসছি, দাঁড়াও!”
হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এল দিয়া।
শুভ আর মোহন বাবু মানে দিয়ার শ্বশুর মশাই একসাথেই অফিস যায়। ওরা বেরিয়ে যেতেই বাড়িটা আবার নিরিবিলি হয়ে গেল।
আজ সকালের জন্য আলুর পরোটা বানিয়েছে দিয়া।রান্নাঘরে ওর কাজ বলতে মূলত সকালের জলখাবার। দুপুর-রাতের রান্না এখনও শুভ্রা দেবীই করেন।প্লেটে সস ঢালতে ঢালতে দিয়া ডাকল,
“মা, আগে এসে খেয়ে যাও।”
ডাকটা নিজের কানে যেতেই কেমন যেন লাগল।
কী সহজে সে অন্যের মাকে “মা” বলে ডাকে ও !
আর শুভ?ভুল করেছে প্রথমেই এই আদিখ্যেতা টা না করলেই পারতো! শুরু যখন করে দিয়েছে আর কিছু করার নেই।
সামনের চেয়ার টেনে বসতে বসতে শুভ্রা দেবী জিজ্ঞেস করলেন,”কী ভাবছিস এত?”
দিয়া একটু ইতস্তত করে বলল,
“ভাবছিলাম, ষষ্ঠীতে মা-বাবাকে কী দেব?”
“কী আর দিবি! একটা শাড়ি দিবি। বাবুকে বলেছি শাড়ির বৌদিকে ডেকে পাঠাতে। সামনের মোড়ে ওর বরের দোকান। যাওয়ার সময় বলে দিলেই বৌদি চলে আসবে শাড়ি নিয়ে।ওর কাছ থেকেই নিয়ে নেব।”
মুহূর্তের মধ্যে দিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
নিজের মায়ের জন্য সোনার দুল।আর দিয়ার মায়ের জন্য শাড়ি।তুলনাটা না চাইলেও বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।
শুভ্রা দেবী যেন তার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন।
“আরও ভালো কিছু দেওয়া যেত। কিন্তু এ বছর অনেক খরচ হয়ে গেছে রে। তোদের বিয়ে, গোয়া হানিমুন, আবার সামনে বিবাহবার্ষিকী। বাবুর ওপর একসঙ্গে এত চাপ দেওয়া ঠিক হবে না।”
দিয়া কিছু বলল না।খেয়ে প্লেট গুলো ধুয়ে নিজের ঘরে দোতালায় চলে এসেছে।
সবসময় শুধু খরচ, খরচ আর খরচ!এটা যে এই ক মাসে কত বার শুনেছে! অসহ্য লাগছে দিয়ার।
সারাদিন সেই কথাটাই মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল।
আজ শুভ ফিরলেই বলবে— সে আবার চাকরি করতে চায়।
যদিও কারণটা নিজেই পরিষ্কার বুঝতে পারছে না।
শুভ কখনও তাকে কোনো কিছুর জন্য বঞ্চিত করেনি।বরং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি দিয়েছে।
শুভ অফিস ট্যুরে গেলে শুভ্রা দেবী পর্যন্ত হাতে টাকা গুঁজে দেন।তাহলে এই অস্থিরতা কেন?
হয়তো কারণটা টাকার নয়।
হয়তো কারণটা নিজের মানুষকে নিজের উপার্জনে কিছু দেওয়ার আনন্দ।আজ ওর টাকা থাকলে দিদিভাই দের সামনে মায়ের মুখটা উঁচু থাকত।
এমন সময় নিচ থেকে ডাক এল শুভ্রা দেবীর —
“দিয়া, নিচে আয়। শাড়ির কাকিমা এসেছে।”
ইচ্ছে করছে না তাও দিয়া নিচে নেমে দেখল সত্যিই যেন ছোট্ট একটা দোকান বসে গেছে।
একের পর এক শাড়ি খুলে দেখানো হচ্ছে।
কিন্তু আজ কোনো কিছুই ভালো লাগছে না তার।
সবকিছুতেই যেন খুঁত চোখে পড়ছে।
শেষ পর্যন্ত শুভ্রা দেবী দুটো শাড়ি বেছে নিলেন।
একটা নিজের জন্য আর একটা রীনা দেবীর জন্য।
দিয়াকেও একটা নিতে বললেন।
কিন্তু রাগের মাথায় ও না করে দিল।
তবে নিজের জন্য যে শাড়িটা শুভ্রা দেবী বেছে নিলেন, সেটা কিন্তু দিয়ার খুব পছন্দ হয়েছিল।
গাঢ় রঙের ওপর মার্জিত কাজ, সঙ্গে অসাধারণ রুচিশীল নকশা।একবার বলতে গিয়েও থেমে গেল।
তার আগেই শুভ্রা দেবী শাড়িটা আলাদা করে ভাঁজ করে রাখলেন।দিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
মনের ভেতরে তখনও একটা কথাই cholche- সোনার কানের দুল।
শেষ পর্ব
