#রহস্য
#অন্তিম_পর্ব
#সোয়াদ_আল_মাহমুদ_তালুকদার
কমিটির প্রধান শাহেদ রুমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,”মিসেস রুমি আপনি সবুজের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। আপনি কি এটা নিশ্চিত হয়ে বলছেন।আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো।এর আগে আমরা সবুজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাইনি।”
রুমি দৃঢ় কন্ঠে বলল,”স্যার আমার কোনো ভুল হচ্ছে না।”
এর মাঝেই সবুজ বলে উঠে,”রুমি এরকম
করছ কেন। তুমিই আমাকে তোমার সাথে রাত কাটানোর কথা বলেছিল। আমি প্রথমে দুই রুমই নিতে চাইছিলাম। কিন্তু তুমিই তো জোর করে এক রুম নিলে।তোমার নাকি বিদেশে একা থাকতে ভয় হচ্ছিল।এরপর রুমে থাকাকালীন আমাকে খারাপ প্রস্তাব দিয়েছিলে। কিন্তু আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।তাই তুমি প্রতিশোধ নিচ্ছো,তাইনা।”
রুমি রেগে উঠে বলল, “আপনি মিথ্যা বলছেন।”
এরপর শাহেদ রুমিকে শান্ত হতে বলল। শাহেদ বলল,” তুমি দুই রুম থাকা সত্ত্বেও এক রুম নিয়েছিলে কেন?”
রুমি বলল,”স্যার ওখানে আর কোনো রুম ছিলনা ।তাই বাধ্য হয়েই এক রুম নিয়েছিলাম আমরা। সবুজ স্যারই আমাকে বাধ্য করেছিল।উনি বলেছিলেন এক রুমে দুটি ঘর আছে।তাই কোনো সমস্যা হবে না।পারলে আপনি রেকর্ড চেক করতে পারেন। সিসিটিভি ফুটেজও দেখাতে পারতাম। কিন্তু উনিই টাকা দিয়ে সব ডিলেট করে দিয়েছে।”
এরমধ্যেই সবুজ রেকর্ড পেশ করল;সবাইকে অবাক করে দিয়ে। সবুজ বলল,”স্যার আমি জানতাম এমনই হবে।তাই আমি প্রমাণ নিয়ে এসেছি। দেখুন সেদিন আরো তিনটা রুম খালি ছিল।”
শাহেদ রেকর্ড চেক করে দেখল। সবুজের কথাই সত্যি। শাহেদ রুমিকে বলল,”আপনার আর কিছু বলার আছে।”
রুমি ভয়ে বলল,”স্যার এটা সবুজ স্যারই কারসাজি।উনার কথা আমার চোখবুঁজে বিশ্বাস করা উচিত হয়নি।আমার নিজেরই দেখা উচিত ছিল উনি সত্যি বলছেন কিনা।রুম খালি ছিল। কিন্তু উনি আমাকে বলেছিল আর রুম নেই। সবুজ স্যার যে কিরকম এটা সুমি জানে।সুমিও তো স্যারের সাথে বিদেশে গেছিল।”
অবশেষে শাহেদ সুমিকে প্রশ্ন করল,”রুমি যেটা বলছে এটা কি ঠিক।”
সুমি অকপটে উত্তর দিল,”না স্যার ,রুমি মিথ্যা বলছে। সবুজ স্যার খুবই ভালো মানুষ। রুমি কেন এরকম করছে আমি বুঝতে পারছিনা।”
রুমি কান্না জড়িত কন্ঠে বলল,”সুমি তুমি এরকম করছ কেন।সব বলছ না কেন। তুমিই তো বললে তুমি সব ফাশ করে দিবে।তোমার উপর ভরসা করেই তো এতদূর এগিয়ে এসেছি।”
পিংকিও একই কথা বলল।
শাহেদ বলল,”এনাফ হয়েছে।তোমাকে বরখাস্ত করা হবে।”
সবুজ এরমধ্যেই বলে উঠে, “স্যার ওকে এত বড় শাস্তি দিবেননা।ওকে আরেকটা সুযোগ দিন।বাসায় ওর বৃদ্ধ মা আছে।আসলে ও ছোট থেকে বাবা ছাড়া বড় হয়েছে।তাই এরকমটা হয়েছে।দুঃখ কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছে।তাই লোভ সামলাতে পারেনি।অল্প বয়স তো।”
শাহেদ বলল, “ঠিক আছে সবুজ। শুধুমাত্র তোমার কথায় এবারের মতো ওকে মাফ করে দিলাম।”
শাহেদ রুমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,”দেখো যার ক্ষতি করতে চাইলে সেই তোমাকে বাচাচ্ছে।আর সবাই শুনে রেখো এই ঘটনা যেন বাইরে না যায়।তাহলে প্রতিপক্ষ কোম্পানি নানা গুজব ছড়াবে।আজকের মত এখানেই শেষ।কাল সবাই যার যার মত কাজ করবে।এই নিয়ে আর কোনো কথা নয়। বিশেষ করে রুমি তুমি।”
অফিস শেষ হলো।রুমি বেরোচ্ছে।আজ বড়ো হতাশ সে।অন্যায়ের কাছে সে পরাজিত হলো। হঠাৎ সিকিউরিটি গার্ড ডেকে বলল,” ম্যাডাম আপনি যে এত দূর এসেছেন এটাই অনেক।এর আগে এর জন্য অনেকে কোম্পানি ছেড়েছে। যদিও সুমি ,পিংকি এখনো রয়ে গেছে প্রমোশনের লোভে।”
রুমি এবার আশার আলো দেখতে পেল।সে সিকিউরিটি গার্ডকে বলল,”যারা চলে গেছে তাদের ঠিকানা জানেন।”
সিকিউরিটি গার্ড বলল, “আর সবার ঠিকানা জানিনা তবে মীরা আর ইরার ঠিকানা বলতে পারব।ওরা দুজন বান্ধবী ছিল।”
সিকিউরিটি গার্ড মীরা আর ইরার ঠিকানা দিয়ে বলল, “ম্যাডাম আমিই চাই এই নরপিশাচের শাস্তি হোক।মীরা আর ইরার দুঃখের কাহিনী একমাত্র আমি জানি।ওদের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল।তবে আমি জানলেই হবেনা।ওদেরও জবানবন্দি দিতে হবে।”
রুমি মীরা আর ইরার খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।আর এই বিষয়টা ইন্সপেক্টর আহমেদকে জানালো সে।সেও তার সাথে যেতে রাজী হলো।পরের সপ্তাহে ছুটির দিন তারা একসাথে যাবে।যাতে সবুজ সন্দেহ না করে।
এদিকে সবুজ গাড়িতে উঠছিল তারমাঝেই সুমি আর পিংকি আসল।সুমি গাড়ির চাবি নিল।আর পিংকি সবুজের পকেট থেকে ক্রেডিট কার্ড নিল।
এটা দেখে সবুজ বলল,”কি হচ্ছে এসব।”
সুমি বলল,”কি আবার হবে।এটা তোমাকে বাঁচানোর পারিশ্রমিক।”
পিংকি বলল,”বেশি কথা বললে সব ফাশ করে দিব। তুমিই আমাদের রে/প করেছিল ।সব কিছু শাহেদ স্যারকে বলে দিব।বলব যে,তুমিই আমাদের মিথ্যা বলতে বাধ্য করেছিল।”
সবুজ এবার নরম হয়ে বলল,”আমি কি না করেছি।যা দরকার নিয়ে নাও তোমরা।”
এরপর পিংকি আর সুমি গাড়ির চাবি আর ক্রেডিট কার্ড নিয়ে চলে গেল।
সবুজ মনে মনে ভাবল, “রুমির ব্যবস্থা হয়েছে।এবার তোমাদের ব্যবস্থার পালা।তোমাদের যেভাবেই হোক কোম্পানি থেকে বের করতে হবে।”
মীরার বাসায় যাওয়ার আগে আহমেদ মীরার নাম্বার জোগাড় করল। হ্যাকিং এর মাধ্যমে রুমির কোম্পানির ডেটাবেস থেকে এসব তথ্য জোগাড় করল।
তারপর রুমি মীরাকে ফোন দিয়ে বলল সব। প্রথমে মীরা এসবে জড়াতে চাইছিল না।কারণ সে নতুন চাকরি নিয়ে পরিবারের সাথে সুখে আছে।তবে রুমি বলেছিল,”বোন ,একজন নারীর সম্মান আর অস্তিত্ত্বের প্রশ্ন।আপনি কি চান আরো অনেক নারী সবুজের লালসার শিকার হোক।”
ইন্সপেক্টর আহমেদ বলল, “চিন্তা করবেননা। আইন অনুযায়ী ভিকটিমের ছবি ও পরিচয় প্রকাশে আইনী বাধা আছে।আর নারীদের বেলায় আরো কড়াকড়ি আছে।”
অবশেষে মীরা রাজি হয়ে যায়। রুমি আর মীরা একসাথে দেখা করে।তবে মীরা পরিবারকে এখনই সব জানায় না।আগেও জানাইনি।মীরা আর রুমি হোটেলে বসে আসে।
এমন সময় মীরা বলল,”আমি জবানবন্দি দিতে রাজি আছি।আর আমার কাছে প্রমাণও আছে। সবুজের লালসার প্রথম শিকার ছিলাম আমি।তাই সে একটু কাঁচা কাজ করেছে।আমার সর্বনাশ করে আমার ন/গ্ন ছবি তুলে রাখে। তারপর পুলিশের কাছে যেতে চাইলে মেসেজে সেই ছবি দিয়ে ব্লাকমেইল করতে থাকে।তবে আমি মেসেজের ক্রিন শর্ট সহ সব প্রমাণ নিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম একদিন আমি সাহস করে পদক্ষেপ নিতে পারব। কিন্তু আর সাহস করতে পারেনি,পরিবারের সম্মানের ভয়ে। কিন্তু তোমাকে দেখে আমি অনুপ্রেরণা পেয়েছি। একজন নারী সম্মানের জন্য কতদূর যেতে পারে। সেদিনের ট্রমার জন্য আমি প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলাম।তাই চাকরিটা ছেড়েই দিলাম।তারপর খানিকটা স্বাভাবিক হলাম।মা বাবা বারবার জিজ্ঞেস করার পরও কিছু বলেনি।এই জন্য এ পর্যন্ত বিয়েও করেনি। অপরাধীরা মুক্ত ভাবে ঘুরে বেড়াবে আর নির্যাতিতারা বন্দী থাকবে তা আর নয়।তোমার এই অবস্থার জন্য খানিকটা আমিও দায়ী।আমি যদি পদক্ষেপ নিতাম তাহলে ঘটনাটা ওখানেই রুখে যেত।”
রুমি প্রমাণ গুলো দেখতে থাকল।
রুমি বলল,” তুমি ঠিক বলেছ। সবুজ অপরাধ করতে করতে এখন পটু হয়ে গেছে।এখন কোনো প্রমাণই রাখেনা। প্রথম অপরাধে ভুল হয়ে থাকে।আর ওর মেসেজ আর ছবি প্রমাণ হয়ে থেকে গেছে।ও ভেবেছিল সব ডিলেট করে পার ভেবে যাবে। কিন্তু তুমি তো ক্রিনশর্ট নিয়ে রেখেছ।আর ফোন রেকর্ডও আছে।আর সবুজ বোধহয় তোমার কথা ভুলেই গেছে। আচ্ছা তোমার বান্ধবী ইরারও কি একই দশা হয়েছিল।”
মীরা হতাশ হয়ে বলল,”হ্যা আমার মতোই ওরও হয়েছিল।এটার জন্য আমিই দায়ী।আমি যখন চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম।ও বারবার বলেছিল,কেন ছেড়েছি।তারপর ওর সাথে একই ঘটনা ঘটায় চাকরী ছেড়ে দিয়েছিল।আমাদের দুজনকেই প্রমোশনের অফার করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা নিইনি। কারণ রে/পি/স্টের কাছ থেকে কোনো সুবিধা নিতে চাইনি।ইরা এখন বিবাহিত।ওর দুটো বাচ্চাও আছে।এখন সুখে আছে। বিদেশে সেটেল হয়েছে।ইরা এসব জানতে পেরে এসবে যুক্ত হতে চাইছিল।তবে আমি চাইনা ও এসব বিষয়ে যুক্ত হোক।তবে সবুজ শাস্তি পেলে অবশ্যই জানাব।দেশে আসলেই সরাসরি সবটা জানাব।যদিও ওর স্বামী সবটাই জানে।ও সত্যিই অনেকটা লাকি। এরকম একটা জীবনসঙ্গী পেয়েছে।আমরা একাই সব সামলে নেব।”
এরপর এসব কথার মাঝেই হঠাৎ রুমির কাছে ফোন আসে।ফোনটা ধরতেই বলে উঠল,”আমি উর্মিলা বলছি।আমি তোমাদের সবুজ স্যারের ওয়াইফ বলছি। তুমি নাকি সবুজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছ।”
রুমি আমতা আমতা করে বলল,”হ্যা।”
উর্মি বললো,”বেশ করেছ।আমি আমার স্বামীর প্রতারণা জেনে গেছি।পিংকি ,সুমির ব্লাকমেইলের মেসেজ আমি দেখতে পেয়েছি।আমার ভাবতেই লজ্জা হচ্ছে আমি একজন নরপিশাচের সাথে ঘর করেছি এতদিন। ভাগ্যিস ও মোবাইলটা খুলে ওয়াশ রুমে গেছিল।আমি সবটা জানতে পেরেছিলাম। তুমি যেদিন অভিযোগ করেছিলে সেদিন থেকে আমি ওর উপর নজর রাখছিলাম।আমি যে জানতে পেরেছি ও এটা জানেনা।আমি সাক্ষ্য দিবো। তুমি চিন্তা করোনা।”
এরপর উর্মিলা,মীরা ও রুমির জবানবন্দি নেয় ইন্সপেক্টর আহমেদ।সব প্রমাণের ভিত্তিতে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট তৈরি করে আহমেদ। অবশেষে সবুজ গ্রেফতার হয়। সবুজ ভাবতেই পারেনি যে তার খেল খতম হবে।
সবুজকে নিয়ে যাওয়ার সময় রুমি তাকে চড় মেরে বলে;”শকুন যতই মন্দির বা মসজিদের উপরে উড়ুক।তাতে তার স্বভাব বদলায় না।তার নজর ঐ ভাগাড়েই থাকে।তুই যতই মানুষকে সাহায্য করতি কিন্তু তোর নজর সবসময় একই জায়গায় থাকত।সবার সামনে তুই ভালো মানুষ ছিল। কিন্তু তোর স্বভাব ছিল ঠিক শকুনের মতো।”
আহমেদকে ধন্যবাদ দিল রুমি। আহমেদ বলল,”আমি কিছুই করেনি। সবকিছুই আপনি
একাই করেছেন।সাথে উর্মি আর মীরাও ছিল।”
আহমেদ অফিস রুম থেকে সবুজকে নিয়ে গেল। অফিস রুম করতালিতে ভরে গেল।সুমির সাহসিকতায় সবাই অবাক।কমিটি প্রধান শাহেদও ক্ষমা চাইল।
পিংকি আর সুমি ক্ষমা চাইল তাদের লোভের জন্য। রুমি তাদের মাফ করে দিলো। সবুজের শাস্তি হলো।
তার মা জাহানারা ও রুমির জীবনে একটা নতুন অধ্যায় সূচনা হলো। এতকিছুর পরও সমাজ রুমিকে কটুক্তি করতে ছাড়ল না।সমাজের সবাই বলতে লাগল,”এই মেয়েকে কে বিয়ে করবে।মেয়ে মানুষ চাকরি করলে তো এমনই হবে।”
তবে রুমি এসব নিয়ে কিছুই ভাবেনা।কারণ তার কোনো ভুল নেই।তার যদি বিয়েও না হয় তবে তার আফসোস নেই।এটা সমাজের কলঙ্ক।সে অপরাধী না হয়েও যদি তার বিয়ে না হয় সেটা তো সমাজেরই কলঙ্ক।সমাজের এই কলঙ্ক সে বয়ে নিয়ে বেড়াবে গর্বের সাথে।সে তার মাকে শান্ত থাকতে বলে।
সে আয়নায় তাকিয়ে বলে,আমার বিয়ে হচ্ছে না ।তাই সবাই আমাকে কটুক্তি করছে।কারণ আমি ধ/র্ষি/তা।আমি সমাজকে দেখাতে চাই দেখো তোমাদের কলঙ্কের চিহ্ন আমি মাথায় নিয়ে বেড়াচ্ছি।আমার বিয়ে হচ্ছে না।এটা সমাজের ব্যর্থতা।বিয়ে না হওয়ার পেছনে আমার কোনো দায় নেই।আমি হার মানব না। জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত লড়ে যাবে।আমার সাথে আমার সৃষ্টিকর্তা আর আমার মা আছে।”
কয়েকমাস সে কঠোর পরিশ্রম করে। শ্রীঘ্রই সে সবুজের জায়গা দখল করে নেয়।এখন সে তার মাকে নিয়ে দুনিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে।তার মার ইচ্ছা ছিল সে পুরো পৃথিবীটা ঘুরে দেখবে। অবশেষে সেটা সত্যি হয়েছে।মা মেয়ে এখন নিজেদেরই একটা সংসার করে নিয়েছে।
সময় দ্রুত এগোচ্ছে।রুমি এখন নিজের একটা এনজিও প্রতিষ্ঠা করেছে।এখন অনেক অসহায় বাচ্চাদের আশ্রয়স্থল রুমি।বিয়ে না করেও এখন অনেক সন্তানের জননী রুমি। অসহায় অনাথ বাচ্চাদের কাছে রুমিই যেন একজন মায়ের মত।
সমাপ্ত
