#রহস্য
#সূচনা_পর্ব
#সোয়াদ_আল_মাহমুদ_তালুকদার
“রুমা, তোর ভাগ্যটা কিন্তু দারুণ! পরের সপ্তাহেই অফিসের কাজে তোকে বিদেশ যেতে হচ্ছে। তোর সাথে আমাদের বস সবুজও যাচ্ছে। জানিস তো, যেসব মেয়েরা বসের সঙ্গে অফিস ট্যুরে গেছে, তাদের প্রায় সবারই প্রমোশন হয়েছে। দেখ, তোরও হয় কিনা!”
ভেংচি কেটে কথাগুলো বলছিল তার সহকর্মী রুপা।
ঠিক তখনই পিংকি হেসে বলে উঠল,
“তুইও তো গত বছর অফিস ট্যুরে গিয়েছিলি। ফিরে এসেই তো তোর প্রমোশন হলো। বল তো, কী এমন ঘটেছিল যে এত তাড়াতাড়ি প্রমোশন পেয়ে গেলি?”
কথাটা শুনে রুপার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সে বলল,
“কী আবার ঘটবে! আমি নিজের যোগ্যতা আর পরিশ্রমের জোরে প্রমোশন পেয়েছি—কারও দয়ায় নয়।”
এই বলে সে কাজে মন দিল। এমন সময় রুমার বস তাকে নিজের কক্ষে ডেকে পাঠালেন।
“স্যার, ভেতরে আসতে পারি?”
রুমার কণ্ঠ শুনে কাজ থামিয়ে সবুজ বললেন,
“হ্যাঁ, আসো। তোমার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
“জি স্যার, বলুন।”
সবুজ গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন,
“রুপা, এটা তোমার প্রথম বিদেশ ট্যুর—আর সেটা আবার আমার সঙ্গে। শুনেছি তুমি নাকি যেতে চাইছ না। মনে রেখো, তুমি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করো এবং একই সঙ্গে আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। ক্লায়েন্ট মিটিংয়ের জন্য বিদেশে যেতে হতে পারে—এটা জেনেই তো এখানে যোগ দিয়েছ। এটা কোনো ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান নয়। ভারতের মুম্বাইয়ে আমাদের ক্লায়েন্টের সঙ্গে দেখা করতে হবে। আশা করছি প্রজেক্টটা তাদের পছন্দ হবে এবং আমরা ডিলটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারব।”
রুপা কিছুটা সংকোচ নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, স্যার। আসলে আমি আগে কখনো দেশের বাইরে যাইনি, তাই একটু ভয় লাগছে।”
সবুজ আশ্বস্ত করে বললেন,
“ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমি তো তোমার সঙ্গেই থাকছি। তোমার ভিসা, পাসপোর্ট সব প্রস্তুত আছে তো? আরেকবার ভালো করে যাচাই করে নিও। আগামী সপ্তাহেই আমাদের ফ্লাইট। নির্ধারিত সময়ে অফিসের গাড়ি তোমার বাসায় পৌঁছে যাবে, যেন এয়ারপোর্টে যেতে কোনো অসুবিধা না হয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখো। মাত্র তিনদিন পরেই আমরা দেশে ফিরে আসব।”
রুপা নীরবে মাথা নাড়ল।
রাতে বাড়ি ফিরতেই দরজা খুলে মা জাহানারা বেগম বললেন,
“কিরে, আজ এত দেরি হলো কেন?”
রুমি ক্লান্ত হাসি দিয়ে বলল,
“মা, অফিসে আজ অনেক কাজ ছিল। তাছাড়া পরের সপ্তাহে ভারতে যেতে হবে—সে নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। তুমি তো জানো।”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তোর বাবা বা একটা ভাই যদি থাকত, তাহলে আমার এত দুশ্চিন্তা হতো না। তুই একটা মেয়ে মানুষ হয়ে একা একা একটা পুরুষের সঙ্গে বিদেশে যাবি—লোকজন কী বলবে? তোর তো বিয়ের বয়সও হয়ে গেছে। আর কতদিন এভাবে কাটাবি?”
রুমি মায়ের হাত ধরে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“মা, এখন সময় বদলেছে। ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে কাজ করে—এটাই স্বাভাবিক। মানুষ কী বলল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। বাবা যখন আমাদের পাশে ছিলেন না, তখন কি কেউ এসে খোঁজ নিয়েছিল?”
জাহানারা বেগম কষ্টের সুরে বললেন,
“তবু পাড়ার লোকজন তোর নামে নানারকম কথা বলে। বলে—মেয়ে এত রাতে বসের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বাড়ি ফেরে। এসব শুনলে আমার খুব খারাপ লাগে। ভাগ্যিস আমাদের ছোট্ট একটা বাড়ি আছে। না হলে কেউ বাসা ভাড়া দিত না। অফিসটা অন্তত কাছেই—এই ভেবেই একটু শান্তি পাই।”
রুমি দৃঢ় গলায় বলল,
“মা, তুমি এত ভাবো না। আমি বসের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, তাই কাজের প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে থাকতে হয়। উনি বিবাহিত, তাঁর দুই সন্তানও আছে। আমি কেন অযথা কোনো সম্পর্কে জড়াব? কিছু মানুষ ভাবে, মেয়েরা চাকরি করে শুধু অনৈতিক কাজের জন্য। তারা সবকিছুতেই কু-অর্থ খোঁজে। অথচ কেউ বোঝে না—মানুষ চাকরি করে অর্থ, সম্মান আর নিজের পরিচয় গড়ার জন্য। কেউ স্বপ্ন পূরণের জন্যও করে। আমি জানি আমি কোনো ভুল করছি না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো—এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় শক্তি।”
রুমি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। অতীতের স্মৃতিগুলো একে একে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল।
মা ছোটবেলায় এতিম হয়েছিলেন। মামা-মামির ঘরেই বড় হয়েছেন। পরে পারিবারিকভাবে বাবার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বাবা ছিলেন একমাত্র সন্তান। দাদা মারা যাওয়ার পর দাদী একা হয়ে পড়ায় তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের কিছুদিন পরই দাদীও ইন্তেকাল করেন।
বাবা প্রবাসে কাজ করতেন। রুমি তখনও মায়ের গর্ভে। বিদেশে এক নির্মাণাধীন ভবনে রং করার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে তিনি মারা যান।
তারপর থেকেই মায়ের একার লড়াই শুরু।
বাবার জমানো কিছু টাকা, সামান্য জমিজমা আর ছোট্ট এই বাড়িটুকুই ছিল সম্বল। মা জমি ভাগিতে দিয়ে অর্ধেক ফসল পেতেন, কিছু জমি বিক্রি করে গার্মেন্টসে চাকরি নেন। সঞ্চয়ের অভ্যাসে সংসারটা কোনোরকমে টিকিয়ে রাখেন।
রুমি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পায়। তারপর মাকে চাকরি ছাড়তে বলে। বাবার মৃত্যুর পর অনেক বিয়ের প্রস্তাব এলেও মা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজি হননি।
রুমি মনে মনে বলল,
“মা আমার জন্য অনেক ত্যাগ করেছেন। এবার তাঁর জন্য কিছু করার সময় এসেছে।”
সময়মতো রুমি ও সবুজ ভারতের মুম্বাইয়ে পৌঁছাল। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি থাকলেও সামনে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং—তাই দু’জনেই মনোযোগী।
হোটেলে পৌঁছে রিসেপশনে বুকিং যাচাই করতে গিয়েই বিপত্তি ঘটল। জানা গেল, পুরো হোটেলে মাত্র একটি রুম খালি আছে।
রুমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“স্যার, রুম তো মাত্র একটা। তাহলে আমি চাইলে রিসেপশনের লাউঞ্জেই রাতটা কাটিয়ে দিতে পারি।”
সবুজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমি ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলছি।”
ম্যানেজারের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলোচনা করে সে ফিরে এসে বলল,
“আর কোনো রুম নেই। তবে এই রুমে দুটো আলাদা বেডরুম আছে। আমরা শেয়ার করতে পারি। এতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।”
রুমি দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,
“না স্যার… আমি বরং বাইরে থাকি।”
সবুজ এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“অপরিচিত শহরে তুমি একা বাইরে থাকবে? তোমার কি ধারণা আছে এটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? আর আজ রাতেই ক্লায়েন্টরা এখানে আসবে। বড় একটা পার্টি হবে। সবাই যদি দেখে তুমি লাউঞ্জে একা বসে আছ, তারা কী ভাববে?”
রুমি আস্তে বলল,
“কিন্তু স্যার…”
কথা শেষ করতে না দিয়েই সবুজ বলল,
“এমনভাবে ভয় পাচ্ছ যেন আমি তোমাকে খেয়ে ফেলব! তুমি এক ঘরে থাকবে, আমি আরেক ঘরে। চল, আগে ফ্রেশ হয়ে নিই। তারপর কিছু খেয়ে নিই। রাতে তো পার্টি আছেই।”
অবশেষে পরিস্থিতির চাপে রুমি রাজি হলো।
রাতে পার্টি জমে উঠল। ক্লায়েন্টদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছে রুমি ও সবুজ। মিটিং শেষে পরিবেশটা আরও অনানুষ্ঠানিক হয়ে উঠল। সঙ্গীত, আলো আর উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল হলরুম।
কিন্তু রুমি ভিড়ের মাঝে একটু নিরালায় গিয়ে বসে রইল। পার্টির কোলাহল তার ভালো লাগে না।
হঠাৎ সবুজ এসে বলল,
“রুমি, একটা ড্রিঙ্ক নাও।”
রুমি মাথা নেড়ে বলল,
“স্যার, আমি এসব খাই না।”
সবুজ হালকা হাসল।
“জানি। তাই তো তোমার জন্য ফ্রুট জুস এনেছি।”
রুমি নির্ভরতার ভরসায় জুসটা খেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার মাথা ঘুরতে শুরু করল। চারপাশ ঝাপসা লাগতে লাগল।
সবুজ উদ্বিগ্ন সুরে বলল,
“তোমাকে দেখে ঠিক লাগছে না। চলো, রুমে গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
তারপরের স্মৃতি অস্পষ্ট…
এরপর সকাল হলো।রুমি হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে বসতেই বুকের ভেতর কাঁপন ধরল। শরীরজুড়ে অসংখ্য আঁচড়ের দাগ। পোশাক এলোমেলো।
সব বুঝতে তার আর বাকি রইল না।
চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
“ম্যাডাম, আপনার নাস্তা।”
রুমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। দরজা খুলতেই হোটেল বয় ট্রে হাতে ভেতরে ঢুকল।
রুমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“সবুজ স্যারকে দেখেছেন?”
হোটেল বয় হেসে বলল,
“আপনার সঙ্গে যে ভদ্রলোক ছিলেন? তিনি তো অনেক আগেই এয়ারপোর্টে চলে গেছেন। আপনাকেও দেশে ফিরতে বলেছেন। ঘুম থেকে উঠলে জানাতে বলেছিলেন।”
কথাগুলো শুনে রুমি স্তব্ধ হয়ে গেল।
“আমাকে রেখে চলে গেলেন?”
তার ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল।
মনে মনে ভাবতে লাগল—
“না… উনি এমন মানুষ নন। হয়তো অন্য কেউ… আমি তো অজ্ঞান হয়ে ছিলাম… উনি হয়তো আমাকে রুমে রেখে পার্টিতে গিয়েছিলেন… অন্য কেউ সুযোগ নিয়েছে…”
নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করলেও মন মানতে চাইল না।
রুমি দ্রুত রিসেপশনে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইল। কর্তৃপক্ষ প্রথমে অস্বীকৃতি জানাল।
রুমি দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমার সঙ্গে বড় অন্যায় হয়েছে। যদি ফুটেজ না দেখান, তাহলে আমি আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।”
অবশেষে তারা ফুটেজ দেখাতে রাজি হলো।
স্ক্রিনে দেখা গেল—রাত দশটার দিকে সবুজ তাকে ধরে রুমে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর আর কেউ ভেতরে ঢোকেনি। সকালে একাই বেরিয়ে গেছে সবুজ।
সব পরিষ্কার হয়ে গেল।রুমির বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
সব গুছিয়ে সে ফ্লাইটে উঠল। জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
“স্যার… আপনি কেন আমার সঙ্গে এমন করলেন? এর জবাব আপনাকে দিতেই হবে।”
চলবে।
