লেখক: মম সাহা
#বঁধুয়া
১…
বিপিনের বউটার বড্ড বদনাম গাঁয়ে। স্বামীর জন্য সেই ভোরে উঠে গরম জল করে। জলটা একটু বেশি গরম হলেই বিপিন লাথি মারে। জলের পাত্রে নয়, বউটার কোমড়ে। আবার জলটা একটু ঠান্ডা হলেও বাঁধে বিপত্তি। বউটার বাপের বাড়ির চৌদ্দ পুরুষকে স্বর্গ থেকে নামিয়ে আনে বিপিন বকতে বকতে। গ্রামের লোক সেই হরহামেশা ঘটা ঘটনার জন্য বউটাকে দোষে। বলে, বাপু স্বামী তোর দেব্ তা। তার জন্য সামান্য জলটাও ঠিকঠাক গরম করতে পারিস না? এ কেমন অকাজের বেটি?
শাশুড়িটা এক কাঠি উপরে। উঠোন ঝাঁট দিতে একটু দেরি করলেই পাড়া-প্রতিবেশীদের ডেকে ডেকে নালিশ করে। নিজের কপাল চাপড়ে মরে এমন হতভাগিনীকে বিয়ে করিয়ে আনার জন্য। বউটা মোটেও রা করে না। তার সমস্ত অপরাধ সে মাথা পেতে নেয়। যেই অপরাধগুলো সে করে না সেগুলোর শাস্তিও মাথা পেতে নেয়।
বিপিন দুপুরের খাবার খেতে আসে না মাঝে মাঝে। তখন সেই দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে বউটা মাঠে যায় খাবার দিতে। বিপিনের সহকর্মীরা হাসে তা দেখে। চোখাচোখি করে। ব্লাউজের ফাঁক গলিয়ে বের হওয়া সাদা চামড়া দেখে তাদের পুরুষত্ব লোভী হয়ে উঠে। একে অপরকে বলাবলি করে, “খাসা মাল বটে।”
বউটার অস্বস্তি হয়। তবুও স্বামী ভক্তি তার কমে না মোটেও। এ নিয়েও গ্রামে কথা উঠে। এত ব্যাটালোকের মাঝে যাওয়ার কী দরকার?
অথচ তারা জানে না, একদিন দুপুরে বিপিনের বউটার জ্বর এসেছিলো বলে খাবার নিয়ে যায়নি দেখে তাকে দু’দিন উপোস করিয়ে রেখেছিলো বিপিন। সেসব কথা জেনে কারই বা কী লাভ? একটু রগরগে কথা বলতে পারার মতন শান্তি কি আর সত্য বলার ভেতর আছে?
বিপিনের বোন- নোয়াটা আবার বেশ ভালো। সবে মাধ্যমিক দিয়েছে। দাদার বউকে সে মাথায় তুলে রাখে। কত বুদ্ধি দেয়! একদিন তার দাদা নিজের বৌকে মারায় সে দাদার সাথে ঝগড়া করল। বউটাকে শিখিয়ে দিলো আরেকদিন দাদা মারতে এলে যেন সেও দু’ঘা লাগিয়ে দেয়। পুরুষ মানুষ এরপর লজ্জায়ও আর হাত তুলবে না।
কিন্তু বিপিনের বউ তা শুনে আঁতকে উঠে। স্বামীর গায়ে হাত তোলার কথা সে কস্মিনকালেও ভাবে না। নোয়া ভাইয়ের বউকে আঁতকে উঠতে দেখে বলেছিলো,
“এত ভয় পাওয়ার কী আছে? একদিন সাহস না করলে কোনোদিন মাথা তুলে বাঁচতে পারবা? আমি হলে তো এমনই করতাম!”
বিপিনের বউটা তখন লক্ষ্মীমন্ত স্বরে উত্তর দিয়েছিলো, “তুমি করতে পারবা, ছোটদ্দি। আমি যে পারব না।”
নোয়া আরও রেগে গিয়ে বলে, “কেন পারবে না? তোমার কী নাই? ”
“বাবা। আমার যে বাবা নাই। ভাই নাই। আছে একটা বয়স্ক মা তাও থাকে একলা, অনেক কষ্টে। আজ তোমার দাদার শরীরে হাত তুললে কাল যদি আমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় আমি কী করব? আমার বয়স্ক মায়ের বোঝা হওয়ার চেয়ে এখানে থাকা ভালো না? বাবা, ভাই যার মাথার উপর নাই সে কার ভরসায় বুকে সাহস জোগাবে?”
নোয়া সেদিন দমে এসেছিলো। তবে তার মায়া কম হয় না এই মেয়েটার জন্য। কী সুন্দর ফুলের মতন মেয়ে। পড়াশোনায় ছিলো চমৎকার। হুট করে তার বাবা মারা গেলো। গরীব মা মেয়ের ঝামেলা কমাতে বিয়ে দিলেন। যেন চঞ্চল পাখিটাকে আটকে দিলেন খাঁচায়। তারপর থেকেই মেয়েটার মুখে বুলি নেই।
বিপিনদের বাড়িতে একটা চাঁপাফুলের গাছ আছে। বিপিনের বউটার সাথে গাছটার বড়োই সখ্যতা। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই সে চাঁপাফুলের গাছটার নিচে প্রথমে যায়। ঘ্রাণ নেয়। কথা বলে একা একা। গাছটাকে তার মায়ের মতন নাকি মনে হয়।
রাতে যখন বিপিন পুরুষত্ব ফলিয়ে গভীর নিদ্রায় নিমজ্জিত থাকে তখনও সে এই গাছটার নিচে এসে বসে। গাছটার বাকলে মায়া করে হাত বুলায়। বিড়বিড় করে কয়েকবার ‘মা, মা’ বলে ডাকে।
নোয়ার মাঝে মাঝে মনে হয় তার দাদার বউটা পাগল। মাঝে মাঝে মনে হয় বোকা। মাঝে মাঝে বোবাও মনে হয়। সংসার করতে হলে এত রূপ ধারণ করতে হয় সেসব তার ভাবনায় আসে না।
প্রতি রবিবার বিপিন বাড়িতে থাকে। সকালে উঠেই রেডিওতে গান শুনে। গরম গরম চা খায়।
সেই রবিবারে ব্যতিক্রম ঘটলো। সকালে তার সামনে গরম গরম চা দেওয়া হলো না। বউটার রাত থেকে এত জ্বর ছিলো। বিপিনের কি আর সেই হুঁশ আছে?
সকাল শুরু করল অকথ্য ভাষায়। লাটসাহেবের বেটি, জমিদারের বাচ্চা আরও কত কী! বিপিনের মা আবার উস্কে দিতে পারতেন ভালো। ছেলেকে তিনি আরও রাগালেন,
“তোর বউ এমনই তো করে। দেখ, দেখ আজ তুই বাড়িতে, তুই দেখেনে।”
পুরুষ বিপিন বুক ফুলিয়ে গিয়ে প্রথমেই লাথি মারল কোমড়ে। জ্বরের ঘোরে বেহুঁশ থাকা বউটা ককিয়ে উঠল। গলার স্বর ভেঙে যা-তা অবস্থা। তবুও বউটা উঠে বসল ক্লান্ত শরীরে। কোনো প্রতিবাদ না করে, কোনো অভিযোগ না রেখেই ছুটল রান্নাঘরে।
কিন্তু শরীরটা বড্ড বেশিই খারাপ ছিলো কি-না, মাথা ঘুরিয়ে সেখানেই পড়ল। নোয়া নিজের ভাই আর মায়ের উপর বড্ড চোটপাট করল। বৌদিকে নিয়ে ছুটল হাসপাতাল। সেদিনই বউটার ভাগ্য বদলে গেলো।
দু’দিন পর যখন বউ বাড়ি ফিরল দেখল বাড়ির চিত্র আরও ভয়াবহ। শাশুড়ি আগে যতটুকু বা রয়েসয়ে কথা বলতেন তার এক ভাগও অবশিষ্ট নেই। উঠতে বসতে বলতে লাগলেন, একটা বাঁজা এসে পড়ল আমার ছেলের কপালে। আমার ছেলে কী দুর্ভাগ্যগো! বাচ্চা দিতে না পারা বেডি আর গাভী কোনোটাই কামে দেয় না-কি?
বিপিনের বউ যেন পাথরমূর্তি। কী হবে তার? শ্বশুর বাড়ি ছাড়বে না বলে এত যুদ্ধ শেষমেশ সেই যুদ্ধে ঈশ্বর তাকে হারিয়ে দিলেন?
বিপিন তো কথায় কথায় বলত, তুই তো মা* একটা। তোর দিকে কুত্তাও ফিরবো না। বে* একটা। বাচ্চা না দিতে পারলে তোকে দিয়ে আমার কী কাজ?
বউটা কাঁদতো তখন বড়ো। বুক কাঁপতো তার সেসব অকথ্য ভাষায়। সারাজীবন এক স্বামী ভক্তিতে কাটিয়ে দেওয়া মেয়ে বে শ্যা বিশেষণে কাঁপবে না?
তবুও চুপ থাকত। একটিবার প্রতিবাদ করে বলতো না, আমায় এসব বলো না। প্রতিবাদ না করতে করতে সংসার যেন ওর বুলি কেঁড়ে নিয়েছিলো।
গ্রামের সবাই তখন ফিসফাস করতো। বিপিনের বউয়ের বদনাম আরও বাড়লো। অকাজের বেটি যে এতটা অকাজের তা নিয়ে কানাঘুষা হতো ভীষণ।
একদিন বৃষ্টিমুখর দুপুরের কথা। বিপিনের বাড়িতে নিমন্ত্রিত ছিলো বিপিনের বন্ধু মনির। সেদিন বাহিরে বড্ড বৃষ্টি ছিলো। বিপিন সকাল থেকেই বাড়িতে ছিলো না। আজকাল তার আবার অন্য নারীর প্রতি টান জন্মেছে। অকাজের বউটার দিকে ফিরে তাকাবার সময় নেই।
মনির ছাতা মাথায় ঠিক দুপুর দুটোতেই হাজির হয় বাড়িতে। হাতে এক হাঁড়ি রসগোল্লা। নোয়া বাড়িতে ছিলো না, পিসিমার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলো। বিপিনের মা ভাত খেয়ে এই সময়ে ঘুমাতেন সবসময়। সেদিনও তাই করলেন।
বিপিনের বউ স্নান সেরে গামছা পেঁচিয়ে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলো। অতিথি আসতেই অতিথি আপ্যায়নে সে মগ্ন হয়ে যায়। মনিরকে বসতে দেয় চেয়ারে। মিষ্টির হাঁড়িটা ছুটে গিয়ে রান্নাঘরে রাখে। এক গ্লাস লেবুর শরবত করে এনে এগিয়ে দেয় মনিরের দিকে।
বিপিনের বউকে মনির এর আগে বহুবার দেখেছে। স্বামীর জন্য ও যখন খাবার নিয়ে যেতো তখন তাকে নিয়ে ওরা ভেতর ভেতর নানান মন্তব্যও করেছে। মেয়েটার শরীরের কোন ভাঁজে প্রথমে চোখ আটকায় তা নিয়ে কত হাসিহাসি হয় তাদের ভেতর! আজ সেই নারীদেহ সামনে, মনিরের চোখ কি আর সামলাতে পারে কাম, লালসা?
বৃষ্টির শব্দ টিনের চালে ঝামুরঝুমুর শব্দ তুলে। মনির শরবতের গ্লাসে হাত না রেখে হাত রাখে বউটার বাহুতে। চমকে উঠে বিপিনের বউ। হাত থেকে তার গ্লাস পড়ে যায়। ছিটকে সরে যেতে নেয় দূরে।
সরতে পারে না। তার আগেই পুরুষালি বাহু তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে। সে চিৎকার করতে চায় কিন্তু বৃষ্টির সেই তীব্র শব্দ পেরিয়ে তার চিৎকার পৌঁছাতে পারে না কারো কানে। শকুন যেমন খুবলে খায় মৃতদেহ, তেমনই মনির তার সমস্ত সতীত্ব খুবলে নেয়।
বৃষ্টি থামে বিকেলে। চারপাশে অন্ধকার নামে। জ্বরে গা পুড়ে যায় বিপিনের বউটার। মুখে রা করে না। মুনির বাড়ি ফিরে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। তার ঐ দানবীয়, কালো, উন্মুক্ত শরীরটা বার বার জ্বরের ঘোরে দেখতে থাকে মেয়েটা। নিজের সর্বনাশের কথা তার মাথায় ঘুরতে থাকে। গাঁয়ে তার এত বদনাম, সতীত্ব হারানোর বদনাম সেখানে যুক্ত হলে সে বাঁচতে পারবে? তার সংসার থাকবে?
জ্বরে ঘোরে সে নিজেকে আবিষ্কার করে চাঁপাগাছের নিচটায়। চাঁপাফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারপাশটায়। বিপিন সামনে দাঁড়িয়ে আছে পাঞ্জাবি পরে। দু-হাত মেলে ডাকছে তাকে।
চলবে।
