Friday, June 5, 2026







প্রাণেশ্বরী পর্ব-০৬

#প্রাণেশ্বরী
#Writer_Asfiya_Islam_Jannat
#পর্ব-০৬

“শুনলাম তুমি শিলাকে বের করে দিয়েছ?কিন্তু কেন? হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানে কি প্রাণ?”

প্রশ্নটা শুনে প্রাণ মোটেও বিচলিত হলো না। ঠোঁটের কোণে ছোট হাসি ফুটিয়ে স্থিরচিত্তে বলে উঠে সে, “ও কাজে অনেক ফাঁকি দিচ্ছিল, সাথে ব্যবহারও বাজে হয়ে এসেছিল। যা আমার পছন্দ হচ্ছিল না, তাই বের করে দিয়েছি। কিন্তু তুমি এভাবে প্রশ্ন করছ কেন? কিছু কি হয়েছে? ডিড আই ডু সামথিং রং?”

প্রাণের শেষ উক্তিটি শুনে নয়ন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। বুঝতে পারে, সে একটু বেশি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছে। তবে সে বাই কি করবে? শিলা যখন ফোন করে জানালো, প্রাণ তাকে জব থেকে বরখাস্ত করে দিয়েছে তখনই তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। নিজের সকল পরিকল্পনা বানের জলে ভেসে যেতে দেখে ধীশক্তি লোপ পেতে শুরু করে তার, দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ে সে। তটস্থ কন্ঠে বলে উঠে নয়ন, “না.. মানে, এমনেই। আমাকে আগে জানালে না যে কিছু, তাই অবাক হলাম। আমাকে আগে বললে নিউ এসিস্ট্যান্ট খুঁজে দিতাম তোমায়, তোমাকে আর কষ্ট করতে হতো না।”

প্রাণ স্মিথ কন্ঠে বলে, “সমস্যা নেই! এমনেও আমার কষ্ট করতে হয়নি। বাবাকে বলে রেখেছিলাম, তিনিই খুঁজে দিয়েছেন। আর মাঝে কাজের এত লোড ছিল যে তোমাকে এসব জানানোর কথা মনে ছিল না।”

নয়ন নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করে বলে, “অহ আচ্ছা। তাই তো বলি, আমার প্রাণটা আমাকে কিছু জানালো না কেন।”

প্রাণ কথা ঘুরানোর জন্য বলে, “হুম! তোমার শুটিং কেমন চলছে? স্ক্রিপ্ট কেমন এবার?”

নয়ন স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল, “খারাপ না। সাসপেন্স এন্ড একশন টাইপ মুভি। মেইন মেইল লিড আমি আর সেকেন্ড মেইল লিড কবির ভাই আছি। বাকি কোস্টাররাও এবার ভালোই, সকলের কো-অর্ডিনেশন জমেছে বেশ।”

প্রাণ বলে, “যাক ভালোই।”

নয়ন প্রাণের কথার প্রত্যুত্তর করে, কিছুক্ষণ এদিক-সেদিকের কথা বলে ফোন রেখে দিল। নয়ন ফোন রাখতেই প্রাণের অধর কোণে বাঁকা হাসি দেখা দিল। সোফার পিছনে মাথা হেলিয়ে আঁখিপল্লব এক করে নিয়ে আনমনে বিরবির করে বলে উঠল সে, “সন্দেহ! সন্দেহ! যেকোন সম্পর্কের অথবা কোন সাজানো পরিকল্পনার ধ্বংসের মূল অস্ত্র সন্দেহ। আর ঠিক এটাই তোমার মাঝে ঢুকাতে চাচ্ছি আমি। সন্দেহ না করলে খেলা জমবে কিভাবে? সাবধান কিভাবে হবে তুমি? ইউ নো না আই লাভ ইউ সো মাচ? তোমাকে হেরে যেতে কিভাবে দেখতে পারি আমি?বল!”

শেষ উক্তিটি প্রাণ কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরেই বলে। অনন্তর, রহস্যময় হাসি হেসে উঠে সে।

________

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমটি জুড়ে হাড় কাঁপানো হাওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম এক সুগন্ধি ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশেই এক আবেদনময়ী নারীর ব্যাকুল চিত্তাকর্ষক। মন শান্ত এবং ভালো রাখার জন্য এরচেয়ে বেশি কি বাই প্রয়োজন একজনের? কিন্তু তবুও নয়ন পারছে না নিজেকে শান্ত রাখতে। রাগদ্বেষে মাথায় যেন আ’গু’নের ফু’ল’কি জ্ব’ল’ছে। মুখশ্রী হয়ে উঠেছে ঈষৎ রা’গা’রু’ণ। বিছানার একপাশে মুঠোফোনটি ছুঁ’ড়ে মে’রে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নয়ন বলে উঠলো, “মেজাজ খারাপ হচ্ছে এখন আমার।”

জেসিকা চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, “কেন কি হয়েছে?”

“গেস হোয়াট? প্রাণের নতুন এসিস্ট্যান্টকে নেহাল আঙ্কেল হায়ার করেছেন। যার মানে, নতুন এসিস্ট্যান্টকে এখন আমরা আর হাত করতে পারবো না। নতুনটাকে গিয়ে কিছু বললেই সব খবরাখবর সোজা নেহাল আঙ্কেলের কাছে পৌঁছে যাবে। আর তারপর…. ধ্যাৎ! সব প্ল্যান ওলোট-পালোট হয়ে গেল।”

জেসিকা এবার শোয়া থেকে উঠে বসে। উৎকন্ঠিত কন্ঠে বলে, “নেহাল শিকদার এবার প্রাণের এসিস্ট্যান্ট সিলেক্ট করেছেন? সিরিয়াসলি?”

জেসিকার প্রশ্ন শুনে পুনরায় ফুঁসে উঠে বলে,”এতক্ষণ কি বললাম আমি?”

জেসিকার আচরণে এবার অস্থিরতার দেখা মিলে। মুখশ্রী হয়ে উঠে পণ্ডুবর্ণ, “নেহাল আঙ্কেল সিলেক্ট করেছেন মানে প্রাণের জন্য বেস্টটাই চুস করেছেন তিনি নিশ্চয়ই৷ তাহলে প্রাণ এখন সবকিছু থেকে আমার থেকে এগিয়ে চলে যাবে? ক্যারিয়ার, ফেম সবদিক দিয়ে? আর আমরা হাতের উপর হাত রেখে সব দেখে যাব? নাহ! এমন হতে পারে না। এই নয়ন! তুমি কিছু কর না। প্লিজ! এভাবে হলে তো চলবে না।”

জেসিকার মাতলামো কথা শুনে নয়নের মেজাজ আরও চটে যায়। সে রোষাগ্নি কন্ঠে বলে, “থামবে তুমি? ভালো লাগছে না আমার কিছু। শান্ত মাথায় ভাবতে দাও আমাকে।”

জেসিকা উদগ্রীব কন্ঠে বলে, “কিন্তু প্রাণ হঠাৎ শিলাকে বের করলো কেন? কারণটা কি?”

নয়ন অসন্তোষ কন্ঠে বলে, “জানোই তো শিলা কাজের বেলায় এক নাম্বারের ফাঁকিবাজ। টাকা ছাড়া এই মেয়ে এক পা-ও নড়ে না। প্রাণের সাথে থাকাকালীনও মনে হয় কিছু একটা করেছে যা ওর চোখে পড়েছে, তাই তো রাখেনি। যদিও….”

“যদিও কি নয়ন? বল?”

নয়ন কিছুটা থেমে বলে, “কাউকে কিছু না জানিয়ে,হিন্ট না দিয়ে হঠাৎ শিলাকে বের করে দেওয়ার বিষয়টা ঠিক হজম হচ্ছে না আমার। আবার প্রাণের ব্যবহারগুলো কেমন যেন লাগছে। আগের চেয়ে বেশ ভিন্ন। গা ছাড়া ভাব। আচ্ছা, আমাদের সম্পর্কে কিছু জেনে গেল না-তো ও?”

জেসিকার মুখশ্রী এবার রক্তশূণ্য হয়ে উঠে। শঙ্কা দেখা দেয় অক্ষিকাচের আনাচে-কানাচে। কিন্তু পরমুহূর্তে কিছু একটা ভেবে নিজেকে শান্ত করে জেসিকা বলে উঠে, “না, এটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কেন না, আমাদের সম্পর্কে ও কিছু একটা আঁচ করতে পারলে এভাবে শান্ত হয়ে বসে থাকতে পারতো না। তুমি আমি ভালো করেই ওর মেন্টাল কন্ডিশন জানি। ও কোন প্রকার ট্রমা নিতে পারে না, প্রচন্ড রিয়্যাক্ট করে বসে। সেখানে তুমি ওর ভালোবাসা, সাধারণ কেউ না। এসবের কিছু জানলে ও একদম উন্মাদ হয়ে যাবে, শান্ত থাকবে না মোটেও। ”

জেসিকার কথায় যুক্তি আছে দেখে নয়ন দমে যায়৷ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “তা ঠিক তবে কিছুদিন প্রাণের আশেপাশেই থাকতে হবে। বাদ বাকি আমি দেখছি কি করা যায়।”

জেসিকা আপন খেয়ালে কিছু একটা ভাবতে ভাবতেই বলে উঠে, “হুম দেখ।”

_______

রাত একটার অধিক বাজতেই আশা বেগম প্রাণের রুমে আসেন। হাতে এক গ্লাস দুধ নিয়ে। প্রাণের কোলে ল্যাপটপ দেখে বলে উঠেন, “রাত কয়টা বাজে সেই খেয়াল আছে? এখনো এই বক্সটা নিয়ে বসে আছিস, নিজের রুটিন-ডায়েট সব ভুলে খেয়ে বসেছিস নাকি?”

প্রাণ দৃষ্টি তুলে তাকায় আশা বেগমের দিকে, “না ভুলিনি, কিছু কাজ পেন্ডিং ছিল সেগুলোই শেষ করছিলাম আশামা। ”

আশা বেগম কাছে এসে বলেন, “অনেক হয়েছে কাজ,এবার রাখ।”

প্রাণ নিজের কাজ গুছিয়ে নিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিন অফ করে বলে, “নাও! রেখে দিচ্ছি। এবার শান্তি হয়েছে?”

আশা বেগম হেসে নিজের হাতে থাকা দুধের গ্লাসটা প্রাণের দিকে এগিয়ে বলে, “হ্যাঁ হয়েছে। এবার ভালো বাচ্চার মত এটাও খেয়ে নে।”

প্রাণ নাকচ করে বলে, “আজ ইচ্ছে করছে না খেতে। অস্বস্তি লাগছে এমনেও।”

“কোন কথা না খাও এটা। রাতে কিন্তু ঠিকমতো খাওনি তুমি। এভাবে চলতে থাকলে শরীরে শক্তি পাবে কিভাবে তুমি?”

প্রাণ কিছুক্ষণ এনিয়ে-বিনিয়ে না করার চেষ্টা করল কিন্তু তাতে কোন লাভ হলো না৷ আশা বেগমের কড়া দৃষ্টির বিপরীতে তাকে শেষ পর্যন্ত খেতেই হলো। খাওয়া শেষে প্রাণ বলে উঠে, “দুধটা কি খারাপ হয়ে গিয়েছিল? টেস্টটা কেমন যেন লাগলো আমার?”

আশা বেগম কিঞ্চিৎ হাসার চেষ্টা করে বলেন, “জাফরান আর বাদাম মিশিয়ে দিয়েছিলাম তোকে, তাই হয়তো এমন লেগেছে৷ এখন পানি খেয়ে শুয়ে পর। আমি লাইট অফ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে যাচ্ছি।”

প্রাণ মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাতেই আশা বেগম বেরিয়ে আসেন। নিচে এসে গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে তিনি লম্বা নিঃশ্বাস ফেলেন।

_______

আকাশে তখন হলদেটে মেঘের হাতছানি। দক্ষিণা বাতাসে দুলছে প্রকৃতি। অজানা শুভ্র,স্নিগ্ধ ফুলগুলো ঝরে পড়ছে সমতলে। রাস্তার আঁকে-বাঁকে ছোট পদচারী শিশুগুলো এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটাছুটি করে চলেছে উপার্জনের স্বার্থে। শাহবাগ চত্তরে যানজট লেগে আছে বিশ্রীরকম। মিনিট দশকের বেশি হলো তবুও জ্যাম ছাড়ার নাম গন্ধ নেই। প্রাণ পিছনের সিটে মাথা হেলিয়ে নয়নযুগল বন্ধ করে শুয়ে আছে, হাতে একটা স্ক্রিপ্ট। সেটাই আনমনে আওড়ে যাচ্ছে সে। আজ অনেকদিন পর শুটিং-এর জন্য বেড়িয়েছিল সে। শুটিং শেষে রওনা হয়েছে কাওরান বাজারের উদ্দেশ্যে, আসন্ন মুভিটির জন্য ‘আর টিভি’ থেকে একটি টক শো আয়োজন করা হয়েছে, সেখানে মুভির মেইন মেইল ও ফিমেল লিড উভয়ই আমন্ত্রিত। আসন্ন মুভিটাতে প্রাণের সাথে এবার জিহান আবরার অভিনয় করেছে। আগে যেহেতু প্রাণ জিহানের সাথে কখনো কাজ করেনি সেহেতু দর্শকরা এবার বেশি উৎসুক জানতে তাদের দুইজনের যুগলবন্দী কেমন হবে? কেন না, দুইজনই অত্যাধিক জনপ্রিয় মুখ জনসাধারণের নিকট। মুখে মুখে তাদের চর্চা হচ্ছে বেশ। আর এটারই সুযোগ নিচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল চ্যানেলগুলো নিজের ‘টি আর পি’ বাড়াতে।

প্রাণ ‘টক শো’-এর জন্য আনমনে নিজের কথাবার্তা গুছিয়ে নিচ্ছিল এমন সময় তার কাঁচে টোকা পড়ে। প্রাণ আঁখিপল্লব খুলে পাশা তাকাতেই ছয়-সাত বছর বয়সী এক ছোট মেয়েকে দেখতে পেয়ে সাইড গ্লাস নামিয়ে নেয় সে জিজ্ঞাসুক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকাতেই মেয়েটি বলে উঠে, “আফা একটা বেলিফুলের মালা লইবেন? দেহেন এক্কেরে তাজা সব ফুল, একটুও নশট হোয় নাই।”

পাশ থেকে চৈতি কিছু বলতে নিলে প্রাণ চোখের ইশারায় তাকে থামতে বলে একবার ফুলের তাকিয়ে পুনরায় মেয়েটার শীর্ণ-জীর্ণ মুখপানে তাকালো। পড়নে ময়লা, ছেঁড়া কাপড়, দৃষ্টিতে একটি মালা বিক্রি করার আকুলতা, অর্থ হাতে পাওয়ার তীব্রতা। প্রাণ হালকা হেসে বলে, “সবগুলো মালার দাম কত?”

কথাটার কথা শুনে মেয়েটার চোখ খুশিতে চকচক করে উঠে। ঠোঁটের কোণে স্থান পায় বিস্তৃত হাসি। সে মালা গুণে হিসাব করে বলে, “দসটা আচে, দুইসো টেহা দিলেই হইবো।”

প্রাণ মাথা দুলিয়ে হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একহাজার টাকার নোট বের করে মেয়েটাকে দিয়ে বলল, “তুমি এই পুরো টাকাটা রাখো আর ফুলগুলো আমাকে দিয়ে দাও।”

মেয়েটার তামাটে চেহেরায় এবার চমৎকার এক হাসি ফুটে উঠল। চোখে খেলা করে গেল চঞ্চলতা। সে খুশি মনে টাকাটা নিয়ে বেলিফুলের মালাগুলো প্রাণকে দিয়ে বলল, “আফনারে ধন্ন্যবাদ আফা। আফনি বড্ড উদার দিলের মানুস।”

প্রাণ জিজ্ঞেস করে, “নাম কি তোমার?কই থাকো তুমি?”

মেয়েটা ইশারা করে বলে, “আমার নাম কলি। থাকি হইলো উদ্যানের লগের বস্তিটায়, ফুতপাতে যেডা আচে।”

“বাবা-মা, ভাই-বোন নেই কোন তোমার কলি?”

মেয়েটা মাথা দুলিয়ে বলে, “নাকো নাই। রাস্তার বাহি পোলাপাইন গো লগেই থাহি আমি।”

“পড়ালেখা কর?”

কলি বিভ্রান্তিতে পড়ে বলে, “হেডা আবার কি?”

প্রান বুঝে মেয়েটার এসব সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। তাই সে মাথা দুলিয়ে বলে, “না কিছু না। তা কলি এখন বাসায় ফিরে যাও, সন্ধ্যা নেমে আসছে কিন্তু।”

কলি হ্যাঁ সূচক মাথা দুলিয়ে চলে যেতেই প্রাণ গাড়ির গ্লাস উঠিয়ে ফেলে। মালাগুলো হাতে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখতে থাকে। পাশ থেকে চৈতি বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠে, “এই মালাগুলো এখন কি করবেন ম্যাম? ফেলে দিবেন?”

প্রাণ আনমনে বলে উঠে, “তাছাড়া আর কি করব?”

চৈতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “তাহলে নিলেন যে?”

প্রাণ চৈতির দিকে না তাকিয়ে বলে, “কারো মুখে হাসি ফুটানো যে কতটা তৃপ্তির তা হয়তো তুমি জানো না।”

প্রাণের এমন কথায় চৈতি চুপ বনে গেল। প্রাণ বেশ কিছুক্ষণ ফুলের মালাগুলো দেখে পাশে অযত্নের সহিত রাখলো। পিছনের দিকে মাথা হেলিয়ে বিরবির করে উঠলো সে, “বিষাক্ত প্রাণে সুবাসের কোন জায়গায় নেই।”

কথাটা চৈতির কর্ণপাত হতেই আড়চোখে তাকালো সে প্রাণের দিকে। বুঝার চেষ্টা করে এর অর্থ।

___________________

রাত ঠিক আটটায় টক শো-টি আয়োজন শুরু হলো। জিহান আর প্রাণকে পেয়ে সবাই যেন খুশিতে আটখানা, খাতিরদারিতে ত্রুটি রাখেনি বিন্দুমাত্র। মূলত প্রাণকে খুশি করার চেষ্টা, দেশের স্বনামধন্য ডাইরেক্টরের মেয়ে বলে কথা। তোষামোদ করে যদি কিছু একটা সুবিধা করা যায়। প্রাণ সবই বুঝেছে তবে গুরুত্ব দেয়নি। নিজের মতই ছিল সে৷অতঃপর আয়োজন শুরু হওয়ার পর হোস্ট একের পর এক প্রশ্ন করেই চললেন, প্রাণ ও জিহানও বেশ সাবলীলভাবেই উত্তর দিয়ে চলল৷ মাঝে মধ্যে ঠাট্টা-তামাশাও হলো। এর মাঝে শো-এর হোস্ট সাবিলা প্রাণকে জিজ্ঞেস করে উঠলেন, “তোমার করা প্রথম ছবির নাম ‘নীলচে তারা’ ছিল ঠিক তো?”

প্রাণ হেসেই উত্তর দেয়, “হ্যাঁ।”

সাবিলাও হেসে বলে, “কখনো কি ভেবেছিলে প্রথম ছবি করেই এত খ্যাতি অর্জন করবে তুমি? এবং এত দূর আসতে পারবে?”

প্রাণ বলে, “সত্যি যদি বলতে হয় তাহলে বলব, মোটেও না। দর্শকরা আমাকে এত ভালোবাসা দিবে, চাইবে তা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি আমি।”

সাবিলা বলে, “প্রথম ছবিটা বোধহয় নয়নের সাথে করেছিলে, রাইট?”

প্রাণ মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাতেই সাবিলা বলে উঠে,” মানতে হবে, নয়নের সাথে তোমার জুটি ফুটেছিল বেশ। আমরা দর্শকরা তোমাদের জুটি এতটাই পছন্দ করেছিলাম যে এখনো তোমাদের এক পর্দায় দেখতে আগ্রহী। সরি! জিহান ভাই তোমাকে আমি ডিচ করছি। তবে সত্যিটা না বলে থাকতেও পারছি না।”

জিহান হেসে বলে, “ব্যাপার না। এটা এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির সবাই জানে, অনস্ক্রিন নয়ন আর প্রাণের জুটি মানেই আলাদা অনুভূতি। সবাই মারাত্মক লেভেলের পছন্দ করে তাদের জুটিকে। দে জাস্ট লুক লাই, মেড ফর ইচ আদার।”

সাবিলা জিহানের সাথে তাল মিলিয়ে পড়ে, “একদম! তা প্রাণ, অফস্ক্রিন কিছু চলছে নাকি তোমার আর নয়নের মাঝে? চাইলে শেয়ার করতে পারো আমার পাঁচকান করব না বিষয়টা।”

প্রাণ রসিকতা কন্ঠে বলে, “টিভি শো-তে এনে লাইভ করে বলছেন কথা পাঁচকান করবেন না?”

সাবিলা হাত উপরে উঠিয়ে চোর ধরা পরে যাওয়ার মত অভিনয় করে বলল, “উপস! ধরা পরে গেলাম৷ তবে তুমি কিন্তু আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে প্রাণ৷ এর মানে আমরা কি ধরব? হুম?”

প্রাণ হেসে বলে, “অফস্ক্রিন কিছু আছে নাকি নেই তা সময় হলেই জানা জানাবে। আপাতত আপনাদের মত আমিও অজানা এই বিষয় নিয়ে। তাই সঠিক উত্তর দিতে পারছি না। দুঃখিত!”

সাবিলা নিদারুণ অভিনয় করে বলে, “আশার আলো কিন্তু জাগাচ্ছো প্রাণ, পরবর্তীতে আবার ছ্যাঁকা দিয়ে দিও না প্লিজ।”

প্রাণ প্রত্যুত্তর না করে মৃদু হাসে। তাই সাবিলা বলে উঠে, “বাট ফ্রাঙ্কলিন স্পিকিং, অফস্ক্রিনে তোমাদের জুটি হলে মন্দ হয় না৷”

প্রাণ প্রত্যুত্তরে সৌজন্যমূলক হাসি উপহার দিতেই সাবিলা অন্য কথায় চলে যায়। আয়োজনটি শেষ হতে আরও ঘন্টাখানেক সময় লাগে। সব প্যাক-আপ হতেই প্রাণ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। বাসায় যাওয়ার জন্য উদ্যোগী হতেই পিছন থেকে জিহান ডেকে উঠল, “প্রাণ শুনো!”

প্রাণ পিছন ঘুরে জিহানের দিকে তাকিয়ে বলে, “হ্যাঁ বল।”

জিহান মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে, “সামনের সপ্তাহ আমার বার্থডে, তাই সে উপলক্ষে আমি ছোট একটা পার্টি এরেঞ্জ করছি। তুমি যদি সেখানে আসতে তাহলে আমি বেশ খুশি হতাম।”

প্রাণ হেসে বলে, “কেন আসব না? অবশ্যই আসব আমি,চিন্তা কর না।”

জিহান সৌজন্যমূলক হাসি হেসে বলে, “থ্যাংক ইউ সো মাচ। আমি পরে তোমাকে পেস আর টাইম জানিয়ে দিব নে।”

“ইয়াহ সিউর!”

জিহান আর কথা বাড়ায় না, বিদায় নিয়ে চলে আসে। জিহান যেতেই প্রাণও বেড়িয়ে পড়ে বাসার উদ্দেশ্যে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে আজ।

____________

কোন এক অবসন্ন সায়াহ্ণে অবশেষে প্রাণের অবসর মিলে। টানা তিনদিন রোবটের ন্যায় ব্যস্ততার সাগরে নিমজ্জিত থেকে আজকের কিঞ্চিৎ অবসরটুকু যেন তার কাছে এক টুকরো নন্দনকানন। একবারে স্নিগ্ধ,নির্মল,প্রসন্ন। কোন ব্যস্ততা নেই,কোন হাক-ডাক নেই, চিল্লাচিল্লি নেই, তাড়া নেই। হাতে এককাপ কফি নিয়ে প্রাণ বারান্দায় রাখা ইজিচেয়ারে গিয়ে বসলো সে। দুপুরে সার্ভেন্টকে দিয়েই রুমের চেয়ারটা এখানে আনিয়ে রেখেছিল। প্রাণ কানে এয়ারপডস গুঁজে নিয়ে পাশ্চাত্য গায়কশিল্পির গাওয়া “সিনড্রেলা’স ডেড” গানটি ছেড়ে দিল। অতঃপর আকাশের পানে তাকিয়ে ধোঁয়া ওঠা কাপে ছোট ছোট চুমুক বসিয়ে আনমনে গুণগুণ করতে থাকে। কারণে-অকারণেই গানটা তার জীবনের সাথে বেশ মিলে যায়। তাই হয়তো এই কয়েকদিনে হাজারবার শুনে ফেলেছে গানটা, বর্তমানে পছন্দের তালিকায় গানটি শীর্ষেও চলে এসেছে। কফি শেষে গানটা উপভোগ করতে করতেই পিছনের দিকে গা হেলিয়ে বসল সে। এর কিছুক্ষণের মাঝেই কারো আগমন ঘটলো। আগন্তুকটি পিছন থেকে এসে প্রাণকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ভোওঅঅ!”

#চলবে

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ