#_প্রণয়িনী_
#_৯ম_পর্বে__
দুপুর বেলা। তীব্র গরমে ঝিমিয়ে আছে ধরনী। নাজেহাল পথচারীরা। হসপিটালেও রোগীর ভিড় যেন উপচে পড়া। আজ শোরগোল বেশ! কেবিনের ভেতরে নিশ্চল তন্দ্রায় বুদ হয়ে আছে প্রাণ। ওষুধের প্রভাব এখনও কাটেনি ওর। পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয়। চোখে জুড়ে ক্লান্তি অথচ সর্বাঙ্গে দৃঢ়তা। তখনই বাহির হতে কানে এলো কারো কথা,
–”এই কেবিনই কি মিস. প্রাণের?
প্রণয় একপেশে হাসল। জনাব এসে গেছে তাহলে? ওর মনোভাব অপেক্ষা করানো। তাই চুপ রইল। ‘নিবিড় দাঁড়িয়ে আছে কেবিনের দরজার সামনে। নার্সের অনুমতি রয়েছে কেবিনে প্রবেশের। তবুও ভদ্র সুলভ নক করল। কিন্তু ভেতর হতে সাড়া পেল না কোন। নব ঘুরিয়ে বুঝল লকড দরজা। এক পর্যায়ে ডাকল ধৈর্যহীন,
–“প্রাণ, দরজাটা খোল। প্লিজ! আমি তোমাকে শুধু একবার দেখতে চাই।
–”ব্লাডি। সাহস দেখ, তুমি ডাকছে আবার! ভালোই হলো তুই এলি।
ভেবেই প্রণয়ের ঠোঁটে ফুটল বাঁকা হাসি। সে বাইরে বেড়িয়ে এলো সময় নিয়ে। নিবিড় মনে মনে চমকেছে প্রণয়কে এখানে দেখে। প্রণয় তড়িৎ মুখের উপর লক করে দিল দরজা। ওর মুখ জুড়ে রয়েছে বিদ্রুপ ভাব। নিবিড় পরক্ষণেই টতস্থ হয়ে দু’হাত মুষ্ঠি বদ্ধ করে শানিত চোখে পিষ্ট করতে লাগল ওকে। প্রণয়ের বরফ ঠান্ডা গলা,
–“ভদ্রতা শিখিসনি?
–”পথ ছাড়।
নিবিড়ের উল্টো শক্ত গর্জন। প্রতিত্তোরে প্রণয়ের কণ্ঠে তাচ্ছিল্য,
–”উনি ঘুমাচ্ছেন। আর ভাবলি কি করে আমি থাকতে পর পুরুষ হয়ে আমার প্রাণ প্রণয়িনীকে দেখবি তুই?
–“তুই হারাম ওর জন্য।
গলায় একরাশ ক্রোধ। নিবিড় উত্তেজিত হয়ে উঠল। প্রণয়ের হাসি চওড়া হয় এতে। বলল ব্যঙ্গাত্মক,
–”কাকের দেখি ময়ূর হতে সখ জেগেছে। আমি সুপুরুষ, সজ্জন ছেলে হয়েও উনার মন জয় করতে পারছি না, আর তুই লম্পট, মেয়েবাজ হয়ে চাইছিস প্রাণের মন পুরুষ হতে?
–”জিভ টেনে ছিড়ব তোর।
নিবিড় চিরবিরিয়ে উঠা রাগে কলার চেপে ধরল প্রণয়ের। কথা মিথ্যে নয়, তবুও এই মেয়ে এখন তার জেদে পরিণত হয়েছে। প্রণয় চাইছিল না হসপিটালে হাঙ্গামা করতে। তবে এবার নিজেকে শমিত রাখতে পারল না সে। সেদিনও তার কলার ধরেছিল, আজ আবার? প্রণয় মুহুর্তেই হাটু ভাজ করে লাথি দিল নিবিড়ের গোপন অঙ্গে।
নিবিড় উফ তাক করার সময় পেল না। প্রণয় পর পর খানিক ঝুকে ঘুষি বসাতে লাগল নাক বরাবর। তারা দু’জনেই সমান বলশালী। প্রণয় তাই তো আগে ধরাশায়ী করল নিবিড়ের সংবেদনশীল জায়গায় মেরে। সে এর আগে কখনো এসব মারামারিতে ছিল না। প্রেমে পড়ে কি কি করতে হচ্ছে ওকে।
প্রাণের ঘুম ভাঙ্গল এ’দফা। কেবিনের বাইরে তর্ক আর ধস্তাধস্তি শব্দে খুবই বিরক্ত হলো সে। কাচা ঘুমটা ভেঙে গিয়ে মাথা ধরল খুব। তাও আস্তে ধীরে উঠে কেবিনের বাইরে এসে দেখে তার দুই জান খাওয়া পুরুষ মারামারিতে লিপ্ত। রাগের বদলে হতাশ হলো প্রাণ। দেখতে থাকল শুধু।
–”কুত্তা, মেয়ে দেখলেই লালা পড়ে তোর, তাই না? একে রুমে ঢুকেছিলি তার উপর কিস ও করেছিস। মেরেই ফেলতাম তোকে।
প্রণয় মন ভরে নিবিড়কে শায়েস্তা করে সটান দাঁড়িয়ে গেল। প্রাণের ঘৃণায় গা গুলিয়ে আসার জোগার। কি বিশ্রী অনুভব করেছে সেদিন সে। প্রণয় আদলে ভালো মানুষির ছাপ ফুটিয়ে তুলে গলা উঁচাল,
–”নার্স, ডক্টর। প্লিজ, চেক আউট হেয়ার. সামওয়ান গট ইঞ্জুরেড.
প্রাণ বিস্মিত! গলবিল রুদ্ধ। নেত্র ছুঁয়েছে কপাল। এই লোক আদেও ভালো মানুষের কাতারে পড়ে? প্রণয়ের হাক-ডাকে এডমিট করা হলো নিবিড়কে। বেচারা ভালোই উত্তম-মধ্যম খেল। প্রণয় সুস্থির শ্বাস নিয়ে ঘুরে দেখল প্রাণকে। চোখ টিপে দিল একটা। প্রাণের মুখটা শক্ত হয়ে উঠল। ত্যক্ত ভূষণে কেবিনে ঢুকতে নিবে প্রণয় ওকে ফট করে পাজা কোলে তুলে নিল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
–”আপনার না হাঁটতে বারন। কথা না শুনলে কিন্তু পিট্টি দিব।
প্রণয় এবার এগোতে ধরল। প্রাণ মুখ ফিরিয়ে নিল। প্রণয় ঠোঁট টিপে হেসে বলে,
–”আপনি এখন দুই জন অথচ ওজন দেখে মনে হচ্ছে আমি কোন তুলোর বস্তা নিয়ে হাঁটছি।
–”ভালোবাসার মানে বুঝেন?
প্রাণের ফালতু কথার পিঠে প্রণয় স্বাভাবিক। বরং চোখে মুখে জানার আগ্রহ। বলল তার স্বরে,
–”না, বুঝি না। তা এর মানে কি?
–”ভালোবাসা মানে নিজের ইচ্ছার উপর কারো শান্তি বিসর্জন করা নয়।
একটু মুহূর্ত চুপচাপ কাটল। প্রাণ কিয়ৎ পলে ফের বলতে নিবে প্রণয় কণ্ঠে ‘হুশশ, ধ্বনি তুলল। থামিয়ে দিল কথা। নিজে বলল কাটকাট,
–”আমি শুধু বুঝি আপনি আমার হলে দুনিয়া জান্নাত হবে আমার। এইসব দুই টাকার লেইম কারণ আমার মনের স্নিগ্ধ অনুভূতিকে টলাতে পারবে না।
প্রণয় প্রাণকে বেডে শুইয়ে দিল ঠিকঠাক ভাবে। দুষ্টু নজরে পরোখ করল মন বিরহিণীকে। কত অপূর্ব সুন্দর লাগছে তাকে। বেশ সুস্থ এখন প্রাণ। যার ফলে ওর মুখের উজ্জ্বল ভাবটা ফিরে আসছে। প্রণয় হুট করে একটা বেহায়া কাজ করে ফেলল। প্রাণের মেদুর রাঙ্গা গালে চুমু এঁকে দিল। সে মিটিমিটি হেসে স্তব্ধ হওয়া প্রাণের দিকে চেয়ে আওড়াল,
–”ভালোবাসি, প্রাণ প্রণয়িনী।
প্রাণ গালে হাত চাপলো। মধুর বাণীতে চোখ বুজে ফেলল। প্রণয় পালালো। নাহলে আবহ গরম হতে বেশি সময় লাগবে না। প্রাণের মন অনেক দিন পর পরম শান্ত হলো বোধহয়!
.
প্রণয় বাড়ি ফিরল। পূর্ণা ফোন করে জানিয়েছে মায়ের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। তাই উপায়ন্তর না পেয়ে তাকে আসতেই হলো। সোজা ঢুকে পরল মায়ের রুমে। ঘরের ভেতর হালকা আলো জ্বলছে। লিপি চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছেন। প্রণয় কপালে ভাজ ফেলে তাড়া দিল মাকে,
–”দেখি, উঠে আসো তো। এই ভর বিকেলে এভাবে শুয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে।
–”করলেই বা কার কি আসে যায়?
লিপির কথায় একরাশ অভিমান। প্রণয়ের গলা নরম, –”আসে যায়। তোমার স্বামীর, ছেলে-মেয়ের অনেক কিছু আসে যায়। এমন কথা মুখে আনবে না আর।
প্রণয় আবার বাইরে গেল কক্ষের। খাবার নিয়ে ফিরেও এলো কিছু সময়ের ব্যবধানে। বসল মায়ের পাশে। এক হাতে লিপিকে তুলে বসিয়ে দিল। সে চুপচাপ নিজের হাতে করে খাইয়ে দিতে লাগল।
–”বুঝলাম, আমি তোমার জীবনে বাইরের মানুষ।
লিপির কথায় প্রণয় কাষ্ট হাসল। এক লোকমা মায়ের মুখে পুরে দিয়ে বলে,
–“মায়ের জায়গায় মা। সে স্থান কেউ নিতে পারে না। প্রাণ উনার জায়গায়। আবার মানুষ দোষ, ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। প্রাণ ছোট থেকে অবহেলায়, অনাদরে, অতীব কষ্টে বেড়ে উঠা একটি ফুল। বিয়ের পর তো স্বামীর কাছেও ঠকে গেছেন। বিশ্বাস করো আম্মু, উনাকে দেখলে তুমি নিজেই তার প্রেমে পরবে। প্রাণ ভাবে আমি সহানুভূতি দেখাচ্ছি। সেই কথা ধরে তুমি অন্তত একটু সহানুভূতি দেখিয়ে উনাকে মেনে নিতে পারো। খুবই সাফ মনের এক ভঙ্গুর মেয়ে উনি।
লিপি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছেন ছেলেকে। কথা বলার সময় প্রণয়ের চোখ ছলছল হয়েছে। নারী মন বুঝল ছেলে উনার খুব করে মজেছে প্রণয়ে। জানতে চাইলেন তিনি,
–”আমার উত্তর যদি না’ই থাকে?
–”ছোট থেকে এখন অবধি তোমরা যা করতে বলেছ তাই করেছি আমি। বাবার ব্যবসা কোটি টাকায় তুলেছি। নিজের সখ ছেড়েছি। এখন প্রশ্ন উঠলে আমার যতটুকু ত্যাগ করেছি তার প্রতিদানে চাইব আমার ভালোবাসা ‘প্রাণকে।
লিপি শুনলেন। সন্তুষ্ট হলেন তাতে। চরিত্রবান ছেলে পেটে ধরেছেন বলে গর্ব হলো প্রচুর। ছেলের খুশির কাছে বড় আর কি বা হতে পারে? তিনি অনেক বুঝিয়েছেন নিজেকে। প্রথমে মেয়ের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনে ছি ছি করেছেন। তবে পরে যখন মেয়ের থেকে সব শুনলেন নিজের বুকও ভার হয়েছিল উনার। ভাগ্য খারাপ তো চরিত্রের দোষ দিবে কেন?
প্রণয় মাথা নিচু করে রয়েছে। আর কেমন করে মাকে বোঝাবে সে? ছেলের দশা দেখে মাতৃমন নরম হলো লিপির। ছেলের গালে হাত চেপে নমিত মুখটা উপরে তুললেন। প্রণয়ে লালচে চোখ চোখ রেখে বললেন,
–”তা একদিন নিয়ে আসিও তোমার প্রাণকে। দেখি, আমিও প্রেমে পড়ি কিনা!
–”আম্মু! ইউ রিয়েলি সে দিস?
প্রণয়ের কণ্ঠে বিস্ময়! চোখ দু’টো মার্বেলের ন্যায় বড় বড় হয়েছে ওর। মুখটা লাগছে শিশু সুলভ। লিপি হেসে দিলেন উচ্চ রবে। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
–”আমার আম্মু বেস্ট!
প্রণয় ভাতের প্লেট রেখে মাকে একহাতে জড়িয়ে নিল। কপালে এক পাশে চুমু দিয়ে হাস্য বদনে পুনশ্চ বলল, –”কালই নিয়ে আসি? নাকি তুমি আজ যাবে প্রাণকে দেখতে? উফফ, তোমাকে দেখলে উনার মুখের অবস্থা যা হবে না। ভেবেই এখনই হাসি পাচ্ছে আমার।
কি উচ্ছ্বাস! কথায় কি উৎফুল্ল ভাব। কতটা খুশি প্রণয়। লিপি কিছুক্ষণ ভাবুক থেকে মজার ছলে শুধালেন,
–”তা বিয়ের পর ভুলে যাবে না তো? এখনই দেখি হবু বউয়ের ন্যাওটা হয়ে গেছো।
–”আমার আব্বু তো তোমায় ভুলবে না।
প্রণয়ের দুষ্টু কথায় লিপি ছেলের বাহুতে আলতো চাপড় মারলেন। আওড়ালেন,
–”ফাজিল ছেলে!
প্রণয় সবটুকু খাবার খাইয়ে দিল মাকে। যাক একটা যুদ্ধ বিজয় করল সে। আর কোন বাঁধা নেই একান্ত নারীকে পেতে।
.
প্রাণের আজকের ব্লাড পুস শেষ হলো। ক্যানুলা খোলার সময় নার্সকে অনুরোধ করল সে,
–”আমি হসপিটাল থেকে রিলিজ নিতে চাই।
–”আপনার শরীর এখনো দুর্বল। তাছাড়া আপনার হাসবেন্ড বারন করে গেছে।
নার্সের কথায় প্রাণের চোখ আগুন দৃষ্টি রুপ নিল। পছন্দ নয় তার এসব। একেবারে স্বামীর পরিচয় দিয়েছে। আগেও এমন করেছিল মানুষটা। রাগটা প্রশমন করে আরও অনুনয় করল সে। শেষ মেষ তাকে ছাড়তে বাধ্য হলো হসপিটাল থেকে।
„প্রাণের তো যাওয়ার জায়গা নেই। সেই ফিরতে হলো নিজ নীড়ে। তবে সে এখানে থাকবে না। টাকা আর তার জিনিস নিয়ে চলে যাবে নতুন বাসা খুঁজতে। বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলিং বেল চাপল প্রাণ। মনিরা গেট খুলে ওকে দেখা মাত্রই হাসি হাসি মুখ দপ করে নিভে গেল। চড়াও হলো প্রচন্ড ক্রোধ। ক্ষিপ্ত গলায় বললেন কটু বাক্য,
–”বেকার ফূর্তি করলি নাকি টাকা দিয়েছে তোর নাগর? তা এত তাড়াতাড়ি খাওয়া হলো জনাবের?
প্রাণের চোখ স্থির। সে চুপচুপ পাশ কাটিয়ে চলে গেল ভেতরে। মনিরা গর্জে উঠলেন,
–”এই মা’গী, বের হ তুই আমার বাড়ি থেকে। ভদ্রলোকের বাড়িতে থেকে বে’শ্যাগিরি চলবে না।
–”ভুলে যেও না এই বাড়ি আমার।
প্রাণের শান্ত কণ্ঠ। মনিরা দ্বিগুণ তেজে জ্বলে উঠলেন। দু’পা এগিয়ে এসে চড় মারবেন প্রাণ হাত ধরে ফেলল উনার। মুচড়ে দিল হাতখানা। যন্ত্রণায় মুখ নীল হলো ভদ্রমহিলার। ক্রু স্বরে বলল প্রাণ,
–”আগে পায়ের তলার মাটি শক্ত ছিল না। আর আমার সন্তানের উপর আচ আসলে ছাড় দিব না একচুল।
–”নাংগের টাকায় দেখি তেজ বেড়েছে।
মনিরার মুখে বিদ্বেষ। কষ্ট পাচ্ছেন তবুও গলার জোর কমেনি। প্রাণ ঝটকা মেরে ছেড়ে দিল উনার হাত। তখনই সেথায় উপস্থিত হলো মোহন। এ ছেলে বউকে নিয়ে ঘরের দোর লাগিয়ে সারাদিন শুয়ে থাকবে, বাপের অন্ন ধ্বংস করবে। মনিরা ছেলেকে দেখে দাগ পরা হাত বাড়িয়ে ধরে কাঁদো সুরে নালিশ জানালেন,
–”বাপ দেখ, এই মুখপরী কি করেছে আমার। লোকজন কী বলছে জানিস তো, আব্বা। ছেলের সাথে ঢলা-ঢলি করে বেডায়, লোকজন আমাদের মুখে ছাই দেবে। তুই ঘাড় ধাক্কা দে এটাকে।
–”আমি থাকবও না এই নরকে। এই বাড়ি’টা আমার গায়ে কাঁটা হয়ে গেছিল অনেক আগেই। শুধু সহ্য করে ভেবেছিলাম একদিন ভালোবাসা পাব। কিন্তু সাপ শুধু বিষ ঝাড়তেই জানে।
প্রাণ মুখ খুলল এবার। খেঁকিয়ে উঠল মোহন,
–”চোপা চালাস না। তাড়াতাড়ি দূর হ চোখের সামনে থেকে। নাহলে এবার লাথি তোর পেটে পরবে।
প্রাণ একটু হাসল। কষ্টের হাসি! চোখের সামনে ভেসে উঠল সে সন্ধ্যার ঘটনাটুকু।
তর্কে গেল না আর প্রাণ। নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগে তার কাপড় ভরল। ছোট্ট ডায়েরিটা নিল। মায়ের ছবিখানায় হাত বুলিয়ে স্বল্প কাঁদল। সঙ্গে রাখল সেটাও। প্রাণ বসার ঘরে এসে করল ভয়াবহ সাহসী কাজ। মোহনের গালে সপাটে থাপ্পড় দিয়ে থু থু ছুড়ে দিল ওর মুখে। যত ঘৃনা আছে সব উগলে দিল ছোট্ট একটা শব্দে,
–”কাপুরুষ!
অতঃপর চিরতরে বিদায় জানাল বসতকে। মৃত্যু অবধি পা ফেলবে না এই বাড়িতে। এমনই এই বাড়িতে জায়গা হয়েছে হাতে গোনা কয়েক দিন।
.
সাঁঝের রেশ পরিবেশে। ঘন আঁধার মুড়িয়ে নিচ্ছে তার চাদরে। প্রাণ এলো মেলো পায়ে রাস্তায় দাঁড়াল। চোখের জল শুকিয়ে গেছে প্রায়। বুকটা লাগছে হালকা, বেশ স্বস্তি সেখানে।
হাঁটতে হাঁটতে প্রাণের নজর গেল ফুচকা স্টলে। পা থামিয়ে পেটে ডান হাত বুলিয়ে বলল,
–”আমার কলিজা, আপনি ফুচকা খাবেন?
একা একাই হাসল প্রাণ। এগোল সেদিকে। আজ কিপটেমি করতে মন চাইছে না ওর। আয়েশ করে টুলে বসল সে। প্রফুল্লচিত্তে বলল,
–”ভাই, ঝাল কম আর টক বেশি করে এক প্লেট ফুচকা দিন।
প্রাণ তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। দূর হতে দেখে গেল প্রণয়। আগের মতই গাড়িতে বসা ওর চোখে মুগ্ধতা। রাগটা পড়ে গেছে তার। প্রাণকে হসপিটালে না পেয়ে আর মন রমণির সাহস দেখে ভেবেছিল আজ চড় মেরেই শাসন করবে তবে প্রণয়ের মন পুলকিত। নির্নিমেষ চাহনি রেখেই আওড়াল সে,
–”কাল থেকে আপনার অঙ্গের পরতে পরতে আদর দিয়ে অতিষ্ঠ করে তুলব আপনাকে। যা হবে আমার অভদ্রতার শেষ সীমা।
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলমান_______________________________________
#_প্রণয়িনী_
#_১০ম_পর্বে__
মৃদু পবনের রেশ আবহে। উড়ছে ধুলো, ঝড়ছে শুকনো পাতা। বৃক্ষরাজির দুলনি শরীর জুড়াবে। সময়টা সন্ধ্যা। ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ! প্রণয় গাড়ি থেকে নামলো। এবার একটু জ্বালানো যাক প্রাণকে। ভাবনা হেতু সে আগে পানির বোতল আনতে পাশের দোকানে গেল।
প্রণয় ফিরে এসে প্রাণকে দেখতে পেল না। হুটোপুটি ভঙ্গিতে রাস্তা পার হয়ে ফুচকা স্টলে এলো। চারপাশে সর্তক চোখ বুলিয়ে অস্থির হয়ে উঠল সে। এখানেই তো ছিল। গাড়িতে যতক্ষণ ছিল তার মুগ্ধ নজরের পলক পরেনি। একটু আড়াল হতেই এত জলদি কোথায় উধাও হয়ে গেল? মন অলিন্দে উচাটন বাড়ল ওর। সাত-পাঁচ না ভেবে ফুটপাত ধরে এগিয়ে গেল প্রণয়।
„প্রাণ তৃপ্তির ঢেকুর তুলে পায়ে পায়ে হাঁটছে। অনেক দিন পর মন ভরে কিছু খেল সে। হাতে একটা পুটলি। ভারি, উঁচু পেটের নিচে ডান হাত চাপা। আননে শ্রান্তি রেশ। এই রাত-বিরেতে বাসা খোঁজা বড্ড মুশকিল আর ঝক্কির কাজ। বিপদ-আপদ এর কথা বলা যায় না। প্রাণ অনেক ভেবে একটা উপায় পেল।
‘হসপিটাল, তার মতো একলা মেয়ের আজ রাতের জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান সরকারি হসপিটাল। সেখানে ভর্তি হয়ে বাকি দুই’টা স্যালাইন পুশ করে নেওয়া যাবে। রাতে ভর পেট খাওয়া হবে তাও বিনামূল্যে। প্রাণ আর সাত-পাঁচ না ভেবে একটা রিকশা নিল। হাঁটতে ইচ্ছে করছে না ওর। দশ টাকা বাচানোর তাগিদে পায়ের শ্রম এবেলা নাহয় ব্যয় করল না!
এদিকে প্রণয় হয়রান। একটা মানুষ তো কর্পূরের মতো উবে যেতে পারে না। নানান দুঃশ্চিন্তা জেকে ধরছে মস্তিষ্কে। ওয়েট, প্রাণের তো যাওয়ার জায়গা নেই, বাড়ি যায়নি তো? হ্যাঁ, তাই হবে। প্রণয় উল্টো ঘুরল। দৌঁড়ে এলো গাড়ির কাছে। মুহুর্তেই রাস্তার ধূলো উড়িয়ে গাড়ি টান দিল নির্দিষ্ট গন্তব্য অভিমুখে।
„প্রাণ এমার্জেন্সিতে ভর্তি হলো। নার্স দোতলায় মহিলা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দিল তাকে। প্রাণ দেখল কোন বেড খালি নেই। নার্সিং রুমে গিয়ে ব্যাপারটা জানালো সে। কতৃপক্ষ এসে মেঝেতে বিছানা করে দিল। প্রাণের মতো আরও অনেক রোগীর স্থান হয়েছে সেখানে। এমনই হয় হসপিটাল গুলোতে। আসন সংখ্যার থেকে রুগ্ন মানুষের সংখ্যা বেশি। যাইহোক, প্রাণের কাছে এটাও মন্দ নয়। রাস্তায় থাকার চেয়ে অনেক নিরাপদ।
প্রাণ পুটলিটাকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে পরল একটু। হাটাহাটি করে পেরেশান হয়েছে। নার্স এলো। তিনি এমার্জেন্সিতে ডক্টর যে প্রেসক্রাইব করে দিয়েছেন তা চাইলেন। প্রাণ মাথার নিচ থেকে হাতড়ে বের করে দিল কাগজখানা। নার্স সেটায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন,
–”একটা কিনতে হবে। অপরটা লাগিয়ে দিচ্ছি।
প্রাণ ঘাড় নাড়ল শুধু। নার্স প্রাণের হাতে ক্যানুলা লাগিয়ে দিলেন। প্রাণ এবার বলল,
–”রাতের খাবার খেয়ে নেই। তারপর দিব।
কেননা স্যালাইন দেওয়া চলাকালীন খাওয়া যায় না। প্রাণ তাই খেয়ে নিয়ে দিবে। ঘুমও হবে এতে। নার্স প্রস্থান নিতেই কারো গলা ভেসে এলো,
–”তা মা, তোমার স্বামী কই? দেখতেছি একাই দৌড়া-দৌড়ি করতেছো।
প্রাণ মাথা ডানে বাঁকিয়ে উৎস পানে তাকাল। মধ্য বয়সী মহিলা বসে আছেন এক পুরুষের শিয়রে। বোধহয় মিয়া-বিবি হবেন তারা। প্রাণ সরল গলায় বলল,
–”নেই।
–”মরছে?
অশিক্ষিতা মহিলা’রা এমনই মুখে কথা আটকায় না তাদের। আবার কতক এমন মানুষের মন খুবই নরম হয়। সহজেই অপরের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে পারে। প্রাণের একই কণ্ঠ,
–”ছেড়ে দিয়েছে।
মহিলার আপসোসের আর সীমা রইল না। তিনি বেশ করে তিরস্কার করলেন সেই হতভাগার যে প্রাণের মতো রূপসী, সাফ দিলের মেয়েকে ঠকিয়েছে। পুটুর-পাটুর কথায় তাদের বেশ জমলো আলাপ। এক শেষে প্রাণের কথার প্রতিত্তোরে মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–”জীবন বয়ে নিয়ে যেতে হয় রে মা। বেটা মাইনষের দিল বোঝা বড়ই কঠিন। এই মোরেই দেখ, মুই বানজি। তয় এই মানুষটা মোক ছাড়ে নাই। পরিবারের জ্বালায় গ্রাম থাইকা ঢাকায় আনছে। কামাই-রোজগার করি খাওয়াইছে। সে এখন বিছানাত পড়ি মুই দু’টা মাইনষের পেট চালাও। তাও হেতি নারাজ হয় মোর উপরে।
বলতে বলতে চোখ ভিজে গেছে উনার। প্রাণ স্বাভাবিক। তার আর চোখে পানি আসে না। কবেই শুকিয়ে গেছে। কত আর বছর হবে, মা যেদিন মরল, তার ভাগের সুখটুকুও নিয়ে গেছে সেই দিন হতে। এক মুদ্রার যেমন দুই পিঠ তেমনই পুরুষ’রা ভালো মন্দ মিলিয়েই হয়। সবই অদৃষ্টের পরিহাস! যে যার’টা ভোগ করবে। ঠিকই তো প্রাণ নিজের জীবন তো দিব্যি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। না অভিযোগ রয়েছে, না অভিমান! বরং আজ এই দিনে এসে সে রবের নিকট শুকরিয়া আদায় করছে।
কথায় কথায় আট’টা বাজল। এই টাইমে সরকারি হসপিটালে খাবার দেওয়া হয়। প্রাণ আসার আগে দুইটা প্লাস্টিকের বাটিও নিয়ে এসেছে। যেগুলোতে দই, মিষ্টি বিক্রি হয় তেমন।
যথারীতি প্রাণের পালা এলো। অবশ্য একটা দিক ভালো খাবারের জন্য লাইন ধরতে হয় না। স্টাফ’রাই এসে বেডে, বেডে ঘুরে খাবার দিয়ে যায়। যার প্রয়োজন সে নেয়, যার রুচি হয় না সে চেয়েও দেখে না।
প্রাণ খাবার পেল। গরম ভাত, সবজি, ডাল, একটা ডিমও আছে। হোটেলে খেলে এই খাবারের দাম ভালোই পড়তো! জিভে জল চলে এলো প্রাণের। চাড়া দিয়ে উঠল খিদে। কি আশ্চর্য! সন্ধ্যায় না ভরপেট খেল সে?
প্রাণের পাশে যিনি রয়েছেন, নাম উনার জহিলা। তার সাথে প্রাণের ভালো সন্ধি হয়েছে। তিনি আগ বাড়িয়ে বললেন,
–”মা, বোতল আছে? থাকলে দেও নিচ থাকি পানি আনি।
প্রাণ কৃতজ্ঞতার চোখে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে বোতল দিয়ে দিল উনাকে। সে এমনি অন্যকে নিজের জন্য খাটাতে নারাজ কিন্তু অসুস্থ শরীরে তার সিড়ি বইতে ভারি দুরহ লাগছে।
‘প্রাণ আজ মুক্ত বিহঙ্গী। তাকে কটূক্তি করার কেউ নেই, নাতো গাল-মন্দ করার কেউ আছে। না কোন চিন্তা রইল। প্রাণ বাটি’টা চেটে-মুছে খেয়ে ঢেকুর তুললো। বেশ জোরেই শব্দ হলো তাতে। জহিলা, তিনি শুনতে পেয়ে চড়া হাসলেন। প্রাণের আননে চেয়ে শুধালেন,
–”পেট ভরছে মা? আরও নিবা?
প্রাণ লজ্জিত হাসল। মাথা ডানে-বায়ে নাড়িয়ে তড়িৎ না উত্তর করল। বার কয়েক ‘আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করতে শোনা গেল ওকে। সে খালি চেয়ে চেয়ে দেখল জহিলার কাজ। তিনি ভাতে পানি ঢেলে নরম করে, সবজির আলু বেছে তা দিয়ে স্বামীকে খাইয়ে দিচ্ছেন। রব কত মহব্বত দিয়েছেন উনাদের মাঝে। প্রাণ অতি সন্তর্পনে চোখ মুছে নিল। মধুর দৃশ্যটুকু দেখার মাঝেই প্রাণের বিশ্রাম নেওয়া হয়ে গেছে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। রাত বাড়ছে।
প্রাণ ছয় মাসের ভারি পেট নিয়ে উঠে দাঁড়াল। হাতের মুঠিতে রয়েছে একটা পাঁচশ টাকার নোট। সে ধীর বেয়ে সিড়ি পার করল। এমন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেইন তোরণের সামনেই অহরহ ফার্মেসির দোকান থাকে। প্রাণ নিজের ওষুধ নিয়ে আবার ফিরতি পথ ধরল।
এই গহীন রাতে কত মানুষের ছোটাছুটি, অ্যাম্বুলেন্স এর সাইরেন, কত কান্না, আহাজারি, কত রোগীর বিষ ব্যথার হৃদয় কাঁপানো গোঙ্গানি গায়ে কাটা দিবে। তাই হয়তো রবের নিকট হতে সবচেয়ে বড় নিয়ামত ‘সুস্থতা।
প্রাণের নাভিশ্বাস উঠেছে। জিরিয়ে নিতে সে সিড়ির প্রথম ধাপেই বসে পরল। কত অচেনা লোক ওর পাশ কাটিয়ে উঠছে, নামছে। তখনই একজন নার্স উঠতে নিচ্ছিল, বয়স খুবই কম হয়তো স্টুডেন্ট। তিনি দায়িত্বশীল হোক বা মানবিক জ্ঞানে হোক জিজ্ঞেস করলেন প্রাণকে,
–”আপনি ঠিক আছেন? কোন অসুবিধা হচ্ছে?
–”একটু বিশ্রাম নিচ্ছি,
প্রাণের উত্তরে নার্স ওর মনোভাব বুঝলেন। তিনি ঝুকে প্রাণের বাহু চেপে ধরে দাঁড় করালেন। ধরে ধরে নিয়ে গেলেন উপরে। প্রাণের সুবিধাই হলো। অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল সে।
নার্সটি প্রাণের হাতের ক্যানুলাতে নল সেট করে দিলেন। প্রাণ শুয়ে শুয়ে বিনিদ্রিত রজনীতে জমিলার সাথে গল্পে মাতলো। ঠিক তার না ঘুমানো পর্যন্ত চলল এই বিস্তর কথোপকথন।
.
প্রণয় অতলান্ত উতলা হয়ে দরজার কলিং বেল বাজাচ্ছে। প্রচুর ধৈর্যহীন তার হস্তের চালনা। সে যতক্ষণ না প্রাণকে দর্শন করবে তার উৎকণ্ঠা দশা শমিত হবে না। ভেতরে ভেতরে বেজায় বিধ্বস্ত প্রণয় এখনই হয়তো কেঁদে দিবে সে সীমায় পৌঁছে গিয়েছে।
প্রণয়কে লাগছে উদ্ভ্রান্তের ন্যায়। সারা শরীরে ঘামের উৎকট গন্ধ। টেনেশনের ফলেই হচ্ছে তা। মুখশ্রী বিবর্ণ হয়েছে। চোখের সাদা অংশ আরক্তিম, সুকোমল কালো মণি জোড়া ঘোলাটে লাগছে। ঝাপসা দৃষ্টি! প্রণয় না পেরে দরজায় থাবড় মারতে শুরু করল।
মনিরা কেবলই বিছানায় গা দিয়েছেন, এই রাত-বিরেতে কার মরণ মাটি হচ্ছে তার দোড়গোড়ায় ভেবে পেলেন না। উনার চট করে মনে হলো প্রাণ আসতে পারে। ঠোঁটে ক্রুর হাসি টেনে দরজা খুলে দিলেন। সামনের ব্যক্তিকে দেখে মুহুর্তেই চিড়বিড়িয়ে ধেয়ে উঠল ক্রোধ। প্রণয় দিক-দিশা ভুলে সামনে কে আছে না আছে আমলেই নিল না। শুধাল হঠকারী কণ্ঠে,
–”প্রাণ কই?
এটা কি সার্কাসের রঙ্গ মঞ্চ নাকি? যে যখন পারছে এসে চড় থাপ্পড় মেরে যাচ্ছে, তল্লাশি চালাচ্ছে। সন্ধ্যায় প্রাণ, এখন এই আপদ। মনিরা খেকিয়ে উঠলেন,
–”জাহান্নামে গেছে।
–”প্রাণ, প্রাণ কই আপনি?
প্রণয় উচ্চ রবে ডাকতে ডাকতে বাসার ভেতরে এলো। মনিরা পরতে নিয়েছিলেন কিন্তু দরজার কপাট ধরে সামলে নিলেন নিজেকে। প্রণয় বাহু দ্বারা উনাকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে দরজার সম্মুখ হতে। কেননা তিনি প্রণয়ের দাপট ব্যতিত তাকে বাসার ভেতরে ঢুকতে দিতে নারাজ।
–”তুই বাড়ি থেকে বের হবি নাকি মানুষ জড়ো করে তোর গুন্ডামি ছোটাব?
মনিরা তুই-তুকারি শুরু করলেন। চিত্তে অসীম তেজ দীপ্ত গড়িমা! উষ্মায় কাঁপছেন ভদ্রমহিলা। যে ছেলে মায়ের বয়সী একজনকে গায়ের জোর দেখাতে পারে তাকে সম্মান দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
প্রণয় থোরাই ডরালো! সে দৌড়ে গেল প্রাণ যে ঘুপচি ঘরে থাকে সেটায়। কিন্তু পেল না কিছুই। মনিরা ভাড়ার ঘর বানিয়েছেন। যাবতীয় ভাঙ্গা-চোরা, পুরনো জিনিসে ঠাসা সে ঘরে। প্রণয় ফিরে এসে মনিরার সামনে দাঁড়াল। চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল,
–”প্রাণকে কই লুকিয়ে রেখেছেন?
কি পাগলামি শুরু করেছে এই ছেলে? প্রাণ কোন বস্তু নাকি যে তাকে লুকিয়ে রাখা যায়। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গল উনার। গলার স্বর অতি কর্কশ,
–”দেখ গিয়ে কোন খদ্দের পেয়েছে। তার সাথেই শুয়ে আছে।
প্রণয় জঘন্য কথাটায় দাঁতে দাত পিষল। খিঁচে নিল আনন। তীব্র ক্রোধানল ভেতরে দমন করল সে। হাত মুষ্ঠি বদ্ধ করে তপ্ত শ্বাস ফেলতেই ধেয়ে এলো আরেক বাক্যবাণ,
–”বেশ্যারা নিজের ভেতর জারজ’দের লুকিয়ে রাখে। তার লুকানোর প্রয়োজন হয় না। তুই দূর হ আমার বাড়ি থেকে।
রাগ মিশ্রিত তাচ্ছিল্য সুর মনিরার। প্রণয় তড়াক করে চোখ খুলল। মনিরা সেই ভয়ানক চাহনি দেখে ভয় পেলেন। প্রণয়ের আঁখি দ্বয়ের লাল শিরা গুলো গণনা করা যাবে। সে এতটা উগ্র, ক্ষিপ্ত হয়েছে যে দূর হতেই তার শরীরের উত্তপ্ত ভাব আচ করতে পারছেন তিনি। প্রণয় পারল না মনিরার তীক্ষ্ণ ফলার ন্যায় জিভ টেনে ছিড়তে। শেষে দারুণ রোষে ছোটাল জবান,
–”আপনি যদি নারী না হতেন এখানেই জ্যন্ত পুতে ফেলতাম।
প্রণয় রাস্তায় নামলো। এতটা মানষিক টানাপোড়নে সে কখনোই পড়েনি। মাথার রগগুলো যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে। ঘিলু পর্যন্ত ব্যথায় টনটন করছে ওর। প্রণয় গাড়ির ফ্রন্ট ডিকিতে মাথা ঠেকিয়ে হেলে গেল। সেভাবেই একান্ত মনে আওড়াল,
–”প্রাণ, আজ যা করলেন তা ঠিক করেননি। আমাকে অতল বিরহে নিমজ্জিত করলেন যে আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলছি।
প্রহর কাটছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাতের গভীরতা। জন, মানুষের বিচরণহীন হয়ে পরছে ধরা। প্রণয় সেভাবেই রয়েছে। বৈভবে আজ সবচেয়ে নিংস্ব মনে হচ্ছে তার বুক। সেথায় ভারি নিঃসঙ্গ শূণ্যতা বিরাজমান। দহনের হাহাকারে পুড়ছে তার ছোট্ট হৃদ কুঠিরখানা। অজান্তেই দু’ এক ফোঁটা অশ্রু কণা গড়িয়ে পরল তার চোখের কোল বেয়ে।
অজানা সময় পার হলো। প্রণয়ের সাহসাই মনে পরল প্রাণের বাটন ফোনের কথাখানা। চকিতেই সটান হলো সে। ঠোঁটে ফুটল একটুকরো চাঁদ হাসি। তর্জনি দিয়ে চোখের কোণ মুছে পকেট হাতড়ে ফোন বের করল। সেভ কন্টাক্ট লিস্ট খুঁজে পেয়েও গেল কাঙ্ক্ষিত নাম্বার। সে কল লাগাল দ্রুতই।
মহান রব প্রণয়কে এবারো হতাশ করলেন। ফোন হতে ভেসে আসছে সেই বিরক্ত ঝড়া রোবটিক কণ্ঠ। প্রণয় রাগে, দুঃখে মাথার পেছনের চুল খামচে ধরল। অদ্ভূত শব্দ করে গাড়ির চাকায় লাথি বসাল সে। উচ্চারিত হলো তার কণ্ঠনালী দ্বারা,
–”নিষ্ঠুর রমণি!
.
রাত প্রায় দু’টো বাজে। হসপিটালে সারারাত লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়। শোরগোলে ঘুমানো দায়! প্রাণ ছটফট করছে। সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না। শরীরের ব্যথা নাকি মনের রোগ তাও বুঝতে অপারগ প্রাণ। তার শুধু মনে আসছে কোথাও কিছু একটা ঠিক নেই। এপর্যায়ে ওয়াশরুমে যাওয়া আবশ্যক অনুভব করল সে।
প্রাণ রয়ে-সয়ে উঠে বসল। গায়ের ওড়না ঠিকই ছিল তাও আরেকবার ঠিক করে নিল। বিছানা মেঝেতে হওয়ায় তার উঠতে বসতে বেশ অসুবিধাই হচ্ছে। কেউ ধরে না তুললে প্রাণের একার পক্ষে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। সে পাশে চাইল। অপ্রতিভ কণ্ঠে ডাকল,
–”চাচি,
জহিলা স্বামীর পা টিপছেন। প্রাণের ডাকে তিনি সাড়া দিলেন,
–”জি, মা।
–”আমাকে একটু তুলে দিন।
জহিলা এক বাক্যে উঠে এসে প্রাণকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। প্রাণ বাধিত ভঙ্গিতে হাসল। সে হাত বাড়িয়ে স্ট্যান্ড থেকে স্যালাইনের প্যাক নিতে ধরলে জহিলা নিজ আয়ত্বে নিয়ে বললেন,
–”মুই লইতেছি মা। তুমার একলা কষ্ট হইব।
প্রাণের অবয়বে জড়তা নামলো। ইশ! মানুষটাকে সে মিছেই বিরক্ত করছে। জমিলা আপন মনে প্রাণকে নিয়ে গেলেন কমন ওয়াশরুমে। সঙ্গ দিলেন ভেতর অবধি। কেননা স্যালাইনের প্যাক নিচু হলেই র’ক্ত আসে ক্যানুলা দিয়ে।
„প্রণয় পরাস্তের ন্যায় বাড়ি ফিরল। তার মাঝে এতটুকু আর প্রাণশক্তি অবশিষ্ট নেই। চিত্ত জুড়ে পুরোই ভঙ্গুর, নিস্তেজ দশা। পরণের পোশাকের ঠিক নেই। ফর্সা আদলে ফ্যাকাসে পরেছে, ঠোঁট জোড়া কুচকুচে কালো। এজন্য বোধহয় গা থেকে বিষাক্ত নিকোটিনের গন্ধ ছাড়ছে। সে মাতালের মতন হেলতে-দুলতে এসে থামল ড্রয়িং স্পেসে।
লিপি ছেলের আশায় পথ চেয়ে ছিলেন। প্রণয় কখনো এত রাত করে বাড়ির বাইরে থাকেনি। কিন্তু তিনি খুশির বদলে আঁতকে উঠলেন। বসা হতে উঠে দাঁড়াতেই প্রণয় ধপ করে সোফাতেই উপুড় হয়ে শুয়ে পরল।
লিপি বিচলিত হয়ে পুনশ্চ ছেলের শিয়রে বসলেন। উনার হাসি-খুশি ছেলের এ’কি হাল হয়েছে? প্রণয়ের ধারে-কাছে টেকা যাচ্ছে না বিশ্রী স্মেলে। লিপি ছেলের মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করলেন একেক পর এক। মায়ের মন যে! চোখেও জল চিকচিক করছে উনার।
মায়ের হাজারো প্রশ্নে প্রণয় নিজ স্বভাবে নিশ্চুপ রইল। তার দুঃখ কাকে দেখাবে? হাজার হলেও সে পুরুষ! প্রণয় হাপড়ের ন্যায় বৃহৎ শ্বাস নিল। হঠাৎ নিগূঢ় ক্লেশ পূর্ণ গলায় বলে উঠল,
–”আম্মু, আমি তাকে হারিয়ে ফেললাম।
লিপি ছেলের শোকে মূর্ছা যাওয়ার পথে। তিনি কি বলে ছেলেকে সাত্বনা দিবেন এও ভেবে পাচ্ছেন না। যে স্বেচ্ছায় হারাতে চায় তার খোঁজ করা বৃথা!
বেশি, বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং…..
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলবে________________________________________
