#_প্রণয়িনী_
#_১১_তম_পর্বে__
রবির সোনালি রশ্মি উঁকি দিচ্ছে। আঁধার কাটছে একটু একটু করে। কিছু পাখপাখালির আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। খুব করে কিচিরমিচির লয় তুলেছে তারা। প্রাণের ঘুম হয়নি একফোঁটা। সে সূর্যের ঘোমটা খোলা দেখছে জানালা গলিয়ে। কেমন করে তার আলো গাছের পাতায় পরছে, বিমুগ্ধ রেশ তার চাহনিতে।
–”মা, ওষুধি পানীয় ফুরিয়ে এলো যে। খুলবে না?
জহিলার কথায় প্রাণ প্রকৃতি থেকে চোখ সরিয়ে উদাস দৃষ্টি ফেলল সেটির উপর। ওর ঘুম না হলেও শরীর সতেজ আর প্রাণবন্ত লাগছে এখন। তাই হয়তো বলে ‘পেটে খেলে পিঠে সয়। জহিলা প্রাণের নির্বাক থাকা দেখে তড়িঘড়ি নিজেই গেলেন নার্স ডাকতে।
প্রাণের আর পরের এক সপ্তাহ র’ক্ত, স্যালাইন নেই। এখন ভোর পাঁচটার মতো বাজছে। জহিলা নার্সকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন। বললেন কি করতে হবে। নার্স বাক্যালাপ ছাড়াই প্রাণের ক্যানুলা রিমুভ করে দিলেন। অতঃপর শুধালেন,
–”আপনি রিলিজ নিবেন?
–”না,
প্রাণ এখন রিলিজ নিবে না। সে সকাল আট’টায় নাস্তা দিবে তা খেয়েই যাবে। তার অনেক টাকা বাচবে। প্রাণ রবের নিকট হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করল। মাত্র পাঁচ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে এক রাতের থাকার জায়গা পেল, দুই বেলা খাওয়া হলো, ফ্রি ওষুধ দিল। এই যুগে কোন মানুষ একজন বিপদগ্রস্তকে এত উপকার করতো নাকি?
জহিলা লেগে পরেছেন স্বামীর খেদমতে। প্রাণ উঠে পরল। রাত নির্ঘুম কাটিয়ে বার বার হামি উঠছে ওর। সে আস্তে ধীরে চলল নিচে। গোটা প্রাঙ্গন নিরবতায় ডোবা। কিছু সাফ-সাফাই কর্মীদের ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে। একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। কতেক লোক তাতে ট্রাস লোড করছেন। প্রাণ টিউবওয়েল এ গিয়ে সময় ধরে হাত-মুখ ধুলো। হাটাহাটি করল অনেকক্ষণ।
„নার্সিং রুমের দরজায় নক করল প্রাণ। কেউ ভেতরে ডাকল তাকে। প্রাণ কক্ষে ঢুকে তার সঙ্গে টুকটাক কথা বলে নিজের বাটন ফোন চার্জ থেকে খুলে নিল। বিনা চার্জে কাল রাতে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিধায় এখানে চার্জে দিয়েছিল। তার মোবাইল অন করতে শ’খানেক কল, মেসেজের নোটিফিকেশন এলো। খানিক বিস্মিত হলো প্রাণ। তাকে কে এতটা স্মরণ করবে?
প্রাণ তক্ষুণি চেক করে দেখল সব প্রণয়ের কল। আনন খানা থমথমে হলো ওর। বুকে জমলো বিতৃষ্ণা। বিরাগ ভাজন মানুষের তরে তার মুড নষ্ট হলো এ’দফা। তবে প্রাণের চোখ আটকে গেল বাবার মেসেজ খানায়। ফোল্ডারে ঢুকে ওর নেত্র কপালে উঠে গেল। এ’কি দেখছে সে? প্রায় দশ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন ভদ্রলোক। বলা নেই, কওয়া নেই এসবের মানে কি? তার বউ, ছেলে জানতে পারলে তো হুলুস্থুল বাধাবেন!
ঠিক তখনই মকবুল সাহেবের কল এলো। থ বোনে যাওয়া প্রাণ নড়ে-চড়ে উঠল এতে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিসিভ করল দ্রুতই। ওপাশ হতে ভেসে এলো পুরুষালি বোজা কণ্ঠস্বর,
–”মা, কেমন আছিস?
প্রাণের নরম মন ক্ষয়ে আসলো। ভিজে গেল নয়ন জোড়ার কোল। ঠোঁট কাঁপছে, কণ্ঠ যেন রোধ হয়ে এসেছে! সে নাক টেনে নিচু স্বরে সালাম জানাল প্রথমে। সালাম বিনিময় শেষে প্রতিত্তোর করল প্রাণ,
–”জি আব্বু, ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
বাবা-মেয়ের কথা শুরু হলো। প্রাণের জড়তা কাজ করতো বাবার সাথে কথা বলতে। আবার মকবুলের সঙ্গে কথা বললে মনিরা এর জের ধরে তাকে অত্যাচার করেন। মহিলা ভাবেন প্রাণ উনার নামে বাপের কাছে নালিশ জানায়, কূট-কাচালি করে। এজন্য প্রাণ বাবার সাথে আরও দূরত্ব বাড়িয়েছে। মকবুল অপরাধী ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন,
–”বাড়ি কেন ছেড়েছিস, মা? মনি খুব জ্বালায় তোকে?
–”না, না, আব্বু। আমি একটা চাকরি পেয়েছি। তাই রোজ যাতায়াতের অসুবিধার জন্য অফিসের কাছে বাসা নিয়েছি।
প্রাণ মিথ্যা বলল। সে নিশ্চিন্ত হলো। মনিরা তার ব্যাপারে উল্টো পাল্টা কিছু বলেনি। বাবার কথায় বোঝা যাচ্ছে তার স্ত্রী তাকে যা বুঝিয়েছেন তা বিশ্বাস করেননি মকবুল। মেয়ের বাড়ি ছাড়ার কারণ জানতেই উনার কল দেওয়া। দীর্ঘ কাল পর বাবার সাথে এভাবে মন খুলে কথা বলে প্রাণের হৃদয় পুলক হলো। প্রায় ঘণ্টা খানেকের মতো কথা চলল তাদের।
„সময় আট বাজে। হসপিটালে নাস্তা দিচ্ছে। প্রাণও নিল। দু’ পিচ রুটি, একটা কলা, একটি ডিম। এই নাস্তা করার জন্যই প্রাণ পাঁচ’টায় রিলিজ নেয়নি। তখন তো আর সে জানতো না তার কাছে অঢেল টাকা রয়েছে। পরে জেনেও আর যায়নি।
প্রাণ খাওয়া শেষে জহিলার সামনে দাঁড়াল। ভদ্রমহিলা প্রাণের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ওর থুতনিতে আঙ্গুল ছুঁয়ে সেই ডগায় চুমু খেলেন। বেশ কিছু উপদেশ দিলেন। প্রাণ আপ্লূত হলো। নিরবে শুনল মা রুপি অচেনা মানুষটার কথা। সেও বিদায় নিল। যাওয়ার আগে জোর করে জহিলার হাতে হাজার টাকা গুজে দিল। বলল,
–”চাচার জন্য ফল-মূল কিনে নিও।
প্রাণ জহিলার রুগ্ন স্বামীর সাথে দু’চারটে কথা বলে বেরিয়ে পরল নিজের পুটলি হাতে চেপে। চলার পথে জনম দুঃখিনীর কপালে জুটেও যায় এমন অভাগী। যারা নিঃস্বার্থভাবে তাদের যা আছে তাই ভাগাভাগি করে বুকে টেনে নেয়।
প্রাণ মেইনরোডে এসে রিকশা ভাড়া করল। এ’গলি, ও’গলি ঘুরে বাসা খুঁজতে হবে, এত হাঁটলে আবার অসুখ করবে তাই প্রশ্নই উঠে না কিপটেমি করার। ভালোর ভালো, মকবুল সাহেব ফের টাকা পাঠিয়ে দিতে চেয়েছেন চার-পাঁচ দিন পর। প্রাণ বারন করল, জানালো প্রয়োজন নেই। উল্টো এই বয়সে বাবার শাসন পূর্ণ ঝাড়ি খেতে হলো তাকে। এসব ভেবে ভেবে আপনাই হাসছে প্রাণ।
রিকশা খানা চলছে নিজ গতিতে। চড়া রোদ আটকাতে হুট তুলে দেওয়া তার। প্রাণের অফিসের আজ প্রথম দিন। কিন্তু সে যাবে না। একবার ভাবল, ফোন করে জানাবে সেটা তবে পরক্ষণে মত বদলেছে। এই অছিলায় যদি চাকরি যায় বেশ ভালো হবে। প্রণয়ের আর মুখ দেখতে হবে না। হতচ্ছাড়া যে পাপ করেছে তা মনে পড়লেই পিত্তি জ্বলে উঠে প্রাণের।
প্রাণের হয়তো সারাদিন বাসা খুঁজতেই ফুরিয়ে যাবে। টুকটাক কেনাকাটা করতে হবে। তাকে লাগছেও চিন্তিত। হুট করে খেয়াল হলো, রিকশাচালক’রা তো প্রায়ই সবখানে যাতায়াত করে। তারা সাহায্য করলেও করতে পারে। প্রাণ অপ্রতিভ গলায় জিজ্ঞেস করল,
–”চাচা, একটা কথা বলি।
–”কও, মা।
বৃদ্ধার বয়স প্রাণের বাবার বয়সী। প্রাণের ইতস্ত ভাব কাটল স্নেহের বুলিতে। সে কেন জানি আগ বাড়িয়ে কারো সাথে কথা বলতে পারে না। বোধহয় তাকে তার ভাগ্যের দোহাই পিঠে ভেঙে ফেলা হতো তার থেকে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে অভ্যাস হয়ে গেছে। প্রাণের স্বর স্বাভাবিক,
–”চাচা, আশেপাশে বাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে? সাবলেট হলেও হবে।
বৃদ্ধাকে কিছুক্ষণ ভাবতে দেখা গেল। দৈবাৎ উনার মনেও আসছে কোথাও নোটিশ দেখেছিলেন। তিনি ধ্যান রাস্তায় রেখে মস্তিষ্ক খাটালেন। একপর্যায়ে চটপটে ভঙ্গিতে বললেন,
–”হ মা, খাড়াও তুমারে লইয়া যাইতেছি।
প্রাণ দরুদ পাঠ করল। তাকে যেন বেশি হয়রান হতে না হয়। চালক বাহনের গতি পরিবর্তন করে গন্তব্যে টানলেন। প্রাণের মন প্রফুল্লতায় ছেঁয়ে রইল। কি জানি কিসের জন্য এত সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে তার! সেই রেশ মুখে-চোখে প্রকাশ পাচ্ছে। মিলিয়ে দিচ্ছে চিন্তা’দের।
রাস্তা ফুরালো। জায়গাটা ঘিঞ্জি। একেবারে গলির ভেতরে। প্রাণ রিকশা থেকে নেমে বলল,
–”চাচা, অপেক্ষা করো। আমি কথা-বার্তা বলে আসি।
ঘাড় নাড়ল বৃদ্ধা। প্রাণ বিল্ডিং’এর ভেতরে ঢুকল। তিন তলা, জীর্ণ-শীর্ণ, রঙ চটা বাড়ি। মালিক ইবনাত, বাড়িতেই ছিলেন। প্রাণ সবিস্তারে নিজের পরিচয় নামা জানালো। কাজ হলো বটে! এদিকে পুরনো বাড়িতে ভাড়াটে তেমন আসে না। কপাল ভালো প্রাণের।
ইবনাত প্রাণকে কক্ষখানা দেখালেন। এও জানালেন তিনি ফ্যান, লাইটের ব্যবস্থা করে দিবেন। নিচ তলার এই কক্ষে একটা পুরনো সিংগেল চৌকি আর কাঠের টেবিল রয়েছে। প্রাণের প্রশ্ন করতে হলো না ইবনাত নিজ হতেই বললেন,
–”এগুলো এক ভাড়াটিয়া ফেলে রেখে গেছে। সমস্যা নেই আমি বের করে দিব।
–”না, না। এর কোন দরকার নেই। আমি ব্যবহার করব।
প্রাণ চকিতেই প্রতিত্তোর করল। সোনায় সোহাগা সে! শেষে কথা বলে ঠিক করে দুই মাসের ভাড়া অগ্রীম দিল। মাসিক ভাড়া বেশি নয়। ইবনাত খুশি হলেন। এক বছর হতে চলল কোন ভাড়াটিয়া এ তল্লাতে আসে না। তিনি ছুটলেন মেকার ডাকতে।
প্রাণ বাইরে এসে রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দিল। পঞ্চাশ টাকা বকশিস দিতেও ভুলল না। সে কিছু দূর হেঁটে দোকানে গেল। পানির বোতল কিনে ফোন লাগাল অদ্বিতাকে। রিসিভ হতেই কুশলাদি বিনিময়ের ধার না ধেরে জানালো,
–”ঠিকানা দিচ্ছি দ্রুত চলে আয়। অনেক কাজ আছে তোর। আর আমার একাডেমিক বইপত্র আনতে ভুলিস না।
অদ্বিতা বিহ্বল। ফোন কান হতে সরিয়ে ভালো করে নাম্বার দেখে পুনরায় কানে ধরতেই টুই টুই শব্দ তুলে কল কেটে গেল। কিয়ৎপলে মেসেজও এলো। অদ্বিতা ঠিকানা পড়ে আর ঘাটাল না। নিশ্চয় বান্ধুবি তার নতুন বাসা নিয়েছে। চটজলদি প্রাণের বই-খাতা ব্যাগে ভরে নিল। তার কাছে রাখার কারণ মনিরা। খাটাশ মহিলা পুড়িয়ে ফেলে।
„প্রাণ নতুন বাড়িতে ফিরল। ইবনাত মহাশয় বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কক্ষে বিদ্যুৎ লাইন মেরামতের কাজ চলছে। প্রাণ ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
–”আংকেল, একটা ঝাড়ু, বালতি আর বসার টুল থাকলে দিন তো রুমটা পরিষ্কার করব।
–”তুমি এই শরীরে পারবে? এখন তো ভারি কাজ করা বারন।
মকবুলের চিন্তিত সুর। প্রাণ ঈষৎ শব্দহীন হাসল। বলল,
–”পারব। নিজে না করলে লোক পাব কই? রাতের থাকার উপযোগী করতে তো হবে।
মকবুল চুপ রইলেন। উনারও বাতে ব্যথা। স্ত্রী নেই। মেয়ে যা দু’ পয়সা পাঠায় তাই দিয়ে দিনাতিপাত করেন। তিনি জিনিস গুলো এনে দিতে গেলেন। প্রাণ পাশেই রাখা চেয়ারে গিয়ে বসল। চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। আগে হয়তো সাবলেট ভাবে এখানে থাকতো অনেকেই। কমন বাথরুম, কিচেন আছে। তার বিপরীত রুমগুলো তালাবদ্ধ। হয়তো তার পড়শী রয়েছে।
প্রাণের পানি পান করার কালে ইলেকট্রিকের কাজ শেষ করে ছেলেটি বেরিয়ে এলো রুম হতে। মকবুল সাহেবও উপস্থিত হলেন। হাতের জিনিস প্রাণকে দিয়ে বললেন,
–”মা, তোমার রুম প্রস্তুত। আর আমি যা যা নিয়ম বললাম তা মানার চেষ্টা করবা। থাকো তাহলে।
প্রাণ ঘাড় নাড়ল। মকবুল ছেলেটিকে নিয়ে প্রস্থান নিলেন। প্রাণ রয়ে সয়ে উঠে দাঁড়াল। বাথরুমে গিয়ে বালতিতে পানি ভরিয়ে আনলো। টুলে বসে আস্তে ধীরে সাফাই কাজে লেগে পরল সে।
„অদ্বিতা যখন বান্ধুবির নতুন বাড়িতে আগমন করল তখন প্রাণের কাজ প্রায় শেষ। ভেজা ন্যাকড়া নিংড়ে বালতি বাইরে নিতেই সখীকে দেখে ঠোঁট এলিয়ে হাসল সে। অদ্বিতা আঁধার মুখে রয়েছে। রুষ্ট স্বরে বলল,
–”একটু সবুর করা যেত না আমি তো আসছি মানুষটা। অসুস্থ শরীরে খাটাখাটুনি করে খুব পুন্যের কাজ করলি।
প্রাণ এগিয়ে গিয়ে এক হাতে জড়িয়ে ধরল বান্ধুবিকে। রুমে নিতে নিতে বলল,
–”মেঝেটা মুছলাম শুধু। করার মতো আহামরি কিছুই নেই।
অদ্বিতা রুমে এসে হাতের ব্যাগ, খাবার প্যাকেট টেবিলে রাখল। তাড়া দিল,
–”যা গোসল দিয়ে আয়। বিরিয়ানি ঠান্ডা হয়ে যাবে তাহলে।
প্রাণ বিগলিত হাসি দিল। এই মেয়েকে কিছু বলাই বৃথা। সে পুটলি খুলে জামা কাপড় বের করল। এক প্রকার হুকুম করল,
–”তোশক, বেডশিট, রান্নার বাসন-কোসন, এটা-সেটা আরও যা যা লাগে কম-সম করে একটা লিস্ট করে ফেল তো। পাঁচ হাজারের মধ্যে যেন হয়ে যায়।
–”টাকা পাবি কই?
–”আব্বু, পাঠিয়েছে। এসে সব বলছি।
প্রাণ বাথরুমে গেল। অদ্বিতা তাই সই। লিস্ট করতে বসল।
„যোহরের আজান পড়ছে। সুমধুর আহ্বান কানে ঠেকল প্রাণের। মাথায় ওড়না তুলে দিল সে। পাশেই অদ্বিতা খাবার বাড়ছে ওয়ান টাইম প্লেটে। আজান শেষ হতেই দুই সখী খেতে আরম্ভ করল। খাওয়ার ফাঁকে কথা চলছে দু’জনের। অদ্বিতা শোনা হেতু প্রাণের কথা টেনে অবাক রেশে ছোটাল বাক্য,
–”প্রণয় ভাইয়ার আর খোঁজ নিসনি?
–”কেন নিব? চাকরি গেলে ভালো না গেলে আমি নিজেই অন্য জব খুঁজে নিব। এখন তো আব্বুও টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছে।
অদ্বিতা বলার মতন ভাষা পেল না। সে শুধুই চেয়ে রইল শক্ত মনের অধিকারীণির আনন পানে। কোন মাটি দিয়ে তৈরি এই মেয়ে তার বুঝে আসে না। প্রণয়ের মতো সরল, বড়লোক, সুপুরুষ ছেলে অন্য কেউ পেলে এতদিনে ফুসলিয়ে-ফাসলিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করে নিত।
প্রাণ লিস্টি বাম হাতে ধরে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে কিছু বাদ গেল নাকি, না কোন জিনিস বেশি ধরে ফেলেছে। মুখ তুলে চাইতে অদ্বিতাকে দেখে বলল,
–”কি হলো, খাচ্ছিস না কেন?
অদ্বিতা ঘাটাতে গেল না। আজ প্রেম আছে কাল নাও থাকতে পারে। প্রণয় যদি প্রাণের পেটের বাচ্চাকে অস্বীকার করে? প্রাণ তো তখন স্ত্রী রুপে বন্দি থাকবে। স্বামীর হুকুম অমান্য করা তো ঘোর পাপ। পুরুষের বদলাতে সময় লাগে না। সবচেয়ে বড় কথা প্রণয় অবিবাহিত। সে এও শুনেছে জনাব ক্যারিয়ার গোছাতে প্রেম অবধি করেনি। কখনো যদি প্রথম হক আদায়কারী হতে না পারার জন্য প্রাণকে ছুড়ে ফেলে দেয়? এই মেয়েটার বেঁচে থাকার আর কোন পথ থাকবে না।
–”তুই এইভাবে হসপিটালে থাকতে পারলি? আমার কথা একবারো মনে হয়নি তোর?
অদ্বিতার ভারি মন ভরা কথা। তার খাওয়া হয়েছে। হাত ধুতে উঠে পরল সে। প্রাণের দৃষ্টি সরু হয়ে এসেছে। ভ্রু জড়িয়ে গেছে। আশ্চর্য! তার মনে পড়বে না কেন? ভাবনা মাঝেই পুনশ্চ আওড়াল অদ্বিতা,
–”শোন প্রাণ, কিছু ঋণ শোধ করা যায় না। সেটা অন্যের কাছ থেকে পাওয়া তোরই নির্ধারিত রিজিক। তুই কাজটা ভালো করিসনি!
–”আচ্ছা, আমি দোষ মানলাম। যা, এমন ভুল আর কখনো হবে না।
প্রাণ মাছুম চেহারা বানাল। অদ্বিতা ফোস করে শ্বাস ফেলল। তাগাদা দিল জলদি খাওয়া শেষ করতে। অথাপি প্রাণের তাড়াহুড়ো নেই। অবশিষ্ট বিরিয়ানি’টুকুও পাতে ঢেলে নিল। সে এখন খাওয়া-দাওয়া বেশি করে করবে। ডক্টর জানিয়েছে তার পেটের বাবুর ওজন অনেক কম। এমন হলে প্রিম্যাচিউর বেবি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। প্রাণ মা হয়ে সেটা কখনোই চায় না।
„প্রায় তিনটে নাগাদ প্রাণ’রা বাসা থেকে বেরিয়েছিল এখন মাগরিবের আজান ওয়াক্তে ফিরল। দু’সই ভীষণ রকম ক্লান্ত! তারা হাতের ব্যাগ গুলো নিয়ে কোন রকমে কক্ষে এলো। সেগুলো মেঝেতে ফেলে রেখে ধপ করে বেডে বসল। হাপাচ্ছে দু’জনেই। প্রাণ তো পুরোই নির্জীব হয়ে গিয়েছে। রিকশা ওয়ালা ঘাড়ে করে তোশক, বালিশ নিয়ে এলেন। অদ্বিতা বলল,
–”মামা, ওগুলো মেঝেতেই রেখে দিন।
চালক আরও কিছু জিনিস রেখে নিজের পারিশ্রমিক নিয়ে চলে গেলেন। তারা খানিক জিরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওড়না কোমড়ে বেঁধে রুম স্যাট করতে লেগে পরল। দুই’জন তোশক এর দুইপাশ ধরে সিংগেল বেডে বিছিয়ে দিল। প্রাণ বালিশে কভার লাগাচ্ছে। অদ্বিতা আরএফএল র্যাক স্যাট করছে।
ঘন্টা খানেক লাগল পুরো রুম সুন্দর করে গুছিয়ে নিতে। প্রাণ হাত খুলে পছন্দের জিনিস কিনেছে। অদ্বিতা প্রাণকে ছোট্ট একটা রাইসকুকার গিফট করেছে। প্রাণ, অদ্বিতা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গোটা কক্ষে চোখ বুলিয়ে নিল। চকচক করছে সর্বত্র। সিংগেল বেড, ক্লথে মোড়া টেবিল। তাতে শোভা পেয়েছে বই। চেয়ার রয়েছে একটা। এক কোণে রান্নার স্থান। ইলেকট্রিক চুলা, ছোট্ট র্যাকে বাসন সব সাজিয়ে রাখা। আজ এতেই ইতি টানল।
প্রাণের মন ভরে গেছে। চোখে নোনাপানির ঢেউ। তার আমৃত্যু সংসারের যে বড্ড স্বাদ! সে মাথা নুইয়ে পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আওড়াল,
–”আপনার আর আমার ছোট্ট সংসার।
অদ্বিতা প্রাণকে এক হাতে জড়িয়ে নিয়ে অপর হাতে সখীর চোখের পানি মুছে দিয়ে হাস্যবদনে নিজেও বলল,
–”প্রাণের সংসার।
দশ, এগারো দুই পর্ব মিলে শুধু প্রাণ এবং তার ঘটনাবলীকে গুরুত্ব দিয়ে সংসার সাজিয়ে দিলাম। বিরক্ত হবেন না।
বেশি, বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং…..
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলবে_________________________________________
#_প্রণয়িনী_
#_১২_তম_পর্বে_
বাড়ি জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চৌধুরী নিবাস মরুভূমির ন্যায় বিরান! সাঁঝ বেলার অমানিশা সকলের মুখে ছেঁয়ে গেছে। ঘড়িতে বাজছে সন্ধ্যা সাতটা। ড্রয়িংরুমে বাড়ির মানুষ গুলো অসহায় চিত্তে বসে, দাঁড়িয়ে রয়েছেন। চাতকের মতো সকলে চেয়ে আছেন ছেলের রুম অভিমুখে।
প্রণয় প্রাণকে দেখার জন্য সেই কাক ভোরে অফিসে উপস্থিত হয়েছিল কিন্তু মন রমণির দেখা মেলেনি। কি যে এক বিশ্রী অনুভূতি হয়েছিল তখন। কেউ বুঝি খঞ্জর বিঁধে দিয়েছিল হৃদয়ে। তীব্র ব্যথা উঠে সেথায়। অকারণেই অফিস স্টাফের উপর চোটপাট করেছিল। খবর পেয়ে পরাণ গিয়ে ভাইকে সামলেছে।
প্রণয় বুকে পাথর চেপে আশেপাশের হসপিটাল, ক্লিনিক, এনজিও সবতেই খোঁজ করেছে তাও সন্ধান পায়নি প্রাণের। একেবারেই যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে!
প্রণয় কেবলই পরাজিত সৈনিকের ন্যায় বাসায় ফিরল। সে মেঝেতে বসে আছে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে। ঘাড় পেছনে হেলিয়ে রাখা। শূণ্য দৃষ্টি জোড়া সিলিং’এ নিবদ্ধ। এই এক দিনেই তাকে শুকনো লাগছে। চেহারায় মাধুর্য নেই। ঠোঁট দ্বয় পুড়ে কুচকুচে কালো হয়েছে। এখন গলা অবধি জ্বালা করছে।
প্রণয় সারাদিন স্মোকের উপর ছিল। মস্তিষ্ক আর মনকে শান্ত রাখতেই তার এই পন্থা। বাসায় এসেছে দশ মিনিট হবে না তাতেই দুই প্যাক শেষ করেছে। উপরন্তু তার বুকের দহন মিটছে না কিছুতেই। কোনভাবেই ভুলতে পারছে না প্রাণকে।
প্রণয়ের চারপাশে সব শলাকার অবশিষ্ট অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কক্ষের বাতাবরণ ভারি, ভ্যাপসা দূর্গন্ধ যুক্ত। বিষাক্ত নিকোটিনের ধোঁয়া বেরতে না পেরে কুয়াশার মতো দেখা যাচ্ছে।
–”আপনি কোথায় প্রাণ? আমি আপনাকে ভালোবাসি যে!
প্রণয় এই এক বুলি আওড়ে যাচ্ছে। আবার স্মোক করার নেশায় মাথা সোজা করল সে। পাশ থেকে প্যাকেট হাতে তুলে খুলে দেখল শলাকা নেই আর। তীব্র রাগে, চন্ডাল ক্ষোভে সেটা ছুড়ে দিল কোথাও। খাঁমচে ধরল মাথার চুল।
ছেলের চিন্তায় পরিবারের সকলে নাজেহাল। লিপি কেঁদে কুটে স্বামীর বুক ভাসাচ্ছেন। আহাজারির ন্যায় বিলোপ করছেন। মোস্তফা পাশেই দাঁড়িয়ে বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তিনি কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ছেলের এই হাল যে মেয়ের জন্য তার সম্বন্ধেও কিছু জানেন না। তাহলে অন্তত যোগাযোগের চেষ্টা করতেন। লোক লাগাতেন খুঁজতে।
জাহানারা মুষড়ে পরেছেন। মাহিমা মাথায় হাত চেপে বসে রয়েছে। পাভেল মায়ের পাশে সোফার হাতলে বসে আছে। পূর্ণা, পরাণ ফোনে ট্রাই করছে প্রাণকে। তখনই হুড়মুড়িয়ে নিচে নামলো প্রণয়। সকলে আঁতকে উঠলেন। চকিতে দাঁড়িয়ে গিয়ে এটা-সেটা বলে ছেলেকে থামাতে চাইলেন।
প্রণয় বাইরের দিকে ছুটছে কারো কথার তোয়াক্কা না রেখে। ওর পরণে শুধু শর্টস। সম্পূর্ণ খালি গা, পায়ে জুতো অবধি নেই। মাহিমা ভাইয়ের বাহু চেপে ধরে বাঁধা দিল। কেউ আর এগোনোর সাহস করলেন না। কেননা প্রণয় রেগে চড়াও হচ্ছে তার উপর। এমন বলশালী পুরুষকে আটকে রাখা মাহিমার সাধ্যতীত। তবুও যতটা পারছে ভাইকে ধরে রেখে জানতে চাইলো,
–”কই যাস এভাবে? ভাই, দয়া করে রিল্যাক্স হ। তুই আব্বু, আম্মুর অবস্থাটা দেখ একবার। এমন পাগলামি করিস না।
প্রণয় মানষিক ভারসাম্যহীন! ঝটকা দিয়ে বোনের বাঁধন হতে ছাড়িয়ে নিল নিজ বাহু। উদভ্রান্তের মতো ছুটল বাইরে। পরাণ গাড়ির চাবি নিয়ে পিছু নিল ভাইয়ের। যেতে যেতে আশ্বাস দিল,
–”ভেব না, আমি যেকরে হোক ভাইকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাব।
জ্ঞান হারানোর সীমায় পৌঁছলেন লিপি। জাহানারা শরীর ছেড়ে দিয়েছেন। পূর্ণা নরম মনের, সে দাদির পাশে বসে কাঁদছে জাহানারাকে আগলে ধরে। মোস্তফা ধপ করে বসে পরলেন স্ত্রীর পাশে। মাহিমা আকুল পাথারে পরল তাদের নিয়ে। ছেলেকে বললেন ডক্টর ডাকতে।
„প্রণয় রাস্তায় উঠতেই পরাণ পথ রোধ করল ভাইয়ের। বলল,
–”ভাইয়া, তোমার পায়ে হেঁটে গেলে সময় লাগবে, আমাকে বলো তুমি কই যাবে, বা কিছু দরকার কিনা। আমি হেল্প করব তোমাকে।
–”প্রাণকে লাগবে আমার।
প্রণয় ছুটতে ধরে বিরবির করল। পরাণ পুনরায় ভাইয়ের সামনে গিয়ে বলল,
–”হ্যাঁ, প্রাণের কাছেই নিয়ে যাব। তুমি গাড়িতে উঠো।
–”সত্যি? তুই জানিস প্রাণ কোথায় রয়েছে?
প্রণয়ের মুখ উজ্জ্বল হলো। সে অধীর হলো প্রাণের কাছে যাওয়ার জন্য। পরাণ ভাইকে গাড়িতে তুলল। মিথ্যে বলে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবে তাকে। এভাবে চলতে থাকলে ব্রেনে প্রেসার পরবে। মাইনর অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। আর রিস্ক নেওয়া যাবে না।
প্রণয় অতলান্ত উতলা! গাড়িতেও স্থির থাকতে পারছে না। পরাণ কি বলেছে তাও খেয়ালে নেই। সে হন্যে চোখে এদিক, সেদিক তাকাচ্ছে। তখনই হুট করে ওর নজরে পরল কিছু। আশার আলো পেল যেন। চেঁচিয়ে উঠল,
–”গাড়ি থামা।
পরাণ সাইড নিয়ে রাস্তার ধারে গাড়ি পার্ক করল। চাইলো প্রশ্ন সূচক ব্যপ্তিতে। ভাই এমন উঁকি-ঝুকি মারছে কেন? প্রণয় ভুল দেখেনি। হ্যাঁ, ওই তো মা-ছেলে সিএনজিতে উঠছে। এই রাতে এভাবে কই যাচ্ছে তারা? প্রণয় কি ভাবল কে জানে! চটপটে গলায় বলল,
–”ওই, ওদের পিছু নে, ভাই।
পরাণ ভাইকে দেখা বাদ দিয়ে প্রণয়ের আঙ্গুলের তাক বরাবর সামনে তাকাল। সে চেনে না। কিন্তু তাদের পিছু নিয়ে কার কি হবে? এনারা তো অন্য কাজেও যেতে পারেন? অযথা সময় নষ্ট। এদিকে ভাই গাড়ি ছোটাতে বিলম্ব করছে জন্য ঝাঁঝাল কণ্ঠে চিবিয়ে উঠল প্রণয়,
–”আহাম্মক, গাড়ি ছাড়।
পরাণ ভাইয়ের এই কঠিন, বাজে ব্যবহার কোন দিন প্রত্যক্ষ করেনি। সর্বদাই যে ছেলে ছোট ভাই-বোনকে তুমি আজ্ঞে করত আজ যেন এক নারীর বিরহে সব ভুলে গেছে। বড় বোনকেও তুই-তুকারি করে এলো। নারীর জন্য পুরুষ কত কি না করে! পরাণ অনুসরণ করল দেখিয়ে দেওয়া সিএনজিকে।
.
মনিরা, মোহন নির্দিষ্ট গন্তব্যে এসে নামলেন সিএনজি হতে। দ্রুতই মুখে ওড়না চাপলেন ভদ্রমহিলা। এই ঘিঞ্জি পরিবেশেই মানায় বেশ্যাকে। তারা এসেছেন প্রাণের বাড়ি। দু’জনের চিত্তে বইছে রাগের গড়িমা। উষ্মায় নিমজ্জিত মা-ছেলে।
পরাণ ব্রেক কষতেই প্রণয় হুটোপুটি ভঙ্গিতে নামল। ঠিকভাবে গতি শূণ্য হতে দিল না গাড়িকে। লেগে যেতে পারত। প্রণয়ের সেই হুশ আছে নাকি? সে ঠিক ধরেছে মনিরা প্রাণের ঠিকানা জানেন। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উনার আসার আর অন্য কারণ হতে পারে না। আত্মীয়-স্বজনরাও তো এত নিম্ন শ্রেণির হবে না।
„প্রাণ আজ নিজ হাতে রাতের রান্না করছে। অদ্বিতার সাথে বাজারে গিয়ে দুই, তিন বেলার বাজার করে এনেছিল। তাই রসিয়ে রান্না করল সে। নোড়া বাটনায় বেটে ঝাল ঝাল করে শুটকি ভর্তা, বেগুন ভর্তা, পুঁটি মাছ দিয়ে পুইশাকের ঝোল।
তরকারি রাঁধা শেষ। ভাত হয়ে গেছে, কুকারের লাইন অফ করতেই দরজায় নক পরল। প্রাণের কপালে কয়েক ভাজের উদয় হলো। তার দুয়ারে অবেলায় কোন অতিথির আগমন ঘটল? অদ্বিতা তো বাড়ি চলে গেছে। সেই এলো নাকি আবার? প্রাণ ওড়না ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে নিল। দরজা খুলে দিতেই ত্রাশ খেলে গেল আননে।
মনিরা ওড়না সমেত প্রাণের কবরীবন্ধ কেশ মুঠিতে ভরলেন। সপ্ত ক্রোধে মধ্যবয়সীর শরীর উষ্ণ হয়েছে। প্রাণ ব্যথায় ককিয়ে উঠল। তখনই গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিল মোহন। চোখে অন্ধকার দেখছে প্রাণ। মাথা ঘুরছে। মনিরা গর্জে উঠবেন কিন্তু পদার্পন ঘটল প্রণয়ের। প্রাণকে এরুপ বিধ্বস্ত দেখে ডেকে উঠল আশ্চর্য কণ্ঠে,
–”প্রাণ,
মনিরা, মোহন তড়াক করে পিছু ঘুরল। এ’ছেলে এখানে কি করছে তাও নগ্ন অবস্থায়? প্রণয় দৌঁড়ে দূরত্ব’টুকু ঘুচিয়ে নিয়ে মোহনের গালে দর ঘুষি বসিয়ে দিল। ছিটকে গেল বেচারা। পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে পরাণ দেয়াল হয়ে দাঁড়াল সামনে।
মনিরা ছেলেকে ধরাশায়ী হতে দেখে প্রাণকে ছেড়ে দিলেন। প্রাণের গালে পাঁচ আঙ্গুলের গাঢ় দাগ ফুটে উঠেছে। প্রণয় যেন প্রাণ ফিরে পেল। মন রমণিকে দেখে মনের ব্যধি, হৃদয়ের উচাটন, অস্থিরতা এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেছে। সে প্রাণকে আলতো করে ঝাপটে ধরে সুশ্রী বদনে ছোট ছোট চুমু খেল। আওড়াচ্ছে,
–”কই হারিয়ে গিয়েছিলেন? আমাকে কষ্ট দিতে খুব ভালো লাগে তাই না? এমন স্পর্ধা আর কখনোই করবেন না।
প্রাণ আকস্মিক ঘটনায় বিহ্বল! বিমূর্ত তার চিত্ত। মস্তিষ্ক ফাঁকা। যুগলের আলিঙ্গনে রদ পরল মনিরার কুরুচিপূর্ণ জবানে,
–”নাগরকে নিয়ে ভালোই ব্যবসা চালু করেছিস!
প্রাণের হুশ ফিরল। সে ছিটকে সরে গেল দূরে। প্রণয় কটমটে চাহনিতে তাকাল পিছু মুড়ে। হুংকার ছুড়ল উচ্চ শৃঙ্খে,
–”বেহায়া, তুই দূর হ, নাহলে তোকে দিয়েই ব্যবসার উদ্বোধন করব।
মনিরা মুখ কুচকে নিলেন। ঘৃণায় গা রি রি করে উঠল উনার। মোহন মায়ের অপমানে রোষ ঝাড়বে তার আগেই প্রাণ দুঃসাহসিক কাজ করে বসল। পুরো কক্ষ জুড়ে চড়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। প্রাণ ফুঁসছে। ওর কান ঝালা হয়েছে প্রণয়ের নোংরা ইঙ্গিতবহ কথায়। হাজার হলেও মা হয়।
প্রণয় থাপ্পড় খেয়ে ভাবলেশহীন। সে এগিয়ে গিয়ে মোহনের কলার ধরে টানতে টানতে বিল্ডিং এর বাইরে এনে রাস্তায় নিক্ষেপ করল। মোহন উপুড় হয়ে পরল ধুলোয় ঢাকা পথে।
মনিরা ছুটে এসে ছেলেকে ধরে তুললেন। প্রাণ এগিয়ে এসেছে। মনিরা প্রাণের দিকে আঙ্গুল তুলে ক্ষিপ্ত গলা দ্বারা বের করলেন,
–”আমার ছেলের রিজিক মেরে খেয়ে কোনদিন ভালো হবে না তোর। মুখপুড়ি মরার কালে পানি অবধি পাবি না।
‘মকবুল সাহেব স্ত্রীকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পিতা হয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তাকে বড় করেছেন, তিনি আর বেকার ছেলের ঘানি টানতে পারবেন না। দেশে একপয়সাও পাঠাবেন না। এতেই মনিরা, মোহন কূল হারা নাবিক হয়ে প্রাণের নিকট এসেছিল তাকে মেরে ধরে বাপের কাছে ফোন দিয়ে অনুরোধ করাতে যেন মকবুল এমনটা না করে।
পথচারীরা কেউ কেউ কাহিনি দেখছে। প্রাণের প্রতিবেশী এখনো কেউ আসেনি। নিচ তলায় সে একাই ছিল। মনিরা প্রাণের দিকে ধিক্কারপূর্ণ চাহনিতে চেয়ে চলে গেলেন। মোহন এই অপমানও তুলে রাখল। দিন তারও আসবে।
প্রাণ নিরস বদনে কক্ষে ফিরে এলো। সারাদিনের সুখকর অনুভূতি বিলীন হয়ে গিয়েছে কবেই। সে দরজা লাগিয়ে দিতে ধরবে প্রণয় জবরদস্তিতে ঢুকল সেথায়। প্রাণ কড়া গলায় শাসাল,
–”আমাকে আর কঠোর বানাবেন না। ভদ্রভাবে চলে যান।
–”কেন আরও থাপ্পড় মারবেন? আমাকে মারুন, কাটুন আমি আর নড়ছি না।
প্রণয় জেদে অটল। কে বলবে এই ছেলে দিন-দুনিয়া ভুলে ছিল! এখন কেমন চাঙ্গা হয়েছে। প্রণয় সোজা গিয়ে বেডে চিৎ হয়ে শুয়ে পরল। আহ! কি শান্তি। পরম সুখ অনুভব হচ্ছে। কই বুকে তো ব্যথা হচ্ছে না। কেমন শীতলতা সেখানে।
পরাণ প্রাণের পা হতে মাথা পর্যন্ত নিবিড় ভাবে পরোখ করল। তার প্রথম সাক্ষাৎ প্রাণের সাথে। না মেয়ে লাবণ্যময়ী! অনন্যা তার বাহার। ওর ভাই এমনই পাগল হয়নি। তবে একটা কিন্তু রয়েছে। ব্যাপার না। ভালোবাসায় সব সম্ভব। প্রণয় কখনোই প্রাণ হতে বিমুখ হবে না। ভাইয়ের চরিত্র সজ্জন। দুনিয়ায় সব পুরুষ খারাপ হলে কেয়ামত এসে যেত যে!
কারো সরু দৃষ্টি নিজের উপর বুঝে প্রাণ মাথার ওড়না টেনে দিল। তাকাল দরজা পানে। পরাণ নড়েচড়ে উঠল। শ্রান্ত কদম ফেলে কক্ষে এলো। পুরো দিন অনেক ধকল সামলেছে সে। নিজের ফোন টেবিলে রেখে বলল,
–”ভাইয়া, আমার ফোন রেখে গেলাম।
–”গেলাম মানে, উনাকে নিয়ে যান।
প্রাণের শক্ত কথায় পরাণ সূক্ষ্ম হাসল। প্রাণ গুটিয়ে গেল। বুঝল তার কপালে অশেষ হেপা আছে। তার একদিক গুছিয়ে উঠতেই অপর দিকে অশান্তি নেমে আসে। প্রণয় সেভাবে থেকেই বলল,
–”কলিজা, এক প্যাক বিড়ি কিনে দিয়ে যেও। আর একেবারে সকালে গাড়ি পাঠিয়ে দিবে।
–”ঠিক আছে,
পরাণ হেসেই ফেলল। এইতো তার ভাইয়া নিজ ফর্মে ফিরছে। প্রাণ তাজ্জব বোনে গেছে! নিজের বাড়িতে নিজেকে আশ্রিতা মনে হচ্ছে। এখন কি করবে? একটা পুরুষ তার বাড়িতে থাকবে মানুষজন জানা জানি হলে এই পাড়াতেও তার থাকা হারাম হবে। প্রাণ ভেবেই আরও অসুস্থ বোধ করছে। কেঁদেই দিবে প্রায়।
পরাণ নিজ দায়িত্বে কক্ষের দরজা লাগিয়ে দিয়ে প্রস্থান নিল স্পেস দিতে। প্রাণ করুণ নেত্র ফেলল প্রণয়ের উপর। প্রণয় পা ঝাকিয়ে চলেছে। কক্ষে সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণে ম-ম করছে। সারাদিন অভুক্ত থেকে এখন খিদেটা বেশ করে টের পাচ্ছে। সে প্রাণের দিকে না চেয়েও বুঝল রমণির মনোভাব। আওড়াল,
–”প্রণয়কে বিনা প্রাণের ছোট্ট সংসার অসম্পূর্ণ।
বেশি, বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং…..
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলবে_________________________________________
