#নোনা_জল #প্রথম_পর্ব
আজ ৭ দিন হয়ে গেল সৃজিতের সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই… সাড়ে তিন বছরের সম্পর্কটা এইভাবে হঠাৎ শেষ হয়ে যাবে দীপান্বিতা সত্যি কোনদিন ভাবতে পারেনি… ঘটনাটা যখন ঘটছে তখনও কি ছাই অনুভব করতে পেরেছিল কিছু?
দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার.. সেদিন অফিসে কাজের চাপ খুব বেশি ছিল।.. তাই মোবাইলের দিকে প্রায় ঘন্টা দেড়েক তাকাতেই পারেনি। ঋষি হঠাৎ জোর করছিল একটু কফি ব্রেকে যাওয়ার জন্য.. ঈশিতারও বেশ ইচ্ছে ছিল.. ওদের কথা শুনে দীপান্বিতার মনে পড়েছিল সকাল থেকে দু কাপ চা ছাড়া কিছুই পেটে পড়েনি.. মালতি দি সেদিন বারবার বলা সত্ত্বেও দুগাল ভাত খাওয়ার মত সময়ও ওর হাতে ছিল না। এতক্ষণে খিদেটাও বেশ চাগাড় দিচ্ছে.. ভেবেছিল কফি আর হালকা কিছু স্ন্যাকস খাওয়াটা এখন সত্যিই খুব দরকার তা না হলে এবার ওর মাথা ধরে যাবে।তাই তিনজনে মিলে একটু ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছিল.. লিফ্টে উঠে ট্রাউজারের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখে প্রায় ৪৫ মিনিট আগে করা সৃজিতের একটা মেসেজ পড়ে আছে.. একেবারেই ক্যাজুয়ালি মেসেজটা ওপেন করার পরেই ওর সামনে গোটা ব্রহ্মাণ্ড দুলে উঠেছিল..
মাত্র তিনটি বাক্য লেখা.. “সরি দীপ,সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হলো না.. আমার সঙ্গে আর যোগাযোগের চেষ্টা করো না .. নিজের মতো করে ভালো থেকো”
ঋষি আর ঈশিতা কি একটা সিনেমা নিয়ে তখন অনর্গল বকবক করছে.. ওদের একটা কথাও দীপান্বিতার মগজে তখন ঢুকছে না.. সেদিন ক্যান্টিনে না গিয়ে কি একটা আজগুবি অজুহাত দিয়ে দীপান্বিতা ফোনটা নিয়ে আবার ফিরে এসেছিল ওর কাজের জায়গায়.. তার আগে সৃজিতকে ওর ৪-৫ বার কল করা তখন হয়ে গেছে… শুধু রিং হয়ে গেছে সে ফোন রিসিভ করার প্রয়োজনই অনুভব করেনি
দীপান্বিতা বুঝেছিল ওর মাথা ঘুরছে.. কোন কিছু সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারছে না.. ঈশিতা ফিরে এসে বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা ওর হয়েছে.. বারবার জিজ্ঞেস করছিল “তুই ঠিক আছিস তো? কি হয়েছে? তোর চোখমুখ এরকম লাগছে কেন”
দীপান্বিতা সেদিনও ঈশিতাকে কিছু বলতে পারেনি.. আজও পারেনা.. কি বলবে.. সাড়ে তিন বছর একটা মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার পর কোন কারণ না বলেই মানুষটা ওকে ছেড়ে চলে গেছে? সবাই তো কারণ জানতে চাইবে.. আর দীপান্বিতার জানা এমন কোন কারণ আজও ওর মাথায় আসে না যার জন্য ওদের সম্পর্কটা এইভাবে শেষ করে দেওয়া যেতে পারে।
গত সাতদিন ধরে ও সৃজিতের মোবাইলে অজস্রবার ফোন করেছে.. রবিবার অবধি মেসেজগুলো যাচ্ছিল..কলটাও ঢুকছিল.. রবিবার রাতের দিকে দেখেছিল ওকে ব্লক করে দিয়েছে.. তারপরেও হ্যাংলার মত মালতীদির ফোন থেকে দুই বার ফোন করেছিল.. দ্বিতীয়বারে ফোনটা রিসিভও করেছিল.. কিন্তু দীপান্বিতার গলার শোনামাত্র কেটে দিয়েছে।
ওই ফোনটা কেটে দেওয়ার পরে মেয়েটা বুঝতে পেরেছিল সৃজিত সত্যিই আর কোনভাবে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে না.. ঘড়ির কাঁটা বলছিল রাত তখন দশটা পনেরো.. মালতি দি ড্রয়িংরুমে বসে সিরিয়াল দেখছিল… স্থান কাল পাত্র বিবেচনা না করেই দীপান্বিতা সেই প্রথম হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল… মালতি দি সিরিয়াল ফেলে অবাক চোখে ওর দিকে ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল “কি হয়েছে তোমার? হঠাৎ করে কোনো খারাপ খবর পেলে নাকি?
কেউ মারা গেছে বুঝি?”
মালতিদির কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দীপান্বিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল.. তারপরে সেই শূণ্য ঘরে পাগলের মত সারারাত যতক্ষণ জেগে ছিল কেঁদে গেছে… এখনো মনে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে সেদিন ও কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল নিজেও জানে না… অদ্ভুতভাবে মালতি দি কিন্তু সেই রাতে এক বার ও দরজায় নক করেনি.. ওরা সাড়ে দশটায় প্রতি রাতে ডিনার করে.. সেই ডিনারের জন্যেও মালতি দি ওকে একবারও ডাকতে আসিনি। পরের দিন সকালে উঠে দেখেছিল আটা মেখে টিফিন বক্স করে ফ্রিজে তুলে দেওয়া হয়েছিল… বুঝেছিল পরিস্থিতি নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছে বছর চল্লিশের ওই মহিলা।
পরের তিন-চারটে দিন দীপান্বিতা প্রাণপণে যুদ্ধ করে গেছে নিজের সাথে স্বাভাবিক জীবনটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য.. সোমবার সকালে উঠে স্নান সেরে অল্প কিছু মুখে দিয়ে অফিসে গেছে ..কাজকর্মে মন লাগানোর চেষ্টা করেছে, সহকর্মীদের সঙ্গে ইচ্ছে না করলেও কথা বলেছে.. কিন্তু দিনের শেষে আশেপাশের সবাই বুঝতে পেরেছে ও নিজের মধ্যে নেই.. ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কারণ জানারও চেষ্টা করেছিল.. কিন্তু দীপান্বিতার এ ব্যাপারটা নিয়ে কারোর সঙ্গে কথাই বলতে ইচ্ছে করে নি.. শেষে কাজকর্মে কোন ক্রিয়েটিভ চিন্তাভাবনা মাথা থেকে আর বের করতে পারছে না দেখে সুদেষ্ণাদি বলেছিল “কদিন ধরেই লক্ষ্য করছি তোকে একদম অন্যরকম লাগছে। আই থিঙ্ক ইউ নিড এ ব্রেক..”ঋষি ও সায় দিয়েছিল কথাটায়.. অফিস থেকে দিন তিনেকের ছুটি ও অ্যাপ্রুভ হয়ে গেল.. কিন্তু বাড়ি যেতে একদম ইচ্ছে করছিল না কারণ ওর চোখমুখের যে অবস্থা হয়ে আছে বাবা মা দাদা বৌদি প্রশ্ন প্রশ্নে ওকে জেরবার করে দেবে.. তাই মালতি দিকে দিন তিনেকের ছুটি দিয়ে পরের দিন ভোরবেলায় বেরিয়ে একাই এসে পৌঁছেছে মন্দারমনিতে..
আপাতত উঠেছে সমুদ্রের ধারের একটা নির্জন রিসর্টে.. সপ্তাহের মাঝখানে টুরিস্টদের ভিড় একটু কম.. এই রিসোর্ট টাও একদম নতুন হয়েছে, তাই ও ছাড়া আর গোটা তিনেক ফ্যামিলি আছে বলেই মনে হয়.. দীপান্বিতার এই সময় কোন লোকজন একদম ভালো লাগছিল না.. বরং নিজেকে নিয়ে বড় বেশি চিন্তা করছিল..কেবলই মনে হচ্ছিল ওর ভেতরের গোলমাল টা ঠিক কোথায় আছে… কারণ ওর ভেতরে তেমন কোন গোলমাল আছে বলেই সৃজিত নিশ্চই সাড়ে তিন বছরের সম্পর্কটা চুকিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে..
দুপুরের চড়া রোদ তখন মন্দারমনির বালিয়াড়ি আর সমুদ্রের নোনা বাতাসে এক অদ্ভুত অলসতা ছড়িয়ে দিয়েছে। দীপান্বিতার ডাইনিং হলের কৃত্রিম আড়ম্বরটুকু সহ্য করার মতো ইচ্ছে হলো না।রিসোর্টের ইন্টারকমে ফোন করে ও ঘরেই খাবার আনিয়ে নিল।
রুমে খাবার দিয়ে যাওয়ার পর ও থালাটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত, ডাল আর হালকা মাছের ঝোল—সবটাই বড্ড অচেনা লাগল। জোর করে মুখে দু-এক গ্রাস তুলতেই গলার কাছে কেমন যেন দলা পাকিয়ে এল। অগত্যা চামচটা নামিয়ে রেখে ও জলের গ্লাসটা এক চুমুকে খালি করে দিল। খিদে আসলে পেটের নয়, মনের অনুভূতির সাথে জড়িয়ে থাকে; মন যখন অসাড়, তখন শরীরও যেন কোনো জ্বালানি নিতে অস্বীকার করে।
সময় কাটানোর একটা মরিয়া চেষ্টায় ও রিমোট তুলে টিভিটা চালাল। রিমোটের বোতাম চেপে একের পর এক চ্যানেল পাল্টে যেতে লাগল—কোথাও চড়া সুরের গান, কোথাও কোনো হাসির সিরিয়াল, কোথাও আবার হাই ভোল্টেজ খবরের তরজা। কিন্তু কোনো একটা শব্দও ওর কানের পর্দা পেরিয়ে মগজে পৌঁছাল না। স্ক্রিনের রঙিন আলোটা ওর চোখের মণি ছুঁয়ে চলে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ভেতরের অন্ধকারটাকে বিন্দুমাত্র আলোড়িত করতে পারল না। বিরক্তি আর ক্লান্তিতে টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে ও উঠে দাঁড়াল।
কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা সরিয়ে ও ব্যালকনিতে এসে বসল কাঠের ইজি চেয়ারটায়।
বিকেলের দিকে হেলে পড়া সূর্যটার দিকে তাকিয়ে ও টের পেল, একাকীত্ব আসলে কোনো নিস্তব্ধতা নয়, একাকীত্ব হলো নিজের ভেতরে হাজারটা প্রশ্নের এক তুমুল শোরগোল, যার কোনো উত্তর নেই। সমুদ্রের ঢেউগুলো একের পর এক বালিতে আছড়ে পড়ছে, আর ফেনিয়ে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। দীপান্বিতার মনে হলো, ওর সাড়ে তিন বছরের সম্পর্কটাও ঠিক এই ঢেউগুলোর মতোই—কতটা আড়ম্বর নিয়ে এসেছিল, আর যাওয়ার সময় শুধু একটু নোনা জল আর এক বুক শূন্যতা রেখে গেল।
চেয়ারের হাতলে হাত দুটো রেখে ও চোখ বুজল। বাতাসে ওর চুলে এসে লাগছে সমুদ্রের নোনা গন্ধ। এই বিশাল পৃথিবীর একটা একচিলতে বারান্দায় ও বসে আছে সম্পূর্ণ একা। আগে একাকীত্ব মানে ও বুঝত ঘরে কেউ না থাকা, কিন্তু এখন ও জানে—চারপাশে এত মানুষ থাকার পরেও একান্ত নিজের একটা মানুষ না থাকাই হলো আসল একাকীত্ব। নিজের ভেতরের এই শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ও যেন নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটাও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।
বিকেলের নরম আলোয় সমুদ্রের জল তখন রূপোলি থেকে আস্তে আস্তে তামাটে রঙ ধারণ করছে। ব্যালকনি থেকে দৃষ্টিটা একটু দূরে প্রসারিত করতেই দীপান্বিতার চোখে পড়ল সমুদ্রের ঠিক ধার ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছে এক নববিবাহিত দম্পতি। মেয়েটির পরনে লালচে রঙের শাড়ি, বাতাসে উড়ছে তার আঁচল, আর ছেলেটি পরম ভরসায় তার হাতটা ধরে আছে। ঢেউয়ের জল যখন ওদের পা ছুঁয়ে যাচ্ছে, দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠছে। সেই হাসির শব্দ এই দূর বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছাল না ঠিকই, কিন্তু ওদের শরীরের স্বচ্ছন্দ ভঙ্গি বলে দিচ্ছিল ওরা এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী।দৃশ্যটা দেখামাত্রই দীপান্বিতার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল। এক লহমায় ওর চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল নোনা জল। সাড়ে তিনটে বছর… কম দিন তো নয়! ও আর সৃজিতও কি এমন স্বপ্ন দেখেনি? তবে আজ কেন ও এই বারান্দায় একলা কয়েদি, আর সৃজিত নিজের মতো করে মুক্ত? চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে নেমে এল. তখনই হঠাৎ রুমের বেলটা বেজে উঠল.. পরপর তিনবার.. যেন কেউ খুব ব্যস্ত হয়ে বেল দিচ্ছে… বিরক্ত লাগলো দীপান্বিতার
জোর করে নিজেকে বারান্দা থেকে বের করে দরজা খুলে অবাক হয়ে তাকালো আগন্তুকের দিকে..
ক্রমশ
✍️#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা
