#নোনা_জল #অন্তিম_পর্ব
দীপান্বিতা শান্ত, নিরেট গলায় বলল, “পরিস্থিতির চাপ সবার জীবনেই আসে সৃজিত। কিন্তু তার জন্য মানুষ মাঝরাস্তায় হাত ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায় না। আর তুমি তো পালাওনি, তুমি নিজের পিঠ বাঁচাতে একটা চলন্ত গাড়ি থেকে আমাকে আচমকা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলে। আজ যে তুমি ফিরে আসতে চাইছ, সেটাও আমার প্রতি ভালোবাসার টানে নয়… আমি যেহেতু বলেছি অফিসে বা বাড়িতে গিয়ে কৈফিয়ত চাইবো তাই নিজের সম্মান হারানোর ভয়ে তুমি আজ এই ফোনগুলো করছ.. আমার ভুলটা কোথায় ছিল বলতে পারো? তোমাদের মত মানুষরা যখন কোন সম্পর্কে সিরিয়াসলি নিজেকে হান্ড্রেড পারসেন্ট দিতেই পারবে না, তাহলে আর একটা মানুষকে সেই সম্পর্কে এত সিরিয়াস করে তোলো কেন?
-আমি নিজেও সিরিয়াস ছিলাম.. ফোনের ওপাস থেকে সাফাই দিতে চায় সৃজিত..
-সেটা তো আমিও ভাবতাম.. আজ বুঝতে পারি, কতটা বোকা বলে তোমার মত একটা ছেলের ওপর চোখ বুজে এতদিন ভরসা করেছি..
-আমি কিন্তু চাই.. সম্পর্কটা আবার আগের মত হয়ে যাক।
-কিন্তু আমি আর চাই না.. একদমই চাই না..
-দীপ শোনো শোনো.. প্লিজ..
ফোনটা কান থেকে নামিয়ে ফেলে দীপান্বিতা.. তারপর দূর থেকে ভেসে আসা শব্দগুলো শুনতে শুনতে মুখের চোয়াল শক্ত করে ফেলে.. এককালে এই দীপ নাম টুকু ওর মুখ থেকে শুধু শোনার জন্য কত এফোর্ট ই না দিয়েছে.. ওই টুকু শুনলেই মাখনের মতো গলে যেত ও.. আর আজ ওই নামটাই যেন ওর কানে গরম সিসা ঢেলে দিচ্ছে.. এত মিথ্যা এত নাটক অকারণে একটা মানুষ করতে পারে!!
ওপাশ থেকে সৃজিত তখনো কত কিছু বলে চলেছে.. মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে কলটা কেটে দেয় দীপান্বিতা.. তারপরে নাম্বারটা ব্লক লিস্টে পাঠিয়ে বিছানা থেকে নেমে বেসিনের সামনে গিয়ে কলটা ছেড়ে দেয়.. আঁজলা ভরে জল নিয়ে চোখে মুখে ঝাপটা দেয়..এক বার, দু বার, তিন বার। জলের হিমেল স্পর্শে চোখের কোণের তপ্ত নোনা জলটুকু ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। আয়নার দিকে তাকায় ও। ভেজা মুখের ওপর চুইয়ে পড়া জলবিন্দুগুলোর নিচে মুখটা এখনো লালচে হয়ে আছে..বেসিনের কলটা বন্ধ করে তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছে নেয় দীপান্বিতা.. আয়নার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে “শোন মেয়ে, সৃজিত কোনদিনই তোকে ভালবাসেনি.. শুধু তুই ই বোকার মত… নির্বোধ নাকি তুই!! একটা লোক তোকে ঠকাচ্ছে আর তুই নিজেকে ঠকতে দিলি?
ভালবাসলে কেউ কোনদিন ছেড়ে যায় নাকি !! প্রমিতকে দেখে বুঝিস না!!”
ঘরের জানলাটা খুলে দিতেই এক ফালি বিকেলের আলো এসে পড়ে ওর মুখে…বুক ভরে একটা শ্বাস নেয় ও—
তারপরে বারান্দায় বসে নিজের ফোন থেকে গ্যালারিতে জমে থাকা সৃজিতের প্রায় হাজার দুয়েক ফটো ডিলিট করতে শুরু করে..
এক সময় শেষ ছবিটাও মুছে যায় ফোন থেকে..
ফোনটা হাতে নিয়ে দরজা লক করে ৪১২ নম্বর রুমে গিয়ে নক করে ও.. দরজা খোলে গৌরব।
-আপনারা চা খেতে যাবেন?
গৌরব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দীপান্বিতার দিকে.. প্রমিত পাশ থেকে উত্তর দেয়, যে কথাটা এইমাত্র বলা হলো এটা যদি আপনি থেকে তুইতে চলে গেছে দেখতে পাই তাহলে বোধহয় বেশি ভালো লাগবে শুনতে!
এক মুহূর্ত না ভেবে দীপান্বিতা বলে
-চা খেতে যাবি তোরা?
গৌরব মুচকি হেসে বলে,
-যাব.. যত কাপ চা খেলে তোর লালচে নাকের ডগাটা আবার নিজের রং ফিরে পাবে ঠিক তত কাপ চা খাব.. চল..
প্রমিত সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বন্ধুর কানে কানে বলে আমার সঙ্গে তুই তোকারি একদম ঠিক আছে.. কিন্তু তোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু রিস্কি হয়ে যাচ্ছে না?.. একবার ফ্রেন্ডজোন হয়ে গেলে কিন্তু ওখান থেকে বেরোতে পারবি না..
গৌরব ফিসফিস করে বলে “ওসব ভাবতে যাস না এখন.. বন্ধুত্বটা ভালো করে হোক আগে.. যে কোন জিনিস স্বতঃস্ফূর্তভাবে হওয়া দরকার..বাকি কথা পরে চিন্তা করা যাবে.. সারা জীবন একসাথে চলার কথা যখন ভাবতে চাই তখন আর তাড়াহুড়ো করে লাভ কি!”
-আরি শালা!! তোর পেটে পেটে এত!!
-আরে ধুর শালা..মেয়েটা সবেমাত্র ব্রেকআপ করে বেরিয়েছে। ওকে হিল হতে দে আগে..
-ওরে বাবা! এতো গাছে না উঠতেই এক কাঁদি..
গৌরব আর থাকতে না পেরে দুঘা বসিয়ে দেয় প্রমিতের পিঠে।
ওদের থেকে কয়েক কদম আগে চলা দীপান্বিতা পিছন ফিরে চোখ গরম করে হুংকার দেয় “তোরা দুটোতে কি এত ফিসফিস করছিস রে”
প্রমিত উত্তর দেয় “গৌরব বলছিল বিকেলের প্রথম চা টা তোর ঘাড় ভেঙে খাবে.. আর ফিস ফ্রাই টাও”
-তোর ওই বক রাক্ষস বন্ধু কি খাওয়া ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতে পারে না?
-পারে রে.. আমিও ভাবতাম ও খাওয়া, ড্রাইভিং আর টাকা ছাড়া আর কিছু বোঝেনা .. তবে ইদানিং দেখছি অন্য কয়েকটা জিনিস ওর মাথায় ঢুকতে শুরু করেছে.. সময় হোক বুঝতে পারবি.. এখন বল ফিস ফ্রাই খাওয়াবি?
-তা চল খাইয়ে দিচ্ছি.. তবে আমি কিন্তু কাল সকালেই কলকাতা ফিরব.. একটা দিন বাড়ি গুছিয়ে পরের দিন সকালে অফিস জয়েন করব.. একটু পরে বাসের একটা টিকিট বুক করব”
-তোকে বাসে ফিরতে হবে না। আমরা এখান থেকে লাঞ্চ করে কাল বেরোবো.. তোকে বাড়িতে ড্রপ করে আমরা বাড়ি চলে যাব.. কিরে গৌরব দীপান্বিতা কে বাড়িতে ড্রপ করে দিতে পারবি না? বাড়িটা চিনে নেওয়াও তো দরকার বল।
-হ্যাঁ ছুটি ছাটায় মালতিদির হাতের রান্না খেতে আসতে পারা যাবে.. গৌরব মৃদু হেসে উত্তর দেয়।
-মালতিদির হাতের রান্না খাওয়ার লোভ যখন এত, তখন আর না করব না।
দীপান্বিতা প্রমিতকে বলে.. তারপর তনয়া কোন রেসপন্স করেছে আর?
-মেসেজ করে যাচ্ছে.. আমি উত্তর দি নি।
হঠাৎই একটা অচেনা নম্বর থেকে ভিডিও কল আসে প্রমিতের মোবাইলে..
ওরা তিনজনে তখন ফোর্থ রাউন্ডের চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেওয়া সবে শুরু করেছে..
-হ্যালো
-কতগুলো মেসেজ করেছি প্রমিত.. উত্তর দিচ্ছ না যে..
প্রমিত ওদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে ..
গৌরব দীপান্বিতার কানে কানে বলে “তনয়ার ফোন.. বেটাকে স্পিকারে দিতে বলি..চল শুনি ”
দীপান্বিতা গৌরবকে আটকে দেয় “না ওর যুদ্ধটা ওকেই শেষ করতে দে”..
গৌরব দীপান্বিতার কথা মেনে প্রমিতকে ইশারায় ওপাশের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেয়.. তারপরে দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলে
“এইসব ঠিকঠাক ব্যাপার গুলো আমি ঠিক ধরতে পারি না..আমায় একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিবি?”
দীপান্বিতা কোন কথা না বলে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেয়..
-কি হলো প্রমিত কোন কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন.. ফেসবুকে তোমার স্ট্যাটাস টা দেখে আমি একদম অবাক হয়ে গেছি..
-কেন এতে অবাক হওয়ার কি আছে? আমায় কেউ ভালবাসতে পারে না?
-না মানে এত বড় একটা খবর তোমার জীবনের.. অথচ আমি তার আভাসও পেলাম না সেটাই আমাকে আরো অবাক করেছে.. একটা কল করে বলতে পারতে যে তুমি সম্পর্কে জড়িয়েছো।
গলা খাঁকারি দিয়ে প্রমিত বলে “ও চায় না আমি আমার কোন এক্স এর সাথে কোন রকম কন্টাক্ট এ থাকি! এই কলটাও ধরতাম না.. নেহাত নাম্বারটা সেভ করা ছিল না তাই ধরে ফেলেছি..”
-বাবা তোমার গার্লফ্রেন্ড তো দেখছি তোমায় নিয়ে ভীষণ পজেসিভ.. এরকম হলে তো তোমার দম বন্ধ হয়ে আসবে..
-আমার গার্লফ্রেন্ড, আমার দম.. আমার জীবন.. পুরোটাই আমার ব্যাপার.. এ নিয়ে কোন বাইরের লোকের মাথা না ঘামালেও চলবে.. তারপর হঠাৎই অন্যদিকে তাকিয়ে অকারণে গলা তুলে বলে “হ্যাঁ বাবু, আসছিইই..”
-তুমি কি ওই মহিলার সঙ্গে আছো নাকি এখন?
-অবশ্যই.. এইতো আমার দু হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আছে.. কোন ফ্লেভারের আইসক্রিম খাবে পছন্দ করে দিতে বলছে.. আমি রাখি…আর শোনো আর কোনদিন আমায় ফোন করবে না.. ও কষ্ট পাবে..
তনয়ার হতবাক মুখের দিকে তাকিয়ে ফোন কেটে দেয় প্রমিত.. ওদিকে দূর থেকে সবটাই শুনতে পেয়েছে ওরা…
টেবিলে এসে চায়ের ভাঁড়টা তুলে নিয়ে প্রমিত এক চুমুক দিল, তারপর দীপান্বিতা আর গৌরবের দিকে তাকিয়ে বলল, “ব্যস, চ্যাপ্টার ক্লোজড! আর কোনোদিন ওপাশ থেকে কোনো মেসেজ বা কল আসবে না।”
গৌরব হেসে প্রমিতের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “শাবাশ গুরু! অ্যাক্টিংটা কিন্তু ফাটাফাটি করেছিস। ওই ‘হ্যাঁ বাবু, আসছিইই’ বলার সময় তোর গলার টোনটা জাস্ট অস্কার পাওয়ার মতো ছিল!”
ছয় মাস পরের এক মনোরম সন্ধে। কলকাতার বুকে তখন হালকা বাসন্তী হাওয়া দিচ্ছে। প্রমিতের নতুন ফ্ল্যাটের আলো-ঝলমলে বারান্দাটা চমৎকার করে সাজানো—টবে ঝুলছে কিছু মানিপ্ল্যান্ট আর ইনডোর পাম, আর এককোণে মৃদু আলো ছড়াচ্ছে একটা লণ্ঠন শৈলীর ল্যাম্প।
বারান্দার কাচের স্লাইডিং ডোরটা ঠেলে প্রমিত ভেতরে ঢুকল। ওর পেছনেই হালকা ল্যাভেন্ডার রঙের কুর্তি আর অফ-হোয়াইট ট্রাউজার্স পরা এক চশমাপরা মিষ্টি মেয়ে। লম্বা কালো চুলগুলো একপাশে বিনুনি করা, আর দু-চোখে মস্ত বড় এক কৌতূহল মেশানো হাসি।
প্রমিত নাটকীয় ভঙ্গিতে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, যার কথা এতদিন তোরা শুধু ফোনেই শুনেছিস, আজ সামনাসামনি আলাপ করে নে। দিস ইজ মীনাক্ষী। আর মীনাক্ষী, এরা হলো আমার সেই দুই রত্ন—গৌরব আর দীপান্বিতা।”
মীনাক্ষী হাত দুটো জোড় করে চমৎকার মিষ্টি বাংলায় বলে উঠল, “নমস্কার! আপনাদের সাথে দেখা করে খুব ভালো লাগল।”মেয়েটির মুখে দক্ষিণী টোনের ভাঙা বাংলা শুনে দীপান্বিতা আর গৌরব দুজনেই হেসেই ফেলল। দীপান্বিতা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মীনাক্ষীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “আরে বাঃ! মীনাক্ষী তো দারুণ বাংলা বলে! বসো বসো এখানে। কেরালা থেকে কলকাতায় এসে এই বাঁদরটার খপ্পরে কীভাবে পড়লে, সেই গল্পটা আগে তোমার থেকে শুনতে হবে।”
মীনাক্ষী হেসে ফেলে প্রমিতের দিকে এক ঝলক তাকাল, তারপর সোফায় বসতে বসতে বলল, “অফিসের প্রজেক্টে আলাপ। প্রমিত খুব ভালো কথা বলে… মানে খুব ফ্লার্ট করতে পারে।”
“আই অবজেক্ট!” প্রমিত সোফার হাতলে বসতে বসতে বুক চাপড়ে বলল, “আমি স্রেফ ট্রু লাভ করতে পারি। আর তোরা বিশ্বাস করবি না, ও কিন্তু মালতিদির চেয়েও ভালো ফিল্টার কফি বানায়। আজ তোদের জন্য নিজ হাতে কেরালা স্টাইলের কফি আর স্ন্যাক্স বানিয়ে এনেছে।”
প্রমিতের নতুন জীবনের এই সহজ আনন্দ দেখে দীপান্বিতার মনটা এক অজানা শান্তিতে ভরে গেল। ও আড়চোখে গৌরবের দিকে তাকাল। গৌরবও তখন ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল। দুজনের চোখাচোখি হতেই একটা নীরব বোঝাপড়ার হাসি বিনিময় হলো।
বিগত ছয় মাসে প্রমিত যেমন তার অতীতকে ভুলে মীনাক্ষীর হাত ধরে নতুন করে বাঁচতে শিখেছে, ঠিক তেমনি দীপান্বিতার জীবনেও গৌরব এক অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থেকে গেছে। তাড়াহুড়ো নেই, জোর খাটানো নেই—শুধু বিশ্বাস ও গভীর বন্ধুত্বের টানে ওরা দুজন দুজনকে চিনে নিচ্ছে প্রতিদিন.. যদিও দুজনেই জানে সেই বন্ধুত্ব আর নিছক বন্ধুত্বে থেমে নেই।বারান্দার বাইরে তখন কলকাতার বুকে অজস্র নিয়ন আলো জ্বলছে।
প্রমিত আর মীনাক্ষীর খুনসুটি, গৌরবের মৃদু হাসি আর ফিল্টার কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে দীপান্বিতা মনে মনে ভাবে—জীবন সত্যিই সুন্দর, শুধু সঠিক মানুষের হাতটা ধরতে জানতে হয়।
সমাপ্ত
#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা
