#নোনা_জল #পঞ্চম_পর্ব
দীপান্বিতা প্রমিতের চোখের গভীরে সেই দীর্ঘদিনের লালিত কষ্টটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। যে ছেলেটা এতক্ষণ ওর মেন্টর সেজে ওকে জীবনের পাঠ দিচ্ছিল, সে নিজেই নিজের তৈরি এক মায়ার খাঁচায় বন্দি।
কচুরির টুকরোটা আলুর দমে ডুবিয়ে অবিশ্বাস্য চোখে প্রমিত তাকিয়ে বলল, “পাগল নাকি দীপান্বিতা! আমি হুট করে ফেসবুকে এই স্ট্যাটাস দেবো? লোকে কী ভাববে? আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি তো কারও সাথে রিলেশনে নেই! এটা তো স্রেফ মিথ্যে নাটক হবে।”
দীপান্বিতা নিজের প্লেট থেকে একটা কচুরির কোণ ছিঁড়ে মুখে পুরে শান্ত গলায় বলল, “এটা নাটক নয় প্রমিত, এটা কাউন্টার সাইকোলজি.. এরকম দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়ালে কিন্তু আপনার চলবে না… সামনে পুরো জীবনটা পড়ে আছে”
গৌরব প্রমিতের কাঁধে হাত রেখে বলল “একবার করেই দেখ না.. যদি একটু ভালো থাকতে পারিস”
প্রমিত খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পকেট থেকে ফোনটা বার করল। ফেসবুক অ্যাপটা খুলে প্রোফাইলে গিয়ে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস এডিটের জায়গায় আঙুলটা ছোঁয়াতেই ওর বুকটা কেমন যেন ধড়ফড় করে উঠল। ও দীপান্বিতার দিকে তাকাল। দীপান্বিতা অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
এক প্রকার চোখ বুজেই প্রমিত আপডেট বোতামটা টিপে দিল—‘In a relationship’. তারপর গৌরবের দিকে তাকিয়ে বলল
“যদি গড়বড় কিছু হয়!!”
“কচু পোড়া হবে!!! তুই কচুরি খা.. কিছু হলে আমি সামলাবো..”
স্ট্যাটাসটা লাইভ হতেই যেন বোমা ফাটল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্রমিতের চেনা-পরিচিত সার্কেল, কলেজের পুরোনো বন্ধুদের লাইক আর কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল। অনেকেই ইনবক্সে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল—”কী রে ভাই? লুকানো কনেটি কে?”, “পার্টি কবে দিচ্ছিস?”
দীপান্বিতা প্রমিতের ফোনটা টেনে নিয়ে দু-একটা কমেন্টে খুব কায়দা করে রিপ্লাই লিখে দিল—”থ্যাঙ্কস ভাই, খুব শিগগিরই জানাচ্ছি” বা কয়েকটাতেএকটা স্রেফ হাসিমুখের ইমোজি। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে এমন একটা রহস্য আর আনন্দের আবহ তৈরি হলো যে যে কেউ দেখলে ভাববে প্রমিত সত্যি তার জীবনের সেরা ফর্মে আছে।
দীপান্বিতা সকলের কচুরির দাম মিটিয়ে দিল… তারপরে সমুদ্রের ধারে এসে ওরা আবার বসলো..
ঠিক তখনই গৌরবের পকেটে থাকা ফোনটা একটা তীব্র ভাইব্রেশনের সাথে একসাথে কয়েকবার বেজে উঠল। গৌরব চটপট পকেট থেকে ফোনটা বার করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই চোখ দুটো গোল গোল করে ফেলল। ও উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, “আরে ম্যাডাম! কেল্লাফতে! ব্যাটার রিপ্লাই চলে এসেছে!”
দীপান্বিতা আর প্রমিত দুজনেই একসঙ্গে গৌরবের ফোনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। স্ক্রিনে সৃজিতের সেই অচেনা নম্বর থেকে পরপর তিনটে মেসেজ ভেসে উঠেছে:
“দীপান্বিতা, প্লিজ শান্ত হও। তুমি এসব কী বলছ? অফিস বা বাড়িতে আসার কোনো প্রয়োজন নেই।”
“আমি কোনো ছেলেখেলা করিনি। পরিস্থিতির চাপে পড়ে অমনটা করতে হয়েছিল।”
“কোথায় আছ তুমি এখন? প্লিজ ফোনটা তোলো, সামনাসামনি কথা বলে সব মিটিয়ে নিচ্ছি।”
সৃজিতের এই ছটফটানি আর খেই হারিয়ে ফেলা মেসেজগুলো পড়ে দীপান্বিতার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। যে মানুষটা এতদিন ওকে কোনো উত্তর দেওয়ার যোগ্য মনে করেনি, স্রেফ একটা ব্লক করে দিয়ে দায় এড়িয়েছিল—আজ নিজের সাজানো কেরিয়ার আর সম্মানে ধাক্কা লাগার ভয়ে সে কত তাড়াতাড়ি উত্তর দিচ্ছে!!
দীপান্বিতা হাত বাড়িয়ে বলল, “গৌরব, ফোনটা দাও। আমি ওকে একটা উত্তর লিখি..”
“আরে না, না! একদম নয়!” গৌরব চট করে ফোনটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। ও মাথা নেড়ে একগাল হেসে বলল, ” আমি প্র্যাক্টিক্যাল জগতের লোক, বিজনেসের স্ট্র্যাটেজিটা আমার চেয়ে ভালো কেউ বুঝবে না। ব্যাটা এখন চরম খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ছটফট করছে। এখন যদি আপনি চট করে রিপ্লাই দিয়ে দেন বা ফোন তোলেন, তবে ও আবার নিজেকে সামলে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে। তার চেয়ে এখন সৃজিতবাবুকে একটু সাসপেন্সে রাখাটাই সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি।”
প্রমিতও গৌরবের কথায় সায় দিয়ে বলল, “গৌরব একদম ঠিক বলেছে দীপান্বিতা। যে মানুষটা আপনাকে সাত দিন ধরে কোনো কারণ না দেখিয়ে গুমরে মরার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল, তাকে অন্তত কয়েক ঘণ্টা এই ছটফটানির আগুনে পুড়তে দিন। ও বুঝুক যে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ওর হাতে থাকে না। আপাতত ও নোটিফিকেশন দেখতে থাকুক, কিন্তু কোনো উত্তর পাবে না। এই উত্তরগুলো যে আপনার প্রতি কোন অনুভূতির জন্য ও দিচ্ছে না সেটা আশা করি আপনি বুঝতে পেরে গেছেন…”
দীপান্বিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর..
নিজের ফোনটা সাইলেন্ট করে দিল… সেখানে তখন ঘন ঘন সৃজিতের কল ঢুকছে…
দুপুরের দিকে সমুদ্রের রূপটা যেন আরও বেশি চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ঢেউগুলো ফেনিল হয়ে আছড়ে পড়ছে তটে, আর সেই নোনা হাওয়ায় তিন বন্ধুর আড্ডা এবার সম্পূর্ণ অন্য একটা ছন্দে বইতে শুরু করল। এতদিনের জমে থাকা মেঘগুলো কেটে যেতে শুরু করলো আস্তে আস্তে..
গৌরব প্যান্টের পকেট থেকে নিজের ফোনটা বার করে রিসোর্টের ম্যানেজারের নম্বরটা ডায়াল করল। ওপাশে ফোনটা রিসিভ হতেই গৌরব বেশ দরাজ গলায় বলল, “হ্যালো, রয়্যাল রিসোর্ট? হ্যাঁ, ৪১২ আর ৪২২ নম্বর রুম থেকে বলছি। আমাদের দুপুরের লাঞ্চের মেনুটা একটু নোট করুন তো… হ্যাঁ, একদম খাঁটি বাঙালি স্টাইলে ফার্স্ট ক্লাস চালের ভাত, মুগের ডাল, আলু ভাজা আর মেইন মেনুতে থাকবে একদম কড়া করে বানানো মন্দারমনির স্পেশাল কাঁকড়ার ঝাল! ঝালটা একটু বেশি দেবেন মশাই..”
গৌরবের এই খ্যাপাটে অর্ডার দেওয়ার ধরন দেখে দীপান্বিতা আর প্রমিত দুজনেই একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল।
ঘণ্টা কয়েক চুটিয়ে আড্ডা মারার পর, তখন ওরা রিসোর্টের লবিতে ফিরে এসেছে। প্রমিতের ফোনের স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠল। প্রমিত ফোনটা পকেট থেকে বের করে ওদের দুজনের চোখের সামনে মেলে ধরল…একটা চেনা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে নোটিফিকেশন—
প্রমিত বিড়বিড় করে বলল “সাড়ে চার বছর পর তনয়া নিজে থেকে মেসেজ করেছে!”
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে: “ফেসবুকে ওটা কী দেখলাম প্রমিত? তুমি রিলেশনে আছ? কে ও? আমাকে তো একবারও জানাওনি!”
তনয়ার মেসেজটা দেখামাত্রই গৌরব উত্তেজনায় প্রমিতের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, “লে হালুয়া! আমি বলেছিলাম না তোকে?””
প্রমিত অবশ্য গৌরবের মতো লাফালাফি করতে পারল না। ও স্তব্ধ হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সাড়ে চার বছর ধরে যে একটা মেসেজের জন্য ও চাতক পাখির মতো বসে থাকত, কত রাত একা একা ওর প্রোফাইল স্টক করে কাটাত—আজ সেই তনয়া নিজে থেকে মেসেজ করেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, প্রমিতের বুকের ভেতর আজ আর চেনা কোনো তোলপাড় হচ্ছে না। বরং ওর নিজেরই অবাক লাগল এটা ভেবে যে, এই সামান্য তিন লাইনের অধিকার খাটানো মেসেজটা দেখার পর ওর মনে ভালোবাসার চেয়ে বেশি এক তীব্র বিতৃষ্ণা জেগে উঠছে।
দীপান্বিতা প্রমিতের মুখের চটজলদি বদলে যাওয়া ভাবটা লক্ষ্য করছিল। ও প্রমিতের আরও একটু কাছে এসে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত অথচ গভীর গলায় বলল, “কী প্রমিত? তনয়ার মেসেজটা দেখে মনটা আবার গলে জল হয়ে গেল না তো? নাকি আমার লজিকটা এবার সত্যি বলে মনে হচ্ছে?”
প্রমিত একটা ম্লান হাসি হাসল। ওর খসখসে গলাটায় এবার কোনো দ্বিধা ছিল না, ও বলল, “না দীপান্বিতা। আপনি এক ফোঁটাও ভুল বলেননি। তনয়া যদি আমার ভালো চাইত, তবে ও এই স্ট্যাটাস দেখে খুশি হতো, কংগ্রাচুলেট করত। কিন্তু ওর এই ‘আমাকে তো একবারও জানাওনি’ লাইনের অহংকারটাই প্রমাণ করে দিচ্ছে ও আমাকে স্রেফ নিজের একটা সম্পত্তি ভেবে রেখেছিল। ও ভাবতেই পারছে না যে আমি ওকে ছাড়াও ভালো থাকতে পারি।”
গৌরব নিজের ফোনটা পকেট থেকে বের করে সৃজিতের চ্যাটটা একবার দেখে নিয়ে বলল, “উফ্! ওদিকে সৃজিতবাবুও এখনও টাইপিং আর ডিলিটিংয়ের খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনও কোনো রিপ্লাই পায়নি বলে ব্যাটার ছটফটানি স্ক্রিন ফুঁড়ে বেরোচ্ছে। আর এদিকে তনয়া ম্যাডামও লাইনে হাজির! প্রমিত, এবার ফাইনাল স্ট্রোকটা তুই দিবি নাকি আমি তোর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ব্লক মারব?”
দীপান্বিতা গৌরবের হাত ফোন থেকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে প্রমিতকে বলল, “না গৌরব, নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্ম বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার অধ্যায়টা প্রমিতকে নিজেকেই লিখতে হবে। প্রমিত, তনয়ার এই মেসেজটা আপনি সিন করবেন। ও দেখুক যে আপনি ওর টেক্সট পড়েছেন। কিন্তু একটা অক্ষরেরও কোনো উত্তর এখন দেবেন না। ও উত্তরের আশায় বসে থাকুক…”
“চলুন আমরা বরং স্নান সেরে লাঞ্চটা করেনি… বেলা একটা বাজতে চলল..”
দীপান্বিতা আলতো করে প্রমিতের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে তনয়ার চ্যাট উইন্ডোটা ওপেন করে দিল। স্ক্রিনে দুটো নীল টিক ফুটে উঠতেই ও ফোনটা আবার প্রমিতের হাতে ফেরত দিয়ে হাসল, “ও উত্তরের আশায় বসে থাকুক প্রমিত… অবহেলা কাকে বলে, ও এবার প্রতি মিনিটে টের পাক। চলুন, আমরা বরং স্নান সেরে লাঞ্চটা করে নিই… বেলা একটা বাজতে চলল। শরীরটাকে আর কষ্ট দিয়ে লাভ নেই।”
গত সাতটা দিন দীপান্বিতার ওপর দিয়ে যেন একটা কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। ঠিকমতো খাওয়া নেই, ঘুম নেই, আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকানোর মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। আজ ঘরে ফিরে ও বাথরুমের শাওয়ারটা খুলে দিল। অনেকদিন পর আজ ও মন ভরে, অনেক সময় নিয়ে স্নান করল। চুলে ভালো করে শ্যাম্পু দিয়ে ঘষে ঘষে যেন গত কয়েকদিনের সমস্ত গ্লানি আর বিষাদ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল ও। স্নান শেষে যখন ও গা মুছে বেরোলো, আয়নায় নিজেকে দেখে ওর নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। এক ঝটকায় যেন চোখের নিচের কালি আর মুখের ম্লান ভাবটা উধাও হয়ে গেছে। ও একটা হালকা আকাশি রঙের সুতির কুর্তি পরল। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর আলগা করে মেলে দিল। নোনা বাতাসে সেই ভেজা শ্যাম্পুর সুবাস মিলেমিশে এক অদ্ভুত সতেজতা তৈরি করল।
ওদিকে ৪১২ নম্বর ঘরে প্রমিতও আজ এক অন্য মানুষ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ও নিজের এক গাল অবিন্যস্ত দাড়ির দিকে তাকাল। যে দাড়িটা ছিল তনয়ার চলে যাওয়ার পর নিজের প্রতি চরম অবহেলার প্রতীক, আজ সেটাকে ও ট্রিমার দিয়ে এক্কেবারে চেঁছে সাফ করে ফেলল। বহুদিন পর পরিষ্কার দাড়ি-গোঁফ কামানো প্রমিতকে আয়নায় বেশ ঝকঝকে আর আকর্ষক লাগছিল। স্নান সেরে একটা হালকা রঙের শার্ট গলিয়ে ও যখন রুম থেকে বেরোলো, ওর মনের ভেতর থেকে এক বিশাল পাথরের ভার নেমে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে গুনগুন করে একটা লোকসংগীত গাইতে গাইতে ও নিচে নামছিল। সাড়ে চার বছর পর ওর গলায় আজ আবার সুর ফিরে এসেছে।
লবিতে নামতেই প্রমিত দেখতে পেল গৌরব আর দীপান্বিতা ইতিমধ্যেই এসে একটা টেবিলে বসে পড়েছে। প্রমিতের চোখটা গিয়ে আটকাল দীপান্বিতার ওপর। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে, দু-একটা অবাধ্য ভেজা চুলের গোছা এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর গাল। দুপুরের চড়া আলোয় দীপান্বিতাকে আজ বড় বেশি স্নিগ্ধ আর মায়াবী লাগছিল। প্রমিতের চোখ থমকে গেল, ওর হাঁটার গতিটা যেন এক মুহূর্তের জন্য শ্লথ হয়ে পড়ল… উল্টো দিকের চেয়ারে বসে থাকা বন্ধুটির চোখের সেই অকৃত্রিম মুগ্ধতা প্রমিতের চোখ এড়ালো না। ও মনে মনে একটু মুচকি হাসল, কিন্তু মুখে কিচ্ছুটি প্রকাশ করল না।
গৌরব প্রমিতকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, “ওরে বাবা! এ তো পুরো হিরো আলমের উল্টো কেস রে! প্রমিত, তোকে তো দাড়ি কাটার পর জাস্ট চেনা যাচ্ছে না মাইরি!”
টেবিলে বসতেই ধোঁয়া ওঠা গরম বাসমতি চালের ভাত, সোনা মুগের ডাল আর মুচমুচে আলু ভাজা চলে এলো। দীপান্বিতা আজ প্রথম এক হাতা ডাল দিয়ে ভাতটা ভালো করে মাখল। এক গ্রাস ভাত আর আলু ভাজা মুখে তুলতেই ওর চোখের কোণটা হঠাৎ ভিজে উঠল। কতদিন পর ও ভাতের আস্বাদ পাচ্ছে! এই ডাল-ভাতের সাধারণ স্বাদটাই যেন ওকে ওর চেনা পৃথিবীতে, ওর নিজের অস্তিত্বে ফিরিয়ে এনে দিল। মনের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কান্নার শেষ বাঁধটা ভেঙে এক ফোঁটা জল ওর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।
গৌরব ও প্রমিত দুজনেই খাওয়া থামিয়ে দিল। গৌরব এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের পকেট থেকে একটা রুমাল বার করল।কোনো ইয়ার্কি না করে, অত্যন্ত যত্ন আর স্নেহের সাথে দীপান্বিতার গালের সেই জলটুকু আলতো করে মুছে দিল। মৃদু হেসে বলল, “ম্যাডাম, এই নোনা জলটা বিষাদের ছিল না, এটা জীবনে ফেরার আনন্দের। এবার চটপট চোখের জল মুছে ওই কাঁকড়ার ঝালটায় হাত দিন, রং দেখে মনে হচ্ছে ম্যানেজারবাবু কিন্তু লঙ্কা কম দেননি! আমি বরং রুমালটা বাইরেই রাখি।”
প্রমিত আস্তে করে গৌরবের কানে কানে বলল “তাহলে তোর মত ভবঘুরেও দায়িত্ব নিতে শিখছে কি বলিস!”
এই প্রথম গৌরবের মুখে কোন জুতসই উত্তর শোনা গেল না.. বেশ লজ্জা লাগছে তখন ওর কিন্তু ভালো ও লাগছে..
গৌরবের মুখে কোনো জুতসই উত্তর না পেয়ে প্রমিত একটু টিপ্পনি কাটার ভঙ্গিতে হাসল। গৌরব নিজের কান দুটো সামন্য লাল করে কাঁকড়ার ঝোলের বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল, “আরে ধুর! খা তোরা, বেশি বকবক করিস না।” তবে ওর চোখে-মুখে লজ্জা জড়ানো একটা অদ্ভুত ভালো লাগার আভা তখন স্পষ্ট।
লাঞ্চ শেষ করার পর ওরা যখন ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠল, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা দুটো ছুঁইছুঁই। দীপান্বিতা নিজের ব্যাগ থেকে সাইলেন্ট করে রাখা ফোনটা বের করতেই তিনজনেরই চোখ কপালে উঠল। স্ক্রিন জুড়ে জ্বলজ্বল করছে—৩১টা মিসড কল! সৃজিত যেন গত দু-ঘণ্টায় পাগলের মতো একের পর এক রিং করে গেছে।
প্রমিত ফোনটার দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর দীপান্বিতার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত, পরিণত গলায় বলল, “দীপান্বিতা, এবার সময় এসেছে। ও এখন মারাত্মক ব্যাকফুটে। আপনি শান্ত মাথায় নিজের ঘরে যান এবং ওর সাথে কথা বলুন। কোনো রাগ বা উত্তেজনা নয়, স্রেফ একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষের মতো ওর মুখোমুখি হোন।”
দীপান্বিতা মাথা নাড়ল..প্রমিত আর গৌরবের থেকে বিদায় নিয়ে ও নিজের ৪২২ নম্বর ঘরে ফিরে এলো। দরজাটা লক করে বিছানায় বসতেই ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভাসছে—’সৃজিত’। ও এবার আর দ্বিধা করল না, রিসিভ করে কানে ঠেকাল। ওপাশ থেকে একটা হাঁসফাঁস করা, অপরাধবোধে জড়ানো গলা ভেসে এলো, “দীপান্বিতা! থ্যাঙ্ক গড তুমি ফোনটা ধরলে! আমি… আমি সত্যি খুব দুঃখিত। প্লিজ আমার বাড়ি বা অফিসে যেও না, সবকিছু নষ্ট হয়ে যাবে।”
দীপান্বিতা জানলার বাইরে উত্তাল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি কোনো সিন ক্রিয়েট করতে আসছি না সৃজিত। শুধু সাড়ে তিন বছরের একটা সম্পর্কের শেষ কৈফিয়তটুকু শুনতে চাই। কেন করলে এমনটা?”
সৃজিত ওপাশ থেকে প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলতে শুরু করল, “দীপান্বিতা, আমি আসলে পরিস্থিতির চাপে পড়েছিলাম। তুমি তো জানো আমার ফ্যামিলি কতটা কনজারভেটিভ। বাড়ি থেকে হঠাৎ বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল, কিন্তু মা-বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, বোনের বিয়ে না দিয়ে বড় ছেলের বিয়ে দেওয়া তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না.. বোনের সবে ক্লাস ইলেভেন.. আমার কাজের অসম্ভব প্রেসার আর বাড়ির এই অবাস্তব দাবি—এইসব সাত-পাঁচ ভেবে আমি মানসিকভাবে পুরো ভেঙে পড়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল আমি তোমাকে কোনোদিনও নিজের করে পাব না, তাই স্রেফ পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। ওই তিন লাইনের মেসেজটা আমার কাপুরুষতা ছিল দীপান্বিতা… প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি ভুল বুঝতে পেরেছি, আমি আবার তোমার সাথে নতুন করে সম্পর্কটা শুরু করতে চাই। আমরা সব সামলে নেব, বিশ্বাস করো!”
দীপান্বিতার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল…
পরের পর্বে সমাপ্ত
#সঞ্চিতা
@কপিরাইট সঞ্চিতা
