#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি থ্রিলার রোমান্স)
#শারমিন_প্রিয়া(শেষ পর্ব)
৩০.
ভোরের আলো কেটে নতুন দিনের সূচনা হয়। সূর্য মামা আলো ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। সূর্যের কিরণে প্রাসাদটা জ্বলমল করছে। অরাইয়া আর আরহাম এখনও ওঠেনি। আরশী কিছুক্ষণ রোদ পোহিয়ে রান্নাঘরে যায়। নাশতা বানায়, রান্না করে। সকালে গোসল করা তার অভ্যাস। সে গোসল সেরে বারান্দায় চেয়ার টেনে বসে। এখানে রোদের আলো এসে পড়েছে। সে চুল ছেড়ে রোদে বসে। বসার আগে সে নিজের জন্য একটি ট্রেতে কাঠবাদাম, সেদ্ধ ডিম আর এক গ্লাস দুধ এনে রাখে। রোদে বসে বসে সেগুলো খায়। মেয়ে আর বর ওঠার জন্য অপেক্ষা করে না।
মেয়ে আর আরহাম উঠলে তাদের খাবার বেড়ে দেয়। খাবার খেয়ে বাপ-মেয়ে উঠোনে যায়। নানান গল্প করে আর ফুলগাছের পুরনো পাতা কেটে দেয়।
আরশী রুমের পেছনের জানলা খুলে তার পাশে বসে। বিলের ধারে কয়েকজন মানুষ বসা। রাতের বেলা এরা থাকে না। রাতে খাঁখাঁ করে বিল।
আরশীর মনে পড়ে পুরনো বাড়ির কথা। তার পুরনো বন্ধুদের দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। সে ভাবে, আরহাম, আরশী সবাইকে নিয়ে সে পুরনো বাড়িতে যাবে। মাসখানেক সেখানে থাকবে। সে মাটির জন্য তার খুব টান। সেখানেই তার শিশু কৈশোর সব কেটেছে। তাই জায়গাটার প্রতি এমন আকর্ষণ তার। আরহাম নিশ্চয়ই এতে আপত্তি করবে না।
রোদের ক্ষীণ আলো এসে পড়ছে দেয়ালে। আর চকচক করছে ফ্রেমে বন্দি আরশী আর আরহামের ছবি। এ ছবি তারা তুলেছিল হানিমুনে গিয়ে। হানিমুনের কথা মনে হতেই আরশীর ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। তার চোখের মধ্যে ভেসে বেড়ায় ওই দিনের কাটানো সব মুহূর্ত। কী সুন্দর ছিল সেই মুহূর্তগুলো। আরহাম কত খুনসুটি করেছিল তার সঙ্গে। কোলে নিয়ে হেঁটেছিল সমুদ্রের ধারে। তারপর রাতে সেই হোস্টেলের রুমে জানলার ধারে বসে তারা সমুদ্রের গর্জন শুনেছিল। আর অপূর্ব চাঁদ দেখেছিল আরহামের বুকে শুয়ে।
আরশী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর বলে, সেই সব স্মৃতি কি এ জন্মে ভোলা যায়? যায় না। যাবে না। কখনোই না।
আরশী উঠে দেয়াল থেকে ছবিটা হাতে নেয়। ধুলো নেই, তবু শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নেয়। তারপর আরহামের ছবিতে হাত বুলিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে।
আরহাম পা হালকা বাঁকা করে দাঁড়িয়ে আছে। এক হাত দিয়ে পেছন থেকে ধরে আছে আরশীকে। অন্য হাতে কালো সানগ্লাস স্টাইল করে ধরে আছে। ব্রাউন রঙের ঠোঁটে লেগে আছে, নজরকাড়া হাসি। লম্বা একগুচ্ছ চুল লেপ্টে আছে ভ্রুজোড়ার মাঝখানে। চোখ দেখে মনে হয় হাজার বছরের প্রেমের অনুভূতি লুকিয়ে আছে সে চোখে। সব মিলিয়ে আরশীর কাছে এই পৃথিবীর সেরা পুরুষদের একজন মনে হয় আরহামকে।
মানুষটার মায়াময় মুখের দিকে তাকালে মনে হয় না সে কাউকে খুন করতে পারে। সে মানুষখেকো ছিল। অনায়াসে সে মানুষের রক্ত চুষে খেত।
আরশী ওসব ভাবনা বাদ দিয়ে ফ্রেমটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, তারপর গভীরভাবে চুমু খায় আরহামকে।
আরহাম চুপিসারে এসে দাঁড়িয়েছিল আরশীর পেছনে। সে তার ছবিতে আরশীর হাত বুলানো আর চুমু খাওয়া দেখে মিটিমিটি হাসে। আরশী নীরব হলে আরহাম দুষ্টুমি করে বলে, “বাস্তবে মানুষটা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ছবিতে এত মনোযোগ দিয়ে কেন দেখতে হবে? সরাসরি চোখ রাখা যায় না?”
আরশী চমকে ফিরে তাকায়। সামনে আরহামকে দেখে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। খানিক লজ্জা লাগে তার। আরহাম তো বাইরে ছিল, এলো কখন—সে টেরই পেল না। ধরা যখন খেয়ে গেছে, কথা না বলাই ভালো। সে দেয়ালে ছবিটা লাগিয়ে দেওয়ার জন্য পা বাড়ালে আরহাম ঝাপটে ধরে আরশীর হাত। আরশী এসে পড়ে আরহামের বুকে।
আরহাম বলে, “আর কত পালাবে আমার থেকে? কত দূরে থাকবে? এতে যে তুমি কষ্ট পাচ্ছো।”
আরশী চোখ তুলে তাকায়, “কষ্ট পাওয়ার কাজ করেছেন আপনি, কষ্ট তো পাবই।”
“ওসব ভোলা যায় না, আরশী?”
“ কী ভুলতে বলছেন? আমার মা-বাবাকে? দেখুন, আপনার প্রতি আমার টান যেমন সত্যি, ভালোবাসা যেমন সত্যি, ঠিক তেমনই আপনার প্রতি আমার রাগ, ক্ষোভ আছে—এটাও সত্যি। আর এই ক্ষোভ আমার জীবনেও সরবে না। সরার মতো কাণ্ড করেননি আপনি। পৃথিবীর কোনো সন্তান তার বাবা-মায়ের খুনিকে ক্ষমা করতে পারে না, আমিও পারব না। এটা মেনে নিতে হবে আপনাকে।”
একটু থেমে আরশী আবার বলে,
“আপনি আমার বেলায় খুব সৎ, ভালো একজন মানুষ—এটা আমি জানি, বিশ্বাস করি। আর করি বলেই আপনার প্রতি ভালোবাসা জেগে ওঠে, টান আসে। কিন্তু তাই বলে আমার মা-বাবার কথা ভুলে যেতে পারি না আমি।
আমার বেলায় এমন হচ্ছে যে, আপনাকে যতটুকু ভালোবাসি, ততটুকু ঘৃণাও করছি। একসাথে কোনোটা আসছে না। আর আসবেও না। যখন ভালোবাসা জাগবে তখন আপনাকে কাছে টানব, আর যখন ঘৃণা জন্মাবে তখন দূরে ঠেলব, এড়িয়ে চলব। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার।”
আরহাম আরশীর ললাট ধরে বলে, “এখন কি ভালোবাসা জাগছে?”
“ওসব কথা বাদ। শুনুন, আপনাকে কিছু বলার আছে।”
“আজ অনেক দিন পর তুমি সুন্দর করে আমার সঙ্গে কথা বলছো। যা বলবে, আমি তাই শুনব।”
“ছাড়ুন আমাকে।”
“এভাবে কি বলা যায় না? মুখ তো উন্মুক্ত। ধরে রাখিনি।”
“ উফ, ছাড়ুন। আসুন, চেয়ারে বসুন।”
আরহাম আরশী পাশাপাশি বসে। আরহাম ঢোক গিলে বলে, “বলো, কী বলবে?”
“আমার খুব ইচ্ছে করছে পুরনো বাড়িতে যেতে। খুব মন টানছে। আমাকে নিয়ে যাবেন? বাড়িটা খালি পড়ে আছে। আমরা তিনজনই সেখানে যাব। সব গুছিয়ে কয়েক দিন থাকব সেখানে।”
“খুব মন টানছে?”
আরশী মাথা নাড়ায়, “হ্যাঁ।”
আরহাম মাথা কাত করে, “ঠিক আছে, যাব।”
আরশী খুশি হয়। বলে, “জানেন? যখন খুব ছোট ছিলাম আমি, বয়স পাঁচ-ছয় বছর, তখন একটা পেয়ারা গাছ লাগিয়েছিলাম। সেটা অনেক বড় হয়েছে। প্রতিবছর পেয়ারা ধরে। খুব মিষ্টি খেতে। এখন নিশ্চয়ই পাড়ার মানুষ খাচ্ছে। খাক। পড়ে পচে যাওয়ার থেকে মানুষ খেলে ভালো। বারোমাস সে গাছে পেয়ারা হয়। আমরা পেয়ারা খাব। দেখবেন, আপনার খুব মিষ্টি লাগবে।
আরও অনেক রকম ফুলগাছ লাগিয়েছি আমি। থোকায় থোকায় ফুল ধরে। ঘ্রাণে মো-মো করে।
আমার সাদা ফুল খুব পছন্দ। সকালে পুকুরপাড়ে চামেলি ফুল ফোটে। সেটার রং সাদা। কী যে শুভ্র লাগে তখন চামেলি ফুলকে। আমি অনেক দিন পুকুরঘাটে গিয়ে বসে থাকতাম ফুল ফোটার পর তুলে নেওয়ার জন্য। আরশী হালকা হেসে বলল,
আচ্ছা, আপনার কি ফুল পছন্দ?”
আরহামের পছন্দ টকটকে লাল গোলাপ। কিন্তু সে আরশীকে খুশি আর চমকে দেওয়ার জন্য বলল, সাদা।
“সাদা গোলাপ আমার খুব পছন্দ।”
আরশী হাসল।
“তাহলে আমরা কবে যাচ্ছি?”
“তুমি চাইলে কালই চলো।”
“খুব ভালো হবে। আমি আজই সব গুছিয়ে নেব।”
আরশী অরাইয়াকে ডাকতে ডাকতে উঠে বাইরে যায়।
আরহাম আরশীর আচরণে বড্ড অবাক হচ্ছে। আরশীর মন খুলে কথা বলায় আরহাম অনেক খুশি হয়েছে। কিন্তু আরশী এত বেশি এক্সাইটেড আর রাগ না করায় আরহামের অবাক লাগছে।
আরশীর হলো কী? আমার প্রতি এত সদয় হলো কীভাবে? ধ্যাৎ, কী সব ভাবছি!
আরশী হয়তো ডিসাইড করেছে সে আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। সবশেষে সে তো আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আরহাম ফোঁস করে দাম ছাড়ে, যাক, অবশেষে আমার জন্য আরশীর মন একটু হলেও গলেছে।
এই কয়েক মাসের চেয়ে আজ আরহাম বেশি খুশি। এত মাস পর আজ আরশী তার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলেছে। সে বিকেলে বাজারে গিয়ে টাটকা খাসির মাংস নিয়ে এসে বিরিয়ানির আয়োজন করে। সে নিজে সবকিছু গুছাতে গেলে আরশীও যায়। বলে,
“একা একা কেন করবেন? চলেন, দুজনে করি।”
অরাইয়াও সামিল হয়। সে একটু আধটু এগিয়ে দেয়—এই, সেই। সে বেশিরভাগ সময় কথা বলতে বলতে মা–বাবাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে। আরহাম হাসিমুখে মেয়ের সব কথা গিলছে, আবার উত্তরও দিচ্ছে।
পাকা অরাইয়া একবার বলে ফেলে আরশীকে,
“আজ কত ভালো লাগছে, আনন্দ লাগছে মা! তুমি আর বাবা কী সুন্দর একসাথে কথা বলছো, কাজ করছো, রান্না করছো—চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে আমার।”
আরশী হেসে ওঠে, জোরে হাসে। মেয়েকে কোলে নিয়ে চেপে চুমু খেয়ে বলে,
“পাকা বুড়ি।”
আরহাম মেয়ের দিকে খেয়াল না করে আরশীর হাসি দেখেই থমকে আছে। আরশী এমনভাবে আজ হাসছে, যেভাবে সে হানিমুনে সমুদ্রের ধারে গিয়ে হাসছিল।
কী সুন্দর সেই হাসি—যেন মুক্তা ঝরছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে মন চায়।
আরশী নিজে যেচে বিরিয়ানি রান্না করে, রেজালা বানায়, ডিমের কোরমা করে। তারপর ডাইনিংয়ে নিয়ে তিনজন খায়। গল্প করে। আরহাম মনে মনে রিল্যাক্স ফিল করে। বলে, এতদিন মৃত্যুপুরী লাগত প্রাসাদটাকে। আজ মনে হচ্ছে যেন প্রাসাদটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ইশ্! যদি বাকি দিনগুলো এভাবে কাটে, তাহলে আমার আর এ জীবনে কিছু চাওয়ার নাই। কিচ্ছু না।
রাত বাড়ে। অরাইয়া শুয়ে পড়ে। আরহাম বাইরের বড় লাইটটা জ্বালিয়ে একবার বাড়িটা দেখে রুমে আসে। দেখে রুমে ডিম লাইট জ্বালানো। সে ডাকে,
“আরশী… আরশী…”
কোনো উত্তর না পেয়ে আরহাম লাইট জ্বালায়। দেখে রুমে কোথাও আরশী নেই। সে ভয় পেয়ে উঠে। তাড়াতাড়ি ওয়াশরুম চেক করে—সেখানেও নেই। দৌড়ে বারান্দায় বের হয়। “আরশী” বলে বলে খুঁজে সারাবাড়ি। কোথাও না পেয়ে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে।
কোথায় যেতে পারে আরশী? অরাইয়াকে ডাকব?
হঠাৎ তার মনে পড়ে—সে তো নিচে ছিল, আরশী নিচ দিয়ে কোথাও গেলে সে টের পেত। তার মানে আরশী ওপরেই আছে। হয়তো রুদ্রাণীর রুমে।
সে উপরে উঠে রুদ্রাণীর রুমের সামনে গিয়ে দেখে দরজা লাগানো। আরহাম এবার সোজা ছাদে চলে যায়। জোৎস্নার আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—ছাদে থাকা সাদা বেঞ্চে বসে আছে এক মানবী।
আরহাম স্বস্তির শ্বাস ফেলে। আরশীর পায়ের কাছে গিয়ে বসে। আরশীর উরুতে মাথা রেখে বলে,
“কী এসব, আরশী? তুমি এখানে, অথচ সারাবাড়ি খুঁজে ফিরছি আমি। কতটা টেনশন হচ্ছিল আমার! আমি এতবার ডাকলাম, একবারও শুনলে না তুমি! এত রাতে এখানে কেন তুমি?”
আরশী হাত তুলে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে দেখাল।
“দেখুন, কত সুন্দর চাঁদ উঠেছে। চকচক করছে। পাশে কী সুন্দর তারারা জ্বলছে। বরাবরই চাঁদ আর তারা আমার ভীষণ পছন্দের। জানালা দিয়ে দেখলাম আজ রাতটা খুব সুন্দর। তাই লোভ সামলাতে পারলাম না—চলে এলাম।”
“আজ তো পূর্ণিমা। রাত সুন্দর তো হবেই। উফ! তুমি আমাকে বলতে পারতে। আমি তোমাকে নিয়ে আসতাম। এভাবে ভয় পাওয়ানোর মানে হয়? প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল আমার!”
আরশী মুচকি হাসে।
“আমার একা চাঁদ দেখার শখ জাগেনি। আপনার সঙ্গে এই চাঁদ বিলাস করার শখ জেগেছে।”
আরহাম কপাল কুঁচকায়।
“কিন্তু আমাকে ছাড়াই তো তুমি এসেছ।”
আরশী দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“আমি জানতাম আপনি আসবেন। তাই বলিনি। আর যদি না আসতেন, তাও ডেকে নিতাম।”
আরহাম আরশীর পাশে গিয়ে বসে।
“তোমার যে কী হয়েছে, আরশী—আমি জাস্ট কিছু বুঝতে পারছি না।”
আরশী চুপটি করে আরহামের বুকে ঢুকে পড়ে। হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে আরহামকে। আরহাম অবাক হলেও প্রকাশ করে না।
আরশী বলে,
“আমার বুক জ্বলছে দাউদাউ করে। কেন জানি না, কিন্তু জ্বলছে। আপনার বুকে বুক মিশালাম যেন সে জ্বলা ঠান্ডা হয়। আমি জানি, আমার বুক আগুন হলে আপনার বুক আমার জন্য পানি হয়ে উঠবে।”
আরহাম নিঃশ্বাস ফেলে আরশীর পিঠে এক হাত রাখে। অন্য হাত দিয়ে আরশীর চুলে হাত বুলায়। চুমু খায়। তার বুক চিনচিন করে ব্যথা করে। কেন জানি তার মনে হচ্ছে—আরশী অনেক কষ্ট জমা করে রেখেছে বুকে।
আরশী ফিসফিসিয়ে বলে,
“আপনি সবসময় আমার চুলে মাথায় হাত বুলান কেন?”
“ইচ্ছে করে, তাই করি। তোমার ভালো লাগে না?”
“খুব ভালো লাগে। নিজেকে আদুরী মনে হয়।”
আরশী আর আরহাম অনেকক্ষণ কথা বলে। আজ আরশী মন খুলে কথা বলে, আদর করে আরহামকে। তার মন আজ এমনটাই চাইছিল—তাই করেছে।
রাত বাড়লে আরশী বলে,
“কাল সকালে বের হতে হবে। এখন আমাদের শুয়ে পড়া উচিত। চলুন।”
_________
সকালে আরহাম একটু আগেভাগে উঠে পড়ে। আরশী ঘুমাচ্ছে দেখে সে ডেকে তোলে না। নিজেই নাশতা বানায়। সবকিছু রেডি করে। অরাইয়া উঠে যায়। নাশতা খেয়ে সে বাবাকে বলে,
“মা ওঠেন নি?”
“না। তোমার মায়ের শরীর খারাপ লাগছে বোধহয়। এজন্য ওঠেনি। একটু দেখো তো মা। ডাক দাও গিয়ে—জ্বর আসল কি না?”
অরাইয়া মায়ের মাথার কাছে গিয়ে ডাকে,
“মা ও মা। এত দেরি হয়েছে, উঠছো না কেন? তাড়াতাড়ি খেয়ে বের হতে হবে।”
মায়ের নড়চড় না পেয়ে অরাইয়া মায়ের কপালে হাত দেয়—জ্বর-টর হয়েছে কিনা দেখার জন্য। মায়ের কপাল ঠান্ডা দেখে সে শিউরে ওঠে। তাড়াতাড়ি হাত-পা, শরীরে হাত দেয়। বরফের মতো সব ঠান্ডা দেখে তার শরীর বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়। তার দম আটকে আসে—মায়ের হলোটা কী!
তাড়াতাড়ি শ্বাস চেক করে। নাকের ডগায় আঙুল নিয়ে দেখে—মায়ের শ্বাস চলছে না। অরাইয়ার ছোট্ট শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। সে তার কান লাগায় মায়ের বুকে—না, সেখানেও কোনো নড়াচড়া নেই।
অরাইয়া জোরে কেঁদে ওঠে,
“মা… মা…”
আরহাম লাগেজ টেনে নিচে নিয়ে যাচ্ছিল। মেয়ের কান্না শুনে লাগেজ ফেলে মেয়ের কাছে আসে। আরশী ঘুমাচ্ছে আর মেয়ে কাঁদছে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় সে। গভীর শ্বাস ফেলে অরাইয়ার কাছে আসে।
“কী হয়েছে সোনা মা? এমনভাবে কাঁদছো কেন?”
“মা… বাবা, মা…”
“মা কী?”
বলে আরহাম আরশীকে ডাকতে যায়। হিমশীতল আরশীকে দেখে এক পা পিছিয়ে যায় সে। ভয় পেয়ে বুক ধ্বক করে ওঠে। আবার আরশীর কাছে আসে। হাত-পা, শরীরের সবখানে হাত বুলিয়ে বরফ দেখে সে থরথর করে কাঁপে। শ্বাস চেক করে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
খাটের ওপর উঠে আরশীকে মাথা কোলে নিয়ে পাগলের মতো চেক করে, পালস, বুক, নাক। কোনো কিছুতেই সাড়া না পেয়ে চারপাশ ভো ভো করে ঘুরতে থাকে তার। চিৎকার করে ওঠে।
“এমনটা হতে পারে না। পারে না এমনটা হতে। আমার আরশীর কিচ্ছু হবে না। কিছু না! আরশী আমাকে ছেড়ে হুট করে চলে যেতে পারে না!
অরাইয়া মা, কী হলো তোর মায়ের? হঠাৎ কী হলো এটা?”
অরাইয়া কেঁদে ভাসাচ্ছে বুক। তারপর কান্না মুছে চোখ বন্ধ করে কী যেন মন্ত্র পড়ে সে।
আরহাম আশার আলো দেখতে পায়। অরাইয়াকে বলে,
“আমাকে যেভাবে বাঁচিয়ে তুলেছিলি, তোর মাকেও ওভাবে বাঁচিয়ে তোল মা। সে ছাড়া আমি নিঃস্ব। তাড়াতাড়ি কর মা।”
অরাইয়া অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। আরহাম ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
“কী হলো অরাইয়া? মা জেগে উঠবে তো? কখন উঠবে? বল না মা! তুই তো জানিস,তোর মা ছাড়া আমার কোনো গতি নেই। ও জেগে উঠবে তো, সোনা?”
অরাইয়া কাঁদে। মাথা ডানে-বামে করে ‘না’ বোঝায়।
আরহাম ধমকে ওঠে,
“কেন নয়? আমি তো জেগে উঠলাম!”
অরাইয়া ফুপিয়ে বলে,
“তোমাকে কেউ মেরেছিল বাবা, তাই বাঁচিয়ে তুলতে পেরেছি। মায়ের আয়ু ফুরিয়ে গেছে। মা এমনি মারা গেছেন। মা আর ফিরবেন না বাবা। আর ফিরবেন না আমার মা।”
আরহাম আরশীকে বুকে জড়ায়।
“এমনটা কেন হলো আরশী? কেন হলো? কাল রাতেই তো তুমি দিব্যি ভালো ছিলে। কত সুন্দর করে কথা বললে আমার সঙ্গে। কত খুশি হয়েছিলাম আমি। চলে যাবেই বলে কি এত সুন্দর কথা বলেছিলি? তুমি জানতে, তুমি চলে যাবে? কী স্বার্থপর তুমি! আমাকে বুঝতেও দিলে না!”
“আরশী… ও আরশী… আমার পৃথিবী… আমি বাঁচব কীভাবে? কীভাবে বেঁচে থাকব তুমিহীন, বলো? তুমি তো জানতেই, তুমি আমার প্রাণ। তাও?
একটু থেমে বলে, তোমায় কী দোষ দেব বলো আরশী? এত এত পাপ করেছি যে, পাপের ফল হয়তো পাচ্ছি আমি।”
অরাইয়া খবর পাঠায় রাজ্যে। তার দাদা-দাদি, দ্রোহান, অগ্নীমা, রাভান আসে।
আরহাম সেই সকাল থেকে আরশীকে জড়িয়ে বসে আছে। রাখছে না নিচে। প্রথমে আহাজারি করেছিল, এখন সে শান্ত। তার চোখ লাল টকটকে হয়ে আছে। এখনও চোখ বেয়ে জল পড়ছে।
দ্রোহানকে দেখে তার বাঁধ ভেঙে যায়। সে আবার কাঁদে আর বলে,
“আমার সব শেষরে ভাই। সব। আমার আরশী, আমার আরশী উড়ে চলে গেছে খাঁচা ছেড়ে। সেই আরশী, যার জন্য আমি সব ছাড়লাম। কীভাবে বাঁচব তাকে ছাড়া, বল ভাই?”
দ্রোহানের চোখে পানি টলমল করতে লাগে। তার নিজেরও অনেক টান ছিল আরশীর প্রতি, একদম বোনের মতো ভালোবাসতো সে আরশীকে। তার হুট করে চলে যাওয়া তাকেও যন্ত্রণা দিচ্ছে।
অগ্নীমা উপরে উঠে গিয়ে আরহামকে বলে,
“তুমি সরো। আরশীকে আমার কাছে দাও। তাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা তো করতে হবে।”
আরহাম চেঁচিয়ে ওঠে,
“কারও কাছে দেব না আমার আরশীকে! সরো তোমরা!”
রানী আরহামের কাঁধে হাত দিয়ে নরম সুরে বলেন,
“এমনিতেই তিন-চার ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। তাকে তো আর রাখা যাবে না। তার ধর্ম অনুযায়ী তাকে মাটি দিতে হবে। এমন ছেলেমানুষী করলে হবে না, কায়ান। তুমি যথেষ্ট বড় আর বুদ্ধিমান। বাচ্চা মেয়েটা মায়ের জন্য কেঁদে অস্থির। তোমার উচিত অরাইয়াকে সামলানো। এভাবে তোমার ভেঙে পড়া শোভা পায় না।”
“আপনি আমার অবস্থা বুঝবেন না মা। আমি আরশীকে কতটা ভালোবাসি, তা বোঝার সাধ্য সবার নেই। আমি আমার বউয়ের জন্য কত কিছু করেছি—তার সাক্ষী এই দ্রোহান মা। তাকে জিজ্ঞেস করে দেখো। আমি আরশীকে কোথাও যেতে দেব না। সে আমার বুকেই থাকবে।”
“এবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে কায়ান,” রাজা বলে ওঠেন। লাশ বেশিক্ষণ রাখলে পচে যাবে। তুমি মেয়েটাকে কবর দিতে দাও।”
সবাই বুঝাতে থাকে আরহামকে। আরহাম কারও কথা শোনে না। সবশেষে অরাইয়া বাবাকে টেনে তোলে। আরশীকে সরায় বুক থেকে। বাবাকে বোঝায়। বলে,
“তুমি বউ হারিয়েছ বাবা। আমি আমার মা হারিয়েছি। আমি এতিম হয়ে গেছি। আমাদের দুজনের দুঃখ একই। পাহাড়সম, কিংবা তার চেয়েও বেশি। কিন্তু বাস্তব মেনে নিতে হবে বাবা। মাকে শায়িত করতে হবে, নয়তো মায়ের আত্মা শান্তি পাবে না। তোমাকে অভিশাপ দেবে।”
শেষে আরহাম সবাইকে বলে,
“আরশীকে এই ঘরের মধ্যেই কবর দিতে হবে। ও সবসময় আমার পাশে থাকবে, আমার চোখের সামনে।”
তার কথা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। কীভাবে লাশকে ঘরে কবর দেবে! এসব কী বলছে আরহাম?
তারা কেউ মানতে নারাজ।
আরহাম তার কথায় অটল। আরশীকে ঘরে শায়িত না করলে সে আরশীকে কোথাও নিয়ে যেতে দেবে না।
অরাইয়া ভেবে-চিন্তে বাবাকে সমর্থন করে। সে সবাইকে বলে,
“আমার বাবা যেমনটা চাইছেন, তেমনটাই হোক।”
ফ্লোর ভেঙে কবর খোঁড়া হলো মেঝেতেই। আরশীকে শায়িত করার আগে আরহাম আরশীর মুখে বারবার হাত বুলায়। ঝুঁকে চুমু খায় আর ফিসফিস করে বলে,
“বড্ড স্বার্থপর তুমি। তোমাকে কষ্ট দিয়েছিলাম বলে তুমি আমাকে এত বড় শাস্তি দিলে। যে শাস্তি সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে আমার। নির্মম যন্ত্রণায় কাটবে আমার বাকি জীবনের প্রতিটি রাত আর দিন।”
তারপর আরশীর কানে কানে বলে,
“এ জীবনের সব দুঃখ চুকিয়ে দিতে পরজন্মে আবার এসো—আমার হয়ে। আর থেকে যেও আজীবনের জন্য।”
আরশীকে সে নিজেই কবরে নামায়। কোনো পুরুষকে ধরতে দেয় না। ঠোঁট চেপে কান্না আটকে কবর দেওয়া কমপ্লিট করে।
অরাইয়া গালে হাত দিয়ে বসে থাকে কবরপাড়ে। বাকিরা বসে আছে খাটে। অরাইয়াকে দেখে আরহামের ভীষণ দুঃখ লাগে। সে এখনই নিজের জান নিয়ে নিত, যদি অরাইয়া না থাকত। মা-বাবা ছাড়া মেয়েটা কঠিন এই পৃথিবীতে বাঁচবে কীভাবে! কত ঝড়-ঝাপটা আসবে তার ওপর। কে সামাল দেবে সব!
এইসব ভেবে সে অন্য ডিসিশন নেয়নি।
সে এগিয়ে গিয়ে অরাইয়াকে কোলে তুলে নেয়। অরাইয়া বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা কাত করে রাখে। ফুপিয়ে কাঁদে আর বলে,
“আর মা আসবে না তাই না বাবা? যতদিন বেঁচে থাকব, আর কোনোদিন মাকে দেখতে পাব না? মায়ের এত শূন্যতা আমরা সইতে পারব তো বাবা? মায়ের ঠিকঠাক আদরও পেলাম না আমি। এইটুকুন আমাকে রেখে মা চলে গেলেন।”
মেয়ের প্রতিটা কথা আরহামের বুকে ছুরির মতো বিধছে। সে মেয়েকে কীভাবে সান্ত্বনা দেবে আর নিজেকে কীভাবে সামলে রাখবে—বুঝতে পারছে না। নিজেকে সামলে কণ্ঠে জোর এনে বলে,
“বাবা আছি তো। ভেঙে পড়ো না মা। বাবা অনেক ভালোবাসে তোমায়, আর বাসবেও। তোমার সব বিপদ-আপদে বাবা পাশে দাঁড়াবে। কোনো চিন্তা নাই তোমার।”
বাবা-মেয়ের এমন মুহূর্ত দেখে উপস্থিত সবার চোখে টলমল করে পানি। অগ্নীমা তো কেঁদেই ফেলে। সে এগিয়ে গিয়ে অরাইয়াকে কোলে নেয়। চোখ মুছে দিয়ে বলে,
“এত ভেঙে পড়ো না অরাইয়া। আমি তোমার আসল মা না হতে পারি, কিন্তু আমাকে মা ডাকতে পারো।”
দাদি এগিয়ে বলেন,
“আমরা সবাই আছি সোনা। তুমি মন খারাপ কোরো না। কেঁদো না।”
রাজা-রানীসহ সবাই রাতে চলে যায়। যাওয়ার আগে বারবার বলে আরহাম আর অরাইয়া যেন তাদের সঙ্গে রাজ্যে চলে যায়। এখানে থাকলে দুঃখ বেশি পাবে। কিন্তু বাবা-মেয়ে কেউই যেতে চায় না। দুজনের এক কথা—তারা আরশীর সামনে থাকবে, দূরে যাবে না।
রাত গভীর হলে অরাইয়া ঘুমিয়ে পড়ে। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আরহাম চুমু খায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কবরপাশে গিয়ে বসে। মেয়ের জন্য সে শান্ত থাকলেও এখন বুক ফেটে যায়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। নিজের মনে অনেক অনেক কথা বলে।
এভাবে দুঃখে দিন কাটতে থাকে আরহাম আর অরাইয়ার। আরহাম মেয়ের সঙ্গে কথা বলে, হাসে, গল্প করে—মেয়েকে দেখায় সে খুশি আছে। যাতে মেয়ে দুর্বল না হয়, মাকে বেশি মিস না করে, না কাঁদে। কিন্তু বাবা-মেয়ে দুজনেই একজনের আড়ালে আরেকজন চোখের জল ফেলে আরশীর জন্য।
প্রতি রাতে অরাইয়া ঘুমিয়ে গেলে চুপচাপ বসে থাকে আরহাম আরশীর কবরপাড়ে। কল্পনায় এমনভাবে কথা কয়, যেন মনে হয় আরশী তার পাশে বসে আছে। সারাদিন কি ঘটেছে কি হয়েছে, মেয়ে কি করেছে, কি বলেছে সব গল্প করে সে অরাইয়ার সাথে। সে আরশীকে ছাড়া কেমন আছে, কীভাবে কষ্টে দিন যাচ্ছে, এটাও বলতে ভুলে না সে। সবকিছু বলে সে আরশীর কবরের উপর হাত রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, তুমি আছো তো? আমি জানি তুমি আমার সব কথা শুনছো? শুনছো তো? নিশ্চয় শুনছো।
অরাইয়া অনেক রাত বাবাকে এভাবে কবরপাড়ে থাকতে দেখে। সে বাবাকে বুঝতে দেয় না যে সে দেখছে। বরং তখন তার মাকে খুব মনে পড়ে। তার বুক ভেঙে যায়। বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে সে, যেন বাবা শুনতে না পান।
আরহাম যে শুধু আরশীর কবরপাড়ে বসে থাকে, এমনটা নয়। আরশী চাঁদ-জোছনা রাত পছন্দ করত। এখনও যেদিন রাত আলোকিত থাকে, আরহাম ছাদে গিয়ে বসে—আরশীর স্মৃতিচারণ করে। বাবা-মেয়ে দুজন মিলে পেছনের জানালা খুলে দেয়। জানালা দিয়ে অপার্থিব সুন্দর জোছনা আরশীর কবরে এসে পড়ে। তারা সবাই একসঙ্গে জোছনা বিলাস করে।
_________
ভালোবাসা মানে সবসময় পাশে থাকা নয়৷ ভালোবাসা মানে কখনও কখনও ভালোবাসার মানুষটার অভাব নিয়েই বেঁচে থাকা।
আরশী নেই তবু সে আছে__ প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্তে, বৃষ্টির দিনে, রোদের দিনে, চাঁদনী রাতে,
আরহাম আর অরাইয়ার জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে। আরহাম অরাইয়া যেমন আরশীকে মিস করে, আরশীও হয়তো তাদেরকে খুব খুব মিস করে। প্রাসাদ ঘুমিয়ে পড়লে সে ও হয়তো ঘুরতে বের হয়। মেয়ে আর বরের শিয়রে বসে। অপলক চোখে তাদেরকে দেখে। হাওয়ায় হাত বুলিয়ে দেয়। চুমু খায়। তার ও হয়তো তীব্র ইচ্ছে করে, তাদেরকে স্ব শরীরে ছুয়ে দিতে, তাদের সাথে একসাথে বাঁচতে। কিন্তু সেট তো আর সম্ভব নয়।
সময় কাউকে ফেরায় না, ক্ষত ও মুছে যায় না। তবু সময় মানুষকে বাঁচতে শেখায়। আরশীর শূন্যতা নিয়েই আরহাম অরাইয়া হয়তো ধীরে ধীরে সামনে এগুবে।
সমাপ্ত|
