Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"তুই আমার শেষ ক্ষুধাতুই আমার শেষ ক্ষুধা পর্ব-২৭+২৮

তুই আমার শেষ ক্ষুধা পর্ব-২৭+২৮

#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্টিক)
#শারমিন_প্রিয়া

২৭.

ভোরে আরহামরা রাক্ষস রাজ্যের সীমানায় এসে দাঁড়ায়। এটা কোনো সাধারণ রাজ্য নয়। ভয়ংকর এক রাজ্য। কালো ছায়ায় ভরা। দূর থেকে তাকালেই বোঝা যায়, এখানের আকাশ অস্বাভাবিকভাবে নিচু হয়ে ঝুলে আছে। কালচে মেঘ ঘন হয়ে পাক খাচ্ছে, যেন রাজ্যের মাথার ওপর চেপে বসেছে অশুভ কোনো পূর্বাভাস। বাতাসে রক্তের গন্ধ। রাজ্যের চারপাশে আগুন আর প্রাচীন শক্তির মিশ্রণে উঁচু পাথরের প্রাচীর, যেগুলোতে সময়ের সঙ্গে জমে থাকা কালো শিরা যেন শিরদাঁড়ার মতো ছড়িয়ে আছে। প্রাচীরের ফাঁকে ফাঁকে জ্বলছে নীলাভ আগুন—রাক্ষস রাজ্যের প্রহরী আগুন। এ রাজ্যে শত্রু ঢুকলেই আগুনের রং পরিবর্তন হয়ে যায়।

রাক্ষস রাজ্যের মেইন ফটক পার হয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়—প্রাসাদ চত্বর। সে চত্বর অস্বাভাবিকভাবে নীরব। সাধারণ দিনে যেখানে রাক্ষসদের গর্জন, অস্ত্রের ঝনঝন আর পদচারণার শব্দে রাজ্য মুখর থাকে, সেখানে আজ কেবল চাপা ফিসফিসানি। আকাশের দিকে তাকালেই বোঝা যায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা। আকাশজুড়ে ভাসছে রক্তলাল চিহ্ন, যুদ্ধের আহ্বান। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আগুন জ্বলছে। কোথাও ধোঁয়া উঠছে, কোথাও চিৎকার। রাজা যে পতনের পথে, পরিস্থিতি দেখেই বুজা যাচ্ছে।

রাক্ষস রাজ্যে যখনই রাজা দুর্বল হয়, রাজ্য নিজেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। আনুগত্য আর ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। প্রাচীন বংশগুলো অস্ত্র তোলে, সেনারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। আজ সেই দিন।

আরহাম চারপাশ একবার গভীরভাবে দেখে নেয়। তার চোখে কোনো ভয় নেই। আছে রাজ্য জেতার অদম্য সাহস।

সে হঠাৎ থেমে যায়। রাজ্যের কারও মন-মেজাজ ঠিক নেই এখন। বাবা আছেন ক্রুদ্ধ হয়ে। এই রাজ্যের অন্দরমহলে আরশী, নজরুল আর অরাইয়াকে নিয়ে যাওয়া মানে তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।

আরহাম নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান নিয়ে মন্ত্র পড়তে শুরু করে। চারপাশের বাতাস ঘুরে দাঁড়ায়। পায়ের নিচের মাটি কাঁপতে থাকে। অগ্নীমা, দ্রোহান আর রাভান বুঝে যায়—সর্দার নিরাপত্তার মন্ত্র পড়ছে। কিছুক্ষণ পর একটা কালো-রুপালি আলো মাটির ওপর গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

আরশী আঁতকে ওঠে।

“কী করছেন?”

আরহাম শান্ত স্বরে বলে,

“তোমাদের রাজ্যে নেওয়া যাবে না। এখানে গেলে কেউই বাঁচবে না।”

আলোটা ঘন হতে থাকে। চারপাশের দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যায়।

চোখের পলকে তারা এসে দাঁড়ায় এক ভিন্ন জায়গায়। মূলত এটা রাজ্যের ভেতরেই, কিন্তু সবার চোখের থেকে অদৃশ্য থাকবে তারা। চারপাশে পাহাড়ঘেরা এক উপত্যকা। উপরের দিকে পাথরের ছাদ, নিচে সবুজ মাটি। মাটির চারপাশে প্রাচীন চিহ্ন খোদাই করা। সেগুলো ক্ষীণ আলোয় জ্বলজ্বল করছে। এটা সেইফ জোন। এখানে ঢুকতে হলে রাজার রক্ত, বিশেষ শক্তিশালী কারও নির্দেশ বা উত্তরাধিকারীর আত্মা লাগে।

আরহাম মন্ত্র শেষ করে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে আরশীকে বলে,

“এখানে তোমরা নিরাপদ। যতক্ষণ না আমি ফিরে আসছি, কেউ তোমাদের ছুঁতেও পারবে না।”

অরাইয়াকে কোলে নিয়ে আরহাম একটু আদর করে দেয়। বুকের কাছে মুখ ডুবিয়ে মনে মনে বলে, বাবা বেঁচে থাকলে তোমাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে। আর যদি না ফিরি, তুমি তোমার মাকে দেখে রেখো। আমি জানি, আমার চেয়েও তুমি বেশি শক্তিশালী। তোমার শক্তি শীঘ্রই জেগে উঠবে।

অরাইয়া বাবার চুল টেনে ধরে। আরহাম মেয়েকে আরশীর কোলে তুলে দিয়ে রওয়ানা হয়। থেমে পেছন ফিরে আরশীর দিকে এক পলক তাকায়। চোখে অনেক কথা জমা থাকলেও মুখে কিছু বলে না।

আরহাম ঘুরে দাঁড়ায়। রাভান, দ্রোহান আর অগ্নীমাকে নিয়ে ভেতরে ঢোকে।

রাক্ষস রাজ্যের মূল প্রাসাদের সামনে পা রাখতেই যুদ্ধের গর্জন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আকাশ ফেটে যেন আগুন ঝরে পড়ছে। কালো মেঘের ভেতর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে রক্তলাল রঙে। চারদিকে ছড়িয়ে আছে পোড়া মাটির গন্ধ, রক্ত আর ক্রোধের ভারী নিশ্বাস। প্রাসাদের উঁচু মিনারগুলোয় আগুন জ্বলছে।

আরহাম এগিয়ে যায়। তার উপস্থিতি টের পেতেই রাক্ষস সেনাদের মধ্যে ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলে,

“শক্তিশালী রাক্ষস ফিরে এসেছে।”

কেউ বলে, “রাজার বড় ছেলে।”

কেউ বলে, “যে মানুষকে বিয়ে করেছে।”

কেউ বিস্মিত, কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ আশাবাদী। আরহাম সেসব কানে তোলে না। ঠিক তখনই প্রাসাদের ভেতর থেকে বজ্রকণ্ঠ ভেসে আসে—

“আরহাম!”

সিংহাসন কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, রাজা কালো পাথরের সিংহাসনে বসে আছেন। একসময়ের ভয়ংকর, অপ্রতিরোধ্য শাসক, আজ তার চোখে ক্লান্তি, কণ্ঠে চাপা রাগ। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রাণী, মলিন মুখে।

রাজা উঠে দাঁড়ান।

“এতদিন পর ফিরেছ? যখন রাজ্য আগুনে পুড়ছে?”

আরহাম মাথা নিচু করে না। সোজা চোখে তাকায়।বলে, “আমার রাজ্য। রাজ্য আমার রক্ত। আগুনে পুড়লে আমাকেই তো ফিরতে হতো।”

আরহামের এই এক লাইনে সভাকক্ষ স্তব্ধ হয়ে যায়। রাণী এগিয়ে আসেন। আরহামের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলেন,

“তুমি কি জানো, তোমার অনুপস্থিতিতে কী হয়েছে?”

আরহাম সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়,

“জানি। ক্ষমতার লড়াই, বিশ্বাসঘাতকতা, যুদ্ধ।”

রাজা হেসে ওঠেন। কঠিন, ব্যঙ্গাত্মক সেই হাসি। বলেন, “যুদ্ধ তোমার জন্য নয়, ছেলে। তুমি তো মানুষী ভালোবাসায় বন্দি।”

আরহাম কিছু বলতে যাবে—ঠিক তখনই দুর্গের বাইরে বিকট শব্দ হয়।

বাহিরের রক্ষীদের চিৎকার ভেসে আসে—

“আক্রমণ শুরু হয়েছে! আক্রমণ শুরু হয়েছে!”

বিদ্রোহী রাক্ষস গোষ্ঠী প্রাসাদের দক্ষিণ ফটক ভেঙে ঢুকে পড়ে। আগুন, অস্ত্র, মন্ত্র—সব একসাথে শুরু হয়।

আরহাম আর এক সেকেন্ডও দেরি করে না।

সে সামনে এগিয়ে যায়। তার কণ্ঠ গর্জে ওঠে—

“রাক্ষস রাজ্যের যারা এখনো বেঁচে থাকতে চাও, আমার পেছনে এসো!”

তার শরীর থেকে কালো-রুপালি শক্তি ছড়িয়ে পড়ে। মাটিতে আঁকা প্রাচীন চিহ্নগুলো জ্বলে ওঠে। তার চোখ রক্তলাল আকার ধারণ করে গভীর কালো হয়ে ওঠে।

বাহিরে বের হতেই শত্রুরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কায়ান রাত্রেশসহ তার যোদ্ধাদের উপর। কায়ান পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। কায়ান একাই একশোজনকে ছিটকে ফেলে। তার প্রতিটি আঘাতে মাটি কেঁপে ওঠে। দ্রোহান রাভানসহ আরও শক্তিশালী সেনারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছে।

রাজা, যিনি কায়ান রাত্রেশের বাবা, তিনি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। ভাবেন, ও যদি না ফিরতো, তবে রাজ্য রসাতলে ডুবতো। ওই আমার যোগ্য উত্তরাধিকারী।

ছেলের যুদ্ধকৌশল দেখে রাণীর চোখ ভিজে ওঠে। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে ফিসফিস করে বলেন, “আমার ছেলে…”

যুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, বিদ্রোহী দলের প্রধান রাজাকে (কায়ানের বাবাকে) লক্ষ্য করে লোহার শক্তিশালী অস্ত্র ছুড়ে দেয়। কায়ান মুহূর্তে বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়। অস্ত্র তার বুকে লাগে। সবাই এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।

কায়ান রাত্রেশ নিজেকে সামলে আবার দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে তার সহযোদ্ধারাও উঠে দাঁড়ায়। শক্তি পায়।

কায়ান দাঁড়িয়ে গর্জে ওঠে, “রাজা পতনের পথে নয়—যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি। ভুলেও আমার বাবাকে আক্রমণ করার কথা ভেবো না।”

সে তুমুল ক্রোধে আবার যুদ্ধ করতে শুরু করে। এবার সে সহ তার অনেক সহযোদ্ধা আঘাত পায়। পরপর আঘাত লাগে তাদের, হাতে, বুকে, মাথায়। রক্ত গলগল করে পড়ে। দ্রোহান চিৎকার করে বলে, “সর্দার, আপনি বিশ্রাম নিন। আমরা দেখে নেব শত্রুপক্ষকে।”

আরহাম হাসে। জোর গলায় বলে, “এই কায়ান এত সহজে হেরে যাওয়ার পাত্র নয়। সব ধ্বংস করে তবেই এ কায়ান থামবে।”

কায়ান এবার সমস্ত শক্তি দিয়ে আক্রমণ শুরু করে। ধীরে ধীরে শত্রুপক্ষের বেশিরভাগ রাক্ষস ঘায়েল হয়ে পড়ে। কায়ান কৌশলে বাকিদেরও কাবু করে ফেলে। এই অবস্থা দেখে শত্রুপক্ষের বিদ্রোহীদের অনেকেই পালাতে শুরু করে, আত্মসমর্পণ করে। শত্রুপক্ষরা যখন ব্যর্থ হয়ে নিজেদের হার মেনে নেয়, আত্মসমর্পণ করে নেয়, তখন যুদ্ধ থেমে যায়।

রাজা ধীরে ধীরে সিংহাসনে বসেন। ভারী কণ্ঠে কায়ান রাত্রেশকে বলেন,

“আজ তুমি প্রমাণ করেছ—তুমি শুধু আমার ছেলে নও… তুমি এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ।”

রাণী এগিয়ে এসে কায়ানের কপালে হাত রাখেন।

“তুমি যাকে ভালোবাসো, সে মানুষ হোক বা রাক্ষস, আমরা মেনে নেব।”

এ কথা বলে তিনি রাজার দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমি আশা করছি, আপনিও আমার কথায় একমত হবেন।”

আরহাম এতটা আশা করেনি। সে গভীর হয়ে বাবার কথার অপেক্ষায় থাকে।

কিছুক্ষণ পর বাবা গম্ভীর গলায় বলেন, “যেহেতু তুমি আমার ছেলে, তোমার হাতে রাজ্য সেফ। যদিও রাক্ষস-মানুষ বিয়ে নিয়মনীতির বাইরে। তাছাড়া শুনেছি, আমার নাকি বংশধরও এসেছে—তোমার রক্ত। সেও রাক্ষস হবে। সবদিক বিবেচনা করে আমি মেনে নিলাম তোমার বিয়ে। তুমি তাদের রাজ্যে নিয়ে এসো। সবাই একসাথে থাকব।”

আরহাম উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। এ যেন স্বপ্নের মতো কথা—অবাস্তবিক। এটা সে কল্পনাতেও ভাবেনি। সে বাবার পা জোড়া ধরে মাথা নত করে বলে,

“আপনি মহান বাবা। আপনি মহান। আপনি আমার আরশীকে মেনে নিয়েছেন। আমি আপনার জন্য, আপনার রাজ্যের জন্য জান দিতে প্রস্তুত।”

“ওর বাবা কি এখনও বেঁচে আছে?”

কায়ান চমকে ওঠে বাবার প্রশ্নে। কপাল বেয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। সে হাতের তালু দিয়ে মুছে মাথা কাত করে বলে, “আছে বাবা। তার আপন বলতে শুধু তার বাবা-ই বেঁচে আছে।”

“তুমি তাকে মেরে ফেলোনি কেন? তুমি জানো না? সে আমার বাবার খুনি!”

রাজার হুংকারে রাজ্য কেঁপে ওঠে।

“তাকে ক্ষমা করে দেওয়া যায় না, বাবা?”

“খামোশ কায়ান। আরশীকে ভালোবাসো বলে তোমার দিক বিবেচনা করে তাকে মেনে নিয়েছি। তাই বলে যে আমার বাবাকে খুন করেছে, তাকে তো আর ছেড়ে দিতে পারি না। আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে না। এটা নিয়মের ঊর্ধ্বে। তুমি আরশীর বাবাকে যদি মেরে ফেলতে পারো, তবেই আরশীকে নিয়ে রাজ্যে ঢুকতে পারবে। নয়তো তোমার স্ত্রী জীবিত থাকবে না।”

কায়ান আঁতকে ওঠে। “এ কেমন শর্ত, বাবা?”

“আমি আমার কথা বলে দিয়েছি। এক কথা দু’বার বলি না আমি।”

আরহাম পড়ে মহা বিপাকে। সে নজরুলকে সবসময় মারতে চাইতো। কিন্তু রুদ্রাণী মারা যাওয়ার পর আরশীর পরিবর্তন দেখে সে সিদ্ধান্ত পাল্টায়। ভাবে—নজরুলকে মেরে ফেললে আরশী পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু বাবা এ কী শর্ত দিলেন! নজরুলের জন্য আরশীকে সে কমপ্রোমাইজ করবে না। আরশীকে হারাতে পারবে না। আরশী তাকে ঘৃণা করুক, পাগল হোক—তবু আরশী তার চোখের সামনে থাকলেই শান্তি।

কায়ান চোখের ইশারা করে রাভানকে। আরশীকে সেফ রাখার গুহার মন্ত্র শিখিয়ে দিয়ে বলে, “আরশীর বাবাকে মেরে বাবার সামনে নিয়ে এসো।”

রাভান সেই আদেশে তখনই গুহায় চলে যায়। ফিরে আসে আরশীর বাবার রক্তাক্ত শরীর নিয়ে। রাজা খুশি হয়ে কায়ানকে বলেন, “তোমার, তোমার স্ত্রী আর মেয়ের জন্য আমার রাজ্য উন্মুক্ত।”

________

অরাইয়া গভীর ঘুমে। তার নিঃশ্বাস চলছে। আরশী পাশে বসে আছে, চোখ-মুখ পাথরের মতো শক্ত তার। সে গভীর ঘুমে ছিল। একটু আগে উঠে বাবাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে হন্যে হয়ে গিয়েছিল। শেষ মাথায় গিয়ে বেশ জায়গা জুড়ে লাল রক্ত দেখে সে চিৎকার করে উঠছিল। কোথাও বাবাকে খুঁজে না পেয়ে সে বুঝে গিয়েছিল—বাবাকে কেউ সরিয়েছে। এই গুহা তো আরহাম নিজেই বন্দি করেছিল। সে ছাড়া কেউ ঢুকতে পারবে না। তার মানে বাবাকে সে সরিয়েছে। হয়তো মায়ের মতো মেরে ফেলেছে। একটু পর আসবে আমাকে মারতে।

না, না, সেটা হতে দেওয়া যাবে না।

সে উঠে গিয়ে মায়ের বাক্সটা খুঁজে বের করে। বই পড়ে বের করে, শক্তিশালী রাক্ষসকে কীভাবে ঘায়েল করা যায়। সে সেই অস্ত্রটা হাতে তুলে নেয়—যেটা দিয়ে দুর্বল অবস্থায় আঘাত করলে রাক্ষসও বাঁচে না। অস্ত্রটা বারবার নেড়েচেড়ে দেখে।

চোখ বন্ধ করে শ্বাস নেয়। এই মুহূর্তে তার কান্না করা উচিত, কিন্তু কান্না আসছে না। রাক্ষসটা অবশেষে তার সবাইকে মেরে ফেলল। সেই রাক্ষস তার বংশ নিশ্চিহ্ন করে দিল, যাকে সে মানুষ ভেবে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল। এই বিশাল জনবহুল রাজ্যে মানুষ হিসেবে এখন শুধু সে-ই বেঁচে আছে। তার প্রাণ হাতের মুঠোয়, যখন-তখন উড়ে যেতে পারে।

রুদ্রাণী আর নজরুলের রক্তে ভেজা, নিথর দেহ মুখ বারবার ভেসে ওঠে আরশীর চোখের সামনে। আর তার জন্য দায়ী একজনই—আরহাম।

আরশীর বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। সে নিভাতে পারছে না। সে আগুন কেবল এক পথেই নিভবে, যখন সে নিজ হাতে আরহামের প্রাণ কেড়ে নেবে।

হঠাৎ তুমুল বাতাসে কেঁপে ওঠে গুহা। আরহাম এসে দাঁড়ায়। আরশী উঠে দাঁড়ায়। আরহামের শরীরে এখনও যুদ্ধের চিহ্ন, অসংখ্য ক্ষত, রক্তে জবুথবু সে। তবু তার মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে একরাশ উজ্জ্বলতা। সে আরশীকে দেখেই হাঁপাতে হাঁপাতে হেসে ওঠে। ডাকে, “আরশী…”

একটু থেমে শ্বাস নিয়ে বলে,

“আমি জিতে গেছি, আরশী। আমরা জিতে গেছি। আমার রাজ্য জিতে গেছে।”

আরহামের কণ্ঠে শিশুসুলভ আনন্দ, যেন সে পৃথিবী জয় করে দৌড়ে এসেছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার কাছে।

আরশী একবিন্দুও নড়ে না। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আরহাম এগিয়ে আসে আরও কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আরশীর পায়ের সামনে। তার ক্লান্ত শরীরটা কাঁপছে। আরহামের এমন ক্লান্ত শরীর আরশী আগে কখনও দেখেনি। তার মানে রাক্ষসটা ভয়ংকরভাবে দুর্বল এখন। আরশী ঢোক গিলে।

এই মুহূর্তটার জন্যই আরশী অপেক্ষা করছিল, এই দুর্বল মুহূর্তের জন্য। সে এক পা এগিয়ে আসে।

আরহামের ভেতর খুশিতে ভরে ওঠে। ভেবে নেয়—হয়তো অবশেষে আরশী মেনে নিয়েছে তাকে। আরশী আরহামকে ধরে তুলে আরহামকে চমকে দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

আরহামের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে হাসে। ভাবে, হয়তো এটাই ভালোবাসা। একবার কাউকে ভালোবাসলে তার কাছে ফিরতেই হয়, ফিরতে বাধ্য। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে,

“আমি জানতাম… আমি জানতাম আরশী, তুমি আমাকে আবার আগের মতো গ্রহণ করবে। আমার থেকে দূরে থাকতেই পারবে না।”

আরহামের সব ভাবনা দূর করে, ঠিক তখনই আরশী লোহার যাদুর ছুরি দিয়ে আঘাত বসিয়ে দেয় আরহামকে। ছুরিটা সোজা ঢুকে যায় আরহামের পেটে। আরহাম ছিটকে সরে।

আরশী এক কোপ দিয়ে বলে, “এটা আমার দু’মায়ের জন্য।”

আরেক কোপ দিয়ে বলে, “এটা আমার ভাঙা জীবনের জন্য।”

“এটা আমার বাবার জন্য। আমি জানি, আমার বাবাকে তুমি মেরে ফেলেছ।”

আরেকটা কোপ দিয়ে বলে, “এটা আমার বংশ নিশ্চিহ্ন করার জন্য।”

এভাবে পরপর কোপ বসায় আরশী।

আরহামের কালো রক্ত ছিটকে পড়ে আরশীর হাতে, কাপড়ে, মাটিতে।

আরহামের মুখে কোনো আর্তচিৎকার নেই। সে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আরশীর দিকে।

ভাবে, আরশী তাহলে অভিনয় করেছিল…আমার উপর এত রাগ জমা ছিল তার।

আরহাম হাসে। আরশী আবার কোপ বসাতে গেলে আরহাম তার হাত ধরে ফেলে। রক্তভেজা ঠোঁটে ফিসফিস করে বলে,

“এই হাত দিয়েই তো তুমি আমাকে প্রথম জড়িয়ে ধরেছিলে, আরশী। সেই হাত দিয়ে কীভাবে আমাকে আঘাত করছো? হাত কাঁপছে না তোমার?”

“না, কাঁপছে না। আপনি একজন খুনি। আমার মা-বাবার খুনি। আমার বাবাকে এখন কেন শেষ করে দিলেন? কেন?”

“সব করলেও তোমাকে ভালোবাসা তো বন্ধ করিনি, আরশী।”

“চুপ। একদম চুপ।”

আরশী আবার কোপ বসাতে গেলে আরহাম হাত তুলে বলে, “থাম, আরশী। আরেকটা কোপ বসানোর আগে একটা কথা শোনো। তুমি ঠিকই করেছ। তোমার জায়গায় আমি থাকলে আমিও হয়তো করতাম।”

রক্ত উঠে আসে আরহামের মুখে। সে হাসার চেষ্টা করে। “কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আমি কখনও তোমাকে খেতে বা মেরে ফেলতে চাইনি আরশী। কখনও ব্যবহার করিনি। কখনও মিথ্যে ভালোবাসিনি। জানো, আরশী? যে রাতে তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম, আমি তখন রাজ্য ভুলে গিয়েছিলাম। সিংহাসন ভুলে গিয়েছিলাম। নিজেকেও ভুলে গিয়েছিলাম। তোমাকেই আমার সমস্ত পৃথিবী ভেবে নিয়েছিলাম…।”

আরশীর চোখ জ্বলে ওঠে। সে চিৎকার করে বলে, “চুপ করো! আমাকে দুর্বল করার চেষ্টা করো না।”

কাঁপা আঙ্গুল দিয়ে ঘুমন্ত অরাইয়ার দিকে ইশারা করে আরহাম বলে,

“ওকে কখনও ঘৃণা করো না, আরশী। ও রাক্ষস হলেও তোমার মেয়ে।”

আরহাম কষ্টে ঠোট কামড়ে বলে, “জানো? তোমাকে বিয়ে করার বিনিময়ে আমার আয়ু এমনিতেই কমে যাচ্ছিল। আমি মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তোমাকে চেয়েছি, সংসার করেছি, ভালোবেসেছি। জীবনের পরোয়া করিনি। এখন যখন তুমি নিজেই আমাকে মেরে ফেলতে চাও—আমি বাধা দেব না। তোমার ইচ্ছে পূরণ হোক। আমি তোমার হাতে মরলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব। তুমি যদি সত্যিই আমার মৃত্যু চাও, তাহলে এখানে আঘাত করো। আরহাম নিজের বুকের বা পাশ চেপে ধরে আরশীকে দেখায়– এইখানে।

আরশী ছুরি নিয়ে আসে আরহামের বুকের পাশে। আরশীর হাত কাঁপছে দেখে আরহাম হাসে।সে আরশীর হাত এক টানে নিয়ে এসে ছুরিটা ঢুকিয়ে দেয় নিজের বুকে। বুকের পাঁজর ভেদ করে ছুরিটা পিঠ দিয়ে বের হয়। আরহাম বমি করে ওঠে—রক্ত বমি। রক্তে নদী বয়ে যায়। চোখ বুজে আসে তার।

আরশী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

আরহাম থু করে একদলা রক্ত ফেলে। রক্তমাখা ঠোঁটে ফিসফিস করে বলে,

“এই জীবনে যদি কোনো সৎ কাজ করে থাকি—তা শুধু একটাই, তোমাকে ভালোবাসা।”

আরহাম বুজতে পারে সে ধীরে ধীরে শক্তি হারাচ্ছে। এ জীবনে সে এরকম দূর্বল আগে হয়নি। এসব নিখুঁত অস্ত্র আরশী পেলো কোথায়। নিশ্চিয়ই রুদ্রাণী দিয়ে গেছে। রুদ্রাণীর বাবার এসব অস্ত্র ছিলো।

আরহাম শরীরের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে পারছে না। সে ঢলে পড়ে মাটিতে। হাত বাড়িয়ে শেষবারের মতো আরশীর হাত ধরে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলে,

“য…দি, যদি আরেকটা জীবন পেতাম…

তবে তোমাকেই ভালোবাসতাম।”

একটু থামে আরহাম। শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার। বুক ওঠানামা করে। সে বলে, “যদি আবার পৃথিবীতে আসতে পারতাম, তবে, এই রক্ত, এই পাপ, এই অভিশাপ, সবকিছুর পরেও আমি আবার তোমাকেই বেছে নিতাম।”

চোখের কোণে জ্বল জমে উঠে আরহামের, সে হাসার চেষ্টা করে, “জানো আরশী? তোমাকে ভালোবাসা আমার কোনো ভুল ছিল না আরশী। ভুল ছিল শুধু, আমি রাক্ষস হয়ে জন্মেছি।”

আরহামের হাতটা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হতে থাকে। আঙ্গুলের চাপ আলগা হয়ে যায়।

আরহামের শরীর একবার মাটি কাঁপিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে শান্ত হয়ে যায়। চোখজোড়া খোলা থাকে। আরশীর দিকে নিবদ্ধ থাকে সে চোখ । ক্লান্ত চোখে, মুখে চিরচেনা সেই হাসি তার লেপ্টে আছে। “এইবার তুমি মুক্ত। মুক্ত।”

আরহামের কণ্ঠের শেষ কথাটা চারদিকে বাতাসে ভাসতে থাকে।

চলমান…..!

#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্স)
#শারমিন_প্রিয়া

২৮.

অচেতন, শক্তিহীন, নিথর আরহামকে চুপচাপ পড়ে থাকতে দেখে আরশীর বুক ধক করে উঠে। চিনচিনে ব্যথায় জমে উঠে বুকের প্রতিটি অলিগলি। সে ধপাস করে বসে পড়ে, কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে আরহামের চোখের পাতা ঢেকে দেয়। আরশীর চোখ বাধ মানে না। টপটপ করে বেয়ে পড়ে চোখের পানি। আরশী রক্তাক্ত আরহামের বুকের ওপর মাথা রেখে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে। কলিজা মোচড় দিয়ে উঠে তার। এমন মনে হচ্ছে যেন ভেতরে কেউ একের পর এক ছুরির আঘাত করছে। তাতে গলগল করে বের হচ্ছে যন্ত্রণার রক্ত।

আরশী মাথা তুলে হাত বুলায় আরহামের গালেমুখে। ঝুকে চুমু খায় আরহামের কপালে। মনে পড়ে কতশত স্মৃতি—প্রথম দেখা, প্রথম স্পর্শ….! আরশী চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়। নিজেকে নিজে বলে,

আমি দুর্বল কেন হচ্ছি? দুর্বল হব না। ও আমার সবকিছু শেষ করেছে, এমনকি আমাকেও শেষ করেছে। সব বিশ্বাস তছনছ করেছে। তিলে তিলে মেরেছে, আর এখনও মারছে।

একটু থেমে ভাঙা কণ্ঠে বলে,

তবু… তবু সত্যিটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ও রাক্ষস। তবু ও-ই আমার আরহাম। আমার প্রথম আর শেষ ভালোবাসা। ওকে আমি মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। এই ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই, কোনো মিথ্যা নেই। তার মৃত্যুতে আমার বুকে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তা আর কারও বুকে হবে না—কারও না। তাকে ছাড়া একদিনও বেঁচে থাকা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। কখনও নয়। যে পৃথিবীতে আমার আরহাম নেই, সে পৃথিবীতে নিশ্বাস ফেলাটাও হবে অসহনীয় যন্ত্রণা। এই ভালোবাসা যেমন পবিত্র, তেমনই অভিশপ্ত।

আরশীর ঠোঁট কেঁপে উঠে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নীরব অশ্রু। ধরা গলায় বলে,

আমি তাকে শাস্তি না দিলে আমার মা–বাবার আত্মা শান্তি পেত না। তাই তার উপযুক্ত শাস্তি আমি দিয়েছি।

কিন্তু যতই যা-ই করুক, আমি যে তাকে ভালোবাসি—এটা চন্দ্র-সূর্যের মতো সত্য। আমার বেঁচে থাকা সম্ভব না তাকে ছাড়া। আমার অবশিষ্ট আপনজনকে মেরে আমিও নিজের হাতে নিজের প্রাণ নেব। আমি আমার রাক্ষস মেয়েকে অবশিষ্ট রাখব না, মানুষের ক্ষতি করার জন্য।

আরশী চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। হাতে তুলে নেয় ছুরিটা। সে জানে, অরাইয়ার মধ্যে কঠিন শক্তি আছে। তাই আরহামকে যেটা দিয়ে আঘাত করেছে, সেই ছুরি দিয়েই অরাইয়াকেও আঘাত করতে হবে।

অরাইয়া তখন অনেকটা দূরে।

আরশী সেখানে যেতেই অরাইয়া চোখ বড় বড় করে ড্যাবড্যাব করে আরশীর দিকে তাকিয়ে থাকে। আরশী মেয়ের চোখে চোখ রাখে না। হাতের ছুরিটা দিয়ে অরাইয়ার বুক বরাবর আঘাত করতে যাবে—তখনই আকাশ ফেটে ভয়ংকর চিৎকার ভেসে আসে।

চারদিক থেকে তুমুল বাতাস উঠে। কালো ছায়ারা একের পর এক নেমে আসে মাটিতে। আরহামকে ঘিরে ধরে বিভৎস সুরে কান্নায় ভেঙে পড়ে তারা।

কায়ান ছিল অসম্ভব শক্তিশালী রাজার উত্তরসূরি—অপরিমেয় শক্তির অধিকারী সে। কায়ানের যখন প্রাণ উড়ে গিয়েছিল, তখনই তার রাজ্যে কালো ছায়া নেমে এসেছিল। তার বাবার শয়নকক্ষে ছিল কায়ানের প্রাণের সুরক্ষা মন্ত্র—একটি স্বচ্ছ কাচের ঝাঁর।

ঝাঁরের ভেতর জাদুমন্ত্রে বেঁচে থাকা একটি ছোট মাছ ছিল।

কায়ানের দাদা এই ঝাঁরটি তৈরি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,

“যেদিন কায়ানের প্রাণ নিভে যাবে, সেদিন এই মাছটিও আপনাআপনি মরে যাবে।”

রাণীই প্রথম সেটা লক্ষ্য করেন। ঝাঁরের ভেতরের মাছটি নিথর পড়ে থাকতে দেখে তিনি চিৎকার করে ওঠেন। রাজা দৌড়ে এসে যখন দেখলেন—

, মাছটি সত্যিই মরে গেছে। তখনই তিনি বুঝে যান, তার ছেলের ওপর ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে।

তিনি হুংকার দিয়ে উঠলেন,

“কে কোথায় আছো? আমার ছেলের অবস্থান বের করো। এখনই সেখানে পৌঁছাও!”

রাভান, দ্রোহানসহ সব সৈন্য তখনই উড়ে চলে আসে এখানে। এসে কায়ানের শ্বাস বন্ধ দেখে তারা হৈচৈ করে ওঠে। আরশীর হাতে রক্তাক্ত জাদুর ছুরি দেখে একদল সৈন্য আক্রমণ করে বসে আরশীকে। নখ-দাঁত সব একসঙ্গে বসায়। আরশী পড়ে যায়, চেঁচিয়ে ওঠে।

রাক্ষসরা কঠিন কণ্ঠে বলে,

“তোর সাহস হলো কী করে সর্দারকে মারার? বল!”

দ্রোহান রাক্ষসদের সরিয়ে আরশীর উদ্দেশ্যে বলে,

“আপনি মেরে ফেলেছেন সর্দারকে?”

আরশী কিছু বলে না৷

দ্রোহান আবার বলে, “বলুন না, আপনি হত্যা করেছেন?”

আরশী হাতের ছুরি দেখিয়ে বলে, “দেখে বুজতে পারছো না?”

দ্রোহানের ভেতর দুঃখে ভরে উঠে। সে ধরা গলায় বলে,

“আপনার ধারণা আছে? সর্দার আপনাকে কতটা ভালোবাসতেন। পুরো রাজ্যের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি আপনার জন্য সব ছেড়েছেন। আপনার জন্য পরিচয় পাল্টেছেন। হিংস্র রাক্ষস থেকে অনেকটাই ভালো হয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি নিজের থেকেও বেশি আপনাকে ভালোবেসেছেন। আপনাকে বিয়ে করলে তাঁর আয়ু কমে আসবে জেনেও আপনাকে বিয়ে করেছেন। কারণ আপনি ছাড়া এই পৃথিবীতে তিনি নিঃস্ব ছিলেন। শুরু থেকে শেষ অবধি আমি সাক্ষী এই ভালোবাসার। যে মানুষটা শেষ বেলাতেও আপনার জন্য ভেবেছে—সেই মানুষটাকে আপনি মেরে ফেললেন? কেন মারলেন, সর্দারনী?”

বলতে বলতে কেঁদে ওঠে দ্রোহান।

“এখন আপনাকে রাজার হাত থেকে কেউই বাঁচাতে পারবে না। কেউই না।”

দ্রোহানের বলা শেষ হতেই রাজার হুংকারে থরথর করে কেঁপে ওঠে মাটি। রাজা উড়ে এসে আরশীর গলায় সব নখ একসঙ্গে বসিয়ে দেয়। আরশীর জিহ্বা বের হয়ে আসে।

অরাইয়া তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। সে হয়তো ভাবছে, যে আমাকে মারতে এসেছিল, আর এখন সে নিজেই মরতে বসেছে।

অরাইয়া কেঁদে ওঠে। ঝাঁঝালো সে সুরে সবাই চমকে ওঠে। অরাইয়ার চোখ বদলে যায়—টকটকে লাল আকার ধারণ করে। তার চোখের আলোয় চারদিক ঝলসে ওঠে। ভয়ংকর তাপ ছড়িয়ে পড়ে। মাটি অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে থাকে। বাতাস ভারী হয়ে আসে। গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ে সাইক্লোনের মতো। পাহাড় থেকে ভারী পাথর পড়তে থাকে, পাহাড় ধসে পড়ে।

সবাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অরাইয়ার দিকে। রাজার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তার হাত এখনও আরশীর গলায় নিবদ্ধ। গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। আরশী দাঁতে ঠোঁট চেপে চোখ বন্ধ করে আছে। কী হচ্ছে, সে টের পাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে, তার প্রাণপাখি এখনই ফুরুৎ করে উড়ে যাবে।

ছোট্ট অরাইয়া সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধীরে ধীরে দাঁড়ায়। ন্যানো সেকেন্ডে সে হয়ে যায় পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চার মতো। সে রাজার কাছে গিয়ে তার গলা খামচে ধরে বলে,

“মাকে ছুঁবে না। হাত সরাও।”

এই বলে সে রাজাকে ছুড়ে ফেলে দূরে। রাজা গিয়ে পড়ে পাহাড়ের মাটির দেয়ালে। স্তব্ধ হয়ে যায় রাজা।ভাবে,

“এই… এই মেয়ে… শিশু মেয়ে! এ… এ কি সেই মহাশক্তিধর কন্যা? যার কথা বাবা-দাদারা বলেছেন? পুরনো গ্রন্থে যার কথা লেখা আছে?”

এই মেয়ের বাবা আমার আরহাম!”

একজন সেনা রাজাকে তুলে ধরে বলে,

“এ কেমন শক্তি, রাজামশাই! আমি জীবনে এমন দেখিনি।”

রাজা কথা বলার অবস্থায় নেই।তিনি পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করছেন।

অরাইয়া নিচু হয়ে বসে আরশীর কাছে। ছোট্ট হাতে আরশীর গাল ছুঁয়ে দেয়। গলায় হাত রেখে চোখ বন্ধ করে কীসব মন্ত্র পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। ব্যথাও মিলিয়ে যায়।

অরাইয়া বলে,

“আমি খারাপ না, মা। আমার ভেতরে কোনো অশুভ শক্তি নেই। মানুষ আর রাক্ষস—দু’পক্ষকেই বাঁচানোর শক্তি আছে আমার মধ্যে। ভয় নেই মা, চোখ খুলো।”

আরশী চমকে গলায় হাত দেয়। রক্ত নেই। ব্যথাও নেই। ধীরে ধীরে চোখ খুলে সামনে অরাইয়াকে দেখে। এত বড় অরাইয়াকে দেখে সে ঝটপট উঠে বসে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখে।

অরাইয়া হাসে, কয়েকটা দাঁত বের হয়।

আরশী চোখ কুঁচকে ভাবে—এতগুলো দাঁত হলো কবে?

অরাইয়া মায়ের হাত ধরে বলে,

“তুমি এভাবে আমাকে কেন দেখছ, মা? আমি তোমার মেয়ে—অরাইয়া এলহা। বড় হয়েছি ঠিকই, কিন্তু ফেস তো চেঞ্জ হয়নি। চিনতে পারছ না কেন?”

আরশী চারদিকে তাকিয়ে ভাবে, রাক্ষসগুলোর মুখ এত চুপসে আছে কেন? রাজা তো আমাকে মারতে এসেছিল—এভাবে পড়ে আছে কেন?

তার মানে… অরাইয়ার বিশেষ শক্তি জেগেছে। সেই আমাকে বাঁচিয়েছে।

আরশীর চোখ ভিজে ওঠে। সে অরাইয়াকে বুকে টেনে নেয়। “তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস?”

“হ্যাঁ মা। ওরা তোমাকে মারতে চাইছিল। আমাকে তো বাঁচাতেই হতো। বাবা ছাড়া একমাত্র আমিই তো আছি, যে তোমাকে সবসময় বাঁচাতে পারব।”

আরশীর চোখ ভিজে ওঠে। অপরাধী গলায় বলে, “আমি তোকে মারতে গিয়েছিলাম, আর তুই আমাকে বাঁচালি? আমি তোকে ঘৃণা করি না মা। ভয় পাই, তুই বড় হয়ে যদি তোর বাবার মতো মানুষের ক্ষতি করিস, সেটা মেনে নিতে পারব না। তাই ভেবেছিলাম তোকে মেরে আমিও মরে যাব। পৃথিবী ভয়ংকর অশুভ শক্তি থেকে বাঁচবে।”

অরাইয়া মায়ের হাত ধরে বলে,

“তোমার অবস্থা বুঝতে পারছি মা। আমার শক্তি আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা অশুভ নয়। মানুষ আর রাক্ষস—সবারই এই পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার আছে। কেউ কারও ক্ষতি করবে না। আমি করতে দেব না।”

রাজা সোজা হয়ে দাঁড়ান। অরাইয়ার দিকে এগিয়ে এসে বলেন,

“নিজের মাকে বাঁচিয়ে নিলি, তোর বাবাকে যে খুন করেছে, তার বিচার করবি না? রাক্ষস রাজ্যের উত্তরাধিকার হত্যার বিচার হবে না?”

অন্যান্য রাক্ষসরা বলে ওঠে,

“আরশীকে মেরে ফেলুন রাজা। সর্দার হত্যার শাস্তি মৃত্যু।”

আরশী হাত উঁচু করে বলে,

“আর একটা কথা বললে কেউ প্রাণ নিয়ে ফিরবে না।”

রাজা হাত তুলে সবাইকে থামান।

অরাইয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

“আমার বাবাকে মারার যথেষ্ট কারণ ছিল আমার মায়ের। আমার মায়ের মা–বাবাসহ সবাইকে মেরেছেন আমার বাবা। কোন মেয়ে এটা সহ্য করবে? তাই মাকে দোষ দেওয়া যাবে না। তবে আমার বাবা একটা মহৎ কাজ করেছেন, যেটা বাবার সব অপরাধের উর্ধ্বে।তিনি আমার মাকে নিজের জীবন, রাজ্য, সিংহাসনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন। এই ভালোবাসাই আমার বাবাকে আমার কাছে সেরা করেছে। আমি আমার মায়ের বিচার করব না। তবে… অরাইয়ার চোখের ভেতর একরাশ দৃঢ়তা জমে ওঠে। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “তবে আমি আমার বাবাকে ফেরত আনতে পারব। বাঁচিয়ে তুলতে পারব আমার ক্ষমতা দিয়ে।”

আরশী চমকে ওঠে।

“সত্যি?”

“হ্যাঁ মা।”

এই সামান্য আশাতেই আরশীর বুকের পাথর গলে যায়। সে অরাইয়াকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু মুখের আলো বেশিক্ষণ থাকে না।

অরাইয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “এইতো খুশী ছিলে মা। এখন মুখ মলিন হয়ে গেল কেন?”

আরশীর গলা ভারী হয়ে আসে। ধরা গলায় বলে,

“আরহাম আমার মা–বাবাকে খুন করেছে। আমি এই সত্যটা কখনও ভুলতে পারব না। মেনে নিতে পারব না আরহামকে। কোনদিন ও না।”

অরাইয়া মায়ের কোলে উঠে মায়ের চোখ মুছে দেয়।বলে,

“তুমি যে বাবাকে মেরেছ, তার তো যথেষ্ট কারণ ছিল। বাবার বেলায়ও তেমনই। শুধু এটুকু মানো মা, বাবা তোমাকে ভালোবাসেন।”

আরশী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“আমি তোমার বাবাকে মেনে নিতে পারব না ঠিক কিন্তু সে পৃথিবীতে না থাকলে আমার বাঁচার মানে নেই। দাম বন্ধ লাগবে। তুমি তোমার বাবাকে বাঁচিয়ে তুলো।”

এই কথা বলার পর আরশী নিজেই বুঝতে পারে না- সে ঘৃণা করছে, নাকি ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরছে।

অরাইয়া মনে মনে হাসে। কী অদ্ভুত তার বাবা–মায়ের ভালোবাসা! ঘৃণা, অপরাধের মাঝেও কী গভীর টান একজনের প্রতি আরেকজনের। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—

আমি বাবাকে আর কোনো খারাপ কাজ করতে দেব না। মায়ের কসম দেব। আমার বিশ্বাস, মায়ের জন্য বাবা সব ছেড়ে দেবেন। সব। তখন মা ও বাবাকে মেনে নিবেন। আমাদের সুন্দর একটা পরিবার হবে। আমরা সুখে থাকব।

চলমান……!

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ