Friday, June 5, 2026







তুই আমার শেষ ক্ষুধা পর্ব-২৯

#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্টিক)
#শারমিন_প্রিয়া

২৯.

নিথর দেহে আরহাম পড়ে আছে। ছোট্ট অরাইয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় আরহামের কাছে। বাবার পাশে বসে তার ছোট্ট হাত বুলিয়ে দেয় বাবার মুখে। নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,

“তুমি মরতে পারো না বাবা। এখনো না। তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। আমরা একসাথে থাকব।”

অরাইয়া তার ছোট্ট দুটো হাত আরহামের বুকের ওপর রাখে। বুকে ছোপ ছোপ শুকনো রক্ত।

অরাইয়া চোখ বন্ধ করে। অরাইয়ার ঠোঁট নড়ে, সে মন্ত্র পড়তে থাকে। এ মন্ত্র কোনো মানুষের ভাষা নয়, কোনো রাক্ষসের ভাষাও নয়। যেন পৃথিবীর জন্মের আগের কোনো ভাষা।

আরহামের শরীর থেকে ধীরে ধীরে আলো বেরোতে শুরু করে। সাদা নয়, কালো আলো।

আচমকা আকাশ কালো হয়ে ওঠে। মাটি কেঁপে ওঠে। রাজাসহ উপস্থিত রাক্ষসরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। একে একে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে।

তাদের কারও মুখে কোনো কথা নেই।

আরশী দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক ধুকপুক করছে। মুখে কথা না বললেও সে মনেপ্রাণে চাচ্ছে আরহাম বেঁচে উঠুক।

আরহামের বুকের ক্ষত ধীরে ধীরে শুকাচ্ছে।

রক্তের রঙ মিলিয়ে যাচ্ছে আলোয়।

হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে আরহামের বুকটা কেঁপে ওঠে। একবার কাপে। দু’বার কাপে।

তারপর শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে।

রাজাসহ উপস্থিত সবাই ভয় পেয়ে ওঠে। তাদের চোখে যেন বিশ্বাস হচ্ছে না সামনের কাণ্ডটা। তারা ফিসফিস করে বলে, এটা কেমনে সম্ভব? কেমনে? এ কোন মহাশক্তিশালী বাচ্চা?

আরহামের রেসপন্স দেখে আরশীর বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হয়। সে ছুটে আসে আরহামের কাছে। আরহামের ঠোঁট নড়ে। আরশী অরাইয়ার দিকে একবার তাকিয়ে আরহামের দিকে তাকায়। তার হাত-পা কাঁপতে থাকে। যে আরহামকে সে মেরে ফেলল, তাকে কীভাবে অরাইয়া জীবিত করতে পারল? আমার অরাইয়ার এত শক্তি? মৃত রাক্ষসকে সে জীবিত করে ফেলল মন্ত্র পড়ে।

অরাইয়ার চোখ আর লাল নেই। শান্ত, গভীর। সে হাপিয়ে মাকে বলে, “মা… বাবা ফিরে এসেছে।”

আরশী মাথা ঝাঁকিয়ে ধরা গলায় বলে, “হে মা।”

আরশীর ভেতরে জমে থাকা সব অভিমানী শক্তি ভেঙে পড়ে। সে আরহামের বুকে ঝুঁকে পড়ে। টপটপ করে চোখ বেয়ে জল পড়ে। যাকে খানিক আগে হারিয়ে ফেলেছিল, সেই ব্যক্তিকে ফিরে পেয়ে তার এমন মনে হচ্ছে যেন সে পৃথিবী হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে। সে আঁকড়ে ধরে আরহামকে।

আরহাম ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। চারপাশ ঝাপসা লাগে। মাথা ভারী লাগছে। ঘোরের মধ্যে সে ভাবে—এসব স্বপ্ন দেখছে না তো? তাকে তো আরশী মেরেছিল, তবে এখন সে আকাশ দেখছে কেন? সামনে এত লোকজন দেখতে পাচ্ছে কেন? সে বারকয়েক চোখ বন্ধ করে আবার খোলে।

সে টের পায়, এটা স্বপ্ন নয়। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? আর বুকের মধ্যে আরশী কাঁদছে কেন?

আরহাম দু’হাত দিয়ে ধরে আরশীকে। তার দিকে মুখ ফেরায়। স্থির চোখে তাকিয়ে ভ্রু-জোড়া নাচিয়ে কৌতুকের সুরে জিজ্ঞেস করে,

“আমার বুকের ওপর ওভাবে কাঁদছ কেন? আমার জন্য কি মায়া হচ্ছে? কলিজা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে? নিশ্চয়ই যাচ্ছে। বুঝি আমি। মুখে যতই না বলো, আমি জানি—তুমি আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসো। কী, ঠিক বলছি তো?”

আরশী চোখ সরিয়ে নেয় আরহামের দিক থেকে। চোখ মুছে উঠে দাঁড়াতে গেলে আরহাম টেনে আবার বুকের মধ্যে ফেলে। আরশী কপাল কুঁচকায়, মনে মনে বলে—মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া অবস্থায় এ লোকটার দুষ্টুমি গেল না। সে চোখ গরম করে আরহামের দিকে তাকায়। আরহাম হেসে ছেড়ে দেয়। আরহাম উঠে বসে।

রাজা এবার এগিয়ে আসেন আরহামের কাছে। কায়ান, দ্রেহানসহ সবাই এসে ভিড় করে ধরে আরহামকে। চোখের সামনে এতজনকে দেখে আরহাম অবাক হয়। রাজা আরহামের হাত, মুখ, পা ছুঁয়ে দিচ্ছেন আর কান্না করছেন? আরহাম জিজ্ঞেস করে,

“এখানে আপনি কেমনে বাবা? আর এত রাক্ষস কেন? দ্রোহান বলো, কীভাবে আসলে এখানে?”

দ্রেহান থেমে থেমে বলে,

“আপনাকে তো সর্দারনী মেরে ফেলছিলেন। রাজা খবর পেয়ে উড়ে আসেন, আমরাও সঙ্গে আসি।”

আরহামের চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে, চিন্তিত হয়ে বলে,

“তোরা আবার আমার আরশীকে আঘাত করিসনি তো?”

দ্রেহান মাথা ঝাঁকায়।

“রাজা করতে গিয়েছিলেন। আজ হয়তো সর্দারনী মারা-ও যেতেন, কিন্তু আপনার মেয়ে সর্দারনীকে বাঁচিয়ে নিয়েছেন।”

কায়ান বাবাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাবার করুণ আর মলিন মুখ দেখে কিছু বলল না।

দ্রোহানের উদ্দেশে আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

“কে বাঁচিয়েছে? আপনার মেয়ে?”

কায়ানের কপালে ভাবনার ছেদ পড়ে।

“আমার মেয়ে? অরাইয়া এলহা?”

“জি।”

সে তো ছোট। এটা বলার পরেই আরহামের মনে পড়ে তার মেয়ের শক্তির কথা। তাহলে কি অরাইয়ার শক্তি জেগে উঠেছে?

সে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,

“আমাকে… আমাকে কে বাঁচিয়েছে? এটা কীভাবে সম্ভব হলো? এই প্রথম কোনো রাক্ষস বেঁচে উঠল!”

“আপনাকেও আপনার মেয়ে বাঁচিয়েছে, সর্দার।”

কায়ান এবার লাফিয়ে ওঠে। রাক্ষসদের ঠেলে বের হয়ে যায় মেয়েকে দেখতে।

অরাইয়া বাবাকে বাঁচিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিল। কিছু দূরে গিয়ে সে নিচে সোজা শুয়ে পড়ে। আরশী তার কাছে গিয়ে বসে। অরাইয়া কোনো কথা বলে না। আরশী তাকে ডাকে,

“অরাইয়া মা… সোনা… কী হয়েছে? কথা বলছো না কেন? চোখ খুলছ না কেন?”

অরাইয়ার কোনো নড়াচড়া নেই। আরশী ভয় পেয়ে অরাইয়ার নাকের গোড়ায় হাত নিয়ে দেখে—শ্বাস চলছে কিনা। শ্বাস চলছে, বুক ওঠানামা করছে। কিন্তু চোখ খুলছে না। হঠাৎ অরাইয়ার শরীর কেঁপে ওঠে। আরশী অরাইয়াকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে। ভয় পাওয়া গলায় চিৎকার করে,

“কি হলো আমার মেয়ের? কি হলো? ও এলহা? কথা বলছিস না কেন? এলহা? অরাইয়া?”

আরহাম উপস্থিত হয়। আরশীর কোলে অরাইয়াকে দেখে অবাক হওয়া চোখে বলে,

“এ কে? আমার মেয়ে অরাইয়া না?”

আরশী মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,

“অরাইয়া।”

“এ… এ তো ছোট ছিল। এত বড় হলো কীভাবে?”

“সেসব কথা পরে হবে। আগে আমার মেয়ের কী হয়েছে দেখুন।”

আরহাম হাত বাড়িয়ে অরাইয়াকে কোলে তুলে নেয়। কোলে আড়াআড়ি করে রাখে। অরাইয়াকে ভালো করে দেখে বলে,

“টেনশনের কিছু নেই। অনেক শক্তি খরচ হয়েছে, তাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে যাবে। তুমি বসো।”

আরহাম অরাইয়ার চুলে, মুখে হাত বুলায়। চুমু খায়।

আরশী পাশে বসে থাকে। আরহাম আরশীর দিকে তাকিয়ে বলে,

“আমার মেয়ে তো আমাকে বাঁচিয়ে নিল। তোমার ইচ্ছে তো আর পূর্ণ হলো না। নাকি আবার মেরে ফেলবে? সত্যি, আমি এতটা বিষ তোমার চোখে? শুধু বারবার মনে হচ্ছে আর অবাক হচ্ছি—কীভাবে পারলে আমাকে আঘাত করতে? একবারও বুক কাঁপেনি তোমার? আমি তো কখনও পারতাম না। কোনোদিনও না।”

আরশী গলায় জমে থাকা ভার নিয়ে প্রশ্ন করে,

“ঘৃণা হচ্ছে না আপনার আমার প্রতি?”

আরহাম সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ে,

“না, একদমই না।”

আরশী অবাক হয়।

“কীভাবে সম্ভব? আমি আপনাকে মেরে ফেললাম, তাও? সত্যি রাগ হচ্ছে না?”

আরহাম অরাইয়াকে ছুঁয়ে বলে,

“এই দেখো, আমার মেয়েকে ছুঁয়ে বললাম, আমার তোমার প্রতি একবিন্দুও রাগ হচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, আমি ব্যথা পেয়েছি। বুকের গভীরে ব্যথা পেয়েছি।”

আরশীর চোখ কঠিন হয়ে ওঠে।

“তাতে আমার কী?”

“কিছুই না, আমি জানি। আচ্ছা, আমার ফিরে আসাতে তুমি কি খুশি?”

আরশী ঠান্ডা স্বরে বলে,

“আমি খুশি হতে যাব কেন?”

আরহামের চোখে চাপা হাসি খেলে।

“তাহলে আমার বুকের ওপর পড়ে কাঁদছিলে কেন? কেন বলো?”

আরশী থতমত খায়। কণ্ঠ শক্ত করে বলে,

“দেখুন, আপনার প্রতি আমার ঘৃণা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। আপনি আমার সঙ্গে যা যা অন্যায় করেছেন, তা আমি কোনোদিনও ভুলব না। আর আপনাকেও আমি মেনে নেব না কখনও।”

আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তখনই জেগে ওঠে অরাইয়া। বাবার গলা জড়িয়ে ডাকে,

“বাবা।”

আরহাম অরাইয়ার নাক টিপে বলে,

“আমার সোনা মেয়ে। তুমি ঠিক আছ?”

“ঠিক আছি বাবা। তুমি ঠিক আছ?”

“হ্যাঁ মা, আমি ঠিক। কিন্তু তুমি কীভাবে আমাকে বাঁচিয়ে তুললে, বলো তো?”

“আমার অনেক অলৌকিক শক্তি আছে বাবা। আমার এমন মনে হয় যেন আমি যা চাইব, তাই করতে পারব। আর সদ্য মরে যাওয়া কোনো রাক্ষসকেও জীবিত করতে পারব।”

আরশী আগ্রহী হয়ে বলে,

“আমার রুদ্রাণী মাকে তুই জীবিত করতে পারবি, অরাইয়া?”

অরাইয়া মলিন মুখে বলে,

“না মা। উনি অনেক আগে গত হয়েছেন।”

আরশীর মুখ চুপসে যায়। সে গম্ভীর মুখে ফিরে তাকায় অপরপাশে।

আরহাম উঠে দাঁড়ায়। আরশীকে বলে,

“চলো, বাসায় ফেরা যাক।”

রাজা এসে আরহামকে বলেন,

“কোথায় যাবে তোমরা? রাজ্যে চলো।”

আরহাম আরশীর দিকে তাকিয়ে বাবাকে বলে,

“আরশী যেখানে যেতে চাইবে, সেখানেই যাব বাবা। রাক্ষস রাজ্যে ওর অস্বস্তি হতে পারে।”

রাজা হাসিমুখে আরশীর কাছে দাঁড়িয়ে বলেন,

“আমি কিন্তু তোমাকে মেনে নিয়েছি, আরশী। তোমার কোনো আপত্তি আছে আমার রাজ্যে থাকার?”

আরশী অকপটে বলে,

“আপত্তি আছে। আমি যাব না।”

রাজা একটু থেমে পরে বলেন,

“ঠিক আছে। এখন একটু চলো। কায়ানকে তার মা দেখে নিক, তারপর চলে যাবে।”

অরাইয়া মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে বলে,

“চলো না মা। আমি দেখব আমার বাবার বাড়ি। পরে আবার চলে যাব। প্লিজ মা।”

আরশী আর কথা ফেরায় না। মাথা কাত করে বলে,

“ঠিক আছে।”

রাক্ষসরা সবাই উড়ে চলে যায়। আরহাম মন্ত্র পড়তে শুরু করে আরশী আর অরাইয়াকে রাজ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মন্ত্র বারবার পড়ে, কিন্তু কাজ হয় না। হাওয়াও নড়ে না। আরহাম বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে ফেলে। নিজের হাতের দিকে তাকায়।

অরাইয়া বিষয়টা বুঝতে পেরে বাবার হাত ধরে বলে, “তুমি অনেক লম্বা বাবা। একটু নিচু হও তো, কিছু বলব তোমায়।”

আরহাম হাঁটু ভাঁজ করে বসে। অরাইয়া বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“তুমি ঘাবড়ে যাবে না তো?”

“না মা, ঘাবড়াব না। বলো।”

“বাবা, আসলে তোমাকে বাঁচিয়ে তুলেছি মানে ধরো—তোমার পুনর্জন্ম হয়েছে। তোমার একবার মৃত্যু হয়েছে, এখন আগের কোনো শক্তি তোমার অবশিষ্ট নেই। তুমি জাতে তে রাক্ষস হলেও একদম মানুষের মতো হয়ে গেছো। মায়ের মতো। বাবা, তুমি কষ্ট পেয়ো না। তোমার রাজ্য আর তোমাদের আমি রক্ষা করব। আমার অনেক শক্তি আছে বাবা, অনেক।”

অরাইয়ার মুখে এ কথা শুনে চুপ হয়ে গেল আরহাম। আরশীও স্তব্ধ হয়ে গেল। আরহামের সব শক্তি শেষ হয়ে গেছে—অরাইয়ার এ কথা তার কানে বারবার বাজতে লাগলো। সে খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করল। গমগম গলায় বলতে লাগল আরহামকে,

“কোথায় গেল শক্তির গৌরব? যে শক্তি দিয়ে আমার মা–বাবাকে মেরেছো! হুঁ—গেল কই শক্তি?”

সে দোলে দোলে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে আসছে।

অরাইয়া বাবাকে বারবার বলতে লাগল,

“তোমার খারাপ লাগছে বাবা? চিন্তা করো না, আমি আছি তো।”

আরহাম স্মিত হেসে বলল,

“আমার রাগ হচ্ছে না। চিন্তা হচ্ছে না। কিচ্ছু হচ্ছে না। বরং স্বস্তি হচ্ছে। শান্তি লাগছে।”

একটু থেমে বলে,

“জানিস মা? আমার আফসোস হতো, নিজেকে ঘৃণা লাগত—আমি রাক্ষস বলে। এমনটা কখন মনে হয়েছে জানিস? যখন তোর মাকে ভালোবেসেছি। কত হীনমন্যতায় ভুগতাম, ভয় পেতাম। বারবার মনে হতো—কেন আমি মানুষ হলাম না? যদি মানুষ হতাম, তাহলে আরশী আমাকে সহজে মেনে নিত। এইসব আফসোস লাগত আমার। কিন্তু এখন যখন আমার সব শক্তি চলে গেছে, আমি শক্তিহীন হয়ে গেছি—আমি খুশি হয়ে গেছি। অনেক খুশি মা। আমার রাজ্য, শক্তি—কিচ্ছু চাই না আমি। আমি সাধারণ, এতেই আমি ঠিক আছি।”

আরশী চমকে ওঠে আরহামের এমন গভীর কথায়।

আরহাম দৃষ্টি ফেরায় আরশীর দিকে। আরশীর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে অরাইয়াকে বলে,

“আশা করি তোর মায়ের এখন আমাকে মেনে নিতে আপত্তি থাকবে না।”

আরশী মুখ বাঁকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নেয়।। কিছু বলে না। তবে আরহামের এসব পজিটিভ কথায় বারবার তার বুকে কিছু একটা হয়।

অরাইয়া মন্ত্র পড়ে বাবা–মাকে নিয়ে রাক্ষস রাজ্যে যায়। সেখানে সবার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা দু’দিন থাকে সেখানে। রাজা গিয়ে অরাইয়ার কথা সব গল্প করেন রাণীর সঙ্গে। রাক্ষসরাও অরাইয়ার কথা গল্প করে বাকিদের সঙ্গে। অরাইয়ার শক্তির কথা পুরো রাজ্যে জানাজানি হয়ে যায়। সবাই মুগ্ধ হয়ে অরাইয়াকে দেখে। রাজা–রাণী তো চোখে হারান অরাইয়াকে। আরশীকেও যত্ন করেন। অগ্নীমা মাঝে মাঝে যেচে আরশীর সঙ্গে কথা বলতে গেলেও আরশী তেমন একটা রেসপন্স করেনা।

অরাইয়া দাদা–দাদীর কাছ থেকে বিদায় নেয়। বলে আসে,

“যখনই প্রয়োজন হবে আমাকে ডাকবেন। বিপদে আমাকে ডাকবেন। হাজির হয়ে যাব।”

আরশী, অরাইয়া আর আরহাম—তিনজন চলে আসে মানুষের জগতে তাদের প্রাসাদে। যেখানে রুদ্রাণী, নজরুল, আরশী, অরাইয়া আর আরহাম থাকত। আরহাম মনে মনে ভাবে—আমি আবার আরশীর মন জয় করে নেব। তারপর আরশী আর আমি সুন্দর সংসার সাজাব।

প্রাসাদটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে আরশীর কাছে। মূলত বাবা–মা নেই বলেই প্রাসাদটা তার কাছে মৃত্যুপুরী লাগে। সে সন্ধ্যায় ছাদের কোণায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। অরাইয়া মায়ের কাছে গিয়ে ছোট্ট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“তুমি মনমরা হয়ে আছো কেন মা?”

আরশী উত্তর দেয় না। দৃষ্টি আকাশেই আটকে থাকে। অরাইয়া একটু কাছে এসে আবার বলে,

“যা হয়েছে তা ভুলে গেলে হয় না মা? সব কিছু মনে রাখলে জীবন এভাবে আটকে থাকবে। যা হয়েছে সব ভুলে যাও, প্লিজ মা। নিজের চোখেই তো দেখলে—বাবা কত ভালোবাসেন তোমায়। তুমি বাবাকে মেরে ফেলেছ, বাবা বেঁচে উঠেছেন, তাও তোমাকে একটা ধমক অবধি দেননি। বাবার ভালোবাসা অনেক গভীর মা—অনেক। তোমার বোঝার সাধ্যের বাইরে। আমি তোমার হাত ধরে মিনতি করছি মা, তুমি বাবাকে মেনে নাও।”

আরশী হেসে অরাইয়াকে কোলে নেয়। বলে,

“এইটুকু পুচকি তুই আমার। এত কথা বলিস কোথা থেকে? কোথায় পাস এত কথা? হুঁ? আমাকে তো অবাক করে দিস এসব বলে বলে।”

অরাইয়া দাঁত বের করে হাসে। মায়ের কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,

“জানো না—তোমার মেয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী। তাহলে তার বুদ্ধিটাও তো সেরকমই হবে। শক্তি যদি বেশি হয়, বুদ্ধি আর কথা বলাটাও তো বেশি হবে।”

বলে সে আবার হাসে।

কি সুন্দর হাসি তার। আরশী মুগ্ধ হয়ে দেখে।

মেয়ের সঙ্গে সেও হাসে। আজকাল অরাইয়া এত সুন্দর করে কথা বলে আর হাসে। অরাইয়ার দিকে তাকালে আরশীর সব রাগ–দুঃখ কেমন জানি পালিয়ে যায়। অরাইয়াকে তার কাছে রুদ্রাণী লাগে। মেয়ের দিকে তাকালে ভেতরে বড্ড অপরাধ কাজ করে—এই মায়াবী মেয়েটাকে সে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। আরশী অরাইয়াকে বুকে চেপে চুমু খায়। কোলে নিয়েই নিচে নেমে আসে।

আরহাম বাজারে গিয়েছিল। বাজার নিয়ে এসে নিজেই রান্নায় বসে যায়। গুণগুণ করে গান গাইছে আর রান্না করছে। আরশী ঘরে গিয়ে ঘর গুছাতে লাগল। রান্না শেষ হলে আরহাম ভাত বেড়ে ডাইনিংয়ে নিয়ে আসে। আরশী আর অরাইয়াকে সঙ্গে নিয়ে খায়। বাবা–মেয়ে অনেক গল্প করল। আরহাম খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে অনেকবার আরশীকে দেখল। আরশী একবারও ফিরে তাকায়নি আরহামের দিকে।

অরাইয়া এইটুকুন ছোট বাচ্চা। তাকে আলাদা ঘরে রাখতে মা–বাবা কেউই ইচ্ছুক নয়। এদিকে পাকা অরাইয়া মা–বাবাকে স্পেস দিতে অন্য রুমে ঘুমানোর জন্য ব্যস্ত। অনেক লড়াই করেও তাকে আরশীর ঘরে রাখা যায়নি। মাকে গম্ভীর গলায় বলে,

“ভয় কেন পাও আমাকে নিয়ে? জানো না আমার অনেক শক্তি। আমি ছোট বাচ্চা হলেও ভেতর থেকে অনেক বড় আমি। মা–বাবা আমাকে আটকিয়ো না।”

আরশী বাধ্য হয়ে তাদের রুমের একদম কাছের রুমে অরাইয়ার জন্য বিছানা গুছিয়ে দেয়।

তারপর সে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। শরীর ভীষণ ক্লান্ত লাগায় দ্রুত তার চোখে ঘুম চলে আসে। আরহাম ফ্রেশ হয়ে এসে অনেক আশা নিয়ে বিছানায় গিয়ে দেখে—আরশী গভীর ঘুমে। শ্বাস চলছে। আরহাম আরশীর একদম কাছাকাছি শুয়ে বালিশে কনুই ঠেকিয়ে হাতের ওপর মাথা রেখে স্থির হয়ে একদৃষ্টিতে আরশীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলতো করে আরশীর মুখে হাত বুলায় আর বলে,

“কি নিষ্পাপ লাগছে তোমাকে। যেন সদ্য ফোটা কোনো পবিত্র ফুল। এই মায়া মায়া মুখটা দেখলে কে বলবে, তোমার ভেতরে তোমার প্রিয় পুরুষের জন্য এত ঘৃণা! “

আরহাম গভীর নিঃশ্বাস ফেলে আরশীর কপালে চুমু খায়, মাথায় চুমু খায়। বুকে মুখ লুকিয়ে নাক টেনে আরশীর পরিচিত ঘ্রাণ নেয়। তারপর আরশীকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে।

আরশীর চ্যাৎ করে ঘুম ভেঙে যায়। সে বুঝতে পারে আরহামের বুকে আছে সে। এমনভাবে আরহামই তাকে যত্নে বুকে রাখে। সে চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকে। তার ভালো লাগছে এভাবে আরহামের মধ্যে থাকতে। তার কত ইচ্ছে করে আরহামকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে প্রাণ জুড়াতে, কিন্তু সে পারে না। বিবেক বাধা দেয়। মা–বাবার কথা মনে হয়।

এখন ও মা–বাবার কথা মনে পড়তেই আরশীর মন বিষে ভরে যায়। সে লাফ দিয়ে উঠে। আরহামকে দূরে ঠেলে দেয়।

আরহাম বিষয়টা বুঝে চুপ থাকে। তার অপরাধবোধ কাজ করে। কেন সে ভয় পেয়ে রুদ্রাণীকে মারতে গেল। আজ সবকিছু ঠিক হয়েও বেঠিক হচ্ছে। যদি রুদ্রাণীকে সে না মারত, হয়তো আরশী তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করত না।

আরশী কাঁদছে। আরহামের সহ্য হয় না সে কান্না। সে আরশীর চোখ মুছে দিয়ে বলে,

“এভাবে কেঁদো না, প্লিজ। আচ্ছা, আমি যে ভুলগুলো করে ফেলেছি, তা তো আর ফেরত আনতে পারব না—তাই না? এখন কী করলে তুমি আমাকে আগের মতো গ্রহণ করবে, বলো? নাকি তোমার মা–বাবার মৃত্যুর দায়ে আমি নিজে নিজে মরে যাব? যদি চাও, তবে এখনই নিজের প্রাণ নিয়ে নেব। মৃত্যু সহ্য করতে পারব আমি, কিন্তু আমার থেকে তোমার এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মানতে পারব না।”

আরশী নিঃশব্দে কাঁদে। তার খুব কান্না পাচ্ছে।

আরহাম কোনো উত্তর না পেয়ে শুয়ে পড়ে। রাত গভীর হয়। অনেক গভীর। আরহাম ঘুমুচ্ছে। আরশী অরাইয়ার রুমে গিয়ে মেয়েকে একবার দেখে আসে। তারপর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। নিজে থেকে আরহামকে শক্ত করে ধরে। টপটপ করে চোখের পানি পড়ে। বুক ভিজে উঠলে আরহাম জেগে ওঠে। আরশী তার বুকে আছে টের পেয়ে আরহাম কিছু বলে না, নড়ে না। নড়লে বা কিছু বললে আরশী সরে যাবে। আরহামের বুকটা ভারী হয়ে আসে। তার খারাপ লাগে আরশীর জন্য। সে জানে—আরশী তাকে খুব, খুব ভালোবাসে। কিন্তু দ্বন্দ্বে সে শেষ হয়ে যাচ্ছে। না তাকে মেনে নিতে পারছে, না ভুলতে পারছে। আর সেই টানাপোড়েনে বেচারী ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে আর আমাকেও ভাঙ্গছে।

চলমান…..!

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ