#_ডাকঘর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্বঃ১
১.
–” এই অবৈধ সন্তানকে নিয়ে এখনি আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যা।”
কথাটা যেন বজ্রাঘাতের মতো আছড়ে পড়লো ঘরের ভেতর। ভদ্রলোকটির গর্জনে সামনে দাড়িয়ে থাকা অবলা নারীটি কেঁপে উঠে। ক্লান্তি আর লজ্জার ভারে তার শরীর এমনিতেই নুয়ে ছিলো, এই কথায় যেন সে পুরোপুরি ভেঙে গেলো। তার ডান হাত ধরে দাড়িয়ে আছে হাফ প্যান্ট আর টি-শার্ট পরা এক দশ বছরের বালক। ছেলেটির হাত শক্ত হয়ে আছে। চোখে ভয় নেই, আছে পরিবেশ বোঝার চেষ্টা। ভদ্রলোকটির চোখ জ্বলছে। চোখে মুখে আভিজাত্যের অহংকার, কন্ঠে অশ্রাব্য ঘৃণা,
–” এখনো দাড়িয়ে আছিস কেন? লজ্জা করে না? এমন কলঙ্ক নিয়ে আমার বাড়িতে এসেছিস।”
নারীটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
–” না, ভাইজান! দয়া করে এমন বলবেন না। ও আমার সন্তান। আর ও কোনো অবৈধ সন্তান না। আমার বৈধ সন্তান।”
ভদ্রলোকটি তার কথায় একটুও কর্নপাত করলো না। চোখে মুখে ঘৃণার ছাপ স্পষ্ট।
–” তাের কোনো কথা শুনতে চাই না আমি। আর আমাকে ভাইজান বলে ডাকবি না। আমি তোর ভাইজান না। এমন চরিত্রহীন মেয়ে আমার বোন হতে পারে না। এখনি বের হয়ে যা। নাহলে, দারোয়ান ডেকে তোদের দুইজনকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো।”
নারীটি আর দাড়িয়ে থাকতে পারে না। মেঝেতে হাটু মুড়ে বসে পড়ে। কান্না করতে করতে নিজের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে অবলা নারীটি। তার কান্না আর তখন চাপা নেই।
–” আল্লাহ! আমি কি অপরাধ করেছি? আমার সন্তানের কি দোষ?”
বালকটি একদম চুপচাপ। তার চোখ স্থির হয়ে আছে সেই মানুষটির দিকে, যাকে আজ সে প্রথম দেখেছে। অথচ, যার সাথে তার রক্তের সম্পর্ক। তথাকথিত সম্পর্কে, মামা হয় তার। আসলেই কি এই মানুষটা তার মামা? এই মানুষটাই কি তার মায়ের আপন ভাই? আজই প্রথম মায়ের হাত ধরে মামা বাড়ি নামক এই বড় বাড়িতে এসেছে সে। মনে হয়েছিলো, এখানে হয়তো আশ্রয় মিলবে। মামা মানে তো আপনজন, এমনটাই তো জেনে এসেছে সে। কিন্তু, এমন অপমান, এমন ঘৃণা, তা সে কল্পনাও করেনি।
বালকটির দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে গেলো। চোখ গিয়ে পড়লো, ভদ্রলোকটির হাত ধরে দাড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটির দিকে। বছর পাঁচেক বয়স হবে মেয়েটির। মেয়েটি একটু আগেই মিষ্টি গলায় তার মামা নামক মানুষটিকে বাবা বাবা বলে ডাকছিলো। গোল গাল, লাল ফ্রক পরা, মাথায় দুটো ঝুঁটি। দেখে মনে হয়, ভালোবাসায় মোড়া এক সংসারের আদুরে রাজকন্যা। বোঝায় যায়, আলালের ঘরে দুলালি।
বালকটি মেয়েটির দিকে তীক্ষ্ণ, লাল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার। মেয়েটি কিছুই বুঝছে না, শুধু কৌতুহলি দৃষ্টি নিয়ে সবার দিকে তাকাচ্ছে। ভদ্রলোকটি আবার গর্জন সুরে বললো,
–” বের হয়ে যা এই মুহুর্তে।”
বালকটি আরেক পলক মামা নামক লোকটির দিকে তাকিয়ে, মায়ের হাত ধরলো শক্ত করে। মাকে মেঝে থেকে উঠালো। কোনো প্রতিবাদ করলো না, কোনো কথা বললো না। শুধু একবার পুরো বৈঠকখানায় চোখ ঘুরালো, ঝাড়বাতি, দামি সোফা, ফার্নিচার, মামা নামক মানুষটি, সব শেষে ছোট্ট মেয়েটিকে দেখলো। তারপর সে মাকে নিয়ে ধীর পায়ে মামা বাড়ি নামক বাড়িটি থেকে বেরিয়ে গেলো। বালকটি আর একবারও পেছনে তাকালো না।
এই দিনটার হিসাব রাখার জন্য, এই যন্ত্রণাগুলোর উত্তর খুঁজে রাখার জন্য, তার ভেতরের কোথাও খুলে গেলো এক অদৃশ্য ডাকঘর। যেখানে জমা হতে লাগলো অপেক্ষা, প্রশ্ন আর ভবিষ্যতের অজানা চিঠি।
.
.
.
রাত ১২টা!!
শহরের রাস্তা দিনে যতোটা ব্যস্ত, এতো রাতে ঠিক ততোটাই শান্ত। লম্বা রাস্তা জুড়ে নিরবতা শুয়ে আছে। শুধু রোডলাইট গুলো, সোনালি আলো ছড়িয়ে অন্ধকারের বুক চিরে দাড়িয়ে আছে। আর এই আলো আর অন্ধকারের মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটা চকচকে কালো গাড়ি। গাড়ির ভেতর রয়েছে শুভ্র চৌধুরী! দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী। কেউ কেউ তাকে বিজনেস ম্যাগনেটও বলে। কোটি কোটি টাকার হিসান, ফোন কল, মিটিং, বড় বড় সিদ্ধান্ত, এইসবই তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সব কিছু শেষ করে নিজেই গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে। ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছে ইচ্ছে করেই। মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গতারও দরকার হয়।
হঠাৎ করেই ব্রেক কষে সে। রাস্তার পাশে এক তরুনী দাড়িয়ে আছে। হাত নেড়ে গাড়ি থামানোর ইশারা করছে। এই শুনশান রাস্তায় এমন দৃশ্য অস্বাভাবিক। শুভ্রর ভ্রু কুচকিয়ে যায়। মুহুর্তের দ্বিধার পর গাড়ি থামায় সে। মেয়েটি দ্রুত এগিয়ে আসে। হাফাতে হাফাতে কাঁপা গলায় বলে ওঠে,
–” দয়া করুন। আমার বাবা খুবই অসুস্থ। যদি একটু লিফট দিতেন, আমি বাবাকে হাসপাতালে নিতাম।”
শুভ্র কোনো উত্তর দেয় না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটির দিকে। গাড়ির হেডলাইট আর ল্যাম্পপোস্টের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মেয়েটির মুখ। উজ্জ্বল শ্যামবর্ন, এলোমেলো চুল, পুরো শরীর ঘামে ভেজা। চোখ দুটো ভেজা, কিন্তু এখন কান্না করছে না। মেয়েটি করুন সুরে বললো,
–” প্লিজ! এতো রাতে গাড়ি পাচ্ছি না। বাবার অবস্থা খুব খারাপ।”
শুভ্র মেয়েটির চোখের দিকে তাকায়। সেখানে কোনো ফাঁকি নেই। শুধু আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব। শুভ্র ধীরে বলে,
–” নিয়ে আসুন।”
মেয়েটি যেন একটু শান্তি পায়।
–” অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।”
মেয়েটি দ্রুত পায়ে ঘুরে যেতে যেতে চিৎকার করে বলতে থাকে,
–” মা! গাড়ি পেয়েছি। বাবাকে নিয়ে আসো।”
শুভ্র গভীর শ্বাস নেয়। ফোন বের করে সময় দেখে আবার ফোন বন্ধ করে রাখে। সামনে তাকাতেই তার চোখ আটকে যায়। মেয়েটি ফিরে আসছে। তার দুই হাত একজন বয়স্ক লোককে ধরে আছে। লোকটার শরীর নিস্তেজ, মুখটা ফ্যাকাশে। পাশে একজন ভদ্রমহিলা, চোখে জল, হয়তো মেয়েটির মা, বয়স্কলোকটির স্ত্রী। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বয়স্ক লোকটির মুখ স্পষ্ট হতেই, চোখ লাল হয়ে আসে শুভ্রর। স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরে, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে বক্রিম রেখা।
মেয়েটি আর তার মা মিলে অসুস্থ লোকটিকে সাবধানে ব্যাকসিটে বসায়। লোকটি মুখ নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করে। মেয়েটি কেঁদে ফেলে।
–” আর একটু বাবা। হসপিটালে পৌঁছে যাবো আমরা খুব দ্রুত।”
মেয়েটি সাবধানে বাবা মাকে পেছনে বসিয়ে, নিজে সামনের সিটে এসে বসে। চোখ মুছে নেয় দ্রুত। তারপর শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
–” চলুন।”
শুভ্র এক পলক মেয়েটির দিকে তাকায়। তারপর সামনে তাকিয়ে রিয়ারভিউ মিররে অসুস্থ লোকটিকে দেখে আরেকবার। গাড়ি চালু করে সে। কালো গাড়িটা অন্ধকার রাস্তা ছিঁড়ে এগিয়ে যায়।
…
হাসপাতাল গভীর রাতেও কখনো ঘুমায় না, শুধু গতি কমে আসে। দিনের কোলাহল নেই, নেই আত্নীয় স্বজনের ভিড়। মাঝে মাঝে শুধু দুই একটা নার্সের দেখা মেলে, কিংবা কখনো ডাক্তারের যাতায়াত। করিডোরের এক কোনায় শুভ্র চৌধুরী দাড়িয়ে আছে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে, হাত পকেটে গুঁজে। বাইরে থেকে দেখলে তাকে নিশ্চিন্ত মনে হবে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঢেউ বয়ে যাচ্ছে তার। তার চোখ স্থির হয়ে আছে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের দিকে। হঠাৎ, সেখান থেকে বেরিয়ে আসে মেয়েটি। অসহায় হলেও, নিজেকে শক্ত করে রাখার অদম্য চেষ্টা। সামনের দিকে তাকাতেই শুভ্র কে দেখতে পায় সে। এক মুহুর্ত থেমে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে তার দিকে। মেয়েটি আস্তে করে বলে ওঠে,
–” আপনি আজ যা করলেন, এই উপকার আমি কোনোদিন ভুলবো না।”
শুভ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। হাসপাতালের ফকফকা আলোয় মেয়েটির মুখ একদম পরিষ্কার। মেয়েটি খুব ফর্সা নয়, শ্যামবর্ন গায়ের রঙ, কিন্তু, মুখে একরাশ মায়া।
–” আপনার নাম কি?”
শুভ্রর কন্ঠ শান্ত কিন্তু গম্ভীর। মেয়েটি সামান্য অবাক হয়। হয়তো তার কথা বিপরীতে এমন প্রশ্ন আশা করেনি। তাও ভদ্র ভাবে উত্তর দেয়,
–” পুষ্পিতা রহমান! সবাই পুষ্প বলে ডাকে।”
পুষ্পিতা একটু থেমে যায়। তারপর আবার বলে ওঠে,
–” আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আপনার নামটা জানতে পারি?”
শুভ্রর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠে।
–” শুভ্র! শুভ্র চৌধুরী!”
এক মুহুর্ত বিরতি দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে,
–” আপনার বাবা এখন কেমন আছেন?”
পুষ্পিতা শুকনো মুখে বললো,
–” মোটামুটি। স্ট্রোক করেছেন। ডাক্তার বলেছেন, আগামীকাল রিপোর্ট বের হলে সঠিক অবস্থা জানা যাবে।”
–” ভালো হয়ে যাবেন। চিন্তা করবেন না।”
পুষ্পিতা হালকা হাসে।
–” আপনাকে সত্যিই অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি সাহায্য না করলে, আমি এতো রাতে কি করতাম জানি না।”
–” ধন্যবাদ বলার দরকার নেই।”
–” কেন?”
–” কারন, আমি এর বদলে অন্য কিছু চাই।”
পুষ্পিতার ভ্রু সামান্য কুচকে যায়।
–” অন্য কিছু মানে?”
শুভ্র খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলে ওঠে,
–” আপনার বাবা সুস্থ হলে, আপনি আমার সঙ্গে একদিন কফি খেতে যাবেন। আর আপনার নম্বরটা দিতে হবে। এক কথায়, বন্ধু হতে চাই আমি আপনার।”
পুষ্পিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে শুভ্রকে দেখে। এক কথায়, সুদর্শন পুরুষ শুভ্র চৌধুরী। সাথে, পরিপাটি পোশাক, শান্ত কন্ঠ, ভদ্র আচরণ, সব থেকে বড় কথা তার বড় বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। পুষ্পিতা মিষ্টি করে একটু হাসে।
–” অবশ্যই!”
আরও কিছুক্ষণ কথা হয় দুইজনের মাঝে। রাত গভীর হচ্ছে। শুভ্র বিদায় নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে। পার্কিংয়ে রাখা নিজের কালো গাড়িটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ফোনটা বের করে। গাড়ির সামনে থেমে যায়। নতুন সেভ করা নাম্বারটির দিকে তাকায়। পুষ্প!
শুভ্রর ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে উঠে এক বক্রিম হাসি। কিছু সময় ফোন স্ক্রিনে থাকা নাম্বারটির দিকে তাকিয়ে থেকে ফোন বন্ধ করে পকেটে রেখে দেয়। গাড়িতে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। কালো গাড়িটা আবার অন্ধকার রাস্তা ছিড়ে এগিয়ে যেতে থাকে, নিয়তির দিকে।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
