আমার মন কেমন করে,
শেষ পর্ব
রাজিয়া খাতুনের কুলখানি আর সুমনের বৌভাত আজ একই দিনে ছিল।
রাশেদের সব বন্ধুরা বৌভাতের অনুষ্ঠান থেকে দলবেঁধে রাজিয়া খাতুনের কুলখানিতে এসেছে। ওদের সবার মুখে পান, বোঝাই যাচ্ছে ভরপেট খেয়ে এসেছে ।
সবাই মুখ গম্ভীর করে বসে আছে ।রাজিয়া খাতুনের মৃত্যু এবং রাশেদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনায় সবাই বেশ দুঃখিত।
কিন্তু মৃত্যু বা দূর্ঘটনার উপর কারো তো কোনো হাত নেই। মনে কষ্ট নিয়েই সবাই সুমনের গায়ে হলুদ, বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে।
নাচ, গান, ডিজে পার্টির আয়োজন অনেক আগে থেকেই থেকেই করা ছিল, সবাই কতরকমের প্রস্তুতি নিয়েছে, কত টাকাপয়সা খরচ হয়েছে, কতো আমন্ত্রিত অতিথি আছে … হুট করে তো সবকিছু বাতিল করে দেয়া যায় না।
সত্যি বলতে, বড় ভাইয়ের বন্ধুর মা মারা গেলে, বা বড় ভাইয়ের বন্ধুর এক্সিডেন্ট হলে, কে কবে বিয়ের স্বাভাবিক আনন্দ ফুর্তি বন্ধ রেখেছে?
সুমনের জীবনে তো এই বিশেষ মুহূর্তগুলো বারবার আসবে না। তাই, মনে কষ্ট নিয়েই সবাই নাচানাচি, হৈ হুল্লোড় করেছে ।
এতোসব ব্যস্ততার মধ্যে, রাশেদের কথা কেউ কতবার মনে করেছে, সেই তথ্য সঠিকভাবে বের করার উপায় নেই।
রাশেদ এখনো হাসপাতালে আছে ।তার শরীরের বিভিন্ন জায়গার হাড় ভেঙেছে ।আশা করা যায়, হাতের হাড় দুমাসের মধ্যেই জোড়া লেগে যাবে ।
তবে, পায়ের হাড় জোড়া লেগে পুরোপুরি সেরে উঠতে হয়তো ছয়মাসেরও বেশি লেগে যাবে।
আপাতত দুটো সার্জারি করার কথা জানিয়েছে ডাক্তার।
এক্সিডেন্টের পর থেকে আজ এই কুলখানি পর্যন্ত সময়ে, রাশেদের সব বন্ধুরাই এসেছে… হাসপাতাল এবং বাড়ি দুই জায়গায়ই ।রাশেদের পরিবারের এই আকস্মিক বিপর্যয়ে সকলেই অত্যন্ত ব্যথিত।
বিয়েবাড়ি এবং শোকের বাড়িতে একসাথে সময় দিতে গিয়ে, রাশেদের বন্ধুরা সবাই বেশ ক্লান্ত।
ওরা সবাই প্রমাণ করেছে, নিজের নিজের জায়গা থেকে কতটা দায়িত্ববান তারা।
একই সাথে শোক এবং আনন্দোল্লাস করে, মনুষ্য চরিত্রের কঠিনতম সত্য প্রমাণ করেছে তারা।
রাশেদের বন্ধুরা সবাই ভালো মানুষ, তারা শিউলি কে বলেছে,
__ভাবী, যে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হলে জানাবেন কিন্তু । বুঝতেই তো পারছেন ভাবী, রাশেদ আর সুজন দুইজনই আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, নিজের লোক।দুইদিক ই দেখতে হচ্ছে তাই। আপনার দুই ভাই এসেছে দেখলাম, সেজন্য অনেকটা নিশ্চিন্ত আমরা। তবে, যে কোনো দরকার মনে করলে, আমরা কিন্তু আছি।
নিজের কাছে নির্ভার হয়েই শোকের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছে তারা।
সবাই তো আর রাশেদ নয় যে, এখানেই খুঁটি গেড়ে বসে থাকবে।শিউলি নিজেও সেটা চায়না। সে খুব ভালো করেই জানে ,
বাইরে যারা সময় দেয়,তারা ঘরে সময় দিতে পারেনা।
তাদের স্ত্রী অপেক্ষায় থাকে, মা অবহেলায় থাকে। তাদের সন্তান বড় হয়, বাবার সাথে দূরত্ব নিয়ে।
শিউলি কোনদিন চাইবে না, নিজের পরিবারের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য সময় কেটে নিয়ে কেউ এইবাড়িতে সময় দিক।
রাশেদ হয়তো নিজের সময়, নিজের শরীর, নিজের পরিবারকে পিছনে রেখে এই বন্ধুদের সময় দিয়েছে। তবু শিউলি চায়, ওরা ওদের সীমারেখার মধ্যে থাকুক ।এতে দোষ নেই তো কোনো।
এতো সব কিছুর মধ্যে,
রাশেদ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শোক পালন করেছে। রাখী আপু দেশের বাইরে থেকে এসেছেন, উনিও তাই শোক প্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন ।
কেবল শিউলিরই শোক প্রকাশের সময় কিংবা সুযোগ, কোনোটাই হয়নি।তার কাঁধে রাজ্যের সব দায়িত্ব।মেহমানদের চিন্তা, অসুস্থ স্বামীর চিন্তা, হঠাৎ ঘটে যাওয়া এতোসব ঘটনায় চুপসে যাওয়া দুই সন্তানের চিন্তা।
যদিও দুই ভাই সঙ্গেই ছিল ।সেই সাথে আরো কিছু আত্মীয় স্বজন আর রাখী আপু। কিন্তু কেউই তো ঠিক এই বাড়ির বাসিন্দা নয়।
এই পৃথিবীর হাজারটা মানুষ হয়তো জানেও না,
শোকের সময়ে নিজের মতো করে শোক প্রকাশ করতে পারাটাও বিশাল এক সৌভাগ্য। সবাই তা পারে না।
পরিশেষে…
রাশেদ আর শিউলির জীবনে আজ ভীষণ আনন্দের দিন। ওদের মেয়ে পুষ্প সরকারি মেডিকেলে চান্স পেয়েছে।
এই ক’দিনে মনে হচ্ছিলো যেনো, কতো সহস্রদিন কেটে যাচ্ছে , শুকনো আর মলিনমুখে।
আজ সেইসব দিনের অবসান হয়েছে।
গত তিন মাস যাবৎ বিছানায় পড়ে আছে রাশেদ।বলা যায়, বন্ধুদের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে সে।
শিউলি অবশ্য কখনো চায়নি, রাশেদ এভাবে সংসারে ফিরুক ।
রাশেদের এই ফিরে আসাটা, ঠিক যেন ভাঙা একটা মানুষের লক্ষন।কিছুতেই সুখী এবং সংসারমুখী মানুষের লক্ষন নয়।
স্বামী বাইরে সময় দিচ্ছে, এটা শিউলিকে কষ্ট দিতো ঠিক। কিন্তু ঘরে থেকেও, মানুষটা মনের দিক থেকে অনুপস্থিত… এটা আরো ভয়াবহ কষ্টের। এটা সে চায়নি কখনো ।
শিউলি কোনরকম জোর খাটায় নি। রাশেদকে সে নিজের মত করে থাকতে দিয়েছে। নিজের সাথে বোঝাপড়া করার মতো সময় দিয়েছে।
শিউলি পরিস্কার বুঝতে পারতো,
বিছানায় শুয়ে শুয়ে জীবনটাকে নতুন ভাবে দেখছে, রাশেদ।উনিশ বছর ধরে যে পুরুষের সাথে সংসার করছে, তার চোখেমুখ যে কোনো স্ত্রীই পড়তে পারে।
সত্যি বলতে, একজন মানুষ যখন একসঙ্গে শারীরিক শক্তি এবং মায়ের ছায়া হারায়… তখন পৃথিবীকে সেই আগের চোখে দেখার উপায় থাকে না।
ইদানিং রাশেদের বন্ধুরা খুব একটা আর আসছে না।প্রথম প্রথম কিছুদিন এসেছিল, কিন্তু কেনো যেনো রাশেদ ঠিক আগের মতো উচ্ছাস নিয়ে আর কথা বলতো না, বন্ধুদের সাথে।
কেন , সেই প্রশ্নের জবাব রাশেদের কাছেও নেই ।
ও নিজেই তো চেয়েছিল, সুমনের বিয়ের সবরকম অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে হোক। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফিরে, বন্ধুদের ফেসবুকে গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌভাতের হৈ হুল্লোড়, নাচগানের ছবি ভিডিও দেখে… ওর এতো কষ্ট হয়েছে কেনো?
তার দুঃখের দিনে কারো আনন্দ এতটুকু কম হয়নি বলে? একটা বিয়ের হাসি থামেনি, একটা গান থামেনি, আয়োজনে এতটুকু কমতি থাকে নি বলে?
রাশেদ তো প্রতারিত নয়।বন্ধুদের সাথে তো সময় লেনদেনের কোনো চুক্তি হয় নি কখনো ।সবসময় নিঃস্বার্থভাবেই দিয়েছে সে ।
কারো বিপদ মানেই ছিল, রাশেদের রাত জাগা।
কারো বিয়ে মানে ছিল, তার নিজের ঘর ফাঁকা ।
কখনো তো হিসেব করেনি সে, আজ কতটা দিলাম, কাল কতটা পাবো!
তবে কেন নিজেকে পরাজিত মনে হচ্ছে, রাশেদের?
তবে কি, নিঃস্বার্থভাবে কাউকে কিছু দেয়া যায় না?
আজ রাশেদের জীবনটা ঘরবন্দী।
হয়তো আরো তিন মাস হাঁটতে পারবে না সে।
তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই ছয়মাস রাশেদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিরতি।
এই বিরতিটা এলো বলেই তো, রাশেদ দেখলো…
তার পুরো পরিবারের ভারে শিউলি কতোটা নুয়ে পড়েছে ।
এই মেয়েটিকে সে ভালবেসেছে, কিন্তু সময় দেয় নি।
নিজের কঠিন সময়ে এলো বলেই তো বুঝতে পারলো রাশেদ ,
ভালোবাসা প্রমাণ করতে হয় উপস্থিতি দিয়ে, সময় দিয়ে।
তাদের দুই সন্তানকে, মাকে, পুরো পরিবারকে সেই প্রকৃত ভালোবাসা দিয়েছে কেবল শিউলি।
তাই তো আজ এই পরিবারে, এতোটা আনন্দের মুহূর্ত এলো।
মরে যাওয়া মনটা তাই তো আবার নতুন করে বেঁচে উঠতে চাইছে।
আজ রাশেদের পা ভাঙ্গা, তবে মনে মনে অনেকটাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে।অথবা জীবনে প্রথম এতোটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশেদ।
একটা অনিচ্ছাকৃত বিরতিতে সে জেনেছে, নিজের জীবনের গভীরতম সত্যটি ।
মাকে আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে রাশেদের। তিনি সবসময় বলতেন,
__একদিন সব বুঝবি রে বাপ, কিন্তু আম্মা আর সেইদিন থাকুম না ।
আমার মন কেমন করে,
সমাপ্ত
রুচিরা সুলতানা
