আমার মন কেমন করে,
প্রথম পর্ব
রুচিরা সুলতানা
অ শিউলি , রাশু আসে নাই? আর কতক্ষণ? ওরে ফোন দেও…রাগ কইরা থাইকো না … আমার সময় শ্যাষ, মা… সময় শ্যাষ।
অস্পষ্ট আর ফ্যাসফেসে গলায় শাশুড়ি মায়ের কথা শুনতে শুনতে, শিউলির চোখ আবারো ঝাপসা হয়ে গেলো।
প্রানপন চেষ্টা করেও শক্ত থাকতে পারছে না শিউলি।তার মনের মধ্যে কেমন একটা কু ডাকছে। মনে হচ্ছে , খুব খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে আজ।
অসুস্থ শাশুড়ি মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শিউলি বললো,
__চোখ বন্ধ করে রাখেন আম্মা।কথা বইলেন না। আপনার ছেলে চইলা আসবে।
শিউলির কথামতো তার শাশুড়ি রাজিয়া খাতুন চোখ বন্ধ করলেন ঠিকই, কিন্তু চুপ করলেন না।উনার পাঁজরের হাড় উঠানামা করছে, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে । তবু তিনি বিড়বিড় করেই যাচ্ছেন।
রাজিয়া খাতুন কি বিড়বিড় করছেন, শিউলি সেটা জানে।
তাই, এবার আর সেই কথা বুঝতে কাছে এগিয়ে গেলো না সে।
ভোর থেকে বিড়বিড় করে নিজের ছেলের কথাই বলে যাচ্ছেন রাজিয়া খাতুন।
শিউলির মনে হচ্ছে, তার শাশুড়ি মা যেটা বললেন সেটা ঠিক। উনার হাতে খুব একটা সময় নেই।
ডাক্তার অবশ্য বলে গেছেন যে, অবস্থা আগের চেয়ে ভালো।
কিন্তু , শিউলির মন মানছে না।
উনিশ বছরের বিবাহিত জীবনের পুরোটা সময়ই শাশুড়ি মা তার সঙ্গে রয়েছেন…কখনো মা হয়ে, কখনো বন্ধু হয়ে, কখনো ছায়া হয়ে। এতোটা অসুস্থ, এতোটা অস্থির কোনদিন হননি তিনি।
এই অবস্থায় মানুষটিকে সত্যি কথাটা বলে লাভ নেই। কোন কিছু বোঝার মতো অবস্থায় তিনি নেই।
সুস্থ থাকলে, সজ্ঞানে থাকলে উনার মনে থাকতো ছেলে কোথায় আছে… তখন আর এতোটা অস্থির হতেন না। তাছাড়া রাশেদকে উনার চেয়ে ভালো আর কে চিনে?
বন্ধুদের সময় দিতে গিয়ে যে পুরুষ বৌভাতের রাত পার করে,ভোরবেলা বাড়ি আসে… বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে যে পুরুষ হানিমুনের ফ্লাইট মিস করে… অসুস্থ মায়ের পাশে সে কিভাবে থাকবে?
এরকম একটা মানুষের সাথে শিউলির জীবনের অনেকটা সময় কেটেই তো গেলো। এখন আর রাগ হয়না। অভিমানও বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে।
সত্যি বলতে, রাগ বা অভিমান করে লাভ নেই তো। রাশেদ সেগুলো বোঝেনা কিংবা বুঝতে চায় না।
সে এক অদ্ভুত মানুষ!
এমন নয় যে শিউলিকে, তাদের দুই ছেলেমেয়েকে
কিংবা নিজের মাকে রাশেদ ভালোবাসেনা।
ওদের সে মন থেকেই ভালোবাসে… , কিন্তু সেটা একান্তই তার নিজের মতো করে ভালোবাসা। দায়িত্বজ্ঞানহীন ভালোবাসা।
কে কবে চেয়েছে এমন ভালোবাসা?
পরিবারের মানুষগুলো বা শিউলি যেভাবে চায়, সেভাবে তো রাশেদ কক্ষনো কাউকে ভালোবাসেনি।
পরিবারের নিত্যদিনের ঝামেলা থেকে শুরু করে, ছোট বড় বিপদ আপদে রাশেদকে সেভাবে কখনোই পাশে পায়নি শিউলি। শাশুড়ি মাকে সাথে নিয়ে ঠেকে, ঠকে, একাই তো সব সামাল দিয়েছে সে।
আজ সেই শাশুড়ি মাকেও একাই হাসপাতালে এনেছে শিউলি।
এছাড়া কি ই বা করার আছে? শিউলির বাবা মা বেঁচে নেই ।ভাইবোনও ঢাকায় থাকে না । একমাত্র ননদটা আমেরিকায় থাকে ।
আর সবচেয়ে বেশি যার পাশে থাকার কথা… সেই রাশেদ তো সমাজসেবায় ব্যস্ত ।
শিউলি চোখের পানি মুছে ব্যাগ থেকে আবারো ফোনটা বের করলো। রাশেদের ফোনটা এখনো বন্ধ। কোনভাবে খবরটা পৌঁছাতে পারলে হতো।
রাশেদ এখনো জানেনা যে, তার মাকে ভোররাতে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। ফোনটা যে বন্ধ হয়ে আছে, সেই খবরও হয়তো তার নেই… কখনোই থাকে না ।
রাশেদ একটা সরকারী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক।তার সমবয়সী সহকর্মীরা পদোন্নতি পেয়ে পেয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। অথচ রাশেদ এতো বছরে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পর্যন্তই গেছে।
এসবে অবশ্য কিচ্ছু এসে যায় না তার।ওর জীবনের ধ্যান জ্ঞান অন্যকিছু।
রাশেদের বন্ধুবৃত্ত বেশ বড়। সেই বৃত্তে থাকা প্রতিটি বন্ধুর পরিবারকে রাশেদ নিজের পরিবার মনে করে। কিংবা বলা যায়, বন্ধুরা ই রাশেদের পরিবার।
বন্ধুদের সুসময় দুঃসময়ে একজন মানুষ কতটা পাশে থাকতে পারে, রাশেদকে না দেখলে সেটা অনুমান করা সম্ভব নয়। শিউলি অন্ততঃ কোনদিন এমন মানুষ দেখেনি জীবনে।
কেবল নিজের পরিবারটা বাদে, পুরো পৃথিবীর বিপদে আপদে রাশেদ সবার আগে ছুটে যায়।এতে যদি নিজের স্ত্রী সন্তান বা মায়ের অবহেলা হয়, হোক।
রাশেদ হয়তো বন্ধু হিসেবে অসাধারণ ।কিন্তু একজন সন্তান হিসেবে, একজন স্বামী হিসেবে, একজন বাবা হিসেবে সে পুরোপুরি ব্যর্থ।
আজকেও রাশেদ বন্ধুর বাড়িতেই আছে। সে এখন সুজন ভাইয়ের বাড়িতে আছে। উনার ছোট ভাই সুমনের বিয়ে। সুজন ভাই রাশেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে একজন। আর সুমনকে তো রাশেদ নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসে।
আগামীকাল সুমনের গায়ে হলুদ, এর পরদিন বিয়ে, তার দুদিন পর বৌভাত…এইসব কিছুর আয়োজন নিয়ে গত দুসপ্তাহ ধরেই রাশেদ মারাত্মক ব্যস্ত।
গত চারদিন হলো কলেজেও ছুটি শুরু হয়েছে। ব্যস … সে আর বাড়িতেই আসছে না।
মাঝে মাঝে এটা ওটা প্রয়োজন হলে, এক ফাঁকে এসে নিয়ে, পরিবারের সবাইকে একবার চোখের দেখা দেখেই আবার বিয়ে বাড়িতে দৌড়।
সে না থাকলে নাকি বিয়ে বাড়ির কোনো কাজ হয়না।
রাশেদকে ছাড়া পৃথিবীর বাকি সব বিয়েগুলো যে কিভাবে হচ্ছে, ভেবে পায়না শিউলি।
বিয়ের পর থেকে এইসব দেখে দেখে, ঝগড়াঝাঁটি,মান অভিমান করে করে, শিউলি এখন ক্লান্ত ।
সংসারের কোনো প্রয়োজনের কথাই আজকাল রাশেদকে আর বলা হয় না।
অবশ্য এবারের বিষয়টা আলাদা।সব ঝামেলা এবার একসাথে ঘেটে গেছে একদম ।
শিউলি আর রাশেদের দুই সন্তানের মধ্যে মেয়েটা বড়, নাম পুষ্প।এ বছর এইচএসসি পাশ করলো
সে।
পুষ্প যেমন ভালো ছাত্রী, তেমনই লক্ষ্মী । সামনেই তার ভর্তি পরীক্ষা, খুব ইচ্ছা তার মেডিকেলে পড়ার ।সরকারি মেডিকেলে চান্স না পেলে, প্রাইভেটে পড়ানোটা খুব চাপ হয়ে যাবে ওদের জন্যে ।
পুষ্প এইসব বুঝতে পারে, তাছাড়া মায়ের কষ্ট ছোটবেলা থেকেই তো দেখছে। তাই, আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে। টেনশনে আর পড়ার চাপে, মেয়ের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।
এদিকে ছেলে পরাগ সামনে এসএসসি দিবে। তার স্কুলে টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে ছেলে মেয়ে দুজনই ভয়ংকর ব্যস্ত ।
রাশেদের মা রাজিয়া খাতুনের হাই ব্লাড প্রেশার, ডায়াবেটিস রয়েছে। আজকাল তার শরীরটা মাঝে মাঝেই খারাপ হচ্ছে ।
সত্যি বলতে,রাশেদের মতো ছেলে যার রয়েছে, তার প্রেশার ডায়াবেটিস তো কখনো কন্ট্রোলে থাকার কথাও না।
মনের দিক থেকে যথেষ্ট শক্ত বলেই এতদিন হেঁটে চলে বেরিয়েছেন রাজিয়া খাতুন।
গত কয়েকদিন যাবৎ রাজিয়া খাতুন সামান্য জ্বরে ভুগছিলেন। এই বয়সের জ্বর ভালো লক্ষণ নয়। মাঝে মাঝেই এই জ্বর বিপজ্জনক হয়ে উঠে।
শিউলি রাশেদকে বলেছিল,
__আম্মার শরীরটা ভালো না।যতই রাত হোক,বিয়ে বাড়ির কাজ শেষ করে বাড়িতে চলে আইসো।
রাশেদ সেই কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। তার ধারণা, ওকে বাড়িতে আটকে রাখার জন্য মায়ের শরীর খারাপের অজুহাত দিচ্ছে শিউলি।
__কথায় কথায় আম্মারে অসুস্থ বানাই দেও কেন , শিউলি? আমার আম্মা এতো ননীর পুতুল না, সে যথেষ্ট শক্ত মানুষ। আমি মাত্র কথা বললাম, পুরাই ফার্স্ট ক্লাস আছে আম্মা ।আচ্ছা, সুমনের বিয়ের আর কয়দিন আছে বলো তো? কতরকম ঝামেলা ঐ বাড়িতে, তোমার কোনো ধারণা আছে?
রাশেদের এইসব অদ্ভুত প্রশ্নের খুব কঠিন জবাব শিউলির কাছে রয়েছে। কিন্তু সেইসব জবাব দেয়াটা, শুধুমাত্র সময় নষ্ট বলেই মনে হয় শিউলির। রাশেদের সঙ্গে ঝগড়া করে আজকাল আর সময় নষ্ট করে না সে ।
এরমধ্যে গত পরশু দিনের কথা, হঠাৎ কোচিং থেকে পুষ্প ফোন করলো। কান্নার জন্য কথা বলতে পারছিলো না মেয়ে ।
বললো, কোচিংয়ে যাবার পর তার পিরিয়ড শুরু হয়েছে।পরীক্ষা চলছিল তাই ও খেয়াল করতে পারেনি। বেশ অনেকটা রক্ত জামায় লেগে গেছে।
মেয়েটা কেন যে এতো অল্পে নার্ভাস হয়ে যায়! অন্যান্য সময়ে একা একা আসা যাওয়া করলেও , এখন বেশ অস্বস্তি হচ্ছে তার। বললো, ওকে গিয়ে নিয়ে আসতে ।
পুষ্পর কোচিং সেন্টার বাসা থেকে অনেকটা দূরে। শিউলি তখন সবে চুলায় রান্না বসিয়েছে। একটু পরেই ছেলেটা আসবে, পরীক্ষার টেনশনে সকালে ঠিকমতো খেতেও পারে নি সে। এখন যদি রান্না শেষ না করে শিউলি বেরিয়ে যায়, তাহলে ছেলে ফিরে এসে কি খাবে? আর শাশুড়ি মায়ের শরীরটা ভালো না, তাকেও তো সময়মতো খাওয়া দিতে হবে।
শিউলি ভাবলো, রাশেদের তো কলেজ নেই এখন। চাইলেই সুজন ভাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে, সে পুষ্পকে বাসায় দিয়ে যেতে পারে।
রাশেদকে ফোন দিতে গিয়ে দেখলো, তার মোবাইল বরাবরের মতোই বন্ধ। শিউলি তাই বাধ্য হয়ে সুজনকে ফোন করলো।
কেন শিউলি সুজনকে ফোন করলো, তাই নিয়ে রাশেদের হাজারটা কথা ।
শিউলির ফোনের পরে সুজনের মনটা নাকি খারাপ দেখেছে রাশেদ। সে নাকি সুজন ভাইয়ের সাথে বিরক্তি নিয়ে কথা বলেছে। রাশেদ বিয়ে বাড়ির কাজ করুক, শিউলি সেটা চায় না… ইত্যাদি ইত্যাদি।
অথচ কেন যে শিউলি ফোনটা করেছিলো , পুষ্পকে শেষমেশ কে গিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলো… সেইসব নিয়ে রাশেদের কোনো আগ্রহ নেই!
এমন স্বামী কোন মেয়ে মেনে নিবে?
রাশেদের এইসব আচরন, এতো বছর ধরে সহ্য করে যাচ্ছে শিউলি। আজকাল আর ধৈর্য্যে কুলোয় না ।
সেদিনই রাগ করে, রাশেদের সব বন্ধুদের মোবাইল নাম্বার ডিলিট করে দিয়েছিলো শিউলি।
মনে মনে পন করেছিলো, রাশেদ নিজে থেকে ফোন করে খোঁজ না নিলে, মরে গেলেও আর শিউলি ফোন করে বিরক্ত করবে না । আর রাশেদের বন্ধুদের তো কোনোদিনও ফোন করবে না, যাই হয়ে যাক না কেন। থাকুক তারা বিয়ে নিয়ে।
এখন খবরটা কিভাবে রাশেদের কাছে পৌঁছাবে বুঝতে পারছে না শিউলি।
অনেকক্ষণ যাবৎ রাশেদের ফোন বন্ধ পাচ্ছে। একেতো বাড়ির বাইরে আছে, তার উপর ফোনটাও বন্ধ। কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হলে একটা মানুষ এমন করতে পারে?
শিউলি অনেকক্ষণ খুঁজেও রাশেদের কোনো বন্ধুর নাম্বার নিজের ফোনে খুঁজে পেলো না। রাগ করে সবার নাম্বার ডিলিট করে দিয়েছিল সেদিন।
শিউলির শাশুড়ি মায়ের মোবাইলে অবশ্য কয়েকজনের নাম্বার আছে, কিন্তু ওই ফোনটা বাড়িতে ।হাসপাতালে আসার সময় ওইটা নিয়ে আসার কথা মাথায় ছিল না।
এখন যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়…
ভেবেই বুক ভেঙে কান্না এলো শিউলির ।
এই এতো বড় পৃথিবীতে রাশেদের মতো মানুষ আর কয়টা আছে, খুব জানতে ইচ্ছে করে শিউলির। তাদের স্ত্রী, পরিবার কিভাবে সব সামাল দেয়?
শাশুড়ি মায়ের কাছে শুনেছে,
রাশেদের বাবা ভীষণ পরোপকারী মানুষ ছিলেন। খুব অল্প বয়সে তিনি যখন মারা যান, রাশেদের বয়স তখন পাঁচ বছর আর রাশেদের ছোটবোনের দু’বছর মাত্র।
ছেলে তার বাবার দিলদরিয়া স্বভাব পেয়েছে… সেই আনন্দে রাশেদের কোনকাজে কখনো বাঁধা দিতেন না রাজিয়া খাতুন।
পরে যখন বুঝলেন,নিজের পরিবারের প্রতি ছেলের সেরকম কোন দায়িত্ববোধ নেই, ঘরের চেয়ে বাইরের মানুষ তার বেশি আপন… তখন আর চেষ্টা করেও কিছু লাভ হয়নি।
শেষে আত্মীয় স্বজন সকলে পরামর্শ দিলো,
__ সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে দাও ছেলের।বউয়ের টানে ছেলে ঘরমুখী হবে।
ছেলে সংসারী হবে এই আশায়, পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে শিউলিকে বউ করে এনেছিলেন রাজিয়া খাতুন।তাতে কোনো লাভ তো হয় ই নি, উল্টো শিউলির জীবনটা একা একা সংসার করে কেটে গেলো।
বলা যায়, শাশুড়ি মায়ের স্নেহ আর ভালোবাসার জোরেই শিউলির সংসারটা টিকে আছে।তাছাড়া, সংসার ভেঙ্গে বেরিয়ে যাবার মতো অবস্থাও তো শিউলির ছিল না ।
অথচ স্বামী আর সংসার নিয়ে কতো সাধারণ একটা চাওয়া ছিল শিউলির…
চলবে।
