Saturday, June 27, 2026







শরতের কাশফুল পর্ব-১৬+১৭

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহজাবীন
#পর্ব_১৬

সকাল নয়টা বেজে গেছে।

রাতের আতঙ্ক পেরিয়ে স্বর্গভূমি আবার স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে গেছে। অন্যান্য দিনের মতই স্নিগ্ধ ও শান্ত সকালটা। কোন পার্থক্য নেই। সূর্যের হালকা সোনালী আভা ছড়িয়ে আছে দিগন্তে। গাছের ডালপালায় জমে থাকা সকালের শিশির আলো পেয়ে মৃদু ঝিলমিল করছে। সেই শান্ত সকালের লয় ভেঙে হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়ায় একটা কালো জীপ। হন্তদন্ত হয়ে সেটা থেকে বেরিয়ে ভেতরে ছুটে যায় পাখি।

কেবিনজুড়ে পিনপতন নীরবতা। মম ঘুমিয়ে আছে হাসপাতালের বেডে। মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে এখনো।
কপালের একপাশে ছোট ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ, হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা লাগানো। চোয়ালের একপাশে একটু ছিলে গেছে। সেখানে অয়েন্টমেন্ট লাগানো। এছাড়া ছোট খাট কিছু আঁচড় ছাড়া, তেমন কোন আঘাত পায়নি সে। ভয়, আর স্ট্রেসের কারণেই বেশি দূর্বল হয়ে পড়েছে মেয়েটা। ঘুমের মধ্যেও ভ্রু সামান্য কুঁচকে আছে। গতরাতের ভয়টা এখনো পুরোপুরি ছাড়েনি তাকে।
বেডের পাশে বসে আছে মুহূর্ত। তার একহাত ধরে রেখেছে মম। এতক্ষণ শক্ত করে চেপে রাখলেও, বাঁধনটা শিথিল এখন। তবে মুহূর্ত হাত ছাড়িয়ে নেয়নি। সেভাবেই বসে আছে চুপচাপ। গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে মমর শুকনো মুখটার দিকে।
কিছু একটা চলছে তার নীরবতার আড়ালে।

মম ঘুমের ভেতর হালকা নড়ে উঠতেই মুহূর্তের চোখের কোণটা হালকা কেঁপে উঠে অস্থিরতায়। সেকেন্ড খানেক পর শান্ত হয়ে যায় মম। শান্ত হয় মুহূর্তও।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢোকে পাখি। এলোমেলো চুল, মুখে কোনো মেকি আবরণ নেই, শ্বাস প্রশ্বাস চলছে দ্রুত। তাড়াহুড়ো করে যে অবস্থায় ছিল সেভাবেই ছুটে এসেছে সে হাসপাতালে। মমর মুখের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো তার।

“মম…”

নিঃশ্বাসের সাথে খুব আস্তে শব্দটা খুব বেরোয় তার ঠোঁট থেকে। দ্রুত এগিয়ে আসে সে বেডের কাছে। মমর কপালে ব্যান্ডেজ, হাতে স্যালাইন, মুখের কাটা দাগগুলো দেখে তার চোখজোড়া ভিজে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে।

“কী হয়েছে ওর?”

জিজ্ঞেস করতে গিয়ে গলা কেঁপে ওঠে পাখির। পেছনে কেবিনের দরজায় চুপচাপ এসে দাঁড়িয়েছে ঘোস্ট। মুহূর্ত কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে জানায়,

“ঠিক আছে এখন। তেমন গুরুতর আঘাত পায়নি। শুধু স্ট্রেসের কারণে দূর্বল হয়ে পড়েছে।”

পাখি ধীরে বসে পড়ে বেডের পাশে। কাঁপতে থাকা হাতে মমর চুল সরিয়ে দেয় কপাল থেকে। হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে। এই মেয়েটাকে ছোট থেকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিল সে বুকে। মা মারা যাবার পর, সেই ছোট্ট মমকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে সে। মুখে তুলে খাইয়েছে, হাতে ধরে হাটা শিখিয়েছে, অসুখে-বিসুখে রাত জেগে বোনের পাশে কাটিয়ে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আজ সেই বোনটার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পরে যাচ্ছে তার কারণে। স্বর্গভূমিতে তো সে মমকে সুরক্ষিত রাখতে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এ কি হাল হয়েছে তার বোনটার?

“আমাকে ক্ষমা করে দিস মম।”
কথাগুলো প্রায় ফিসফিস করে বেরোয় তার ঠোঁট থেকে।
“আমি তোকে একা করে দিয়েছি। আমি ভেবেছিলাম, তুই সেফ থাকবি এখানে। তোকে প্রোটেক্ট করার দায়িত্ব তো আমার।”
দুচোখ ভরে ওঠে পাখির। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরে মমর হাতে।
“কিন্তু আমি… আমিই উল্টো তোকে বার বার বিপদে ফেলে দিচ্ছি। প্রথমে বাবা, আমার কারণে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে গেল। আর এখন তুই… আমি কিছুই ঠিক করতে পারছি না। সব এলোমেলো করে দিচ্ছি বরং।”
মাথা নিচু করে নেয় পাখি। চোখ থেকে ছলকে পরে আরো কয়েক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। মম হালকা নড়ে ওঠে। ভ্রু জোড়ার মাঝে ভাঁজ পরে তার। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় সে।

“আপু?”

“মম! তুই ঠিক আছিস? এখন কেমন লাগছে? ডাক্তার ডাকবো?”

“আমি ঠিকাছি।”

বড় বোনের অস্থিরতা দেখে মনটা ভারী হয়ে ওঠে মমর। এমনিতেই কত চিন্তায় থাকে পাখি। কত দায়িত্ব তার উপর। সেসবের মাঝে মম এসে আরো ঝামেলা বাড়াচ্ছে। শোয়া থেকে উঠে বসতে চায় মম। মুহূর্ত সাহায্য করে তাকে। পাখি এগিয়ে দেয় একটা পানিভর্তি গ্লাস। গ্লাসটা দুহাতে ধরে আস্তে ধীরে কয়েক ঢোক পানি গেলে মম। পাখির চোখের কোণে তখনও জল জমে আছে।

“কাঁদছো কেন আপু?”

“আমার ভুল হয়ে গেছে মম। তোকে আমি আমার দায়িত্বে এখানে এনেছি। কিন্তু… ”
গলা ভারী হয়ে আসে পাখির। কথা সম্পূর্ণ করতে পারে না সে। মমর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“তুই খুব ভয় পেয়েছিলি, না?”

“হুম। কিন্তু এখন তুমি আছো, আর কোন ভয় নেই।”

“আমি তোকে আর একা ছাড়বো না মম। আমার ভুল হয়ে গেছে।”

“ভুলটা তোমার না, আপু। তুমি সাথে থাকলেও হয়ত…”

ঈষৎ কেঁপে ওঠে মম সেই বিভীষিকাময় ঘটনার কথা স্মরণ করে। গলার কোথাও কিছু একটা আটকে আসে। ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করে। বিছানার চাদর খামচে ধরে সে। রাতের সেই দৃশ্য ভেসে উঠতে শুরু করে চোখের সামনে। রক্ত, ধুলো, আগুন!
আতঙ্কের জালে আটকা পরবার আগেই একটা স্পর্শ তাকে ফিরিয়ে আনে বাস্তবে। ঘোলাটে চোখে তাকায় মম। তার পায়ের কাছে নীরবে বসে আছে মুহূর্ত। এক হাত দিয়ে মমর পায়ের তালুতে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে ম্যাসাজ করে দিচ্ছে সে। অবাক হয় মম। কি করছে ছেলেটা! তার উচিত ওকে মানা করা। এভাবে পায়ে হাত দেওয়া তো ঠিক না। কিন্তু মম কিছু বলতে পারে না। উল্টো চোখজোড়া বন্ধ করে নেয় সে। কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকে। দু তিন মিনিট পর শরীর হালকা হয়ে আসে তার। মনে হয় যেন হাড়ে শক্ত করে লেগে থাকা জট একে একে খুলে যাচ্ছে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে চোখ খুলে তাকায় মম।

“শ্রেয়া আপু কোথায়? কেমন আছে এখন?”

“ট্রিটমেন্ট চলছে। আঘাতগুলো সারতে সময় লাগবে, তবে ভয়ের কিছু নেই আপাতত।”

প্রশ্নটা পাখিকে করলেও উত্তর আসে মুহূর্তের তরফ থেকে। পাখি আগে ছুটে এসেছে মমর কাছে। শ্রেয়ার সাথে এখনো দেখা করা বাকি।

“তুই রেস্ট নে। আমি শ্রেয়ার সাথে দেখা করে আসছি।”

মমর সাথে আরো কিছুক্ষন থেকে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে পাখি। দরজার পাশে দাঁড়ানো ঘোস্টকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে করিডোর ধরে এগিয়ে যায় সে। শ্রেয়ার কেবিনের কাছাকাছি চলে আসতেই পেছন থেকে ঘোস্ট এসে তার পথ আটকে দাঁড়ায়। মুখ তুলে তার দিকে তাকায় না পাখি। শুধু গম্ভীর মুখে বলে,

“সরো সামনে থেকে।”

“ভেতরে আক্রোশ আছে। এ সময় যাওয়াটা ঠিক হবে না।”

“কেন হবে না?”
খারাপ মেজাজটা আরো এক পারদ চড়ে। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে তাকায় সে ঘোস্টের দিকে।
“শ্রেয়া কি আক্রোশের অংশী? কি সম্পর্ক ওর শ্রেয়ার সাথে? কিসের জোরে অধিকার খাটায় সে শ্রেয়ার উপর?”

“সেটা ওদের ব্যাপার পাখি।”

“রাইট। ওদের ব্যাপারে আমাদের নাক গলানো উচিত না। কিন্তু নিজেদের ব্যাপারে তো কথা বলতে পারি, তাইনা?”

চোয়াল শক্ত করে বলে পাখি। ঘোস্টের উপর সাংঘাতিক ক্ষেপেছে সে আজ।

“তুমি কোন আক্কেলে এরকম একটা কাজ করলে ঘোস্ট? আমার বোনের উপর হামলা হয়েছে রাতে। ও হাসপাতালে ভর্তি, কিন্তু আমি কিছুই জানলাম না। তুমি তো ঠিকই টের পেয়েছিলে। তোমাকে জানানো হয়েছে হামলার কথা। তাহলে আমাকে জানালে না কেন? আমার ফোনটাও সরিয়ে রেখেছিল তুমি ইচ্ছে করে, তাই না? যাতে কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করতে না পারে।”

পাখির অভিযোগগুলোর বিপরীতে নির্লিপ্ত রইলো সে। বরাবরের মতই কন্ঠ নমনীয় করে সে বললো,

“তুমি ক্লান্ত ছিলে পাখি, ঘুমাচ্ছিলে। তোমাকে জাগানোর কোন প্রয়োজন আমি দেখিনি।”

“প্রয়োজন দেখোনি? কি করে দেখলে না তুমি প্রয়োজন? আমার বোন গোলাগুলির মাঝখানে আটকা পরে ছিল ঘোস্ট! আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আধমরা হয়ে পরে আছে হাসপাতালে। আর তুমি বলছো, কোন প্রয়োজন দেখোনি?”

“ঐ মুহূর্তে তোমাকে জাগলেও, তুমি কিছু করতে পারতে না। শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করতে।”

“হ্যাঁ, করতাম। ওটাই নাহয় করতাম! কেউ তো অন্তত ওদের নিয়ে ভাবতো! কারণ তোমাদের কারো তো মাথাব্যথাই নেই ওদের নিয়ে। বিশেষ করে তোমার! মমর যদি আজকে কিছু হয়ে যেত, তাহলে সেই দায়ভার কার হতো? আমি জানি, তুমি ওকে পছন্দ করো না। কিন্তু আমার কথাটা একবার ভাবলে না তুমি? ছোট থেকে যে মেয়েটাকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি, ওর যদি কোন ক্ষতি হয়, আমি সহ্য করতে পারবো?”

কথাটা মুখে আনতেও বুকটা কেঁপে উঠলো পাখির। চোখজোড়া জ্বলছে। ইচ্ছে করছে হাউমাউ করে একপ্রস্থ কেঁদে নিজেকে হালকা করতে। কিন্তু যেই পুরুষটির শার্ট ভিজিয়ে কেঁদে সে নিজের কষ্টগুলো ঝেড়ে ফেলে, স্বস্তি খুঁজে নেয় যার প্রশস্ত বুকের জমিনে, যে তার সাহস ও মনোবলের আধার, সেই আজ তার বোনের বিপদে উদাসীন, নির্লিপ্ত আচরণ করছে। পাখি জানে, ঘোস্ট অনুভূতিহীন, যান্ত্রিক। একমাত্র সে ছাড়া অন্য কারো প্রতি তার অনুভূতি বা সহানুভূতি কোনটাই কাজ করে না। শুধু লজিক দিয়ে হিসেব নিকেশ করে সিদ্ধান্ত নেয় সে। কিন্তু মম তো তার বোন। পাখির জন্যে কি মেয়েটার প্রতি একটু সহানুভূতি দেখানো যায় না?

“ওর কিছু হয়নি। সঠিক সময়েই উদ্ধার করা হয়েছে ওদের।”

ঘাড় ঘুরিয়ে করিডোরের শেষ প্রান্তে চোখ বুলিয়ে জানায় ঘোস্ট। আক্রোশের আবেগের গন্ধে এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে যেমন কালো ধোঁয়া কুন্ডলি পাকিয়ে উপরের দিকে উঠে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি আক্রোশের মিশ্র অনুভূতিগুলোও ছড়িয়ে পড়েছে। কেবিনের ভেতর থেকে কিছুক্ষন পরপর মৃদু গরগর আওয়াজ ভেসে আসছে। যদিও সেটা কেবিনের দরজা ভেদ করে পাখির কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। ঘোস্ট একবার ভাবলো পাখিকে এখান থেকে ফিরে যাবার কথা বলবে, কিন্তু পরক্ষণেই সেই চিন্তা বাদ দিলো সে। এই সময় ওকে ফিরে যাবার কথা বললে আরো রেগে যেতে পারে। যদিও এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোন লজিক সে খুঁজে পেলনা, তবুও পাখি যেহেতু থাকতে চাইছে, তবে তাই হোক।

ভাবনাটাকে আরো পাকাপোক্তভাবে সঠিক প্রমাণ করে পাখি করিডোরে থাকা একটা চেয়ারে উপর ধপ করে বসে পড়ে। মাথাটা নিচু করে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পরাজিতের ন্যায় বলে,

“এসব কিছুর মাঝে কোন কিছুই সঠিক হয়নি ঘোস্ট! আমি ওকে এখানে নিয়ে এসেছিলাম ওকে সুরক্ষিত রাখতে। কিন্তু এখানে এনে আরো বেশি বিপদে ঠেলে দিয়েছি।”

পাখির কণ্ঠে একরাশ মন খারাপের আভাস। ব্যাপারটা ভালো লাগলো না ঘোস্টের। সে এগিয়ে এসে বসলো তার অংশীর পাশে। পাখির সব কিছুতে তার ভাগ আছে। এমনকি অবসাদেও। যদিও এর কারণ তার লজিকের বাইরে, তবুও এর অংশীদারিত্ব সে ছাড়বেনা।

“তোমার কোন দোষ নেই এখানে সুকন্যা।”

“কিন্তু তোমার আছে! তুমি আমাকে কেন জানালে না তখন? কেন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে?”

তার দিকে তাকিয়ে তেজ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো পাখি। ঘোস্ট এই প্রশ্নে কোন যৌক্তিকতা খুঁজে পেল না। তবুও সে নমনীয় কণ্ঠে বললো,

“সিরিয়াস কিছু হলে, আমি হয়ত তখনি জানাতাম। তবুও আমাকে ক্ষমা করে দাও সুকন্যা। আই অ্যাম সরি। তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি আমি। তুমি বলেছিলে, মম হোস্টেলে থাকবে। আমিও তাই সেটা ভেবে নিশ্চিত ছিলাম, যে ও সুরক্ষিত আছে।”

“ও ছিলনা সুরক্ষিত। একদমই ছিল না। আমার বুকের ভেতরটা জ্বলছে ঘোস্ট। আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার কারণে মেয়েটা আজ এতবড় বিপদের মুখে পরেছে।”

ঘোস্ট একহাতে জড়িয়ে ধরে পাখিকে। পাখি চুপটি করে মুখ লুকিয়ে নেয় তার বুকে। চোখজোড়া বন্ধ করে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে সে সেখানে। ঘোস্ট গম্ভীর আওয়াজ তুলে বলে,

“চাইলেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়না পাখি। কেবল বোকারাই এটা বিশ্বাস করে যে, চাইলেই সব নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারি, যুদ্ধে নামতে পারি, পাহারা বসাতে পারি, রক্ষা করার শপথ নিতে পারি। কিন্তু কোন না কোনভাবে বিপদ ঠিক রাস্তা খুঁজে নেয়। কোন বিপদ আমাদের কাছে ঘেঁষতে পারবে না, সেটা ভেবে নিজেকে বোকা বানানোর চেয়ে, যেকোন বিপদের মুখে নিজেকে প্রস্তুত রাখা শ্রেয়।”

পাখি চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। মাথাটা এখনো ঘোস্টের বুকে ঠেকানো। স্থির চোখে পাখির চোখজোড়ার দিকে তাকালো সে। এক হাতে তাকে আগলে রেখে, অন্য হাতে আলতো করে তার গাল ছুঁয়ে দিলো। সেই চিরচেনা ভঙ্গিমায় আঙুলের স্পর্শে চোখের উপর এসে পরা অবাধ্য চুলগুলোকে গুঁজে দিল কানের পেছনে।

“তুমি ওকে সুরক্ষিত রাখতে চাও, ও সুরক্ষিত আছে। তুমি নিজের আয়ত্বের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছো। এরপরও নিজেকে দোষারোপ করাটা, তোমার অন্যায় হবে নিজের প্রতি। আর আমি সেটা হতে দেব না।”

পাখির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ছলকে ওঠে। সে জিজ্ঞেস করতে চাইছিল, কিভাবে আটকাবে তাকে ঘোস্ট। মনটাকে বন্দী করবে? কিন্তু সেটা তো আগে থেকেই তার খাঁচায় বন্দী!
তবে জিজ্ঞেস আর করা হলোনা। তার আগেই শব্দ করে বেজে উঠলো পাখির ফোন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো পাখির। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে সেটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরলো।

“হ্যালো,”

“হ্যালো, আপু! মম কোথায়? কতবার ফোন করেছি ওকে সকাল থেকে! রিসিভ করছে না কেন?”

ঝিনুকের কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে পড়ছে। সে নিশ্চিত মম ইচ্ছে করেই তার ফোন ধরছে না। পাখিকে সে সহজে ফোন করেনা এখন আর। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসার পর। যতই রাগ, মান অভিমান থাকুক না কেন, বোন তো বোনই হয়। ছোটখাট মান অভিমানে রক্তের টান ঢিলে হয় না কখনো। তাই সচরাচর কথা না হলেও, প্রয়োজনে ঠিকই হয়।

“মম একটু অসুস্থ। কি হয়েছে? ওকে ফোন করছিলি কেন?”

“অসুস্থ না ছাই! ওর সব বাহানা বুঝি আমি। আজকে ওর HSC পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। সেজন্যেই নাটক করছে, তাই না?”

রেজাল্ট বেরিয়েছে মমর? কপালে ভাঁজ পড়ে পাখির। একবার মমর কেবিনের দরজায় দিকে তাকায় সে।

“রেজাল্ট খারাপ করেছে?”

“শুধু খারাপ করেনি, জঘন্যরকম করেছে! আমি ইংরেজির শিক্ষক, আর আমার বোন কিনা ইংরেজিতে মাত্র 40% নাম্বার পেয়েছে। আর গণিতে তো পুরো ডাব্বা! ফেল করেছে গণিতে! একমাত্র ইতিহাসে 70% মার্ক তুলেছে। বাকি সাবজেক্টের অবস্থা দেখে আমার তো মনে হচ্ছে, ইতিহাসের মার্কি ভুল করেছে নিরীক্ষকরা। ওটা রিচেক করলে হয়ত, ওটাতেও ফেল আসবে!”

ঝিনুকের ঝাঁঝালো গলায় দেওয়া বিবৃতিতে পাখির মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়।

“এই মেয়েকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা। সব কমন প্রশ্ন এসেছিল। আমি নিজে ওকে পড়িয়েছি! ভাবতে পারছো! আমার প্রতিটা স্টুডেন্ট ভালো ভালো রেজাল্ট করে মিষ্টি দিয়ে যাচ্ছে বাসায়। আর আমার আপন বোন কিনা… আমার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে আপু! কোথায় ও? ফোনটা দাও দেখি, আজকে ওর কান, আমার গলা! যেকোন একটা না ফাটা পর্যন্ত ছাড়ছি না আমি!”

এতসব চিন্তার মাঝেও ঝিনুকের কথায় ফিক করে হেসে দেয় পাখি। ভাগ্যিস মম বাংলাদেশে নেই। থাকলে ওর কান টেনে ছিঁড়ে ফেলতো ঝিনুক।

“ও আসলেই অসুস্থ ঝিনুক। সুস্থ হলে আমি পাঠাচ্ছি তোর কাছে। তখন ইচ্ছেমত বকে নিস।”

একটু চমকালো ঝিনুক। মমকে নিয়ে যেভাবে হুট করে দেশ ছেড়েছে পাখি, তাতে ঝিনুক ভেবেছিল ওকে হয়ত আর সহজে দেশে ফিরতে দেবে না সে। ওখানকার কোন ইউনিভার্সিটিতেই হয়ত এডমিশন করিয়ে দেবে। টাকার তো আর অভাব নেই পাখির। আদরের ছোট বোনের জন্যে চাইলে যেকোন দরজা খুলে দিতে পারে সে। কিন্তু এখন যেহেতু ডাব্বা মেরেছে মম, সেহেতু আবার পরীক্ষায় বসতে তার দেশে ফিরতেই হবে।

“আসলেই পাঠাবে? তাহলে তো ভালোই। আমি আমার কলেজের পিয়নের সাথে কথা বলে রাখছি।”

“পিয়নের সাথে কি কথা?”

“বিয়ের কথা! এই মেয়েকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। ও দেশে আসলেই আমি ওকে আমার কলেজের পিয়নের সাথে বিয়ে দিয়ে দেব।”

“ফালতু কথা রাখ তো ঝিনুক। তুই বরং ওর গণিত খাতাটা রিচেকের ব্যবস্থা কর। অমনোযোগী, অলস হতে পারে, কিন্তু ফেল করার মত স্টুডেন্ট মম না। ও যদি খাতায় ৪০ এর উত্তর করে আসে, তবে ৪০ ই পাবে। সন্দেহ নেই। নিশ্চিত মার্কিয়ে কোথাও ভুল হয়েছে।”

“ঠিকাছে। ওকে পাঠাচ্ছ কবে? আর বাবা?”

ঝিনুকের প্রশ্নের উত্তর দিতে একটু সময় নেয় পাখি। পাখির বাবা, মামুন সাহেবের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। এখনো বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারেননি। তবে হাত পায়ের বল ফিরছে। নড়াচড়া করতে পারেন। মুখের কথাও ষ্পষ্ট হচ্ছে আস্তে আস্তে। মেয়েদের সাথে নিয়মিত ভিডিও কলে যোগাযোগ হয় তার। ভিনদেশে একা একা থাকলেও, খারাপ নেই উনি। তার মত চিকিৎসাধীন বয়স্ক লোকেদের নিয়ে বিভিন্ন এক্টিভিটিসের ব্যবস্থা আছে সেখানে। এতে তাদের শারীরিক অবস্থার যেমন উন্নতি হয়, তেমনি মানসিক অবসাদও কাটে।
ঝিনুকের সাথে মনোমালিন্য হলেও, বাবার ব্যাপারে সব আপডেট নিয়মিত পায় সে। কিন্তু পাখি চাইছে না মমকে আবার ঝিনুকের শ্বশুরবাড়িতে পাঠাতে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না পাখি। তাই একটু ভেবে বলে,

“দেখছি আমি। মম আগে সুস্থ হোক। ওকে কিছু বলিসনা ঝিনুক। একটা পরীক্ষার রেজাল্টই জীবনে সবকিছু না।”

তর্কে জড়ায় না ঝিনুক। পাখির সাথে অযথা তর্ক করে লাভ নেই। না বুঝে শুনে কথা বলে না পাখি। আর সে যেটা বোঝে, সেটা থেকে তাকে সরিয়ে আনার সাধ্য কারো নেই।

“ঠিকাছে। আমি অপেক্ষায় থাকবো ”

***

চলবে…

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহজাবীন
#পর্ব_১৭(১)

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বাড়িতে ফিরেছে ঘোস্ট। পাখি আর আজ মমকে একা ছাড়েনি, কিন্তু তাকে যেতে হয়েছে। গতকালের ঘটনা নিয়ে ঝামেলা চলছে মানুষদের সাথে। কিভাবে, কখন, কেন, কি কি হলো, সব নিয়ে ঘাটাঘাটি চলছে। এক তথ্য, এক বিবৃতি চার পাঁচবার করে আওড়াতে হচ্ছে।

ভাগ্যিস চাইনিজ নিউ ইয়ারের ছুটি চলছে! চায়নাতে এটাই ওদের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপুর্ন উৎসব। সরকারি ছুটিই থাকে সাত দিন বা তার বেশি। যাতে পরিবার নিয়ে একত্রে উৎসব উদযাপন করতে পারে সবাই। আর এই উৎসব চলে মাসখানেক ধরে। স্বর্গভূমি যেহেতু চীনেরই অংশ, তাই এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি এখানেও। নিয়ম অনুযায়ী সাত দিনের ছুটি বরাদ্দ করা হয়েছে সব স্টাফদের। ছুটি পেয়ে পরিবারের সাথে সময় কাটাতে চলে গেছে বেশিরভাগ মানুষ। শুধু অল্প কিছুসংখ্যক স্টাফ ছিল হামলার রাতে। যাদের মধ্যে সিংহভাগই গার্ড। পাহারারত অবস্থায় থাকায়, গ্রে’নেড হামলায় ধ্বসে পড়া ভবনগুলো মোটামুটি খালিই ছিল।
গুরুতর আহত হয়েছে অনেকে। সবার চিকিৎসা স্বর্গভূমিতে সম্ভব নয়। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ও সর্বাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলেও, পর্যাপ্ত ডাক্তার বা নার্স নেই স্বর্গভূমিতে। খুব সাবধানতার সাথে হাতে গোনা তিনজন ডাক্তারকে বাছাই করে জায়গা দেওয়া হয়েছে এখানে। তার মধ্যে শ্রেয়া নিজেই অসুস্থ। তাই আহতদের বাইরে পাঠানো হয়েছে চিকিৎসার জন্যে। সেসব নিয়ে সারাদিন ছোটাছুটি চলেছে ডিরেক্টর দেনিজ ইলকারের। সাহায্য করেছে HCO-এর অফিসাররাও।

এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও পাখি আজ সারাদিন মমর পাশেই ছিল। সকালে মমকে রিলিজ করে দেবার পর, সে মমকে কলোনীতে নিয়ে এসেছে। নিজের বাড়িতে!
এখন ঘোস্ট বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেটাকে একদৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে। ভেতর থেকে ভেসে আসা টুকটাক শব্দ ও মমর শরীরের গন্ধে তার মাথার বা পাশের একটা রগ ঈষৎ টনটন করে উঠলো। স্বভাবগত ভাবে হাইব্রিডার্সরা প্রচন্ড একরোখা, দখলদারী প্রবণতার। নিজেদের ব্যক্তিগত সীমানা খুব স্পষ্ট ওদের। ওদের জিনিস বা জায়গায় অনুমতিবিহীন প্রবেশ মানে সেই হাইব্রিডার্সকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। ওদের সংবেদনশীল ইন্দ্রিয় নিজের আস্তানায় অন্য কারো উপস্থিতি মেনে নিতে পারেনা। অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা ঘিরে ধরে ওদের। বিবাহিতদের ক্ষেত্রে তো ব্যাপারটা আরো বেশি অস্বস্তিকর। একমাত্র নিজের অংশী ছাড়া অন্য কোন অবিবাহিত তরুণীর প্রাকৃতিক গন্ধ অসহনীয়, বিরক্তিকর হাইব্রিডার্স ছেলেদের কাছে। সেজন্যেই পাখি এতদিন মমকে নিজের বাড়িতে আনেনি। সে চায়নি ঘোস্ট অস্বস্তিতে পরুক। কিন্তু এখন ব্যাপারটা ভিন্ন। মমর প্রতি এখন দরদ উথলে উঠছে পাখির, আর ঘোস্টের প্রতি রাগ। তাই কোনকিছুর তোয়াক্কা না করেই নিয়ে এসেছে ছোটবোনকে নিজের বাড়িতে।

ঘোস্টের বাড়ির সীমানা থেকে কিছুটা দূরে গাছের আড়ালে দাড়িয়ে আছে মুহূর্ত। সেদিকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ঘোস্ট। খুব করে চাইছে ঘোস্ট, মুহূর্ত তার সীমানার ভেতরে ঢুকুক। অন্তত এই বাহানায় কাউকে পেটানো তো যাবে! মারপিট করে যদি নিজের তীক্ষ্ম মেজাজটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে ক্ষতি কি! কিন্তু মুহূর্ত তাকে সে সুযোগ দিচ্ছে না। যদিও তার নিজের মেজাজের অবস্থাও একই রকম। সমস্যা একই। মম কেন ঘোস্টের বাড়িতে থাকবে? একই বাড়িতে, একই পরিবেশে, একই বাতাসে শ্বাস নেবে তার মোমোটা অন্য একটা পুরুষের সাথে! যেই বাতাসে তার মোমোর গন্ধ মিশে গেছে, সেই বাতাস প্রবেশ করবে ঘোস্টের নাসারন্ধ্রে! ঘোস্টের হরমোন ও ঘামের গন্ধ যেই বাতাসে আষ্টেপিষ্টে মিশে আছে, সেই বাতাস ছুঁয়ে যাবে তার মোমোকে! ব্যাপারটা ভাবতেই গা গুলিয়ে আসছে মুহূর্তের। মানুষরা কিভাবে পারে পরপুরুষ বা পরনারীকে নিয়ে এক বাড়িতে থাকতে? এতটা ভোঁতা ইন্দ্রিয়! পাখি ঘোস্টের অংশী হলে কি হবে, দিনশেষে মানুষের মানুষই রয়ে গেল। এ নিয়ে একপ্রস্থ মুহূর্তের সাথে ঝামেলা হয়ে গেছে পাখির। মোমোকে নিয়ে আসার সময় রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিল সে। কিন্তু পরবর্তীতে মোমোটার ছলছল করতে থাকা চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে আর কথা বাড়ায়নি।

এই মুহূর্তে ঘোস্টকে নিজের বাড়ির খোলা বারান্দায় দাঁড়ানো দেখে মেজাজটা খচখচ করছে মুহূর্তের। ইচ্ছে করছে, ওকে টেনে সরিয়ে আনতে। কিন্তু নিজের বাড়িতে যাওয়া থেকে তো আর আটকানো যায়না তাকে।

মুহূর্ত সীমানা পেরিয়ে আসবেনা জেনে, একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ঘোস্ট। চাবির সাহায্যে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো সে। আর ঢুকতেই, দুটো মেয়েলি গন্ধ চারপাশ থেকে আঁকড়ে ধরলো তাকে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে ঘোস্টের। নিজের আবাসস্থলে অন্য নারীর উপস্থিতি, এই অনুপ্রবেশ মেনে নিতে পারেনা তার ভেতরের আদিম, বুনো সত্ত্বাটা। কিন্তু তখনই জোর করে সে নিজেকে মনে করায়, ঠিক কোন পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছে মেয়েটা। সকালেও ফ্যাকাশে মুখে হাসপাতালের বেডে পড়েছিল। আর পাখি? তারচেয়ে ভালো করে কি পাখির অনুভূতিদের কেউ বুঝতে পারবে? পাখির প্রতিটি অনুভূতি গভীরভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতা, প্রকৃতি একমাত্র তাকেই দিয়েছে। সে তো জানে, জীবন ও সম্পর্কগুলোর মাঝে সমতা বজায় রাখতে কতটা কষ্ট করছে তার সুকন্যা। সবসময় সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখেছি পাখি তাদের সম্পর্ককে। তবে কি আজ সে তার সুকন্যার জন্যে এটুকু সহ্য করে নিতে পারবে না?

চেষ্টা তো করতেই হবে। একটা ঢোক গেলে ঘোস্ট। মমর উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে, পাখির চিরচেনা মিষ্টি সুবাসটায় মনোযোগ দিল সে। লম্বা করে একটা প্রশ্বাস ছেড়ে জুতো খুলে সু রেকে রাখতে উদ্যত হলো। কিন্তু জুতোটা রাখতে গিয়ে থমকালো সে। পাখির ক্যান্ডেল হিলের জুতো জোড়ার পাশে রাখা মমর এঙ্কেল বুট। দৃশ্যটা পছন্দ হলো না ঘোস্টের। দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো তার। সে মোজা পরা পায়ের দু আঙুলের সাহায্যে মমর জুতো সরিয়ে উপরের তাকে রেখে, নিজের জুতো জোড়া গুছিয়ে রাখলো পাখির হিলের পাশে।

ড্রয়িং রুমে বসে আছে মম। সোফায় হেলান দিয়ে সামনের টি টেবিলে দু’পা উঠিয়ে রেখেছে সে। কোলে একটা কুশন, কোমড়ের পেছনে আরেকটা এবং তৃতীয়টা স্থান পেয়েছে মমর মাথার পেছনে। কোলে রাখা কুশনের উপর একটা কাচের বড় বোল। সেটাতে আছে মচমচে কলার চিপস। মমর পাশেই সোফার উপর কাত হয়ে পড়ে আছে একটা খালি সোডার ক্যান। সেটা থেকে অবশিষ্ট কয়েক ফোঁটা মিষ্টি পানীয় টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়েছে সোফার উপর। জায়গাটা এখন গোলাপী হয়ে আছে। টেবিলের উপর আরেকটা আধ খাওয়া কোকের বোতল রাখা। ঠিক মমর পায়ের কাছে। যেকোন সময় একটু ধাক্কা লাগলেই ওটা মাটিতে গড়াগড়ি খাবে। টেবিলের উপরে গুছিয়ে রাখা ম্যাগাজিনগুলো এখন ঝুলছে সোফার হাতলে। সোফার নীচে পরে আছে পাখির সাধ করে কেনা নীল কুশিকাটার থ্রো ব্ল্যাঙ্কেট। সেটার এক কোণা আটকে আছে মমর কোলের কুশনটার নীচে। দূর থেকেও ব্ল্যাঙ্কেটের উপর পরা চিপসের গুড়ি গুড়ি অংশবিশেষ এড়ালো না ঘোস্টের তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে।
দিনখানেক আগেও এই সোফার উপর পাখিকে কোলে নিয়ে বসে ছিল সে। ক্লান্ত হয়ে তার বুকে গুটিসুটি মেরে পরে ছিল তার সুকন্যা। আর ব্ল্যাঙ্কেটটা দিয়ে ঢাকা ছিল দুজনের বিবস্ত্র কায়া। এখন সে কথা মনে পরতেই ঘোস্টের চোখমুখ বিতৃষ্ণায় কুচকে এলো। তার নিখুঁত, গোছানো ঘরটার চেহারা বদলে গেছে এক দিনেই।

টিভিতে একটা কোরিয়ান মুভি চলছে। মম হা করে সেটা গিলছে। আর একটু পরপর একটা করে চিপস মুখে দিয়ে মৃদু শব্দ তুলে চিবুচ্ছে। ঘোস্ট নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইছিল, কিন্তু তার ছায়া এসে পরায়, টিভি থেকে চোখ সরিয়ে তাকালো মম। ঘোস্টকে দেখেই দাঁত বের করে একটা হাসি দিল মম।

“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া!”

মমর সালামের উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করলো না ঘোস্ট। একপলক তার দিকে তাকিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে। সেদিকে তাকিয়ে একটা কুটিল হাসি দিয়ে আবারও টিভির স্ক্রিনে মনোযোগ দিল মম।
এদিকে রান্নাঘরে ব্যস্ত সময় পার করছে পাখি। মমর পছন্দের খাবার রান্না করছে সে। কেরেলা এগ রোস্ট, নার্গিসি কোফতা, পাতলা মসুর ডাল আর ঝরঝরে বাসমতি চালের ভাত। পাখি অবশ্য এত ভারী খাবার খায়না সাধারণত রাতে। আর ডিম জিনিসটা খুব একটা পছন্দ না ঘোস্টের। তাই তার জন্য ভেজিটেবল স্যুপ করেছে। সব আয়োজন প্রায় শেষ। তবে শেষে এসে তার মনে হলো, ডিমের অমলেটটাও করলে ভালো হয়।

ঠিক সেসময়ই পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল ঘোস্ট। সব ফেলে দু মিনিট চোখ বন্ধ করে মুহুর্তটা উপভোগ করে নিল পাখি। ঠোঁটে ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পরলো ওপেন কিচেনে দাঁড়িয়ে আছে তারা। যেকোন সময়, যেকোন দিক থেকে উঁকি দিলেই, মম দেখে ফেলবে তাদের। পাখি তাড়াতাড়ি চোখ খুলে মোচড়ামুচড়ি শুরু করলো। ঘোস্ট কপালে ভাঁজ নিয়ে ছেড়ে দিল তাকে। তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির উত্তরে পাখি বললো,

“মম আছে। এদিকে এসে পড়লে!”

কথাটা পছন্দ হলো না ঘোস্টের। তবে সেটা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাববার সময় দিল না পাখি তাকে। তার হাতে দুটো কাঁচা মরিচ, আর লেবু ধরিয়ে দিয়ে বললো,

“এগুলো কেটে দাও তো। আগে লেবু কাটবে। পাতলা পাতলা করে স্লাইস করবে। আর মরিচটাও একদম ছোট ছোট করে কুচি করো। ওমলেটে মরিচ কচকচ করলে খেতে চায়না মম।”

মরিচ আর লেবু হাতে নিয়ে দাড়িয়ে রইলো ঘোস্ট। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো তার স্ত্রীর দিকে। তবে পাখির সেদিকে দেবার মত মনোযোগ নেই। সে ব্যস্ত হাতে ডুবো তেলে সাঁতার কাটতে থাকা নার্গিসি কোফতা উল্টে পাল্টে তেল ঝরিয়ে নামাচ্ছে। ঘোস্ট অগ্যত লেবু ও মরিচ ধুয়ে নিয়ে নির্দেশনা অনুযায়ী কাটা শুরু করলো।

রান্নার আয়োজন শেষে টেবিলে সবকিছু গুছিয়ে রাখছে পাখি। মম ও ঘোস্ট দুজনেই ফ্রেশ হয়ে এসে বসে পরলো মুখোমুখি দুটি চেয়ারে। মাঝখানে বসলো পাখি। টেবিলে ডিম আর ডিম দেখে খুশি হয়ে গেল মম। প্রশস্ত হেসে খাওয়া শুরু করলো সে। ঘোস্ট চুপচাপ স্যুপ নিয়ে বসলো। পাখি এটা ওটা পাতে তুলে দিচ্ছে মমকে। নিজেও এক চামচ ভাত নিল সে। মমকে সঙ্গ দিতে লেবু আর কোফতা দিয়ে শুকনো দু লোকমা ভাত একটু একটু করে মেখে খেতে লাগলো। ঘোস্টকে শুধু স্যুপ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখে কপাল কুঁচকে মম জিজ্ঞেস করলো,

“একি ভাইয়া! আপনি তো কিছুই খাচ্ছেন না। এই ডিমের কোফতাটা খেয়ে দেখুন, কি মজা!”

ঘোস্ট একপলক তাকালেও কোন উত্তর দিল না তাকে। তার জায়গায় পাখি বললো,

“ও ডিম খায়না তেমন একটা।”

“ওহ্! ডিম খায়না? কি অদ্ভুত! ডিম আবার খায়না কিভাবে?”

বলতে বলতেই একটা নার্গিসি কোফতার মাংসের প্রলেপটা ছাড়িয়ে, ভেতরের আস্ত ডিমটা মুখে পুরে নিল সে। ঘোস্ট বার কয়েক চোখের পলক ফেলে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। বেলুনের মতো ফুলে উঠেছে মমর গাল দুটো। মাথার চেয়ে গালের আকার বড় মনে হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে নিশ্চিত ছিল, নির্ঘাত এবার ডিম গলায় আটকে মরবে মেয়েটা। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মম ডিমটা ঠিক কায়দা করে গিলে খেয়ে ফেললো।

“ভাইয়া, ডিম অতি সুস্বাদু, পুষ্টিগুণ সম্পন্ন, আন্তর্জাতিক মানের উপাদেয় খাদ্য। এটা না খাওয়ার কি আছে? ডিম ছাড়া কোন খাবার হয় নাকি! এইযে আপনি সবজি সেদ্ধ করা পানি খাচ্ছেন, এতে কি শরীরে বল পাবেন? নাহ্! একদম না। দু’দিন পরেই তো লতার মত নেতিয়ে পরবেন এসব খেয়ে।”

মমর কথা শুনে হালকা কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিল পাখি। ঘোস্ট মমর দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শুধু।

“থাক না মম। খানা, আর গান দুটোই নিজের পছন্দ অনুযায়ী হওয়া উচিত। তুই খাবারে মন দে। ডিমের রোস্টটা কেমন হয়েছে?”

“একদম ফাটাফাটি! কত বছর পর তোমার হাতের মাসালা এগ রোস্ট খাচ্ছি আপু!”

বলেই পাখির হাত টেনে এনে তার উল্টো পিঠে একটা চুমু দিয়ে বসলো মম। সাথে সাথে শব্দ করে চামচটা স্যুপের বাটিতে ফেলে দিল ঘোস্ট। পাখি আড়চোখে তাকালো তার দিকে। পাখির হাতের দিকে তাকিয়ে আছে সে। তার নীল লেন্সের যান্ত্রিক বা চোখটা জ্বলজ্বল করছে। টেবিলের উপর রাখা বা হাতটা আলতো করে মুষ্ঠিবদ্ধ করে রেখেছে সে। এছাড়া অন্য কোন বাহ্যিক পরিবর্তন লক্ষণীয় নেই। তবে ভেতরে ভেতরে যে সে ফুঁসছে, সেটা আলাদা করে বলে দিতে হলো না পাখিকে।

“ভাইয়া, আপনিও খেয়ে দেখুন। এই জিনিস না খেলে লাইফটাই লস!”

বলেই পেঁয়াজ রসুনের ভারী আস্তরণে মাখা একটা আস্ত মশলাযুক্ত ডিম টুপ করে ঘোস্টের স্যুপের বাটিতে ফেলে দিল মম। জোরে একটা শ্বাস টেনে নিল পাখি। হা করে কয়েক সেকেন্ড সে তাকিয়ে রইলো স্যুপের বাটিতে ভাসমান তেল চিটচিটে ডিমটার দিকে। তারপর মুখ তুলে তাকালো মমর দাঁত বের করা হাসিহাসি মুখটার দিকে। সবশেষে সে ভয়ে ভয়ে তাকালো ঘোস্টের মূর্তির মত স্থির অবয়বের দিকে।

মম তো মনে মনে বেজায় খুশি। ভূত ভাইটাকে জব্দ করার সুযোগ পেয়েছে সে আজ। ডিম খায়না! কি সাংঘাতিক ব্যাপার! মমর মতে, যারা গোলগাল সিম্পল ডিম খায়না, তাদের ভেতরে মারাত্মক ঘাপলা থাকে। এরা সব টক্সিক মেন্টালিটির হয়। আলাভালা হবার ভান ধরে এরা আশেপাশের মানুষদের দিয়ে খাটিয়ে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করে! যদিও তার এই ধারণার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবুও এটাই মনে প্রাণে বিশ্বাস মমর।

স্যুপের বাটিটা দু আঙুলের সাহায্যে কিছুটা সামনে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঘোস্ট মমকে জিজ্ঞেস করলো,

“ডিম খুব পছন্দ তোমার?”

মম একহাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভান করে হালকা হেসে বললো,

“ডিম আবার কার না পছন্দ? ডিম হচ্ছে ডুমডুমাডুম ডিম!”

প্লেট থেকে ডিমের অমলেটের একটা বড় টুকরো ছিড়ে সেটা হাওয়ায় ঝুলাতে ঝুলাতে মম গেয়ে উঠলো,

“ছোটদের বড়দের সকলের…..
গরীবের নিঃস্বের ফকিরের….
মুরগিরই ডিম…সব মানুষের….
সব মানুষের….”

গান শেষে টুপ করে ডিমের টুকরোটা মুখে পুরে নিল মম। এদিকে পানি পান করতে গিয়ে হাসি ও কাশি একত্রে উঠে গেল পাখির। ঘোস্ট একহাতে ওর পিঠে ম্যাসেজ করে দিল সে শান্ত না হওয়া পর্যন্ত। এদিকে মমও হাসছে মনখুলে। দু’বোনের হাসাহাসি শেষ হলে ঘোস্ট সরল কণ্ঠে মমকে আবারো প্রশ্ন করলো,

“ডিম কোথা থেকে আসে, জানো?”

মম কাঁধ ঝাকিয়ে উত্তর দিল,

“সেটা ডিপেন্ড করে কিসের ডিম তার উপর। মুরগির হলে, মুরগি থেকে। হাঁসের হলে, হাঁস থেকে। কবুতরের হলে, কবুতর থেকে।”

ঘোস্ট মাথা নেড়ে বলে,

“ঠিক। প্রজাতিগত ভিন্নতা থাকলেও, উৎপত্তিস্থল কিন্তু এক।”

ভ্রু কুঁচকে তাকালো মম। ঘোস্ট একটু থেমে আবারও বললো,

“জন্মানোর পাঁচ মাস পর থেকেই মুরগির ডিম্বাশয়ে ওভা পরিপক্ব হতে শুরু করে। একটা পরিপক্ব ওভামকে বলে কুসুম। কুসুম ইনফান্ডিবেলুম নামক সরু নলে অবতরণ করে অপেক্ষা করে। জমাটবাঁধা, আঠালো সে অংশে প্রবেশ করে মোরগের শুক্রাণু।”

মমর মুখের হাসিটা এক নিমিষে চুপসে গেল। কিন্তু ঘোস্ট তো মাত্র শুরু করেছে। সে বলতেই থাকে।

“একটিমাত্র শুক্রাণু সেই কুসুম তথা ডিম্বাণুর প্রাচীর ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর শুরু হয় কোষ বিভাজন। সেখানে সেই নীরব, পিচ্ছিল, উষ্ণ নালীর ভেতরে শুরু হয় প্রাণের সঞ্চারণ। ডিমটা ভেঙে বাচ্চা মোরগ বেরোবে, নাকি মুরগি, সেখানেই নিশ্চিত হয়ে যায়। এরপর ম্যাগনামে গিয়ে কুসুমের গায়ে সাদা স্তর জমা হতে শুরু করে। ইউটেরাসে সৃষ্টি হয় খোলস। প্রায় বিশ ঘণ্টা মুরগির ইউটেরাসে খোলস গঠনের অপেক্ষায় ছিল তোমার প্লেটের ঐ ডিমটা।”

আঙুলের ইশারায় মমর প্লেটের আধখাওয়া অমলেটটা দেখিয়ে দেয় ঘোস্ট। মম বিস্ফোরিত নয়নে তাকায় নিজের প্লেটের দিকে।

“ইউটেরাসে খোসা তৈরি শেষে ভ্যাজাইনার পথ ধরে ডিমটা গিয়ে পৌছায় ক্লোয়াকাতে। এখানে বাকি মলমূত্র ও অন্যান্য বর্জ্যের সাথে মাখামাখি অবস্থায় বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট চেপে থাকে ডিমটা। প্রায় সাড়ে সাত হাজার ছোট ছোট সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে ডিমের খোলসে, বাতাসের আর্দ্রতা ও ডিমের অভ্যন্তরীণ ফ্লুইডে সমতা বজায় রাখতে। ডিমটা ওইসকল ছিদ্র নিয়েই বর্জ্যে পরিপূর্ণ থলিতে মাখো মাখো অবস্থায় থাকে। ততক্ষণ, যতক্ষণ না পেশি শিথিল হয়ে লেজের নিচের ছিদ্র দিয়ে টুপ করে মাটিতে পরে। আর এভাবেই পৃথিবীতে আগমন ঘটে তোমার ডুমডুমাডুম ডিমের।”

ফ্যাকাশে মুখে চোখ তুলে তাকালো মম আবারো ঘোস্টের দিকে। চোখের কোণটা প্রথমে হালকা কেঁপে উঠলো তার। পরমুহুর্তেই চোখমুখ কুঁচকে মৃগী রোগীর মত সারা শরীর কেঁপে উঠলো মমর। চেয়ার ছেড়ে এক দৌড় দিল সে বেসিনের দিকে। পাখি সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। নিজের আধখাওয়া কোফতার ডিমটা সরিয়ে রেখে ঘোস্টের দিকে বাঁকা চোখে তাকালো সে।

“একটু স্যুপ খেয়ে নাও সুকন্যা। নইলে লতার মত নেতিয়ে পরবে।”

একটা বাটিতে পাখির জন্যে স্যুপ বেড়ে এগিয়ে দিয়ে বললো ঘোস্ট।

***

চলবে…

#শরতের_কাশফুল
#লেখনীতে_মাহ্জাবীন
#পর্ব_১৭(২)

বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে মম। কিছুতেই ঘুম চোখে ধরা দিচ্ছে না। ঘড়িতে বাজে সবে আটটা। এত তাড়াতাড়ি ঘুমের অভ্যাস নেই মমর। অন্য সময় ফোনে অনবরত স্ক্রল করে সময় পার করে সে। কখন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যায় টেরই পাওয়া যায় না। কিন্তু আজ আর ফোনটা হাতের কাছে নেই। শ্রেয়ার বাড়িতে ফেলে এসেছিল সম্ভবত। সোজা হয়ে শুয়ে কিছুক্ষন ধূসর সিলিংটার দিকে তাকিয়ে রইলো মম। মনে মনে এক থেকে গোনা শুরু করলো। এভাবে গুনলে নাকি ঘুম এসে পড়ে। কোথায় শুনেছিল সেটা মনে নেই। তবে এই মুহূর্তে চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি!

এক…
দুই….
দশ….
একশো তিরানব্বই….
তিনশো পঁচিশ…

গুনতে গুনতে সাতশো পঁচাশি পর্যন্ত চলে গেল মম। তবুও ঘুম এলো না চোখে। বিরক্ত হয়ে বিছানায় উঠে বসলো সে। একই সময়ে পেটটাও গুড়গুড় আওয়াজ তুলে জানান দিল, ক্ষিধে পেয়ে গেছে তার।
ঘোস্টের মুখ থেকে ডিমের আত্মজীবনী শোনার পর আর ডিম মুখে রোচেনি মমর। তার পছন্দের ডিম ফেলে রেখে সে গিলেছে সবজির স্বাদহীন স্বাস্থ্যকর স্যুপ। ঐ পাতলা পানি খেয়ে কি আর পেট ভরে!
ডিনার শেষে আর কাবাবে হাড্ডি হয়ে ভূত ভাইটাকে জ্বালাতে চায়নি সে। তাই রেস্ট নেবার বাহানায় তার জন্য বরাদ্দ গেস্ট রুমটায় এসে পড়েছে। কিছুক্ষন ম্যাগাজিন নিয়ে নাড়াচাড়া করে, একটা বই হাতে তুলে নিয়েছিল সে। মরগান হাউসেলের দ্যা সাইকোলজি অফ মানি।

দু মিনিটও শান্ত হয়ে সেটাতে মনোযোগ দিতে পারেনি মম। এসব কি আর তার জন্যে। এসব পরে পাখির মত জ্ঞানী গুণী মহীয়সীরা! নিজেকে ভেঙে চুরে গোড়া থেকে আমূলে পরিবর্তন করেছে পাখি। সে তো আর রোমান্টিক গল্প উপন্যাস পড়ে নয়। মম ভাবলো, লাইব্রেরি থেকে কিছু রোমান্টিক বই এনে রাখা যেতে পারে এখানে। তবে কালকের পর লাইব্রেরীটা কি আর অক্ষত আছে? উত্তর জানা নেই মমর। গতরাতের ঘটনাগুলো আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গোলাগুলির শব্দ, রক্ত, আতঙ্ক!
মাথাটা জোরে দু হাতে চেপে ধরে ঝাঁকায় মম। নাহ্! সেসব আর মনে করতে চায়না সে। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মম। পায়চারি করতে থাকে সারা ঘরে। কিন্তু বুকের ভেতরে চাপ অনুভব করতে শুরু করে সে। মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছে। অস্থিরতা বাড়তে থাকে মমর। দু হাঁটুতে হাত দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়ায় সে। মনে মনে উল্টো গোনা শুরু করে মম। স্মৃতির ভবরে না ফেঁসে মনোযোগ দিতে চায় অংকের সংখ্যায়। তখনই হঠাৎ কিছু একটা এসে তার পায়ের কাছে পরে। ভ্রুজোড়া কুচকে তাকায় মম। ধীরে ধীরে বস্তুটা হাতে তুলে নেয় সে।

রুমালে জড়ানো এক টুকরো ছোট্ট ডাল। দুমড়ে মুচড়ে ডালটাকে রুমালে পেচিয়ে ছুঁড়ে মেরেছে কেউ। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে মম। ইট পাথর ঢিল মারতে দেখেছে সে মানুষকে, কিন্তু গাছের ডাল রুমালে পেচিয়ে মারতে প্রথম দেখছে। কাজটা কার এবং কি উদ্দেশ্যে করা সেটা জানার প্রবল আগ্রহ নিয়ে সে জানালার কাছে চলে এলো। কৌতূহল নিয়ে বাইরে উকি দিয়ে দেখলো বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি অবয়ব। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখতে পারছে না মম। তবে অবয়বটি তাকে হাতের ইশারা করতেই, শরীরের গঠন, কাঁধ কাঠি মিলিয়ে সে বুঝলো, এটা মুহূর্ত। ইশারায় মমকে বাইরে ডাকছে সে।

মম কিছুক্ষন দ্বিধান্বিত হয়ে দাড়িয়ে রইলো। কিন্তু কৌতূহলের কাছে হার মেনে, সে পা বাড়ালো রুমের বাইরে। অন্ধকার করিডোর ধরে এগিয়ে এসে সে দেখলো, ডাইনিং টেবিলের উপর, ডিজাইন করা সিলিংয়ে মৃদু হলুদ বাতি জ্বলছে। সে আলোয় আলোকিত হয়ে আছে লিভিং রুম, রান্নাঘর সহ পুরো ওপেন এরিয়াটা। আশেপাশে পাখি বা ঘোস্ট কাউকেই দেখলো না মম। নিস্তব্ধ হয়ে আছে পুরো বাড়িটা। নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটাও ভারী মনে হচ্ছে মমর। মম শ্বাস আটকে পা টিপে টিপে এগিয়ে এলো সদর দরজাটার দিকে। অতি সাবধানতার সহিত ধীরে ধীরে দরজার লক খুলে সামান্য ফাঁক করলো। মৃদু একটা শব্দ হলো লক খোলার। কিন্তু নিস্তব্ধ বাড়িতে সেই শব্দটাই জোরালো শোনালো। চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে নিল মম। তার মনে হলো, এখনই বোধহয় কেউ না কেউ এসে ধরে ফেলবে তাকে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পার হয়ে যাবার পরও যখন সব পূর্বের মতই নীরব থাকলো, তখন চোখ খুললো মম। নিশ্চিন্ত মনে দরজা যৎসামান্য ফাঁক করে বাইরে বেরিয়ে এলো। সামনের খোলা বারান্দা পেরিয়ে উঠোন, উঠোনের চারদিক ঘেরাও দেওয়া। সেই সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মুহূর্ত। মম চপল পায়ে দূরত্ব পেরিয়ে এগিয়ে এলো তার কাছে।

কালো হুডি পরে, দুহাত জিন্সের পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল মুহূর্ত। চাঁদের ম্লান আলোয় অদ্ভুত রহস্যময় লাগছে তাকে। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। হাওয়ার সাথে চলেছে গাছের পাতাদের অদৃশ্য ফিসফিসানি। না জানি কোন অজানা গল্পের চর্চায় তাদের এই উল্লাস! মমর খোলা চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে বাতাসের কোমল স্পর্শ। একটা ঢলঢলে সালমন পিংক কালারের টিশার্ট ও সাথে কালো ট্রাউজার পরনে তার। শার্টের সামনে প্রিন্ট করা হ্যালো কিটির লোগো। প্রায় কাছাকাছি এগিয়ে এসে হুট করেই হোঁচট খেয়ে সামনের দিকে পরে যেতে নেয় সে। ব্যাপারটা ঘটতে দেরি হয়, কিন্তু মুহূর্তের তাকে দু’বহুর মাঝে আগলে নিতে দেরি হয়না।

মধ্যাকর্ষণ তাকে টেনে মাটিতে মিশিয়ে দেবার আগেই, এক হাতে মমর কোমড় আঁকড়ে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল মুহূর্ত। অন্য হাতটা সমতা আনতে চলে গেল তার ঘাড়ের পেছনে। কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে এলো সে। শূন্যে ঝুলে রইলো মম। তার লম্বা চুলগুলো পেছনে মাটি ছুঁই ছুঁই করে দুলছে হাওয়ায়। আকাশে এক টুকরো মেঘ ভেসে এসে ঢেকে দেবার চেষ্টা করছে চাঁদটাকে। কিন্তু সেই মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে রূপালী আলোয় স্নান করিয়ে দিচ্ছে সে ধরণীকে। চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে মমর চেহারায়। তার কাজল কালো চোখের মণিতে প্রতিফলিত হচ্ছে সেই আলো। চোখজোড়া চকচক করে উঠছে তার। অন্য সময় হলে হয়ত, হোঁচট খেয়ে মৃদু আওয়াজ তুলে চিৎকার করে উঠতো মম। শ্বাস আটকে আসতো ভয়ে। শ্বাস তার আটকে এসেছে ঠিকই, তবে ভয়ে নয়। এ অনুভূতি ভয়ের নয়।

স্থির হয়ে আছে মুহূর্ত। তার হাতের উষ্ণ স্পর্শ স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে মম। সেই উষ্ণতা পৌঁছে যাচ্ছে পিঠ ছাড়িয়ে বুকের গহীন পর্যন্ত। দুহাতে মুহূর্তের কাঁধের কাছটা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে সে। ইঞ্চিমাত্র দূরত্ব তাদের মাঝে। হুডির আড়াল থেকে চুলগুলো বেরিয়ে এসে কপাল ছুঁয়েছে মুহূর্তের। উদাসীন বাতাস আলতো করে ছুয়ে এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে তাদের। তীক্ষ্ম চোয়াল ছুঁয়ে চুইয়ে পড়ছে চাঁদের আলো তার সোনালী চামড়ায়। সেই আলো শুষে ভেতর থেকে নীলচে আভায় জ্বলে উঠছে সে। সরু, তীক্ষ্ম, ঐ মধুরঙা চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে অন্ধকারে।

মৃদু হাসি ফুটে ওঠে মমর ঠোঁটে। মনে পড়ে যায় তার, মুহূর্তের সাথে প্রথম সাক্ষাতের রাতটির কথা। এরকমই এক অন্ধকার রাতে প্রথম দৃষ্টিমিলাপ হয়েছিল তার এই মধুরঙা চোখগুলোর সাথে। সেদিন কি ভয়টাই না পেয়েছিল সে! অথচ, আজ এই চোখগুলোই তাকে হাসায়, ভরসা দেয়, বিশ্বাস যোগায়। খুব বেশিদিন আগের কথা তো নয়। এরমাঝেই এত পরিচিত কি করে হয়ে উঠলো এই চোখজোড়া?

“আমি পরে যেতে নিলেই, তুমি প্রতিবার এসে সামলে নাও কি করে?”

ঠোঁটে মিষ্টি হাসিটা লেগেই আছে মমর। সেটা দেখে হাসি ফুটে ওঠে মুহূর্তের ঠোঁটেও।

“ম্যাজিক!”

মাথাটা এলিয়ে শব্দ করে হেসে ওঠে মম। দুলে ওঠে তার পুরো কোমল কায়া। কোন চিন্তা নেই, ভয় নেই, মলিনতা নেই সেই হাসিতে। পা দুটো হেলায় মাটি ছুঁয়ে আছে কোনমতে। শূন্যে আটকে থেকেও প্রাণখুলে হাসছে মেয়েটা। পায়ের নীচে মাটি না থাকলেও, তাকে আঁকড়ে ধরে রাখা ছেলেটির প্রতি বিশ্বাস আছে। সেই অগাধ বিশ্বাসেই হয়ত এতটা আন্দোলিত তার হৃদয়। মুগ্ধ নয়নে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে তাকে দেখছে মুহূর্ত। চাঁদের ম্লান আলোকরশ্মি তাকে ছুঁয়ে স্বর্গীয় হয়ে উঠছে যেন।

হাসি থামিয়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে চায় মম। মুহূর্তের ইচ্ছে করেনা মোমোটাকে ছাড়তে। প্রয়োজনের চেয়ে দুই সেকেন্ড অতিরিক্ত সময় নেয় সে। ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে আনে। মমর পায়ের দিকে ইশারা করে সে জিজ্ঞেস করে,

“জুতো কোথায়?”

পায়ের দিকে তাকিয়ে জিভে কামড় দেয় মম। মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলে,

“এইরে! জুতো পরতেই ভুলে গেছি। তুমি একটু অপেক্ষা করো, আমি এক্ষুনি জুতো পরে আসছি।”

বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে ঘুরে দাঁড়ালো সে। কিন্তু এক কদমও এগোতে পারলো না। পেছন থেকে তার হাত জড়িয়ে ধরে আটকে দিল মুহূর্ত। মম জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললো,

“লাগবে না। এভাবেই চলো।”

“কোথায়?”

“সেটা গেলেই দেখতে পাবে।”

মমর সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসলো মুহূর্ত। মম মাথা নেড়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, কি।

“খালি পায়ে হেঁটে যেতে হবে না। আমার কাঁধে ওঠো।”

“তোমার কাঁধে চড়ে যাবো?”

বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল মমর। মুহূর্ত শুধু মাথা নেড়ে নিশ্চিত করলো যে, হ্যাঁ, কাঁধেই চড়তে হবে। কিন্তু মম নড়লো না। সংকোচে কাচুমাচু করতে লাগলো সে। মমকে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অধৈর্য্য হয়ে পড়লো মুহূর্ত। সে টান দিয়ে মমর দু’হাত নিজের গলায় পেঁচিয়ে নিল। দুই হাঁটুর নীচে হাত গলিয়ে মোমোটাকে ধরে উঠে দাঁড়ালো সে। আচমকা নিজেকে এই অবস্থায় আবিষ্কার করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুহূর্তের গলা পেঁচিয়ে ধরে ঝুলে রইলো মম।

এতক্ষণে মুহূর্ত উপলব্ধি করতে পারলো যে, মম কেন সংকোচ করছিল। নিজ জায়গায় জমে গেল সে। শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। মমর শরীরের উষ্ণ আলিঙ্গন কাপড়ের আস্তরণ ভেদ করে ছুঁয়ে দিচ্ছে তাকে। নামমাত্র দূরত্বও নেই তাদের মাঝে আর। মেয়েটার শরীরের সমস্ত গোপন ভাঁজ এখন লেপ্টে আছে তার সাথে। বজ্রপাতে বজ্রাহত হবার মত সেই অনুভূতি বয়ে গেল শরীরের প্রতিটি শিরায় শিরায়। সমুদ্রে জোয়ার আসার মত প্রচণ্ড বেগে তার আদিম পুরুষসত্ত্বা আছড়ে পরে জানান দিচ্ছে নিজের উপস্থিতি। চোখজোড়া বন্ধ করে নিল মুহূর্ত সেই মুহুর্তের আবেশে। মমর ছোট ছোট, উষ্ণ নিশ্বাস ঘাড়ে এসে পরতেই পাথরের মত জমে গেল তার শরীর। লজ্জায়, না জানি অজানা কোন অস্বস্তিতে নড়ে চড়ে উঠলো মম। মুহূর্তের কাঁধে মুখ গুঁজে দিল সে। সেই উষ্ণ ভেজা স্পর্শে গোলে যাবার মত অবস্থা মুহূর্তের। বুকের ভেতর থেকে বের হতে চাওয়া চাপা গর্জনটা ঠোঁট কামড়ে আটকে রাখলো সে কোনমতে।

চোখ মেলে একটা শুকনো ঢোক গিলে হাঁটতে শুরু করলো মুহূর্ত। তার কাঁধের কাছ থেকে ফিসফিসিয়ে মম বললো,

“আমি হেঁটে যেতে পারবো।”

মুহূর্তও ভাবলো একবার। নামিয়ে দেবে কি? কিন্তু পরক্ষণেই সে চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো সে। এখন নামিয়ে দিতে গেলে নির্ঘাত লজ্জায় পরে যাবে মোমোটা। নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইবে তার কাছ থেকে। কিন্তু সেটা তো হতে দেওয়া যাবে না।
শুকিয়ে যাওয়া নিচের ওষ্ঠটা জিভের ছোঁয়ায় ভিজিয়ে নিয়ে মুহূর্ত বললো,

“পারবে, কিন্তু প্রয়োজন নেই। তোমার কি অসুবিধা হচ্ছে?”

শুকিয়ে আসা গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে পারল না মম। অসুবিধা? সে তো হচ্ছেই। অসুবিধা হচ্ছে তার নারীসত্ত্বার প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তার হৃদয়ের তীব্র ধুকপুকানিতে, আবেশে ভারী হয়ে আসা তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে। তার দু’পা ছড়ানো মুহূর্তের কোমড়ের দুদিকে। দু’পাশে তার হাঁটুর কাছটা দৃঢ় হাতে ধরে রেখেছে মুহূর্ত। খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতি। সামান্য নড়াচড়াতেও তার অতীব যত্নে আগলে রাখা স্পর্শকাতর অঙ্গদ্বয় পিষ্ট হচ্ছে মুহূর্তের পেশীবহুল পুরুষালী শক্ত পিঠে।
কথা বেরুচ্ছে না মমর মুখ থেকে। গলা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে, বহু কষ্টে সে জানালো,

“হুম। কিছুটা। এভাবে বস্তার মত কাঁধে ঝোলার অভ্যাস নেই আমার।”

“আর একটু। এইতো কাছাকাছি এসে পরেছি।”

বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে দেওয়া অদ্ভূত, অচেনা, নতুন সে অনুভূতির ঝড়কে উপেক্ষা করার চেষ্টা করলো মম। খোলা আসমানে ভাসমান রুপোর থালার মত চাঁদ, ঝিঁ ঝিঁ পোকার সম্মিলিত সুর, গাছগাছালিদের ধরণীর সাথে জুড়ে থেকেও বাতাসের কোলে খেলা করা। মনকে শীতল করে দেবার মত আবেগী পরিবেশ। গাছ গাছড়ার সারির মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া কাঁচা রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মুহূর্ত তাকে নিয়ে। প্রায় মিনিট সাতেক পর তারা পৌঁছালো অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা ছোট ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে।

আধুনিক ডিজাইনে কালো ও বেইজ রঙের মিশেলে নির্মিত বাড়িটি। চারদিকে ঘেরাও দেওয়া কয়েক ফুট উঁচু ইটের দেয়াল দিয়ে। প্রশস্ত কালো রং করা ভারী লোহার গেট পেরিয়ে ছোট একটা ঘাসে আবৃত লন। বসার জন্যে একপাশে একটা টেবিল ও তার দুপাশে দুটো বেঞ্চ রাখা। লনের অন্যপাশে একটা জিপ পার্ক করা আছে। গেট থেকে লনের মাঝখান দিয়ে সরু একটা হাঁটার পথ চলে গেছে সোজা বাড়িতে ঢোকার সিঁড়ির গোড়ায়। তিন ধাপে সিঁড়ি পেরিয়ে উঠতে হবে প্রশস্ত খোলা জায়গাটায়। সামনেই কাঠের সদর দরজা। দরজার বাম পাশে নিচতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত পুরোটা বিশেষ কাঁচ দিয়ে তৈরি জানালা।

কৌতূহল নিয়ে যখন বাড়ির বাইরের অংশটা দেখছিল মম, তখনই তাকে নিয়ে লন পেরিয়ে সদর দরজাটার সামনে এসে থামলো মুহূর্ত। নিচু হয়ে বসে মমকে নামিয়ে দিল সে।

“এটা কোথায় নিয়ে এলে? কার বাড়ি এটা?”

“এতদিন কারো ছিল না। আজ থেকে আমার।”

চাবির সাহায্যে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো মুহূর্ত। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। মম দাঁড়িয়ে রইলো দরজার কাছেই। এই অন্ধকারে ভেতরে ঢোকার সাহস পেলনা সে। কয়েক সেকেন্ড পর শব্দ করে সুইচ চেপে আলো জ্বেলে দিল মুহূর্ত। চোখের সামনে অনাবৃত হলো বাড়ির ভেতরের খোলা জায়গাটা। খোলা বলতে পুরোটাই ফাঁকা। ভেতরে আসবাবের কোন বালাই নেই।

“এ তো পুরো ফাঁকা বাড়ি। এখানে থাকবে কি করে?”

“আজকেই শিফট হয়েছি তো। বললে মানুষরা পুরো বাড়ি ডেকোরেট করে দেয়, কিন্তু এখন, কালকের হামলার পর এত দ্রুত সবকিছু সম্ভব হবে না। কিছুদিন সময় লাগবে, তাই আমি মানা করে দিয়েছি। ভাবছি, নিজেই পছন্দমত জিনিসপত্র এনে সাজাবো।”

“দারুন আইডিয়া! নিজের মনমত সাজিয়ে নেবে নিজের বাড়ি, সেটাই ভালো।”

মিষ্টি হেসে সায় জানালো মম। মুহূর্ত সম্মতি পেয়ে মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি আমাকে সাহায্য করবে?”

“অবশ্যই। আমি অনলাইনে অনেক সুন্দর সুন্দর ডেকরেশনের ছবি দেখেছি। তোমাকে পরে ফরোয়ার্ড করে দেব।”

“আমি দেখে কি করবো। তুমি বলে দিও, কোথায় কি লাগবে, আমি ব্যবস্থা করে দেব।”

বলতে বলতে সোজা গিয়ে ডানপাশের দরজা দিয়ে অন্য একটা রুমে চলে গেল সে। মমও গেল পিছু পিছু। রান্নাঘর এটা। টুকটাক কিছু জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে কাউন্টারে। এছাড়াও নতুন একটা ফ্রিজ ও ওভেন দেখা যাচ্ছে। মুহূর্ত গিয়ে ফ্রিজ খুলে একটা ঠান্ডা পানির বোতল বের করলো। মমর হাতে তুলে দিল বোতলটা। মম সেটা হতে নিয়ে বোতলের ক্যাপ খুলতে খুলতে বললো,

“ঠিকাছে, কিন্তু সবার আগে বাড়ির রংটা পাল্টে নেওয়া যায় না? কালো আর বেইজ বাইরে থেকে প্রিমিয়াম মনে হলেও, ভেতরে বিদঘুটে লাগছে।”

মুহূর্ত সেটা শুনে কাঁধ ঝাকিয়ে বললো,

“ওকে। কি রং চাও ভেতরে বলো।”

“আমি বললেই হলো! থাকবে তুমি, তুমি ডিসাইড করো।”

“তুমি যা বলবে সেটাই ফাইনাল।”

মুহূর্তের কথা শুনে ভ্রু জোড়া কপালে উঠে গেল মমর।

“আমি যদি বলি পিংক?”

“তাহলে পিংক কালারই হবে।”

“সিরিয়াসলি? তুমি তোমার বাড়ি পিংক কালারের করবে? সালমন পিংক? ঠিক আমার এই শার্টের কালারের মত।”

কথাটা মম মজার ছলে বললেও মুহূর্ত নির্দ্বিধায় মাথা নেড়ে সায় জানালো।

“ঠিকাছে, হয়ে যাবে।”

সরু চোখে তাকালো মম তার দিকে। মুহূর্তের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যেন সত্যি সত্যিই সে মমর কথা মেনে বাড়ি পিংক কালারের করে ফেলবে। মম তাকে এ নিয়ে আর কিছু বলতো, তার আগেই গরগর শব্দ তুলে মমর পেটটা জানান দিল যে, সে এখনো খালি।

“তোমার কি খিদে লেগেছে মোমো?”

ভ্রু কুঁচকে মমর পেটের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো মুহূর্ত। লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো মমর। সে ইতস্তত করে বললো,

“আসলে…একটু একটু লেগেছে।”

“আমি তোমার জন্য কিছু বানিয়ে দিচ্ছি।”

মম মানা করতে চেয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে কাউন্টারের উপর একে একে জিনিসপত্র বের করে সাজাতে শুরু করে দিয়েছে মুহূর্ত।

“নুডুলস চলবে?”

হাতে একটা নুডুলসের প্যাকেট ধরে জিজ্ঞেস করলো মুহূর্ত। মম জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে আগ্রহের সাথে বললো,

“দৌড়াবে!”

ওর আগ্রহভরা কন্ঠ শুনে খুশিমনে রান্নায় ফিরে গেল মুহূর্ত। পানি সেদ্ধ করতে দিয়ে দুটো ডিম হাতে তুলে নিল সে। কিন্তু তার হাতে ডিম দেখে পাশ থেকে মম চেঁচিয়ে উঠলো,

“এই, এই ডিম কেন?”

“তুমি না ডিম পছন্দ করো?”

“করতাম, আপাতত আর করি না। ফালাও ওটা!”

মমর কথা শুনে বিস্মিত মুহূর্ত। সে তো জানে তার মোমোটার ডিম ভীষণ প্রিয়। সেজন্যেই তো সে সবার আগে কয়েক ডজন ডিম এনে ফ্রিজ ভর্তি করে রেখেছে।
অবাক হলেও দ্বিমত করলো না মুহূর্ত। ডিম ছাড়াই রামেন স্টাইলে রান্না করে নিল নুডুলস।
রান্না শেষে দুটো বাটিতে নুডুলস নিয়ে বেরিয়ে এলো দুজনে। মুহূর্তকে অনুসরণ করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলো মম। এখানে তিনটা বড় বড় রুম আছে। তারমধ্যেই একটাতে ঢুকে গেল তারা। নিচতলার মত দোতালাটাও খালিই পরে আছে। তবে এই রুমটাতে লাগানো হয়েছে একটা ফ্লাট স্ক্রিনের বড় টিভি। টিভির সামনে বিছানো একটা বড় ম্যাট্রেস।

“টিভি এলো কোথা থেকে?”

“হোস্টেল থেকে খুলে এনে লাগিয়েছি। এটাতে আমার পছন্দের সব কোরিয়ান ড্রামা সেভ করা আছে। নতুন টিভি লাগালে, সেসব আবার নতুন করে সেভ করতে হবে। তাই আগেরটাই নিয়ে এসেছি।”

“বেশ বুদ্ধি তো তোমার! কি কি ড্রামা দেখেছো, দেখি!”

বলেই দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ম্যাট্রেসের উপর হাঁটু মুড়ে আয়েশ করে বসে পড়লো মম। মুহূর্ত ওর পাশে বসে নুডুলসের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে টিভিটা চালু করলো। দুজনে মিলে বেছে বেছে সিলেক্ট করলো ‘মাই ডিমন’ নামের কোরিয়ান রম-কম। মুহূর্ত কালেক্ট করে রাখলেও এখনো ড্রামাটা দেখার সময় সুযোগ পায়নি।
দুজনে খুব মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করতে লাগলো সময়টা। একটা দৃশ্যে হাসতে হাসতে মম আধশোয়া হয়ে মুহূর্তের কাঁধে মাথা রেখে চোখ মুছতে লাগলো। দেখতে দেখতে দুটো পর্ব শেষ হয়ে গেল। তৃতীয়টা চালু করবে কিনা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে মুহূর্ত লক্ষ্য করলো মম তার গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পরেছে।
একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠলো তার চেহারায় মমর ঘুমন্ত মুখটা দেখে। কিছুক্ষন সে দৃশ্য উপভোগ করার পর মমকে সরিয়ে সোজা করে শুইয়ে দিল সে। নিজেও শুয়ে পরলো তার থেকে কিছুটা দূরত্বে। কিন্তু মনটা খচখচ করছে। মাঝের দূরত্বটা বড্ড বেশি বেমানান ও হৃদয়কটু ঠেকলো তার কাছে। বেশিকিছু না ভেবে মুহূর্ত দূরত্ব ঘুচিয়ে মমকে বুকে টেনে নিল। ঘুমন্ত মম একটু নড়েচড়ে ভালো করে মুহূর্তের বুকে মুখ গুঁজে গুটিসুটি মেরে শুয়ে রইলো। মুহূর্ত যখন নিস্পলক দৃষ্টিতে তার মোমোটাকে অবলোকন করতে ব্যস্ত, তখনই ভাইব্রেট করে উঠলো তার ফোনটা।

“গুড নাইট ঘোস্ট!”

ফোনটা কানের কাছে ঠেকিয়ে বললো সে। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁই ছুঁই করছে। মম বের হবার সময় স্পষ্ট টের পেয়েছে ঘোস্ট। মুহূর্তের সাথে গিয়েছে, সেটাও বুঝেছে। তবে পাখিকে বুঝতে দেয়নি। ব্যস্ত রেখেছে তাকে।

“পিচ্চিটা কোথায়?”

“আমার বুকে। কোন সমস্যা?”

“জাহান্নামে থাকলেও আমার সমস্যা নেই। খালি অক্ষত থাকলেই চলবে। সাতটার মধ্যে পাখি ওঠার আগে ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাবে।”

“এত সকালে তো আমার মোমোটা ওঠে না।”

“সেটা তোমার সমস্যা।”

“মোটেই না, সমস্যা তোমার বউয়ের। আমার মোমো আমার কাছে থাকলে, আমার অন্তত কোন সমস্যা নেই।”

ওপাশে কিছুক্ষন চুপ করে রইলো ঘোস্ট। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গমগমে সুরে বললো,

“দরজা খোলা থাকবে। ওর রুমে রেখে যেও।”

***

চলবে….

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ