গল্পঃ #বিচার
লেখিকাঃ #মিশু
পর্বঃ (৪)
মানুষের ভাগ্য বড়ই অদ্ভুত, কখন কাকে কোথায় নিয়ে যাবে তা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানে না। তেমনি আজকে আমাদের ও ছাড়তে হচ্ছে এতদিনের পরিচিত ঘর বাড়ি সেই সাথে প্রিয়জনের স্মৃতি। হ্যা আমরা সেইরাতে কাপড় গুছিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ি থেকে আল্লাহর নাম বেড়িয়ে পড়লাম অজানা উদ্দেশ্যে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা হুহু করে কেদে উঠে। আসলে বাবার সব স্মৃতি তো এই বাড়িটা জুড়ে। তবুও ভাগ্য কে তো মানতেই হবে। তাই ধীরে ধীরে বেড়িয়ে পড়লাম সামনের উদ্দেশ্যে৷ হাটকে হাটতে বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে আসছি। মা বয়স্ক মানুষ আবার তিন তিনটে বাচ্চা কেউ আর হাটতে পারছে না। এইদিকে এখনো বেশ খানিকটা হাঁটলে সামনে পাকা রাস্তা পাবো আর ওইখান থেকেই যেকোনো গাড়ির ব্যাবস্থা হবে। এইদিকে ওরা হাটতে পারছে না জন্য সামনে একটা গাছের তলায় সবাইকে নিয়ে বসলাম। বেশকিছুক্ষণ জিড়িয়ে নিয়ে উঠতে যাবো তখনি পেছন থেকে কেউ শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরে। আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি মেম্বারের জামাই কুতুব আলি নেশা করা অবস্থায় হিংস্র দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কিছু না বলে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকি। আমার চেষ্টা করা দেখে কুতুব আলি দাঁতে দাঁত চেপে বলে, কই যাও সেতু রাণী? তোমার তো কোথাও যাওয়া হবে না। কি মনে করছো তোমাকে এত সহজে আমি আমার কাছ থেকে পালাতে দেবো?
এই বলেই হিহিহিহি করে হাসতে শুরু করলো। আপা বললো, এই কুতুব ছাড় আমার বোনকে৷ আমরা আমাদের মেয়েকে তোর ওই পাগল সালার সাথে বিয়ে দিবো না বুঝছিস। তাই আমাদের যেতে দে। ছেড়ে দে ওকে।
মা বলে, বাবা হাতজোড় করছি তোমার কাছে ছেড়ে দাও ওকে। আমাদের যেতে দাও।
ওদের কথা শুনে কুতুব আরো জোড়ে হেসে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলে, আচ্ছা ছেড়ে দিলাম। তোর বোনের ও আমার পাগল সালাকে বিয়ে করতে হবে না। তাহলে তোর বোন কে বল আমাকে বিয়ে করতে। সত্যি বলছি তোর বোনকে রাজরাণী করে রাখবো। আর সাথে তোকে আর তোর মাকে খুশি করবো?
লোকটার মুখে এরকম নোংরা কথা শুনে আমার আর সহ্য হলো না তাই লোকটার মুখে দিলাম সপাটে এক চড়।
লোকটা তেড়ে আমার দিকে আসতেই টুপ করে নিচ থেকে ব/টি তুলে নিলাম হাতে। রাস্তায় সেফটির জন্য নিয়েছিলাম। ভাবতেই পারিনি এত তাড়াতাড়ি কাজে লেগে যাবে। ব/টি নিয়ে কুতুবের সামনে ধরে বললাম, এই কুতুব আর এক পা এগুলে তোর ধর থেকে মুন্ডু আলাদা করে দিবো কিন্তুু। পিছে যা বলছি। কি ভেবেছিস টা কি আমরা নারী তাই এতই অসহায়? মোটেই না আমরা নারী আমরা সব পারি।
আমার আকষ্মিক এই রূপে কুতুব ও ভয় পেয়ে যায়।যতই হোক ম/রার ভয় সকলেরই আছে। ও পেছাতে থাকে তারপর একটা গাছের কাছে গেলে আপাকে বলি একটা ওরনা দিয়ে ওর হাত বেধে গাছের সাথে বাঁধতে। নেশা করে থাকায় শরিরে বেশি জোড় নেই। সেই সুযোগে আপা আর আরাফাত ওকে গাছের সাথে বেধেঁ ফেলে। ওকে বাধা শেষে আমরা তাড়াতাড়ি আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করি।
এইদিকে রাত ১০ টা বেজে গেছে। রাস্তায় অল্প গাড়ি।
আমাদের গন্তব্য আপাতত ঢাকা। ওখানে মায়ের জেঠাতো এক বোন থাকে। উনার নাম ঝুনি। খালা অনেক মজার মানুষ। ছোট বেলায় আসতো আমাদের বাড়ি। অনেকদিন হলো দেখা নেই। ফোনে ওনাকে সবকিছু জানানোর পর খালা আমাদের ওনার কাছে যেতে বলেছেন। আপাতত ওনার কাছে যাবো তারপর যা একটা ব্যাবস্থা করবো।
এদিকে রাত সাড়ে দশটায় ঢাকার একটা বাস পেলাম।
তারপর ওই খালার দেওয়া ঠিকানায় পৌছাতে পৌঁছাতে রাত ৪ টে।
এদিকে খালার দেওয়া ঠিকানায় পৌছে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। এতবড় বাড়িতে খালা থাকে? বাড়ির সামনে এসে খালাকে ফোন দিলাম। খালা বললো এসেছিস দ্বারা আমি আসছি। একটুপর খালা বাড়ি থেকে বের হলো। মাকে দেখে বললো, এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। চল আমার সাথে।
আমরাও কোনো কথা না বলে খালার পেছন পেছন আসতে লাগলাম। খালা আমাদের সাথে করে বস্তির মতে একটা জায়গায় একটা ঘরে নিয়ে গেলো। ঘরের দরজা খুলে ভেতরে বসিয়েই মাকে জড়িয়ে ধরে কেদেঁ উঠলেন খালা। খালা জানতেনই না আব্বা মা/রা গেছে। মা ও খালাকে দরে কেদেঁ উঠলো। বেশকিছুক্ষণ দুইজনই কেদেঁ শান্ত হলো। তারপরই খালা আমাকে আর আপাকে দেখে বললো, ওমা! ইতু আর সেতু কত বড় হয়ে গেছে। সেই ছোট্টোটি দেখেছিলাম৷ আর ইতু কি মিষ্টি বাচ্চা গুলো তোর। সত্যি শয়তান গুলোর মনে একটু ও দয়া মায়া নেই। নইলে এই বাচ্চা গুলোকে কিভাবে এইভাবে দূরে রাখে? চিন্তা করিস না মা আমার কাছে এসেছিস দেখি কিছু একটা ব্যাবস্থা ঠিক হবে। ওই যে বাড়িটা থেকে আমি বের হলাম না ওনারা অনেক ভালো মানুষ। তোদের খালু যখন আমাকে এই শহরে একা রেখে পালিয়ে গেলো আমি তখন দিগবিদিক শূন্য হয়ে চারিদিকে ঘুরছিলাম। ভাড়া দিতে না পারায় ঘরের সব জিনিস রেখে বাড়িওয়ালা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। তখন ওই বাড়ির বড়মা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এখন তো আমি ওখানেই বেশি থাকি। এই ঘরটা নিয়ে রেখেছি মাঝে মধ্যে থাকার জন্য। এখন থেকে তোরা এই ঘরটায় থাকিস। আর কালকে তোদের দুই বোনকে বড়মার কাছে নিয়ে যাবো আমি কথা বলে রেখেছি দেখিস তোদের ও কাজের ব্যাবস্থা হয়ে যাবে।
আচ্ছা অনেক কথা হলো। আরেকটু রাত আছে সবাই অনেক দূর থেকে এসেছিস একটু আরাম করে নে৷
ছোট একটা ঘর তাতে একটা চকি। চকিতে বাচ্চাদের শুইয়ে দিয়ে আমরা চারজন মাটিতে মাদুর পেতে শুয়ে পড়লাম। চোখে ঘুম আসছে না। রোহানের কথা মনে হচ্ছে। ওর কি বিয়ে হয়ে গেছে? নিশ্চয়ই ওর বউ খুব সুন্দর। ধুর কিসব ভাবছি আমি। এখন থেকে পুরোনো কথা আর ভাববো না। নতুন শহরে নতুন করে সবাইকে নিয়ে ভালোভাবে বাঁচবো।
চলবে………
