Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"গহন কুসুম কুঞ্জেগহন কুসুম কুঞ্জে পর্ব-১৭+১৮

গহন কুসুম কুঞ্জে পর্ব-১৭+১৮

#গহন_কুসুম_কুঞ্জে
১৭.

তনয়ার ঘরের বিশাল বুকশেলফটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল স্বরূপ৷ শেষে মন্তব্য না করে থাকতে পারল না সে, “তোমার বইয়ের কালেকশন তো দারুণ!”

তনয়া হাসল। “হ্যাঁ, ছোটোবেলা থেকে জমিয়েছি সব।”

“বই পড়তে ভালোবাসো বুঝি?”

“খুব!”

“আগে তো বলোনি।”

“সময়টা কোথায় পেলাম?”

স্বরূপ বই দেখতে লাগল। আহমদ ছফার বইগুলো দেখে বলল, “এগুলো সব পড়েছ?”

“হ্যাঁ!”

“কেমন লাগে?”

“দারুণ! আমার পছন্দের লেখক।”

স্বরূপ একটু অবাক হয়ে তাকায়৷ তারপর বলে, “আমার মনে হতো মেয়েরা আহমদ ছফা বোঝে না।”

তনয়া ভুরু কুঁচকে বলল, “এর মানে কী? বুঝবে না কেন? মেয়েদের মাথায় কি ঘিলু কম?”

“ঠিক সেটা না..” স্বরূপ কথা ঘোরাল, “আমার আসলে ধারণা ছিল মেয়েরা শুধু প্রেম ভালোবাসার গল্প পড়ে, যেমন শরৎচন্দ্র, কিংবা হুমায়ূন..”

“হুহ…” হাত উল্টে তনয়া বলল, “মেয়েরা সবই পড়ে। পাঠকদের মধ্যে মেয়ে পাঠকই বেশি বুঝলে? এত যে জ্ঞান দিচ্ছো, তোমার নিজের বাড়িতে তো বইয়ের চিহ্নও দেখলাম না।”

“বই পড়ি না অনেকদিন।”

“কেন?”

“ইচ্ছে করে না। ব্যস্ততায় বই পড়ার ইচ্ছে মরে গেছে।”

বলতে বলতে সে ড্যান ব্রাউনের ‘ইনফার্নো’ বইটা টেনে নিয়ে বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।

“পড়বে এখন?”

“হুম। এটা অনেক আগের পড়া। খুব পছন্দের ছিল, কিন্তু ভুলে গেছি৷ আরেকবার পড়াই যায়।”

তনয়া খুশি হয়ে বলল, “আচ্ছা পড়ো।”

“তুমি খুশি হচ্ছো কেন?”

“আমার খুব ইচ্ছে ছিল আমার বরও বই পড়বে। তারপর একসাথে বই কিনব, পড়ব, আলোচনা করব।”

স্বরূপ হেসে বলল, “বইপড়া ছেলের অভাব পড়ে গিয়েছিল বুঝি?”

“মানে?”

“এইযে আমাকে বিয়ে করে ফেললে?”

“তোমার সাথে কপালে লেখা ছিল।”

স্বরূপ বাঁকা হাসল। কিছু বলল না। তনয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি কি তোমাকে খুব বিরক্ত করছি?”

স্বরূপ বই থেকে চোখ না তুলে বলল, “গানের সুরে প্রশ্নটা করো, তাহলে উত্তর দেব।”

তনয়া একটা কুশন ছুঁড়ে মারল স্বরূপের মুখে। তারপর উঠে চলে গেল। স্বরূপ কুশনটা বুকে জড়িয়ে বই পড়ায় মনোযোগ দিল।

কিছুক্ষণ পর তনয়া দুই কাপ কফি নিয়ে ফিরল। একটু আগে সকালের নাস্তা সেরেছে তারা। আজ অনেক রান্নাবান্না হবে। মা আগে থেকেই পাশের বাড়ির ছুটা বুয়া বিনু খালাকে বলে রেখেছিল তাকে একবেলা কাজ করে দিয়ে যেতে হবে। আর ওদের গৃহপরিচারিকা তো আছেই। মা তনয়াকে বললেন তাকে কোনো সাহায্য করতে হবে না। সে স্বামীকে সঙ্গ দিতে পারে।

তনয়া একটু লজ্জা পেয়েই চলে এসেছে।

স্বরূপ কফির কাপ হাতে বলল, “তুমি বানিয়েছ?”

“না, মা বানিয়েছে।”

“তুমি কি রান্নাবান্না পারো না?”

তনয়া একটু অবাক হয়ে বলল, “পারব না কেন?”

“কখনো খাওয়ালে না তো।”

“আশ্চর্য তো! সুযোগ পেলাম কখন?”

“তাই তো! তাই তো!”

স্বরূপে আরও কিছু অসংলগ্ন কথা বলে গেল বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে। তার প্রধান মনোযোগ রইল বইতে। তনয়াও একটা বই নিয়ে বসেছে, পশ্চিমবঙ্গের লেখকের বই। খুব নামডাক হয়েছে বইটার। এটা নিয়ে সিরিজও তৈরি হয়েছে। ইন্দুবালা ভাতের হোটেল। সেই কবে কিনে রেখেছিল তনয়া। আজও পড়া হয়নি।

পড়তে শুরু করে তনয়ার খুব মজা লাগতে শুরু করল। কত রকমের রান্নার বর্ণনা আর সাথে এগিয়ে যাওয়া ইন্দুবালার জীবনের গল্পটা! এক পর্যায়ে তনয়ার চোখে পানি চলে এলো। সে বই বন্ধ করে অন্যদিকে তাকাতেই দেখল স্বরূপ চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছে। ওর মুখে এত গভীর বিষাদের ছায়া সে আগে দেখেনি। কিসের এত বেদনা তার?

স্বরূপ অনেকক্ষণ পর চোখ খুলল। তার চোখ লাল। তনয়ার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল, “ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”

তনয়া জানে, ও ঘুমায়নি। এইমাত্র একটা মিথ্যে বলল। সে কি এত কাছে থেকেও মানুষটাকে স্পর্শ করতে পারছে না?

বইটা শেলফে রেখে দিয়ে বারান্দায় চলে গেল স্বরূপ। তনয়াও আর কিছু পড়তে পারল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ঝুলে রইল ঘরে।

*

দুপুরের খাবারটা জমজমাট হলো। এত পদ দেখে স্বরূপের মাথা ঘুরে যাবার জোগাড়! সে হেসে বলল, “আন্টি, এত পদ দিয়ে আমি জীবনেও খাইনি। এসব এক মাস ধরে খাওয়া যাবে।”

তনয়ার মা হাসিমুখে বললেন, “বিসমিল্লাহ বলে শুরু করো, আজকেই খেতে পারবে।”

স্বরূপ মনে মনে ইন্না-লিল্লাহ পড়ল।

খাবে না খাবে না করেও সে কম খেল না৷ তনয়া খেয়াল করল স্বরূপ বেশ আরাম করে খাচ্ছে। মা আর বাবার যত্নটা সে উপভোগ করছে। ওর চোখেমুখে সকালকার সেই বিষাদের ছিটেফোঁটাও নেই। কী প্রাণবন্ত হাসি! মানুষটা ভালোবাসা ভালোবাসে। তাহলে তাকে কেন নয়? সে কি ভালোবাসতে পারছে না? নাকি তার ভালোবাসা মানুষটাকে স্পর্শ করছে না?

*

সন্ধ্যার দিকে ওরা রওনা দিল নিজেদের বাসায়। মা সাথে খাবারদাবার দিয়ে দিয়েছেন। তনয়ার জিনিসপত্র তো আছেই। স্বরূপ সব জিনিস গাড়িতে তুলতে তুলতে বলল, “তোমাকে নিয়ে বাসা বদলাতে হলে আমার খবর হয়ে যেত। ভাগ্যিস নিজের ফ্ল্যাটে থাকি।”

তনয়া কিছু বলল না। দন্ত বিকশিত হাসি উপহার দিল।

বাড়িতে পৌঁছে তনয়া বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিল। যদিও বিয়ে করে এখানেই সে এসেছিল, তবুও এই প্রথম তার মনে হলো এই তো তার সংসার। তার বর্তমান ঘর। নিজের ঘরের মতো শান্তি লাগছে। এর আগে মা চাচীরা থাকায় ভালো করে দেখতে পারেনি তনয়া। আজ ঘুরে ঘুরে সব দেখল। চারটা বেডরুম, সবগুলোই সুন্দর করে সাজানো। রান্নাঘরটা দুর্দান্ত বলা যায়! পুরোটা ঝকঝক করছে। বসার ঘরটা বড়। একপাশে বিশাল জানালায় হালকা রঙের মসৃন কাপড়ের পর্দা টানা। পর্দা সরিয়ে দিতেই আলোজ্বলা শহরের বড় একটা অংশ যেন উন্মুক্ত হলো চোখের সামনে।

সে মনে মনে স্বরূপের রুচির প্রশংসা না করে পারল না। স্বরূপের কথা মনে হতেই নিজেদের বেডরুমে উঁকি দিল সে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে কার সাথে যেন। সে পেছন থেকে গিয়ে জড়িয়ে ধরল স্বরূপকে। স্বরূপের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সে ধীরেসুস্থে কথা শেষ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “কী হয়েছে?”

“বাসাটা এত সুন্দর করে সাজিয়েছ তুমি! আমি ইম্প্রেসড!”

“তোমাকে ইম্প্রেস করতে তো সাজাইনি।”

তনয়া একটু অপমানবোধ করে বলল, “তা জানি। কিন্তু কাকে ইম্প্রেস করতে সাজিয়েছ শুনি?”

“নিজেকে।” ছোট্ট উত্তর দিল স্বরূপ।

তনয়া ওর কথা কানে নিল না। মাঝেমধ্যে লোকটাকে বিরক্তিকর লাগে। সে জিনিসপত্র একটু একটু করে গোছাতে শুরু করল। স্বরূপের ডাক শুনে একটু পরে উঠে পড়ল। বসার ঘরে গিয়ে দেখল সে দুই কাপ চা বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। তনয়া যেতেই বলল, “লাইট অফ করে দিয়ে এসে বসো।”

“অন্ধকারে চা খাবে?”

“অফ করো আগে তারপর দেখো কী হয়।”

তনয়া লাইট বন্ধ করে মুগ্ধ হয়ে গেল। বিশাল জানালা দিয়ে চাঁদের আলো গলগল করে ঢুকে যাচ্ছে। আজ বোধহয় পূর্ণিমা। রূপার থালার মতো চাঁদটা আকাশে বসে বিলিয়ে দিচ্ছে সব রূপ।

স্বরূপ জিজ্ঞেস করল, “চা খেতে অসুবিধা হবে?”

“নাহ।” সে পাশে গিয়ে বসে চায়ের কাপ তুলে নিল।

বেশ কিছুক্ষণ নিরবতার পর স্বরূপ বলল, “আজকে যে বইটা পড়তে নিলাম তার সাথে কিছু স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। সেজন্যই কিছুটা অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিলাম সকালে।”

তনয়া মনে মনে বলল, “অন্যমনষ্ক না, কথাটা হবে আবেগী। কিন্তু আপনাকে তো তা বলা যাবে না। বললে বলবেন আপনার আবেগ টাবেগ কিছু নেই।”

স্বরূপ বলে গেল, “ওটা আমাকে একজন উপহার দিয়েছিল জন্মদিনে। পড়ার পর তার সাথে লম্বা আলোচনা হয়েছিল। তোমার বইটা অনুবাদ হলেও আমি পড়েছিলাম ইংরেজিতে। সে ইংরেজি সাহিত্য পছন্দ করত। ছাত্রীও ছিল ইংরেজি সাহিত্যের। ওর জন্যই অনেক বই পড়েছিলাম। চলে যাবার পর আর পড়িনি।”

তনয়া চুপ করে শুনল শুধু। আবার কিছুক্ষণ নিরবতা।

স্বরূপই ফের কথা শুরু করল, “ও সবসময় সেই টিচারের কথা বলত। তার গলায় পোয়েট্রি শুনলে নাকি পাগল পাগল লাগে। আমার রাগ হতো, অভিমান হতো। কিন্তু বুঝিনি মানুষটাই আমার নেই।”

তনয়া স্বরূপের একটা হাত ধরল। একসময় মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখনো ওকে ভালোবাসো?”

স্বরূপ তনয়ার হাতটা আঁকড়ে ধরল। হাত কাঁধে মাথা রেখে বলল, “না তনয়া, ভালোবাসি না। তবে সবটা ভালোবাসা আর বিশ্বাস তার জন্য একটা কাচের জারে জমিয়ে রেখেছিলাম। জারটা ভেঙে গেছে। আমার সব বিশ্বাস আর ভালোবাসা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার সেই ভালোবাসার টুকরোগুলোর জন্য কষ্ট হয়। কাউকে বিশ্বাস করতে না পারার জন্য কষ্ট হয়। তার দেয়া অপমানের জন্য কষ্ট হয়। আমি ভুলতে পারি না সেসব। তুমি বুঝবে না তনয়া। এতটা বিশ্বাসঘাতকতা চাইলেই ভোলা যায় না।”

তনয়া বুঝল, তার কাঁধ ভিজে যাচ্ছে। স্বরূপ কাঁদছে। ওর ভেতরটা কষ্টে মুচড়ে যাচ্ছে। তবুও তার মাঝে একটা স্বস্তি টের পাচ্ছে সে। ভালোবাসা না থাকুক, স্বরূপ তাকে ভরসা করতে শুরু করেছে। আপন ভাবতে শুরু করেছে। নয়তো এসব কথা তাকে বলত না। তার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতও না।

তনয়া চুপচাপ স্বরূপের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকল যতক্ষণ না তার কান্না থেমে যায়। একসময় সে নিজেই সামলে নিয়ে উঠে বসল। ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোমার খুব খারাপ লেগেছে এসব শুনতে তাই না?”

তনয়া সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, “তুমি আমাকে সব বলতে পারো। যা মনে আসে সব বলে দিলে তুমি হালকা হবে। তোমার মনও। আমি তাতেই খুশি হব।”

স্বরূপ এবারও হাসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। তার অপরাধবোধ হচ্ছে কিছুটা। তনয়ার জায়গায় অন্য কেউ হলে ঝগড়া করত প্রাক্তনের কাহিনী শুনে। আর এই মেয়ে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। সে মনে মনে বলল, “তনয়া, তুমি এত আলাদা কেন? তুমি এত ভালো কেন?”

(চলবে)

সুমাইয়া আমান নিতু

#গহন_কুসুম_কুঞ্জে
১৮.

তনয়া যখন চিৎকার করে জেগে উঠল তখন ঘড়িতে আড়াইটা বাজে। ওর চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে স্বরূপের। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিল। তনয়া তখন জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। ভয়ানক একটা স্বপ্ন দেখেছে সে।

স্বরূপ তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “তনয়া, ঠিক আছো?”

তনয়া একটু ধাতস্থ হলে উত্তর দেয়, হ্যাঁ।”

স্বরূপ তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। জিজ্ঞেস করল, “খারাপ স্বপ্ন দেখেছিলে?”

তনয়া স্বপ্নটা মনে করতে চায় না। পরপর দুটো ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়েছে তার৷ একবার স্টেশনে আরেকবার গ্রামে। দুটো মিলে বিভৎস এক স্বপ্নের রূপ নিয়েছে। সে সব ভুলে থাকতে চায়, এমনিতে অনেকটা ভুলে থাকেও, কিন্তু অবচেতন মন বলেও একটা জিনিস আছে! সে ভোলে না।

তনয়া পানিটা এক চুমুকে শেষ করে বলে, “হাবিজাবি স্বপ্ন দেখেছি।”

স্বরূপ আর স্বপ্নের কথা তোলে না। বলে, “শুয়ে পড়ো। লাইট অফ করব?”

তনয়া একটু বিরক্ত হয়েই বলে, “তোমার এত লাইট অফ করতে ইচ্ছে হয় কেন বলবে? একটু আলো থাকলে কী হয়?” বলতে বলতে তনয়ার চোখে পানি চলে এলো।

স্বরূপ অবাক হয়ে বলল, “আমি কি কাঁদার মতো কিছু বলেছি? এরকম রিয়েক্ট করছো কেন মাঝরাতে?”

তনয়া এবার উত্তরই দিল না। বিছানা থেকে উঠে বেরিয়ে গেল। পাশের খালি ঘরে আলো জ্বেলে বসে রইল। তার ইচ্ছে করছে না কোনো কথা বলতে। বরং ভয় করছে। বুক কাঁপছে। বারবার স্বপ্নে দেখা কালো রোমশ হাতের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। একা ঘরে তার আরও ভয় করতে লাগল। কিন্তু স্বরূপের ওপরও রাগ হচ্ছে। রাতে একটা মানুষ ভয় পেয়ে জেগে উঠলে এরকম কড়া সুরে কথা বলবে কেন? তনয়ার সাথে কেউ কোনোদিন জোরে কথা পর্যন্ত বলেনি। তার এবার সত্যিই ভীষণ মন খারাপ লাগতে শুরু করল। সাথে ভয় তো আছেই। চোখের পানি বাঁধ মানতে চাইছে না৷ একসময় সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল।

*

তনয়া চলে যাবার পর স্বরূপ কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো বসে থেকে শেষে শুয়ে পড়ল। রাত দুপুরে মেয়েদের ন্যাকামি সহ্য করতে পারবে না বলেই সে বিয়ে থা করতে চায়নি। শখ করে এই মেয়েই তাকে বিয়ে করেছে। সামান্য কথা সহ্য করতে না পারলে সারাজীবন মা বাবার পুতুপুতু কন্যা হয়ে থাকা উচিত ছিল!

শুয়ে অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করল স্বরূপ। ঘুমটা হাওয়া হয়ে গেছে। তারচেয়েও বেশি হাওয়া হয়েছে তার বুকের ভেতরটা। খারাপ লাগা জমা হচ্ছে একটু একটু করে। আশ্চর্য তো! সে মেয়েটার ওপরে বিরক্ত হলে তার জন্যই আবার খারাপ লাগবে কেন? যত্তসব বাজে অনুভূতি!

মোবাইলটা টেনে নিল সে। ফেসবুকের পাতা খুলে বসল। আজকাল এই এক জিনিস পৃথিবীর সব ভুলিয়ে দিতে পারে। কত হাসি-ঠান্ডা, বিনোদনে ভর্তি এই জগত! স্বরূপের বড় কঠিন সময়ে এই ফেসবুকিং করে সে লম্বা সময় কাটিয়ে দিত। পরে অবশ্য আরও বেশি হতাশ লাগত, তবুও সময় তো কেটে যেত!

আজ কাটল না। অনেকক্ষণ নিউজফিডে ঘোরাঘুরি করেও সে দেখল ঘড়ির কাটায় অতিবাহিত হয়েছে মাত্র পনেরো মিনিট! অথচ সাধারণত উল্টোটা হয়।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, তনয়ার সাথে যে লাইট নিয়ে কথা কাটাকাটি হলো সেই লাইট সে তখন থেকে জ্বালিয়েই রেখেছে, বন্ধ করেনি!

স্বরূপ শেষ পর্যন্ত উঠে বসল। নিজেও বুঝতে পারল না কখন সে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে আর কখন পায়ে পায়ে পাশের ঘরে চলে গেছে।

তনয়া তখনো কাঁদছে। তার জামার সামনের অংশ ভিজে গেছে চোখের পানিতে। স্বরূপের এবার সত্যিই দুশ্চিন্তা হতে লাগল। সে পাশে বসে তনয়ার মাথায় হাত রেখে বলল, “তনয়া, অ্যাই তনয়া…কী হয়েছে তোমার? খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছিলে? নাকি আমার কথায় কাঁদছ? পাগল নাকি তুমি? তনয়া…”

তনয়া মুখ ঘুরিয়ে রাখল। স্বরূপ নরম সুরে কথা বলায় তার অভিমান উপচে পড়ছে। উহু, গলে পড়বে না সে। যদিও রাগ বা অভিমান কোনোটাই দীর্ঘমেয়াদে তার মনে বসে থাকে না। একা একাই উড়ে চলে যায়৷ তার ওপর এখন একজন বসে বাতাস দিচ্ছে!

স্বরূপ হাত দিয়ে চেপে তনয়ার মুখটা ঘোরানোর চেষ্টা করল। তনয়া শক্ত হয়ে রইল। সে এবার উল্টোপাশে গিয়ে বসল। তনয়া সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এবার তার হাসি পাচ্ছে। “কী মুশকিল! এইমাত্র যেসব কান্না ভেতর থেকে বানের স্রোতের মতো ভেসে আসছিল সেসব কোথায় গেল?” নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল তনয়া। “না রে তনয়া, তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না। তুই একটা চরম বোকা। ইমোশনাল ফুল! না না, আবেগী বেকুব!”

স্বরূপ এদিকে সত্যিই ঘাবড়ে গেছে। সহজ একটা মেয়ে এরকম করছে কেন? গভীর দুঃখ পেয়েছে? সে তো এত কঠোর ব্যবহার কখনো করে না। বরং ওর নরম স্বভাবের জন্য যথাসম্ভব নমনীয় হওয়ার চেষ্টা করে।

স্বরূপ এবার তনয়াকে জোর করে উঠিয়ে কোলে তুলে নিল। রওনা দিল নিজের ঘরের দিকে।

তনয়া প্রথমে চমকে গিয়েছিল। স্বরূপের কোলে চড়ে তার ভারি মজা লাগল। হাসিও পেয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অনেক কষ্টে হাসি আটকে মুখটা গম্ভীর করে রাখল সে। হয়তো একটু বেশিই অভিনয় হয়ে গিয়েছিল। স্বরূপ ওকে কোলে রেখেই জিজ্ঞেস করল, “তনয়া তোমার কি বাথরুমে যাওয়া প্রয়োজন?”

তনয়া আর পারল না, হেসে ফেলল। স্বরূপ চোখ বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাহিনী কী?”

তনয়া এবার স্বরূপের গলা জড়িয়ে ধরে স্বাভাবিক সুরেই বলল, “কিছু না। আমার খুব খারাপ লাগছিল। তুমি মন খারাপ ভালো করে দিয়েছ।”

“আমার জন্যই তো মন খারাপ হয়েছিল।”

“পুরোটা তোমার দোষ নয়। স্বপ্নও তো দেখেছিলাম। কিন্তু তুমি বলো, আর এরকম করে কথা বলবে না? আমার কষ্ট হয়।”

“কিরকম করে?”

“এইযে ধমক দিয়ে…”

“তুমি বয়সে কত ছোটো, একটু আধটু ধমক নাহয় খেলে..”

“না। একটুও না। আমি কোনো ধমক চাই না।”

“কী চাও?” স্বরূপ এবার খানিকটা তরল গলায় বলল।

তনয়া কথা বলল না। তার আবারও হাসি পাচ্ছে। সে বুঝে গেছে, চাইলেও কোনোদিন এই মানুষটার সাথে সে রাগ করে থাকতে পারবে না। ওর মুখ দেখে সব অপরাধ ক্ষমা করে দিতে পারবে। একটু আহ্লাদ করলে নিজেকে মেলে দিতে ওর একটুও সময় লাগবে না। এরকম বিধ্বংসী অনুভূতির কি কোনো মানে হয়?”

ওর ঘোর লাগা চোখের দিকে তাকিয়ে স্বরূপের মনে হলো, মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে। সে তো তাবিজ কবচ করেনি৷ এত পাগল হওয়ার কী কারন?

“তুমি কি আজকে আমাকে নামাবে না?” বলতে বলতে খিলখিল করে হেসে ফেলল তনয়া।

স্বরূপ ওকে বিছানায় নামিয়ে দিল। পরক্ষণেই তনয়ার হাসি চাপা পড়ে গেল স্বরূপের ঠোঁটের ভাঁজে।

কিছুক্ষণ পর তনয়া টেবিল ল্যাম্পটা বন্ধ করতে হাত বাড়াতেই স্বরূপ খপ করে ধরে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলল, “আজ তো লাইট বন্ধ হবে না। ওটা আলো ছড়াবেই…”

তনয়া শক্ত মুঠির ভেতর থেকে হাত ছাড়াতে ব্যর্থ হয়ে চোখদুটোই বন্ধ করে ফেলল।

*

ওদের ঘুম হয়েছিল শেষ রাতের দিকে। তনয়া ক্লান্তিতে মড়ার মতো ঘুমাচ্ছিল। ঘুমের মধ্যেই শুনেছে স্বরূপ তাকে বলছে, সে অফিসে যাচ্ছে। তনয়া কোনোরকমে চোখ মেলে দেখেছে মভ কালারের শার্ট, কালো প্যান্ট পরা এক ব্যস্ত মূর্তি ঘোরাফেরা করছে। আরেকটু কষ্ট করে পুরোপুরি চোখ মেলতেই চোখে পড়েছে ওর ব্যাকব্রাশ করা চুলের নিচে সুন্দর মুখে ব্যস্ততার ছাপ, আর একটু ভ্রুকুুটি। আহারে!

তনয়া উঠে বসতে বসতে বলল, “আমার জন্য তোমার এত তাড়াহুড়ো করতে হলো তাই না?”

স্বরূপ ঘুরল তার দিকে। “উঠেছো কেন? তোমার কি অফিস আছে নাকি? ঘুমাও!”

“কিন্তু তুমি খাবে না?”

স্বরূপ ব্যস্তভাবে ঘড়ি দেখল। তারপর এক ছুটে এসে তনয়ার গালে চুমু খেয়ে বলল, “এইতো খেলাম। এখন যাই। তুমি খেয়ে নিও। সব আছে ফ্রিজে।”

তনয়ার চোখে আবার ঘুম জড়িয়ে এলো। ঘুমের সাথে মিশে রইল মিষ্টি পারফিউমের ঘ্রাণ। মনে হলো স্বরূপ আশেপাশেই তো আছে!

(চলবে)

সুমাইয়া আমান নিতু

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ