Friday, June 5, 2026







বাড়িপ্রতিযোগিতাগল্পপোকা ধারাবাহিকগল্প প্রতিযোগিতা ২০২০গল্পের নাম-শক্তিরূপেণ সংস্থিতা পর্ব-তিন

গল্পের নাম-শক্তিরূপেণ সংস্থিতা পর্ব-তিন

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_প্রতিযোগিতা_২০২০
গল্পের নাম-শক্তিরূপেণ সংস্থিতা পর্ব-তিন
লেখায়-সমন্বিতা ঘোষ

মাঝখানে দুটো দিন বেশ ব্যস্ততার মধ্যে কাটল আরাধ্যা, নীলাশা আর ইমরানের। কেননা ছুটির আগেই বেশ কিছু অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিট করতে হয়েছে। তারপর যাওয়ার জন্যে গাড়িও ঠিক করতে হয়েছে।
মনে মনে আরাধ্যা বাদে সকলেই উত্তেজিত আর খুশি ; বন্ধুরা মিলে একসাথে পুজো কাটাবে বলে কথা।

যাওয়ার দিন সকালবেলা…..

আরাধ্যা আজ সাদা রঙের একটা চুরিদার পড়ে চুলটা ছেড়েছে। চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। ডান হাতে ঘড়ি আর গলায় আহিরের দেওয়া চেনটা। এতেই ওকে অসাধারণ লাগছে। একটা আলগা শ্রী যেন তার মুখে লেগে রয়েছে।
নীলাশা কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলি উঠল,”আমি যদি ছেলে হতাম না নির্ঘাত ক্রাশ খেয়ে যেতাম তোকে দেখে।”
আরাধ্যা ওর কথা শুনে একটু হেসে বলে উঠল,”আর যদি তুই এখনো রেডি না হোস তবে আমাদের আজ দেবীপুর যাওয়ার প্ল্যান পাক্কা ক্র্যাশ হয়ে যাবে।”

নীলাশা ভ্রূ কুঁচকে , “কেন এখন তো সবে আটটা বাজে। গাড়ি তো আসবে নয়টাতে …”বলতে বলতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল ,”ও মাই গড! সাড়ে আটটা?”
এরপর তড়িঘড়ি ড্রেস নিয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে চলে গেল।
আরাধ্যা হেসে উঠল নীলাশার কান্ড দেখে।

নয়টা বেজে পনেরো মিনিটে আকাশলীনা আর ইমরানকে পিক আপ করে নীলাশাদের হোস্টেলের বাইরে গাড়ি এসে হর্ন মারল। নীলাশা হোয়াইট জিন্স আর ব্ল্যাক টি শার্ট পড়েছে। তার উপর জিন্সের হাফ জ্যাকেট পড়তে পড়তে নীচে নেমে এল। আরাধ্যা নীচেই দাঁড়িয়েছিল। নীলাশা আসতে গাড়িতে উঠে বসল। ওদের লাগেজগুলো ড্রাইভার ডিগিতে তুলে দিল।

ইমরান ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে।ব্লু ডেনিম জিন্সের সাথে সিগ্রিন কালারের শার্টে তাকে দারুন লাগছে দেখতে।
আকাশলীনা, নীলাশা আর আরাধ্যা পেছনে বসেছে। নীলাশা বলে উঠল,”এই লীনা তোকে না পিঙ্ক শাড়িতে দারুন লাগছে।কিছুটা পরীদের মতো।অনেকদিন পর তোকে শাড়িতে দেখলাম। কি বলিস ইমরান?”
–বাকিদের কথা জানিনা তবে আমার আরু বুনুকে খুব মিষ্টি লাগছে ।
–সেই এখন তো বোনকে পেয়ে আমাকে ভুলেই গিয়েছ।
–হিংসুটে।
–এই আরাধ্যা দেখেছিস আমাকে হিংসুটে বলছে তোর দাদা।

আরাধ্যা ওদের কথোপকথন দেখে হাসতে হাসতে বলল,”আসলে আমাদের বন্ধুটিকে আমার ভাইয়ার সবসময়ই ভালো লাগে।আর আজকে তো আরো স্পেশাল লাগছে। তাই সবার সামনে বলতে মন চাইছে না।”
আকাশলীনা এবারে একটু লজ্জা পেয়ে গেল আরাধ্যার কথা শুনে।
এমনি খুনসুটি করতে করতে কখন যে ওরা আড়াই ঘন্টার পথ পেরিয়ে দেবীপুর ঢুকে গেছে খেয়ালই করেনি।

হঠাৎ বেশ পুরোনো আমলের বড় একটা বাড়ির সামনে গাড়ি আসতেই ইমরান বলে উঠল ,”এই দাঁড়াও ,দাঁড়াও” বলে নেমে ডিগি থেকে লাগেজ বের করে আরাধ্যা যে জানলার সিটে বসেছিল সেখানে এসে বলল,”এই যে বুনু খালি জমিদার বান্ধবীর বাড়িতে থাকলে হবে না। এই নায়েবের বাড়িতেও আসতে হবে কিন্তু। এটা আমার বাড়ি। টাটা।কাল ভোরে দেখা হচ্ছে। ”
ইমরান বাড়িতে ঢুকে যেতেই গাড়ি আবার চলতে শুরু করল।লীনা মুখ ভার করে জানলার দিকে চেয়ে রইল।
–ভাইয়ার বাড়ি এখানে?
–হ্যাঁ। ও আর লীনা ছোটোবেলা থেকে একইসঙ্গে বড় হয়েছে। পড়াশোনা ও একসাথে। শুধু কলকাতায় পিজিটা আলাদা।
–ও কিসব বলছিল জমিদার,নায়েব…
–আসলে লীনাদের পূর্বপুরুষরা জমিদার ছিলেন এখানকার।আর ইমরানের পূর্বপুরুষরা নায়েব ছিলেন।তাই মজা করে অমনভাবে বলল।
–আচ্ছা আকাশলীনা তোর পূর্বপুরুষরা কি নরোত্তম সিংহর সাথে রিলেটেড?
আকাশলীনা কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলল,”হ্যাঁ । তবে তুই কিভাবে জানলি?”
আরাধ্যা স্মিতহাস্যে উত্তর দিল,”ঐ মনে হল। দেবীপুরের ইতিহাসে নরোত্তম সিংহর জমিদারি সম্পর্কে পড়েছিলাম। তাই..”
আকাশলীনা কিছুটা মজার স্বরে বলল,”নীলাশা তোকে একদম ঠিক নাম দিয়েছে। আমিও তোকে ঐতিহাসিক ম্যাডাম বলে ডাকব ভাবছি।”
আরাধ্যা মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি সিংহ বাড়িতে ঢুকে পড়েছে।
ওরা গাড়ি থেকে নামতেই কতগুলো বাচ্চা ছুটে এসে আকাশলীনাকে জড়িয়ে ধরল।
আরাধ্যা অবাক হয়ে চারিদিকে তাকাচ্ছে আর ইতিহাসের এক রঙ্গমঞ্চে উঠে আসার এমন এক অপ্রত্যাশিত সুযোগে শিহরিত হচ্ছে। সে যেন নীলাশা,আকাশলীনা এবং অন্যান্য সকলের উপস্থিতি ভুলে সাড়ে তিনশো বছর আগের প্রাচীন ইতিহাসের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। নানা অজানা কাহিনী যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে।
এমনসময় এক ভদ্রমহিলার কথায়,”তুমিই তো আরাধ্যা, লীনার কাছে তোমার কথা অনেক শুনেছি।মা, তোমার আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?আমি বলেছিলাম গাড়ি পাঠিয়ে দেব।কিন্তু মেয়ের যা মেজাজ ; আমার কথা শুনলে তো?” আরাধ্যা বেড়িয়ে এল সেই কল্পজগৎ থেকে।
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


আরাধ্যা এগিয়ে গিয়ে ভদ্রমহিলাকে প্রণাম করে বলল,”না,আমার কোনো সমস্যা হয়নি মণি মানে আন্টি। ” ভদ্রমহিলা আরাধ্যার গালে হাত রেখে বললেন,”আমি তোমার বান্ধবীর যেমন মা তেমনি তোমারো মা।মণি বলেই ডাকো। খুব ভালো লাগল তোমার মুখ থেকে ঐ ডাকটা।”
আরাধ্যার চোখ ছলছল করে ওঠে।মনে মনে
ভাবে- কতদিন মা আমাকে এমন আদর করে কথা বলেনি।
শ্রীময়ীদেবী বলেন,”এই মেয়ে আজকের দিনে চোখে জল কেন? দ্যাখো তোমার বান্ধবীদের স্বাগত জানিয়ে ঘরে তুললাম। আর তুমি এখনো দাঁড়িয়ে। চলো ,চলো।ইমরান জানতে পারলে বলবে মামণি তার বুনুর খেয়ালটুকু রাখেনি।”
আরাধ্যা দরজার সামনে দাঁড়াতে শ্রীময়ীদেবী ভেতর থেকে বরণডালা নিয়ে এসে ওকে বরণ করতে করতে বললেন, “আমাদের বাড়ির নিয়ম সকলকে বরণ করে ঘরে তুলতে হয়;কেননা মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের
বাস।”
বরণশেষে আরাধ্যা ঢুকতে যেতেই একসাথে পাশাপাশি আরেকটি ছেলে ফোনে কথা বলতে বলতে ওর সাথে ঘরে প্রবেশ করল।
শ্রীময়ীদেবী মনে মনে বলে উঠলেন, “আজকের দিনে দুজনে জোড়ে প্রবেশ করল?দুজনের পা একইসঙ্গে এবাড়ির মাটি স্পর্শ করল?”
এমনসময় আকাশলীনা এসে বলল,”এই আরাধ্যা, চল তোর রুমটা দেখিয়ে দিই। তারপর ফ্রেশ হয়ে এলে বাড়ি আর চণ্ডীমণ্ডপ যেখানে পূজোটা হবে সেটা দেখিয়ে দেব।”
আরাধ্যা বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল,”তোদের বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কেও একটু বলবি?আসলে মানে…”
আকাশলীনা বলে উঠল,”আবার ইতিহাস?বেশ তবে তোকে হিমাদ্রিদার সাথে আলাপ করিয়ে দেব ।উনি এখানে একবছর ধরে আছেন। আমাদের বাড়ির ইতিহাস নিয়ে বই লিখছেন। এবারে ঘরে চল।”
আরাধ্যাকে নিয়ে আকাশলীনা যেতে গেলে শ্রীময়ীদেবী বলে ওঠেন,” আমি আরাধ্যাকে নিয়ে যাচ্ছি। তুই একবার তোর দাদাভাইয়ের সাথে দ্যাখা করে আয়।” কথাটা শুনেই লীনার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক খেলে গেল। “মা, সত্যিই দাদাভাই এসেছে?পাঁচবছর পর বুনুর কথা মনে পড়ল তবে?” বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে দৌঁড়তে দৌঁড়তে উঠে গেল।

শ্রীময়ীদেবী আরাধ্যাকে একটি ঘরে নিয়ে এলেন। ঘরটির প্রতি কোণায় শৌখিনতার ছাপ স্পষ্ট। বিছানা,ড্রেসিংটেবিল,আলমারি ছাড়াও সেন্টার টেবিল আর সিঙ্গেল সোফা রয়েছে।ঘরলাগোয়া ব্যালকনিটা আরাধ্যার সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে যা থেকে জমিদারবাড়ির পেছনটা দেখা যায়। উন্মুক্ত শ্যামলিমা যেন আচ্ছ্বাদিত করে রক্ষা করছে জমিদারবাড়ির এই পেছনদিকটা। সেই শ্যামলিমার বুক চিড়ে সরু সুরকি পথ কোথায় যেন মিশে গেছে।
বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে বিছানায় এসে বসল আরাধ্যা। এরপর একটা নেভি ব্লু কালারের শাড়ি বের করে পড়ে নিল আর কানে ছোট্ট ঝুমকো দুল পড়ে চুলে আলগা খোপা করল।
এমনসময় দরজায় টোকা পড়তেই তা খুলে হাসিমুখে নীলাশা আর আকাশলীনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরাধ্যা বলে উঠল,”আমি রেডি। এবারে চল। তোদের বাড়িটা ঘুরে দেখি।”

ওরা বাড়ি ঘুরে দেখতে লাগল–

“তোরা যেদিক দিয়ে ঢুকলি সেটা হচ্ছে আমাদের বাহিরমহল। আর রয়েছিস অন্দরমহলে। ঐ পাশটাতে পদ্মপুকুর;নামেই পুকুর কিন্তু এত গভীর যে কেউ সাঁতার না জেনে পড়লে হয়েছে। আমাদের এখানে দেবী অম্বিকাকে অষ্টমীতে যে পদ্মসাজে সাজানো হয়; সেই সকল পদ্ম এই পুকুর থেকে নেওয়া হয় “।
” কিন্তু এই পদ্মসাজটা কি?” আকাশলীনার কথার মাঝেই নীলাশা বলে উঠল।
আরাধ্যা শান্তকন্ঠে বুঝিয়ে বলল,”সন্ধিপূজোর সময় পদ্মফুল যেমন যজ্ঞে লাগে।তেমনি বহু স্থানে সেই পদ্মফুলের গয়না দিয়ে দেবী দূর্গাকে সাজানো হয়।সেটাকে মহাসাজ বা পদ্মসাজও বলা হয়। ”
এরপর আকাশলীনা আবার বলতে শুরু করল–
” ঠিক।আর এটা আমাদের দালান। এখানকার উত্তর দিকের ঘরগুলোতে মায়ের পূজোর কাজ যারা করতেন তারা থাকতেন। আমার জন্মের আগের থেকে ঐ ঘরগুলো বন্ধ। আর দক্ষিণ দিকের ঘরগুলোতে বারোজন পুরোহিত থাকতেন। ওরা একসাথে দেবী অম্বিকার পূজো করতেন। ”
আরাধ্যা বলে উঠল,”বন্ধ কেন?” আকাশলীনা বলল,
” দাদু খালি বলে অশুভ ছায়া আছে। আরে একটা মানুষ না হয় মারা গেছিল। তারজন্য এতগুলো ঘর বন্ধ রাখার কোনো মানে আছে?এখনো নাকি রাত্রিবেলা এখান থেকে আওয়াজ পান উনি ঠুক
ঠুক। এমনকি বহু মূল্যবান জিনিসপত্র ও এই ঘরে রয়েছে। সেগুলি বের করার কথাও চিন্তা করেননা।”
আরাধ্যা দক্ষিণ দিকের মাঝের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে এগিয়ে গেল। তাতে ঝুলতে থাকা বড় তালাটাতে হাত দিয়ে মৃদুকন্ঠে বলে উঠল,”স্ট্রেঞ্জ!”
নীলাশা কিছুটা অধৈর্য হয়েই এবারে বলল,”আচ্ছা,পূজোর জায়গাটা দেখতে গেলে হয় না?”
আকাশলীনা তাতে সায় দিয়ে ওদের নিয়ে চন্ডীমন্ডপের দিকে চলে গেল। তখনও চন্ডীমন্ডপে শেষ মূহুর্তের কাজ চলছে; প্রস্তুতির চূড়ান্তমূহুর্তে ওরা এসে দাঁড়াল সেখানে। ঠাকুরের জায়গাটা কোড়া শাড়ি দিয়ে ঢাকা;কাল চক্ষুদানের পর সরানো হবে সেই আবরণ।
টেরাকোটার সূক্ষ্ম কাজ দেখে অভিভূত হয়ে গেল ওরা।এমনসময় একজন বৃদ্ধ ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,”দিদিভাই এরাই বুঝি তোমার বন্ধু?”
–হ্যাঁ দাদু। ও আরাধ্যা আর ও নীলাশা।
–বাহ!খুব সুন্দর নাম দুজনেরই। খুব মজা করবে কিন্তু। আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবে।
তা হ্যাঁ গো দিদিভাই ওদের লক্ষী – জনার্দন মন্দিরটা ঘুরিয়ে আন না।কাল থেকে ভীষণ ভিড় হবে। অত ভিড়ের মধ্যে শান্তিতে দেখতে পারবেনা।আজ থেকে গর্ভগৃহে পূজোর এ কয়টা দিন শুধু আমাদের যাওয়ারই অনুমতি আছে ভোগ দিতে যাওয়ার জন্য । ওরা একবারে দেখে আসুক।
–আচ্ছা দাদু।
——–‌‌‌‌‌———————————————————
জমিদার বাড়ির পাশেই কিছুটা দূরত্বে একখণ্ড সবুজের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলা বাংলার আটচালা স্থাপত্যের নিদর্শন জোড়া শিবমন্দির আর মাঝে দোলমঞ্চ। তার বাঁদিকের সরু পথ ধরে খানিকটা এগোতেই ,বাংলার আটচালা আর ওড়িশার রেখদৌলের অনবদ্য শিল্পীশৈলীর প্রতিভূস্বরূপ লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির এর কারুকার্য দেখে ,মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল আরাধ্যা আর নীলাশা।
ধীরে ধীরে মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকে দেখতে লাগল দেয়ালজুড়ে পোড়ামাটির কারুকার্য; শ্রীকৃষ্ণের শৈশবের বেশ কিছু কাহিনী চিত্রণ করা রয়েছে। শেষ দেওয়ালদুটোর সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল আরাধ্যা। কিছুটা ভ্রূ কুঁচকে দেখতে লাগল ছবিদুটো।

“কি দেখছেন এত মনোযোগ দিয়ে? আর আপনাকে তো আগে দেখিনি। এখানে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করেছেন কেন?” এক পুরুষকন্ঠের প্রশ্নে আরাধ্যা কিছুটা চমকে ওঠে পেছন ফিরে দেখে,
ছ- ফুটের ,দোহারা চেহারার এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে রয়েছেন;চোখে ভয়মিশ্রিত কৌতুহল বিরাজমান।পকেট থেকে তার ম্যাগনিফাইং গ্লাস উঁকি দিচ্ছে।

আরাধ্যা কিছু বলার আগেই আকাশলীনা ওদের দিকে এগিয়ে এসে বলে,”আরাধ্যা উনিই হিমাদ্রি সেন। ইতিহাসমঞ্চের এক সদস্য। উনিই আমাদের বাড়ির ইতিহাসের উপর বই লিখছেন। আর হিমাদ্রিদা ও আমার বান্ধবী আরাধ্যা।কিন্তু তুমি এখন এখানে?”
কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হিমাদ্রি ,”না মানে ঐ একটু কাজ ছিল এদিকে তাই ভাবলাম একটু দেখে যাই দেয়ালচিত্রগুলো। এগুলোর বর্ণনাও দিতে হবে তো। তা বান্ধবী, বান্ধবীর মতো থাকলেই ভালো। সব বিষয়ে আগ বাড়িয়ে নাক না গলালেই তার মঙ্গল ” বলে বেড়িয়ে গেলেন।

পরিস্থিতি কিছুটা থমথমে হয়ে যাওয়ায় আকাশলীনা সামাল দিতে বলে উঠল,” কিছু মনে করিস না।উনি একটু অদ্ভুতভাবেই কথা বলেন। বেলা তো অনেক হল;বাড়ি চল খেয়ে নিবি। ”
নীলাশা বলে উঠল, “হ্যাঁ রে আমারো বড় খিদে পেয়েছে।”

শেষ দুপুরে…………………

সিংহবাড়ির সকলে প্রায় দিবানিদ্রা দিচ্ছে।
আরাধ্যা ঘর থেকে বেড়িয়ে,
‘ব্যাপারগুলো বড্ড অদ্ভুত। হিমাদ্রি লোকটাও অত্যন্ত সন্দেহজনক।আর দেয়ালে ওগুলোর মানে কি? ইশ একটা ছবি যদি তুলতে পারতাম ‘
—– এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে পুকুরের একদম ধারে চলে এসেছিল বুঝতেই পারেনি । হঠাৎই পুকুরধারের শ্যাওলায় পা পিছলে পড়ে যেতে গেলেই বলিষ্ঠ দুটো হাত আরাধ্যাকে জড়িয়ে ধরল। কিছুটা ভয় পেয়ে আরাধ্যা চোখ বুজে নিয়েছিল। আরাধ্যা ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকাতেই অপর চোখের গভীরে যেন হারিয়ে গেল। সূর্যের শেষ রক্তিম আভা মেখে যেন দুজনেই এক নতুন জগতে পাড়ি দিয়েছে; যেখানে শুধু তারা দুজনেই আছে।
কিছুক্ষণ পর আরাধ্যা তার বাঁধন ছাড়িয়ে একটু দূরে সরে গেল। সেই সুদর্শন যুবকও ঘোর কাটিয়ে পেছন ঘুরে বলে উঠল,
“একটু দেখে চলতে হয়। পড়ে গেলে কি হত? সাঁতার জানেন কি? ”
“না,জানিনা। আর ধন্যবাদ ” আরাধ্যা স্বাভাবিকভাবে বলতে চাইলেও অদ্ভুত এক ভালোলাগা আর লজ্জা যেন তাকে ঘিরে ধরল।
— বাই দ্য ওয়ে তোমাকে তো আগে দেখিনি। তুমি কে?
–আমি আরাধ্যা। আকাশলীনার বান্ধবী।
–ওহ তুমি বুনুর বন্ধু? আমি আহিতাগ্নি। আহিতাগ্নি সিংহ। নাইস টু মিট ইউ।আর একটু সাবধানে চলাফেরা কোরো।

আহিতাগ্নি চলে যেতেই আরাধ্যা আর ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ,বিছানায় বসে আপনমনেই বলে উঠল,
” এ কেমন অনুভূতি হচ্ছে?এত ভালো লাগছে কেন?কারোর বলা এত সাধারণ কথাগুলোও এত ভালো লাগতে পারে?”

এরপর সন্ধ্যাবেলাটা খুব হইহই করে কাটালো সকলে।যদিও অজান্তেই বারম্বার ওর চোখদুটো আহিতাগ্নির দিকে চলে যাচ্ছিল। আর আহিতাগ্নিও আড়চোখে বারবার দেখে যাচ্ছিল আরাধ্যাকে।

ডিনারের পর সেদিন আর গল্প হল না ওদের।যেহেতু পরের দিন দেবীর চক্ষুদান উপলক্ষে ভোরবেলা সকলকে উঠতে হবে তাই যে যার মতো করে শুয়ে পড়ল।
——————————————————————–
গভীর রাত।চারিদিক নিস্তব্ধ। দরজা খুলে আরাধ্যা বেড়িয়ে এল ব্যালকনিতে। চাঁদের জোছনায় আকাশ যেন রূপোলি সাজে সেজেছে ; তারারা যেন সেই সৌন্দর্যে অনুঘটকের মতো মিশে তার মোহময়ী রূপকে অন্য এক মাত্রা দিয়েছে। বিভোর হয়ে এই দৃশ্যই দেখছিল আরাধ্যা; তার চোখে ঘুম নেই।

” কাল পঞ্চমী। মা লুকিয়ে লুকিয়ে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যে ভোররাতে মাথার সামনে নতুন জামা রেখে যেত। সকালে আমি আর ভাই কত খুশি হতাম নতুন জামা দেখে। তারপর সকাল হতেই নতুন জামা গায়ে পাড়ার খুঁদে ক্লাবের প্যান্ডেলে গিয়ে তদারকি।দুপুরে একথালাতে ভাত মেখে খাইয়ে দিত আমাদের…..বাবা নতুন চুরি এনে দিত….”
–এসব ভাবতে ভাবতেই অজান্তেই আরাধ্যার চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরল সে।

কিছুক্ষণ পর আকাশের দিকে চেয়ে বলে উঠল,
” জানো, আমার এখনো খুব ইচ্ছে করে মাঝেমধ্যে বাবার গলা জড়িয়ে ধরতে। মায়ের কোলে মাথা রেখে শুতে। আচ্ছা, রাতের তারারা মা-বাবার কাছে কি সত্যিই আমি মরে গিয়েছি?”
পরমুহূর্তেই মনে মনে বলে উঠল,”এসব আমি কি ভাবছি?এত সহজে দুর্বল হলে চলবে না…এখনো অনেক লড়াই বাকি।”
এমনসময় হঠাৎই এক ছায়ামূর্তিকে পাঁচিলের গা বেয়ে যেন সরে যেতে দেখল সে । চোখের জল মুছে চশমাটা পড়ে ভালো করে দেখতে যেতেই দেখল ততক্ষণে ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হয়েছে। সন্দিহান হয়ে ঘরে ফিরে আসার সময় আচমকা পায়রার ডাক শুনে থমকে পেছন ফিরতেই দেখে আরেকটা ছায়ামূর্তি ক্ষিপ্র গতিতে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আরাধ্যা দেয়ালের আড়ালে তৎক্ষণাত সরে গিয়ে লোকটার গতিবিধি নজর করে।
ঘরে ফিরে বিছানায় বসে একমনে ঘটনাগুলো সাজাতে থাকে সে।
খানিকক্ষণ পর নিস্তব্ধ পরিবেশ খানখান করে ,এক নারীকন্ঠের “বাঁ-চা-ও” আর্তনাদ আর গুলির “গুড়ুম” শব্দ ভেসে এল।
আরাধ্যা চমকে আবার বেড়িয়ে এল ব্যালকনিতে টর্চ হাতে। টর্চ জ্বালিয়ে দেখতে থাকল কোথার থেকে আসছিল কন্ঠস্বর। কিন্তু আর কোনো শব্দ বা ছায়ামূর্তি ওর দৃষ্টিগোচর হল না।
মনে মনে বলে উঠল,”আপাতদৃষ্টিতে এই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আড়ালে ,হাসিখুশির মাঝেও কিছু তো একটা আছেই; যা সকলের অগোচরে ঘটে চলেছে। কি সেই রহস্য?”
(ক্রমশ)
[আমার ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবেন।
আমার নিজস্ব মোবাইল না থাকাতে মায়ের মোবাইল থেকেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি। তাই অ্যাকাউন্ট একজনের নামে আর লেখা আরেকজনের নামে।]
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ